বৃহস্পতিবার, ০৭ মে ২০২৬, ২৪ বৈশাখ ১৪৩৩
সর্বশেষ বিশেষ সংবাদ জাতীয় সারাদেশ আন্তর্জাতিক খেলা বিনোদন বাণিজ্য লাইফস্টাইল আইন-আদালত মতামত অন্যান্য
/ জাতীয়

লেঃ কর্ণেল কাজী নুরুজ্জামান কেনো ‘বীর উত্তম’ উপাধি গ্রহণ করেননি: সারোয়ার ওয়াদুদ চৌধুরী


প্রকাশ :

মহান মুক্তিযুদ্ধের ২৬ সেপ্টেম্বর ৭ নম্বর সেক্টর কমান্ডার মেজর নাজমুল হক ভারতে এক সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাওয়ার পর লেঃ কর্ণেল কাজী নুরুজ্জামানকে ওই সেক্টরের কমান্ডার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য বীরত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে ‘বীর উত্তম’ খেতাবে ভূষিত করা হলেও, মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রধান কৃতিত্ব গণমানুষের, গণযোদ্ধাদের—এই বিশ্বাস থেকে তিনি আজীবন এ উপাধি গ্রহণ করেননি এবং কোথাও নিজের নামের সঙ্গে এই উপাধি ব্যবহারও করেননি। মুক্তিযোদ্ধা, সাধারণ মানুষ ও অজ্ঞাত শহীদদের যথাযথ মূল্যায়ন হয়নি—এই আক্ষেপ থেকেই তিনি নিজের অবস্থানে অটল ছিলেন।

বীর উত্তম উপাধি গ্রহণ না করার পেছনের অন্যতম একটি ঘটনার বর্ণনা তিনি নিজের স্মৃতিকথায় তুলে ধরেছিলেন। তিনি লিখেছেন, একদিন হঠাৎ দেখলেন এক জীর্ণ বৃদ্ধা মাথায় ঝুড়ি নিয়ে তাঁর দিকে আসছেন। সহযোদ্ধাদের তিনি বললেন, বৃদ্ধা কী নিয়ে এসেছে দেখে আসতে। কিছুক্ষণ পর তিনি নিজেই এগিয়ে গিয়ে ঝুড়ির ভেতর দেখে বিস্মিত ও আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। সেখানে ছিল প্লাস্টিকের অ্যান্টি-পার্সোনাল মাইন। তিনি সঙ্গে সঙ্গে মাইনগুলো নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে নির্দেশ দেন। পরে বৃদ্ধার কাছ থেকে জানা যায়, তিনি ভিক্ষা করে জীবনযাপন করেন এবং একা থাকেন। পাকিস্তানি সেনারা রাতে মুক্তিযোদ্ধাদের চলাচলের পথে কিছু পুঁতে রাখছে দেখে তাঁর সন্দেহ হয়। পরে তিনি গিয়ে সেগুলো কুড়িয়ে আনেন, যেন মুক্তিযোদ্ধাদের ক্ষতি না হয়। কাজী নুরুজ্জামান লিখেছিলেন, এই বৃদ্ধার মতো অসংখ্য সাধারণ মানুষের সাহস ও আত্মত্যাগের সাক্ষী তিনি নিজে। সেই কারণেই তিনি মনে করতেন, একা নিজের বীরত্বের স্বীকৃতি গ্রহণ করা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে ধানমন্ডির ১৩/এ নম্বর বাসায় ছিলেন কাজী নুরুজ্জামান। পাকিস্তানি বাহিনীর পিলখানায় নারকীয় হত্যাযজ্ঞ, নারীদের আর্তনাদ এবং পরদিন ঢাকার ভয়াবহ দৃশ্য তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। এরপরই তিনি সপরিবারে মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের সিদ্ধান্ত নেন। ২৬ মার্চ দুপুরে তাঁর দুই মেয়ে নায়লা ও লুবনা স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র প্রচারের কথা জানালে তিনি তা শোনেন এবং বুঝতে পারেন, দেশজুড়ে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে।

