রবিবার, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২১ ভাদ্র ১৪৩৩
সর্বশেষ বিশেষ সংবাদ জাতীয় সারাদেশ আন্তর্জাতিক খেলা বিনোদন বাণিজ্য লাইফস্টাইল লালমনিরহাট মতামত অন্যান্য

চার খুনের নেপথ্যে মাদক, নাকি অন্যকিছু? ৯ দিন পর ডোপ টেস্ট নিয়ে প্রশ্ন


প্রকাশ : (১ দিন আগে)
চার খুনের নেপথ্যে মাদক, নাকি অন্যকিছু? ৯ দিন পর ডোপ টেস্ট নিয়ে প্রশ্ন

রংপুরে চাঞ্চল্যকর চার খুনের ঘটনাটি তাৎক্ষণিক বা মাদকের জেরে কোনো দুর্ঘটনা নয় এটি সম্পূর্ণ সুপরিকল্পিত একটি হত্যাকান্ড। রংপুর জেলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তাঁর পরিবারকে হত্যার এই নির্মম ট্র্যাজেডি ঘিরে পুলিশের তাড়াহুড়ো করে মেলা হিসেব এবং ছড়ানো গুঞ্জন নিয়ে চালানো অনুসন্ধানে উন্মোচিত হয়েছে একাধিক চাঞ্চল্যকর ও অসংলগ্ন তথ্য।এ ঘটনায় ১২দিন পর তিন দফায় সেগুলো  ফরেনসিক ল্যাবে আলামত পাঠানো হয়েছে। সচেতন মহলের অনেক অধরা প্রশ্নের জটে হত্যাকান্ডের রহস্য লুকিয়ে আছে বলে মনে করছেন অভিজ্ঞ মহল।
তদন্ত সংস্থা বলছে, হত্যাকান্ডের শিকার শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের তিনজনের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে রেখেছে সিআইডি। আসামিদের ডিএনএ নেওয়ার পর ফরেনসিক পরীক্ষায় পাওয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ডিএনএ মিলে গেলে এই হত্যাকান্ডের সঙ্গে সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসের সম্পৃক্ততার বৈজ্ঞানিক প্রমাণও চলে আসবে।
সিআইডির রংপুর অফিসের পুলিশ সুপার (ভারপ্রাপ্ত) সুমিত চৌধুরী জানান, ঘটনাস্থল থেকে ঘটনার দিন সিআইডির বিশেষজ্ঞ ইন্সপেক্টর মিল্লাতের নেতৃত্বে ৩৫টিরও বেশি আলামত সংগ্রহ করা হয়। এরপর সব আলামত তদন্ত কর্মকর্তার কাছে হস্তান্তর করা হয়।
সিআইডি ও তদন্ত সংস্থা সূত্রে জানা গেছে, মরদেহ উদ্ধার কার্যক্রমের সময় ঘটনাস্থল থেকে ৩৫টি আলামত সংগ্রহ করেছিল সিআইডি। ১২দিন পর তিন দফায় সেগুলো ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানো হয়েছে। এসবের মধ্যে ফল কাটার চাকু, ইয়াবা সেবনের ফয়েল, সিগারেটের শেষাংশ, নান রুটি, শসা ও খেজুর, বেসিনের দাগ, নিহত শিশু প্রিয়মের খাতায় পাওয়া একটি লেখাসহ সংগ্রহ করা ৩৫টি আলামত রয়েছে।
