শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২০ ভাদ্র ১৪৩৩
সর্বশেষ বিশেষ সংবাদ জাতীয় সারাদেশ আন্তর্জাতিক খেলা বিনোদন বাণিজ্য লাইফস্টাইল লালমনিরহাট মতামত অন্যান্য

ক্ষমতার পালাবদলের পর সামনে আসছে উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ


প্রকাশ : (১৯ ঘন্টা আগে)
ক্ষমতার পালাবদলের পর সামনে আসছে উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ

ক্ষমতার পালাবদলের পর সামনে আসছে উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ। একটি সরকারের পতন বা মেয়াদ শেষে তার কর্মকাণ্ডের হিসাব-নিকাশ শুরু হওয়া স্বাভাবিক। তবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়কার কর্মকাণ্ড নিয়ে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, নিয়োগ-বাণিজ্য ও অর্থপাচারের একের পর এক অভিযোগ সামনে আসায় সেগুলোর সত্যতা যাচাইয়ের দাবি উঠেছে।

সাম্প্রতিক সময়ে সাবেক যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) এক সংবাদ সম্মেলনে দুদকের উপপরিচালক আকতারুল ইসলাম বিষয়টি জানান।

দুদকের কাছে আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে জমা পড়া অভিযোগের একটি অংশ যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতি ঘিরে। অভিযোগ অনুযায়ী, ৩৮ উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তাকে বদলির বিনিময়ে ৭৬ লাখ টাকা, ১৫০ সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার পদোন্নতির জন্য দেড় কোটি টাকা এবং পছন্দের কর্মস্থলে পদায়নের জন্য আরও ২ কোটি টাকা নেওয়া হয়েছে।

দুদক সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ১১টি অভিযোগ জমা পড়েছে। এর মধ্যে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন প্রকল্পে কমিশন, ঢাকা ওয়াসার এমডি নিয়োগ, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নিয়োগ, টেন্ডারে অর্থ লেনদেন, সরকারি কর্মকর্তাদের পদায়ন ও বিদেশে সম্পদের অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকার সময় উন্নয়ন প্রকল্পের বরাদ্দ থেকে ২৫ শতাংশ অর্থ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। কথিত প্রেস সেক্রেটারি মাহফুজ আলম এসব কার্যক্রম তদারক করতেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। একইভাবে ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে আব্দুস সালামের নিয়োগে ১০ কোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৮ কোটি টাকা দুবাইয়ের আল-আনসারি মানি এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে এবং ২ কোটি টাকা নগদ দেওয়ার দাবি রয়েছে।

২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি মোহাম্মদ এজাজকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নিয়োগেও ২০ কোটি টাকা নগদ এবং বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে ১০ শতাংশ কমিশনের অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার টেন্ডার নিষ্পত্তিতে ১০ থেকে ৩০ শতাংশ কমিশন নেওয়ার দাবিও করা হয়েছে।

জেলা প্রশাসক নিয়োগ নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, আসিফ মাহমুদ ৪৮টি ডিও লেটার দিয়েছিলেন এবং এর মধ্যে ৩৬ জন পরে ডিসি হিসেবে নিয়োগ পান। জেলা অনুযায়ী ডিসি পদায়নে ২ থেকে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেনের অভিযোগও করা হয়েছে।

আসিফ মাহমুদের সম্পদ নিয়েও বিভিন্ন দাবি সামনে এসেছে। ক্রিপ্টোকারেন্সি, দুবাইয়ে বিনিয়োগ ও সুইজারল্যান্ডে ব্যাংক হিসাব থাকার অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব দাবি এখনো প্রমাণিত নয়। সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাব, সম্পদ বিবরণী ও বৈদেশিক লেনদেনের তথ্য যাচাই করেই এর সত্যতা নির্ধারণ সম্ভব।