প্রথমে পরিবারকে করটিয়ায় পাঠিয়ে দিয়ে ২৮ মার্চ তিনি জয়দেবপুর হয়ে টাঙ্গাইলে যান দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের কমান্ডার কে এম শফিউল্লাহর সঙ্গে দেখা করতে। পরে ময়মনসিংহে গিয়ে শফিউল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এসময় কে এম শফিউল্লাহ তাঁকে ব্যাটালিয়নের দায়িত্ব নিতে অনুরোধ করেছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধের ৪ এপ্রিল হবিগঞ্জের তেলিয়াপাড়ায় অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক বৈঠকেও উপস্থিত ছিলেন কাজী নুরুজ্জামান। বিদ্রোহী বাহিনীগুলোকে একটি কমান্ড চ্যানেলে এনে সমন্বিতভাবে যুদ্ধ পরিচালনার সিদ্ধান্ত হয় সেই বৈঠকে। সেখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তিনি। পরবর্তীতে মুক্তিবাহিনীর কেন্দ্রীয় দপ্তরে দায়িত্ব পালন করেন এবং মুক্তিবাহিনীর পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।

মে মাসে তাঁকে সভাপতি করে একটি পর্ষদ গঠন করা হয়। একইসঙ্গে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রথম ‘ওয়ার ব্যাচ’ ক্যাডেট নির্বাচনের জন্যও কমিটি গঠন করা হয়। তাঁর নেতৃত্বেই প্রথম ব্যাচের অফিসারদের নির্বাচন সম্পন্ন হয়। পরে ৭ নম্বর সেক্টরে তাঁর নেতৃত্বে গড়ে ওঠে ৮টি সাব-সেক্টর। এই সেক্টরের আওতায় ছিল দিনাজপুরের দক্ষিণাঞ্চল, বগুড়া, রাজশাহী ও পাবনা অঞ্চলসহ উত্তরবঙ্গের বিস্তীর্ণ এলাকা।

অক্টোবর, নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে ৭ নম্বর সেক্টরের বহু গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধে তিনি কখনো নির্দেশনা, কখনো সরাসরি নেতৃত্ব দিয়েছেন। ১৪ অক্টোবর শেখপাড়া সাব-সেক্টরের দুর্গাহরি থানার গলহরির যুদ্ধে তাঁর নেতৃত্বে পাকিস্তানি বাহিনীর দুই কর্মকর্তাসহ ৭৩ জন সৈন্য নিহত হয়।

৬ নভেম্বর তিনি ভোলাহাট সাব-সেক্টরের লেঃ রফিককে মকরমপুর আলীনগর ক্যাম্পে আক্রমণের নির্দেশ দেন এবং নিজেই অপারেশনের নকশা প্রণয়ন করেন। ৭ নভেম্বর মুক্তিযোদ্ধাদের দুর্ধর্ষ আক্রমণে পাকিস্তানি বাহিনী পিছু হটে মহানন্দা নদী পেরিয়ে পালিয়ে যায়। এর ফলে ভোলাহাট থেকে রহনপুর পর্যন্ত প্রায় ১০০ মাইল এলাকা মুক্ত হয়।

১৩ নভেম্বর তাঁর নির্দেশে বগুড়ার সুখানপুকুর স্টেশনের কাছে শিহিপুরে ডিনামাইট বিস্ফোরণে পাকিস্তানি সৈন্যবাহী একটি বিশেষ ট্রেন ধ্বংস করা হয়। এতে প্রায় ১৫০ পাকিস্তানি সৈন্য নিহত হয়। এটি ছিল পাকিস্তানি বাহিনীর ওপর মুক্তিযোদ্ধাদের অন্যতম বড় আঘাত।

১৬ নভেম্বর তিনি ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরকে আলমপুর আম্রকাননে পাকিস্তানি ঘাঁটি আক্রমণের নির্দেশ দেন। লেঃ রফিক ও লেঃ কাইউমের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা ওই ঘাঁটি দখল করতে সক্ষম হন। এছাড়া ১৩ ও ১৪ নভেম্বর হামজাপুর সাব-সেক্টরের ঘনেপুর বিওপির যুদ্ধও তাঁর নির্দেশনায় সংঘটিত হয়, যেখানে পাকিস্তানি বাহিনীর ৩০ সৈন্য নিহত হয়।

২৮ নভেম্বর শাহপুর গড়ের যুদ্ধে তিনি নিজেই নেতৃত্ব দেন। যদিও মুক্তিযোদ্ধারা শাহপুর গড় পুরোপুরি দখল করতে পারেননি, তবুও পাকিস্তানি বাহিনীর ওপর বড় ধরনের আঘাত হানতে সক্ষম হন, যা বিজয়ের পথকে আরও সুগম করেছিল।

মুক্তিযুদ্ধে তাঁর স্ত্রী ডা. সুলতানা জামানও অসামান্য অবদান রাখেন। তিনি নিজ উদ্যোগে ৭ নম্বর সেক্টরের মাহদিপুর সাব-সেক্টরে একটি হাসপাতাল গড়ে তুলেছিলেন।