রংপুর মেট্রোপলিটন গোয়েন্দা পুলিশের উপকমিশনার  সনাতন চক্রবর্তী জানান, গত দুই দিনে তিন দফা সিআইডি থেকে পাওয়া সবগুলো আলামত আদালতের নির্দেশে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে পরীক্ষার জন্য ৩ সেপ্টেম্বর ঢাকার সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানো হয়েছে। এই পরীক্ষার ওপর নির্ভর করে কারাগারে থাকা আসামি সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হবে।
হত্যাকান্ডের পর রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সদ্য বিদায়ী পুলিশ কমিশনার মোঃ আব্দুল মাবুদ দুই তরুণ সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধকে গ্রেপ্তার করে এবং তাদের মাদক সেবনের জেরে খুন করার জবানবন্দি উপস্থাপন করে দ্রুত সাফল্য দেখানোর চেষ্টা করেছিলেন। অনুসন্ধানে পুলিশের এই বর্ণনার সঙ্গে বাস্তবতার অনেক অমিল।ঘটনার দিন রাতে কথিত ইয়াবা সেবনের স্থান অভিযুক্তদের গতিবিধি এবং সীমান্ত নামের এক তরুণের মায়ের দেয়া বক্তব্যের সঙ্গে পুলিশের মূল এজাহারের তফাৎ রয়েছে স্পষ্ট। গণপতি চক্রবর্তীর বাসার ছাদে ওঠার পথেই মাদক সেবনের উপযুক্ত জায়গা থাকা সত্বেও কেন অভিযুক্তরা নিস্তব্ধে একে একে চারজনকে খুন করল এবং প্রতিবেশীরা বিন্দুমাত্র শব্দ পেল না  এ নিয়ে উঠেছে বড় প্রশ্ন উঠেছে। প্রযুক্তির তথ্যানুযায়ী ২১ আগস্ট রাত ৩টা থেকে পরদিন দুপুর পর্যন্ত গণপতি চক্রবর্তী ও অভিযুক্তদের ফোন লোকেশন একই টাওয়ার এলাকায় হলেও একই স্থানে ছিল না।হত্যাকান্ডের আর্থিক কারণ হিসেবে গণপতি স্যারের প্রভিডেন্ট ফান্ডের ১৫ লাখ টাকার গুঞ্জন উঠলেও অনুসন্ধানে জানা গেছে, কাচারী বাজার সোনালী ব্যাংক শাখায় গচ্ছিত সেই প্রভিডেন্ট ফান্ডের একটি টাকাও তিনি তোলেননি।প্রদেয় নথিপত্র অনুযায়ী, এলপিআরে থাকায় তাঁর পেনশনের টাকা পাওয়ারও সুযোগ ছিল না। ফলে অর্থিক স্বার্থে এই খুন, সেই তত্বও জোরালো ভিত্তি পাচ্ছে না।
অন্যদিকে, ঘটনার সময় সিসিটিভি ফুটেজে কোনো অস্বাভাবিক মোটরসাইকেলের আনাগোনা দেখা না গেলেও, গণপতি চক্রবর্তীর ঘরের বিদ্যুৎ সংযোগ পোল থেকে যেভাবে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল, সে বিষয়ে নেসকো বা পুলিশ, কোনো পক্ষই তদন্ত করেনি। নির্দিষ্ট ফিডারে সেদিন মাত্র ১ ঘণ্টা ১৩ মিনিট লোডশেডিং থাকা সত্বেবও পোল থেকে সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকাটি বড় কোনো রহস্যের ইঙ্গিত দেয় কি?
