বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬, ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
সর্বশেষ বিশেষ সংবাদ জাতীয় সারাদেশ আন্তর্জাতিক খেলা বিনোদন বাণিজ্য লাইফস্টাইল আইন-আদালত মতামত অন্যান্য
/ জাতীয়

তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের রোডম্যাপ আসছে দেড় মাসে, ৮ সদস্যের কমিটি গঠন


প্রকাশ :

দেশের উত্তরাঞ্চলের লাখো মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের কার্যক্রম নতুন গতি পেয়েছে। প্রকল্পটির বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে নিতে সরকার ৮ সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করেছে। আগামী এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে এই কমিটি একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন ও বাস্তবায়ন রোডম্যাপ সরকারের কাছে জমা দেবে। এরপর সেই প্রতিবেদনের সুপারিশের ভিত্তিতে প্রকল্পের বিভিন্ন ধাপ বাস্তবায়নের কাজ শুরু করা হবে।

বৃহস্পতিবার (৪ জুন) বাংলাদেশ সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তিস্তা অববাহিকায় সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনা বিষয়ে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি।

মন্ত্রী বলেন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা শুধু একটি উন্নয়ন প্রকল্প নয়, এটি উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা, কৃষি, পরিবেশ ও অর্থনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত একটি জাতীয় অগ্রাধিকারমূলক কর্মসূচি। সে কারণেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান  প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়নের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন।

তিনি বলেন, “প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে তিস্তা অববাহিকায় সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হয়েছে। আমরা চেষ্টা করছি কীভাবে দ্রুততম সময়ে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে নেওয়া যায়। এ লক্ষ্যে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে ৮ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগামী এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে তারা একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন জমা দেবে।”

পানিসম্পদমন্ত্রী আরও বলেন, প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর সরকার পুনরায় বসে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া হলেও পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির কাজ দ্রুত সম্পন্ন করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, “এটি অল্প সময়ের কোনো কাজ নয়। একটি বৃহৎ নদীভিত্তিক মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে সময় লাগবেই। তবে আমরা চাই পরিকল্পনা, সমীক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম যত দ্রুত সম্ভব সম্পন্ন করতে, যাতে মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু করা যায়।”

বৈঠকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, তিস্তা নদীকে ঘিরে উত্তরাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের আশা-আকাঙ্ক্ষা রয়েছে। তিস্তা পাড়ের মানুষের জীবনমান উন্নয়ন এবং নদী ব্যবস্থাপনার জন্য কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে।

তিনি বলেন, “আমি নিজেও তিস্তা পাড়ের সন্তান। তিস্তা নিয়ে বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে আমরা সম্পৃক্ত ছিলাম। প্রধানমন্ত্রীও দীর্ঘদিন ধরে এই বিষয়ে সচেতন। নির্বাচনের সময় তিনি যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, সেটিকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাস্তবায়নের জন্য সরকার কাজ করছে।”

দুলু বলেন, বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিকতা ও দৃঢ় অবস্থান স্পষ্ট হয়েছে। তিনি দ্রুততম সময়ে কাজ শুরুর নির্দেশনা দিয়েছেন। তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে উত্তরাঞ্চলের কৃষি, যোগাযোগ, পানি ব্যবস্থাপনা এবং নদীভাঙন প্রতিরোধে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

তিনি আরও জানান, প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রকল্পটি বাস্তবায়নে প্রায় ১২ থেকে ১৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে। এটি দীর্ঘমেয়াদি, প্রায় ১০ বছর মেয়াদি একটি পরিকল্পনা। তবে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তা নিশ্চিত করতে সরকার বিভিন্ন বিকল্পও বিবেচনা করছে।

পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ বলেন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর অঙ্গীকারকে বাস্তবে রূপ দিতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করছে। খুব শিগগিরই প্রকল্পের দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখতে পাবেন দেশের মানুষ।

তিনি বলেন, “তিস্তা পাড়ের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে এই প্রকল্পের বাস্তবায়ন চেয়ে আসছেন। আমরা চাই স্বল্প সময়ের মধ্যেই এমন কিছু কার্যক্রম শুরু করতে, যাতে জনগণ বুঝতে পারেন যে সরকার বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে।”

প্রতিমন্ত্রী জানান, মহাপরিকল্পনার আওতায় কয়েকটি বিষয়কে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে তিস্তা ব্যারাজের সক্ষমতা বৃদ্ধি, পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা উন্নয়ন, নদীর প্রবাহ ব্যবস্থাপনা, সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ এবং নদীকেন্দ্রিক পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা।

তিনি বলেন, “পানি সংরক্ষণ এবং ব্যারাজ ব্যবস্থার উন্নয়নকে আমরা প্রথম অগ্রাধিকার দিচ্ছি। একই সঙ্গে নদীর নাব্যতা, শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রাপ্যতা এবং কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির বিষয়গুলোও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।”

ফরহাদ হোসেন আজাদ আরও জানান, প্রকল্পের কারিগরি বিষয়গুলো মূল্যায়নের জন্য ইতোমধ্যে বিশেষজ্ঞ টিম গঠন করা হয়েছে। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় পর্যায়ের মন্ত্রী ও কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে একটি প্রতিনিধি দল শিগগিরই তিস্তা অববাহিকা এলাকা পরিদর্শন করবে। মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ও স্থানীয় মানুষের মতামতকে গুরুত্ব দিয়েই পরবর্তী পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি জেলার কৃষি, মৎস্য, পরিবেশ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। একই সঙ্গে নদীভাঙন রোধ, জলাবদ্ধতা নিরসন, সেচ সুবিধা বৃদ্ধি এবং শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট কমাতে প্রকল্পটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

উল্লেখ্য, তিস্তা বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আন্তঃসীমান্ত নদী। প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে নদীটির ভাঙন ও বন্যায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়, আবার শুষ্ক মৌসুমে পানির স্বল্পতায় কৃষকরা চরম দুর্ভোগে পড়েন। দীর্ঘদিন ধরে তিস্তা অববাহিকার নদী ব্যবস্থাপনা, পানি সংরক্ষণ, নদীশাসন ও কৃষি উন্নয়নের জন্য একটি সমন্বিত মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে আসছেন উত্তরাঞ্চলের মানুষ। সরকারের সর্বশেষ এই উদ্যোগে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন নিয়ে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে তিস্তা পাড়ের জনপদে।