কাজী নুরুজ্জামানের জন্ম ১৯২৫ সালের ২৪ মার্চ। তাঁর জন্মস্থান নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে যশোর ও পশ্চিমবঙ্গের নদিয়ার চাটদহ গ্রামের উল্লেখ পাওয়া যায়। তাঁর পিতা খান সাহেব কাজী সদরুল ওলা এবং মাতা রতুবুন্নেসা। কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে ১৯৩৯ সালে ম্যাট্রিক এবং ১৯৪১ সালে আইএসসি পাস করেন। পরে একই কলেজে কেমিস্ট্রিতে অনার্স অধ্যয়নকালে রয়্যাল ইন্ডিয়ান নেভিতে যোগ দেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বার্মা ও সুমাত্রায় মিত্রশক্তির পক্ষে যুদ্ধ করেন। ১৯৪৭ সালে ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে দেরাদুনের রয়্যাল ইন্ডিয়ান মিলিটারি একাডেমি থেকে কমিশন লাভ করেন। দেশভাগের পর পূর্ব পাকিস্তানে এসে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন।

১৯৪৯ সালে ইংল্যান্ডে আর্টিলারি কোর্স সম্পন্ন করে পাকিস্তানের নওশেরায় আর্টিলারি সেন্টার অ্যান্ড স্কুলে প্রশিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। ১৯৫৬ সালে মেজর পদে পদোন্নতি পান। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের বিরোধিতা করায় তাঁকে ১৯৬২ সালে ইপিআইডিসিতে প্রেষণে পাঠানো হয়। একই বছর লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদে পদোন্নতি পেলেও পরবর্তীতে পাকিস্তানি আমলাদের সঙ্গে মতবিরোধের কারণে স্বেচ্ছায় চাকরি থেকে অবসর নেন।

সামরিক জীবনের বাইরেও তিনি ছিলেন সব গণআন্দোলনের সামনের সারির মানুষ। ১৯৬২ সালে প্রগতিশীল লেখক ও বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলেন। ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের সময় আবার সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এবং ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

স্বাধীনতার পর তিনি ফ্যাসিবাদবিরোধী গণতান্ত্রিক কমিটি গঠনে নেতৃত্ব দেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে আন্দোলন গড়ে তোলেন। আশির দশকে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সভাপতি ছিলেন। ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধের দাবিতে আন্দোলন করায় সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ তাঁকে কারাবন্দি করেন। ১৯৮৫ সালে গঠিত মুক্তিযুদ্ধ চেতনা বিকাশ কেন্দ্রের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং ২০০৭ সালে সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম গঠনে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

তিনি সাম্রাজ্যবাদ, আগ্রাসন ও প্রতিক্রিয়াশীলতার বিরুদ্ধে সক্রিয় ছিলেন। পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নেও তিনি সোচ্চার ভূমিকা পালন করেন এবং ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চুক্তির সমালোচনা করেন।

কাজী নুরুজ্জামান নিয়মিত লেখালেখিও করতেন। তিনি সাপ্তাহিক ‘নয়া পদধ্বনি’ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। ‘একাত্তরের ঘাতক ও দালালরা কে কোথায়’ গ্রন্থের অন্যতম সম্পাদক ছিলেন তিনি। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে—

‘একাত্তর ও মুক্তিযুদ্ধ: একজন সেক্টর কমান্ডারের স্মৃতিকথা’,

‘মুক্তিযুদ্ধ ও রাজনীতি’,

‘বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতি’ এবং

‘স্বদেশ চিন্তা’।

ঢাকা সিটি করপোরেশন তাঁর নামে পান্থপথের একটি সড়কের নামকরণ করেছে ‘বীর উত্তম কাজী নূরুজ্জামান সড়ক’।

২০১১ সালের ৬ মে ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে বার্ধক্যজনিত কারণে ৮৬ বছর বয়সে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। সৎ, সাহসী, নির্ভীক, নির্মোহ, দায়িত্বশীল ও নিবেদিতপ্রাণ এই দেশপ্রেমিকের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই। তাঁর আত্মার চিরশান্তি কামনা করি।

শোকসন্তপ্ত পরিবার, স্বজন ও গুণগ্রাহীদের প্রতি গভীর সমবেদনা।

লেখকঃ সারোয়ার ওয়াদুদ চৌধুরী