ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যা মামলার তদন্ত শেষে দায়ের করা অভিযোগপত্রে আসামিদের নির্দিষ্ট ভূমিকার বিস্তারিত তুলে ধরেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। মামলায় মোট ১৭ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে, যাদের মধ্যে ১২ জন গ্রেপ্তার হলেও এখনো পাঁচজন পলাতক।
মঙ্গলবার বিকেলে ঢাকা মহানগর পুলিশের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) শফিকুল ইসলাম জানান, এই হত্যাকাণ্ডের তদন্তে আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সাক্ষীর বক্তব্য, ঘটনাস্থলের আলামত, সিসিটিভি ফুটেজ, উদ্ধার করা আগ্নেয়াস্ত্র ও বুলেট এবং ইলেকট্রনিক ডিভাইসের ফরেনসিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এসব তথ্যের ভিত্তিতেই অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে।
ডিবির ভাষ্য অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী ও নির্দেশদাতা হিসেবে সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর তাইজুল ইসলাম চৌধুরী ওরফে বাপ্পীর নাম উঠে এসেছে। ওসমান হাদিকে সরাসরি গুলি করেন ফয়সাল করিম, যাকে সহযোগিতা করেন আলমগীর হোসেন। এই তিনজন বর্তমানে ভারতে আত্মগোপনে রয়েছেন।
তদন্তে আরও জানা গেছে, ফয়সাল করিমের ভগ্নিপতি মুক্তি মাহমুদ তাঁদের আশ্রয় দেন এবং অস্ত্র গোপনে রাখেন। আর ফিলিপ স্নাল নামের এক ব্যক্তি ফয়সালসহ পলাতক আসামিদের সীমান্ত পার হতে সক্রিয়ভাবে সহায়তা করেন।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, নুরুজ্জামান নোমানী ওরফে উজ্জ্বল, সিবিয়ান দিও ও সঞ্জয় চিসিম হালুয়াঘাট সীমান্ত দিয়ে ফয়সাল ও আলমগীরের ভারতে পালিয়ে যেতে সহযোগিতা করেন। ফয়সালের বাবা মো. হুমায়ুন কবির হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত মোটরসাইকেলের নম্বর প্লেট পরিবর্তন, অস্ত্র রক্ষণাবেক্ষণ এবং নরসিংদীতে অস্ত্র সরানোর কাজে যুক্ত ছিলেন। তাঁর মা হাসি বেগম ফয়সাল ও আলমগীরকে আশ্রয় দেন এবং অস্ত্র সংরক্ষণে সহায়তা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
ফয়সালের বোন জেসমিন আক্তারও হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্র গোপনে রাখার পাশাপাশি আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত। আর তাঁর স্ত্রী সাহেদা পারভীন সামিয়া পালিয়ে যাওয়ার খরচ হিসেবে বিকাশের মাধ্যমে ৩০ হাজার টাকা পাঠিয়েছিলেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
এ ছাড়া ফয়সালের শ্যালক ওয়াহিদ আহমেদ সিপু ঢাকা থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্র সংগ্রহ করে নরসিংদীতে নিয়ে যান এবং পরে তা তাঁর পরিচিত মো. ফয়সালের কাছে রাখেন। ফয়সালের বন্ধু মো. কবির হত্যায় ব্যবহৃত মোটরসাইকেল সরবরাহ করেন। বান্ধবী মারিয়া আক্তার লিমা হত্যার পরিকল্পনার বিষয়ে অবগত ছিলেন বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। হত্যার পরিকল্পনায় সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেছে আমিনুল ইসলাম ওরফে রাজুর বিরুদ্ধেও।
ডিবি জানিয়েছে, বর্তমানে প্রাপ্ত তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতেই অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে নতুন তথ্য বা সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে সম্পূরক অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে।
সংবাদ সম্মেলনে শফিকুল ইসলাম আরও বলেন, শরিফ ওসমান বিন হাদি ভিন্ন ধারার রাজনীতি শুরু করেছিলেন। সেই রাজনৈতিক তৎপরতার কারণেই তাঁকে লক্ষ্য করে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। গুলিবর্ষণকারী ফয়সাল করিম ছাত্রলীগের সাবেক নেতা এবং তাঁর সহযোগী আলমগীর আদাবর থানা যুবলীগের কর্মী ছিলেন বলে তদন্তে জানা গেছে।
উল্লেখ্য, শরিফ ওসমান বিন হাদি ঢাকা-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন এবং নিয়মিত গণসংযোগ করছিলেন। গত ১২ ডিসেম্বর জুমার নামাজের পর পুরানা পল্টনের কালভার্ট রোডে রিকশায় থাকা অবস্থায় তাঁকে গুলি করা হয়। মাথায় গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর হামলাকারীরা মোটরসাইকেলে করে পালিয়ে যায়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হলে ১৮ ডিসেম্বর তিনি মারা যান।