সোমবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২৫, ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪৩২
সর্বশেষ বিশেষ সংবাদ জাতীয় সারাদেশ আন্তর্জাতিক খেলা বিনোদন বাণিজ্য লাইফস্টাইল আইন-আদালত মতামত অন্যান্য
/ জাতীয়

কেন শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার ঝুঁকি নেবে না ভারত


প্রকাশ :

ভারতের কাছে পাঠানো সর্বশেষ নোট ভারবালে বাংলাদেশ সরকার সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গত ১৭ নভেম্বর শেখ হাসিনা এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পাঁচ দিন পর এ অনুরোধ পাঠানো হয়। অভিযোগ—গত বছরের জুলাই–আগস্টের ছাত্র আন্দোলন দমনে নির্দেশনা দিয়ে তারা প্রায় ১,৪০০ মানুষের মৃত্যুর দায় এড়াতে পারবেন না।

রায় ঘোষণার পর থেকেই ঢাকা জানিয়ে আসছিল, দিল্লির কাছে প্রত্যর্পণ চাইবে। অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকেও কড়া ভাষায় দুইজনকে দ্রুত বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর আহ্বান জানানো হয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্যাখ্যা—দুই দেশের মধ্যকার প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী ভারত এ অনুরোধ বিবেচনা করতে বাধ্য। তাদের ভাষায়, মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত ব্যক্তিকে আশ্রয় দেওয়া বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ নয় এবং ন্যায়বিচারের বিরোধী।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেন। এরপর থেকে বিভিন্ন সাক্ষাৎকার ও বিবৃতি সেখান থেকেই দিয়েছেন। গত এক বছরে প্রত্যর্পণের দাবি কয়েক দফা তুললেও ভারত কোনো অনুরোধের সরাসরি জবাব দেয়নি। প্রথম নোট ভারবাল গ্রহণের বিষয়টি নিশ্চিত করলেও দ্বিতীয়বার দিল্লি নীরব। আইসিটির রায়ের পরও ভারত শুধু বলেছে—রায়টি খেয়াল করেছে এবং বাংলাদেশে শান্তি ও স্থিতিশীলতার পক্ষে রয়েছে; প্রত্যর্পণ প্রসঙ্গে তারা কিছু বলেনি।

ভারতীয় গবেষকদের অভিমত—দিল্লি এখন কোনো বড় সিদ্ধান্ত নিতে চাইবে না। কারণ বাংলাদেশে বর্তমান সরকারকে ভারত সাময়িক হিসেবে দেখছে। তাদের ধারণা, একটি নির্বাচিত সরকার দায়িত্বে এলে তবেই ভারতের অবস্থান স্পষ্ট হবে।

ভারতে শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর বিরোধিতা রাজনৈতিকভাবেও শক্তিশালী। আওয়ামী লীগের সঙ্গে ভারতের দীর্ঘ সম্পর্ক, মুক্তিযুদ্ধকালীন সহযোগিতা, ১৯৭৫ সালের পর ভারতে আশ্রয়, এবং ক্ষমতায় থাকার সময়ে ভারতের নিরাপত্তা স্বার্থে তার ভূমিকার কারণে তাকে দিল্লি ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবেই দেখে। সেই মিত্রকে মৃত্যুদণ্ডের মুখে ঠেলে দেওয়া ভারতের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি সিদ্ধান্ত।

প্রত্যর্পণ চুক্তি থাকলেও ভারত চাইলে রাজনৈতিক চরিত্রের অপরাধ ধারা ব্যবহার করে এ অনুরোধ ফিরিয়ে দিতে পারে। যদিও হত্যার অভিযোগ এই ধারায় পড়ে না, কিন্তু শেখ হাসিনার সরাসরি সম্পৃক্ততা প্রমাণ করাই সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং। বিচারপ্রক্রিয়ার ন্যায়সংগততা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হতে পারে। এমনকি ভারত ইতিবাচক সাড়া দিলেও পুরো ব্যাপারটি যাবে আদালতের পূর্ণাঙ্গ শুনানিতে—যেখানে শেখ হাসিনার আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ থাকবে।

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে ভারতের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাবিষয়ক স্বার্থ বড় এবং সংবেদনশীল। তাই ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচন সামনে রেখে দিল্লি খুব সতর্ক থাকবে। আরও একটি বিষয় হলো—বাংলাদেশের নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হলে ভারতবিরোধী বক্তব্য রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগানো হতে পারে, যা দুই দেশের সম্পর্ককে বাড়তি চাপের মুখে ঠেলে দিতে পারে।

লেখক: দ্য ডিপ্লোম্যাটের দক্ষিণ এশিয়া সম্পাদক