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কর্মকাণ্ড নিয়েও বিভিন্ন মহল থেকে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। গ্রামীণ-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে বিদেশি বিনিয়োগ, সরকারি অনুমোদন ও সুবিধা পাওয়ার বিষয়ে অভিযোগ রয়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৫ সালের জুনের মধ্যে ফ্রান্সের গ্রামীণ ক্রেডিট এগ্রিকল ফাউন্ডেশন ও গ্রামীণ আমেরিকায় বাংলাদেশ থেকে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ বাড়ার দাবিও করা হয়েছে। এসব অর্থের উৎস ও বিদেশে পাঠানোর অনুমোদন ছিল কি না, তা যাচাইয়ের দাবি রয়েছে।

গ্রামীণ ইউনিভার্সিটির অনুমোদন, গ্রামীণ এমপ্লয়মেন্ট সার্ভিসেসের জনশক্তি রপ্তানি লাইসেন্স, গ্রামীণ টেলিকমের ডিজিটাল ওয়ালেট অনুমোদন এবং গ্রামীণ ব্যাংকের কর সুবিধা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তে স্বার্থের সংঘাত ছিল কি না, সেটিও তদন্তের বিষয় হতে পারে।

আইন উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে আসিফ নজরুলের বিরুদ্ধেও বিভিন্ন অভিযোগ ওঠে। এর মধ্যে সাব-রেজিস্ট্রার বদলির অভিযোগ অন্যতম। অভিযোগ অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রায় ১৮ মাসে ৪০৩ জন সাব-রেজিস্ট্রারের মধ্যে ২৮২ জনকে বদলি করা হয়। তাদের মধ্যে প্রায় ২০০ জন অর্থের বিনিময়ে পছন্দের কর্মস্থলে বদলি হয়েছেন বলেও দাবি করা হয়েছে। ভালো কর্মস্থলে বদলির জন্য ১০ কোটি এবং সাধারণ বদলিতে ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।

২০২৫ সালের ২ জুন দেশের বিভিন্ন আদালতের ২৫২ বিচারককে একযোগে বদলি নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। বদলির পেছনে আর্থিক লেনদেন এবং কয়েক শ কোটি টাকা লেনদেনের দাবিও করা হয়েছে। এ ছাড়া অর্থের বিনিময়ে আসামিদের জামিন নিশ্চিত এবং প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকার সময় নতুন রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স অনুমোদন নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ওই সময়ে ২৫২টি নতুন প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স দেওয়া হয়।

সাবেক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ও তার স্বামী আবু বকর সিদ্দিকীকেও ঘিরে সম্পদ বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক লেনদেনের বিভিন্ন অভিযোগ সামনে এসেছে। এসব অভিযোগ যাচাইয়ে সম্পদ বিবরণী, আয়কর রিটার্ন, ব্যাংক হিসাব ও সম্পত্তির দলিল পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

এ ছাড়া মোস্তফা সরয়ার ফারুকী, নুরজাহান বেগম ও আদিলুর রহমান খানসহ আরও কয়েকজন সাবেক উপদেষ্টার বিরুদ্ধেও দুদকে অভিযোগ দেওয়ার দাবি রয়েছে।

তবে অভিযোগ জমা পড়া এবং অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়। আবার অভিযোগ থাকার কারণে তদন্ত না করাও জবাবদিহির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধান শুরু হওয়ায় এখন প্রশ্ন—অন্তর্বর্তী সরকারের পুরো সময়ের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোও কি একইভাবে যাচাই করা হবে?

সরকারপ্রধান, উপদেষ্টা, আমলা কিংবা অন্য কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে গিয়ে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। অভিযোগ সত্য হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা এবং প্রমাণ না মিললে দায়মুক্তি—দুই ক্ষেত্রেই স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি কোনো ব্যক্তি বা দলের নয়; প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্রের ক্ষমতা ব্যবহার করে কেউ ব্যক্তিগত সুবিধা নিয়েছিল কি না। এর উত্তর রাজনৈতিক বক্তব্যে নয়, বেরিয়ে আসা উচিত তদন্তের নথি ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ থেকে।

বিজ্ঞাপন