একসময় দেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে প্রভাবশালী নেত্রী হিসেবে পরিচিত ছিলেন শেখ হাসিনা। দীর্ঘ পথ পেরিয়ে ক্ষমতার শীর্ষে ওঠা, আবার হঠাৎ পতনের পর দেশ ছাড়তে বাধ্য হওয়া—তার রাজনৈতিক যাত্রা এখন এক জটিল পর্যায়ে থেমে আছে।
বর্তমানে তিনি ভারতে অবস্থান করছেন। এই সময়েই বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তার অনুপস্থিতিতে একটি মামলায় মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা হয়। তাকে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে ঢাকা ও নয়াদিল্লির অবস্থান এখনো স্পষ্ট নয়। ভারত জানাচ্ছে তারা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করছে।
২০২৪ সালের ছাত্র–জনতার আন্দোলন দমনের ঘটনায় দায়ী করার লক্ষ্যেই এই বিচার হয়েছে বলে জানায় ট্রাইব্যুনাল। তবে শেখ হাসিনা ও তার ঘনিষ্ঠরা বরাবরই দাবি করে আসছেন—এ ধরনের অভিযোগ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ছাড়া বোঝা সম্ভব নয় এবং তিনি এসব অভিযানে জড়িত ছিলেন না।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মোবাশ্বার হাসান বলেন, গণ–আন্দোলনের উত্থানের সময় নানা পক্ষের চাপ বাড়তে থাকায় তিনি দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। তার ভাষায়, রাজনৈতিক সংকট ও জনরোষ পরিস্থিতিকে দ্রুত জটিল করে তোলে।
১৯৭৫ সালের আগস্টে পরিবারের সদস্যদের হারিয়ে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক পথ শুরু হয় নির্বাসন থেকেই। পরে ১৯৮১ সালে দেশে ফিরে তিনি মূলধারার রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। তিন দশকের বেশি সময় ধরে তার সঙ্গে খালেদা জিয়ার দ্বন্দ্বই বাংলাদেশের রাজনীতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।
২০০৮ সালে আবার ক্ষমতায় ফেরার পর তাকে দেখা যায় আরও কৌশলী ও দৃঢ় অবস্থানে। অবকাঠামো উন্নয়ন, জঙ্গিবাদ দমন ও আঞ্চলিক সহযোগিতায় তার সরকারের অর্জন আছে; একই সঙ্গে মানবাধিকার ও নির্বাচন নিয়ে বিতর্কও বাড়তে থাকে।
সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবি থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন পরে বড় জাতীয় আন্দোলনে রূপ নেয়। সহিংসতায় বহু প্রাণহানির অভিযোগ ওঠে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও উদ্বেগ জানায়। শেষ পর্যন্ত চলমান অস্থিরতার মধ্যেই তার সরকারের পতন ঘটে।
ট্রাইব্যুনালের রায় ঘোষণার পরে বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে হস্তান্তরের আহ্বান জানিয়েছে। কিন্তু ভারত বলছে, মামলাটি ঘিরে রাজনৈতিক ব্যাখ্যার সুযোগ রয়েছে, আর দুই দেশের প্রত্যর্পণ চুক্তিতে রাজনৈতিক মামলার ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমের provisions আছে।
ভারতে দায়িত্ব পালনে অভিজ্ঞ কিছু কূটনীতিক মনে করেন, সব আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত দিল্লি দ্রুত কোনো সিদ্ধান্ত নিতে চাইবে না। অন্যদিকে তার পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে—ভারত তাকে আশ্রয় দিয়ে মানবিক ভূমিকা পালন করেছে।
রায় ঘোষণাকে সামনে রেখে বাংলাদেশে আসন্ন নির্বাচনের আগে রাজনীতিতে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ায় অন্তর্বর্তী সরকারের সামনে চাপ বাড়ছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, বিরোধী দলগুলোর জন্য সুযোগ তৈরি হলেও রাজনৈতিক বিভেদ নিজে থেকেই দূর হবে না।
মোবাশ্বার হাসানের মতে, বাংলাদেশ এখনো ঐকমত্যের রাজনীতিতে পৌঁছায়নি। আওয়ামী লীগ ভবিষ্যতে সংগঠন পুনর্গঠনের চেষ্টা করবে—তবে বর্তমান নেতৃত্বের ছায়া থেকে সরে এসে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা থাকে—এই রায় ও প্রত্যর্পণ–সংক্রান্ত অচলাবস্থা কি দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন মোড় এনে দেবে, নাকি সামনে আরও একটি দীর্ঘ অনিশ্চয়তার সময় অপেক্ষা করছে?