এদিকে, রংপুর মহানগর নাগরিক কমিটির সদস্য সচিব এডভোকেট পলাশ কান্তি নাগ বলেন,ইয়াবা সেবন দেখে ফেলার কারণেই শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ পরিবারের ৪ সদস্যকে নৃশংসভাবে খুন করা হয়েছে মর্মে যখন পুলিশের তরফে শুরু থেকে দাবি করা হয় তখন ঘটনার ৯ দিন পরে ২ আসামীর ডোপ টেস্ট করা হলো কেন? বিজ্ঞ আদালতের আদেশের জন্যই নাকি ডোপ টেস্টে বিলম্ব হয়েছে।প্রশ্ন হচ্ছে-তদন্তকারী কর্মকর্তা ডোপ টেস্টের জন্য কবে বিজ্ঞ আদালতে আবেদন করেছিলো?সত্যিই কি আদালতের অনুমতির জন্য বিলম্ব হয়েছিলো নাকি তদন্তকারী কর্মকর্তার ইচ্ছাকৃত গাফিলতি?এছাড়া  হত্যাকান্ডের ঘটনার ১২ দিন পর পুলিশ কর্তৃক ঘটনাস্থল থেকে ৩৫ টি আলামত জব্দ করে ফরেনসিক টেস্টের জন্য ল্যাবে পাঠানো হয়েছে। ঘটনাস্থলের আলামত জব্দ তদন্ত কার্যক্রমের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ অথচ এক্ষেত্রে বিলম্বের কারণ কি?ঘটনার ১২ দিন পর সংগৃহীত আলামত থেকে আদৌ সঠিক ফলাফল আসবে কি?ইতিপূর্বে আসামীদের পরিবারের পক্ষ থেকে পুলিশের বিরুদ্ধে পানিতে ধুয়ে আলামত নষ্ট করার অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছিলো সেক্ষেত্রেও পুলিশের বক্তব্য সন্তোষজনক মনে হয়নি।এমনকি ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্টতা থাকতে এমন সন্দেহজানক ব্যাক্তিদের কেন জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় আনা হচ্ছে না? হত্যাকান্ডের প্রকৃত রহস্য উন্মোচনে নির্বাহী বিভাগের ভুমিকা নানা কারণে বিতর্কিত হয়েছে ফলে বিচার বিভাগীয় তদন্ত জরুরী বলে মনে করেন তিনি।
জানাগেছে,স্বজন ও ঘনিষ্ঠদের বক্তব্যে স্পষ্ট যে, গণপতি স্যার এই হত্যাকান্ডের আগে চরম নিরাপত্তাহীনতা ও আতঙ্কে ভুগছিলেন। তাঁর চায়ের দোকানদার বন্ধু প্রদীপ এবং শ্যালিকা জানান, শেষ দেড় মাস ধরে তিনি রহস্যজনক কারণে ঘর বন্ধ করে ঘুমাতেন এবং কৌতুকের ছলে নিজের জীবননাশের আশঙ্কার কথা প্রকাশ করতেন।
রংপুর কারমাইকেল কলেজে অধ্যয়নরত নিহত আগামী চক্রবর্তী মৃত্যুর ঠিক আগে তাঁর এক বন্ধুর সঙ্গে চ্যাটে সরকারি চাকরিপ্রার্থী একজনের বিরুদ্ধে জিডি করার পরামর্শ চেয়েছিলেন।
গণপতি চক্রবর্তীর ব্যবহৃত শেষ ফোনের ইনকামিং-আউটগোয়িং কল রেকর্ড বিশ্লেষণে দেখা যায়, শেষ কলটি এসেছিল ২০ আগস্ট বিকেলে তাঁর স্ত্রীর মোবাইল থেকে, যা ২১ আগস্ট ভোর ৬টা ৫ মিনিটে বন্ধ হয়ে যায়। ধারণা করা হচ্ছে, ওই সময়সীমার মধ্যেই ঘাতকেরা তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছিল।
হত্যাকান্ডের দেড় মাস আগে সিদ্ধার্থদের বাড়ি বিক্রি-ঃ
আলোচিত এ হত্যাকান্ডের ঘটনায় গ্রেপ্তার সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস পিসতুতো ও মামাতো ভাই। সিদ্ধার্থের বাবা বিনয় দাস ও কাকা বিজয় দাসের বাড়ি ছিল গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির লাগোয়া। হত্যাকান্ডের প্রায় দেড় মাস আগে প্রতিবেশী বিধান চন্দ্র দাসের কাছে ৩৫ লাখ টাকায় ওই বাড়ি বিক্রি করে দেন তারা। এ জন্য বায়না চুক্তিও করা হয়। বাড়ির দলিল সম্পন্ন হওয়ার পর ভারতের শিলিগুড়িতে সপরিবারে চলে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল তাদের।
বিধান চন্দ্র দাস স্থানীয় একটি স্বর্ণের দোকানের মালিক তিনি জানান, প্রায় দেড় মাস আগে বায়না সূত্রে জমিটি কিনেছেন।
 সচেতন মহল যা বলছেন-ঃ
শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর পরিবারকে নিঃশেষ করে দেওয়ার মূল রহস্য ও এর নেপথ্যে থাকা প্রকৃত মাস্টারমাইন্ডকে খুঁজে বের করতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখালেখির পাশাপাশি সচেতন মহলও জোরালো দাবি তুলেছেন।
পুলিশের তদন্ত প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও বক্তব্যে অমিল থাকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনের আহ্বান জানিয়েছেন সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন রংপুর জেলা ও মহানগর কমিটি।
সংগঠনটির রংপুর মহানগর সভাপতি অ্যাডভোকেট জোবায়দুল ইসলাম বুলেট বলেন, আসামিদের ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন ছিল, কিন্তু তাদের নেপথ্যে কোনো চক্রান্ত রয়েছে কি না তা বের করা হয়নি। দেরিতে আসামিদের ডোপ টেস্ট করা হলো কেন, এ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এই ঘটনায় যে ব্যক্তি আগাম তথ্য দিয়েছিলেন, তিনি কীভাবে জানলেন, তাও খতিয়ে দেখা হয়নি। ঘটনার সময় বিদ্যুতের সংযোগকে বিচ্ছিন্ন কে করল, তা তদন্তের দাবি রাখে। ১২ দিন পর ফরেনসিক ল্যাবে আলামত পাঠানো হয়েছে, একটি চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলায় এমন গাফলতি কেন হচ্ছে?দেশের পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার উদ্দেশে এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকান্ড হতে পারে আশঙ্কা করে তিনি বলেন, দুর্বল তদন্তের কারণে আসামিরা ফাঁকফোকর দিয়ে পার পেয়ে যেতে পারে। ইতোমধ্যে ওই এলাকার মাদক ব্যবসায়ীরা আত্মগোপনে চলে গেছে। পুলিশ তাদের এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তার করতে পারেনি। জনমনে যেসব প্রশ্ন দানা বেঁধেছে, তার উত্তর পুলিশ কিংবা তদন্ত সংস্থা এখনো বের করতে পারেনি। কেন, কি কারণে এই হত্যাকান্ড সংঘটিত হয়েছে তা জাতির কাছে স্পষ্ট করতে হবে। এর জন্য সময় নিয়ে হলেও তদন্ত প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা এবং গ্রহণযোগ্যতা আনা জরুরি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রাথমিক তদন্তের অসংখ্য ভুল ও তাড়াহুড়োর পর, পরিবারটিকে নিঃশেষ করে দেওয়ার মূল রহস্য ও এর নেপথ্যে থাকা প্রকৃত মাস্টারমাইন্ডকে খুঁজে বের করতে এখন নিখুঁত ও নিরপেক্ষ তদন্তের জোরালো দাবি উঠেছে।
রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-কমিশনার সনাতন চক্রবর্তীও এখন স্বীকার করছেন যে, ঘাতকেরা জবানবন্দিতে মাদক সেবনের কথা বলে তদন্তকারীদের বিভ্রান্ত করেছিল।
প্রসঙ্গত,গত ২২ আগস্ট রংপুর নগরের মাছুয়াপাড়ায় নিজ বাড়ি থেকে গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী (২৫) ও ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তীর (১২) লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় প্রতিবেশী সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসকে গ্রেপ্তার করে।পরে তারা আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দেয়।গণপতি চক্রবর্তী রংপুর জিলা স্কুলের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ছিলেন। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে চাকুরীথেকে অবসরে যান।এ ঘটনায় তাঁর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী বাদী হয়ে মেট্রোপলিটন কোতোয়ালি থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন।

বিজ্ঞাপন