এক যুগে বারবার লোকসানের ধাক্কায় সেভাবে চলার স্বপ্ন ও বাস্তবতা এখন কৃষকদের আতঙ্কে পরিণত হয়েছে
রংপুরের কৃষকের কাছে আলু ছিল নগদ টাকার ফসল। মৌসুম শেষে আলু বিক্রির টাকাতেই বছরের বেশির ভাগ সময় চলত অনেক পরিবার। কিন্তু গত এক যুগে বারবার লোকসানের ধাক্কায় সেভাবে চলার স্বপ্ন ও বাস্তবতা এখন কৃষকদের আতঙ্কে পরিণত হয়েছে। । কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) রংপুর আঞ্চলিক কার্যালয়ের তথ্য এবং রংপুর কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের বার্ষিক বাজার পর্যালোচনা প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০১৪ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ১২ বছরের ৭ বছরই আলু চাষে লোকসান হয়েছে।
সরেজমিনে দেখাগেছে,স্টিক জাতের ৬২ কেজি ওজনের এক বস্তা আলুর সর্বোচ্চ দাম ৯‘শ টাকা থেকে ৮‘শ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।এতে উৎপাদন ও সংরক্ষণ খরচের তুলনায় ব্যাপক লোকসান গুনতে হচ্ছে আলু চাষীদের। জেলার কাউনিয়ার হরিচরণ শর্মার চাষী জহুরুলের হিসাব অনুযায়ী, এক বস্তা (৬২ কেজি) আলুর উৎপাদন খরচ পড়েছে প্রায় ১ হাজার ৪‘শ থেকে ১ হাজার ৫‘শ টাকা। এর সঙ্গে কোল্ডস্টোরেজ ভাড়া হিসেবে কেজি প্রতি ৬ টাকা হিসাবে ৬২ কেজির জন্য খরচ হয় ৩৭২ টাকা। অন্যান্য খরচ ধরা হয়েছে প্রায় ১৮০ টাকা। সব মিলিয়ে কোল্ডস্টোরেজে আলু রাখার পর্যায় পর্যন্ত প্রতি বস্তায় মোট খরচ দাঁড়ায় আনুমানিক ১ হাজার ৯৫২ থেকে ১ হাজার দুই হাজার টাকা।সেই আলু এখন বাজারে বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৮‘শ থেকে ৯“শ টাকা প্রতি বস্তা দরে।প্রতি বস্তায় চাষীদের লোকসান দাঁড়াচ্ছে প্রায় ৯“শ থেকে এক হাজার টাকা পর্যন্ত।
এনিয়ে রংপুরের আলুচাষিদের মধ্যে চরম হতাশা ও দিশেহারা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। কৃষকদের আশঙ্কা, উৎপাদন খরচের তুলনায় ন্যায্য দাম না পেলে আগামী মৌসুমে আলু চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে।
আলু চাষী ও ব্যবসায়ী মোঃ আবদুল লতিফ, মনসুর ,মানিক, মেঘু বলেন, আলু উৎপাদনে বিপুল টাকা বিনিয়োগের পর কোল্ডস্টোরেজে সংরক্ষণ করে যদি উৎপাদন খরচের অর্ধেকের কাছাকাছি দামে আলু বিক্রি করতে হয় তাহলে কৃষককে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে। এর পরেও আলুতে পচন রোগ ধরেছে।
মিঠাপুকুরের কৃষক হাবিবুর বলেন, সরকার কৃষকদের পাশে না দাঁড়ালে কোল্ডস্টোরেজে সংরক্ষিত বিপুল পরিমাণ আলু নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।পাশাপাশি এমন পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে আলু উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
রংপুর কৃষি বিপণন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত মৌসুমে জেলার ৪২টি হিমাগারে আলু সংরক্ষণ করা হয়েছিল ৪ লাখ ৮৮ হাজার ৬৩৮ মেট্রিক টন। গত ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত খাওয়ার আলু সংরক্ষিত ছিল ২ লাখ ৮৪ হাজার ৬১৭ মেট্রিক টন। গত মৌসুমে ১ লাখ ৬৫ হাজার ৫০০ জন কৃষক ৬৬ হাজার ৪৫০ হেক্টরে আলুর আবাদ করেছিলেন। মোট উৎপাদন হয়েছিল প্রায় ১৯ লাখ ৫৭ হাজার টন আলু।
রংপুর বিভাগীয় আলুচাষি ও ব্যবসায়ী সমিতির সদস্যসচিব বিশ্বজিৎ বণিক বলেন, গত মৌসুমে ৪২ একরে আলু চাষ করে সাড়ে ৭ হাজার বস্তা পেয়েছি। লাভের আশায় ১৭ হাজার বস্তা কিনে হিমাগারে রেখেছি। গত বছর প্রায় ৭০ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। এবার আলু চাষ আর না করার চিন্তা করছি।
রংপুর কৃষক সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক পলাশ কান্তি নাগ বলেন, আলু আবাদ করে কৃষক লাভ তো দূরের কথা যদি উৎপাদন খরচ তুলতে না পারেন। তাহলে তাঁরা খেয়ে-পরে পরিবার নিয়ে বাঁচবেন কীভাবে।
ডিএইর রংপুর অঞ্চলের ভারপ্রাপ্ত অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন,দেশের প্রায় ২৫ শতাংশ আলু রংপুর অঞ্চলে উৎপাদিত হয়।এ অঞ্চলে মোট উৎপাদনের মাত্র ২২ শতাংশ হিমাগারে সংরক্ষণের সুযোগ আছে। উৎপাদিত আলু সংরক্ষণ ও দাম পাওয়া নিয়ে প্রতি বছরই কৃষকরা বিপাকে পড়েন।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট রংপুরের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মোঃ খায়রুল ইসলাম বলেন, সংরক্ষণ প্রক্রিয়াজাতকরণ বাজার ব্যবস্তাপনা ও রপ্তানি কাঠামো শক্তিশালী করা না গেলে কৃষকেরা ধীরে ধীরে আলু চাষে মুখ ফিরিয়ে নিবে।
ইত্তেফাক।