রবিবার, ২২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১০ ফাল্গুন ১৪৩২
সর্বশেষ বিশেষ সংবাদ জাতীয় সারাদেশ আন্তর্জাতিক খেলা বিনোদন বাণিজ্য লাইফস্টাইল আইন-আদালত মতামত অন্যান্য
/ জাতীয়

সংস্কার নিয়ে মতভেদ বিএনপি-জামায়াত-এনসিপির, জাতীয় ঐকমত্য নিয়ে অনিশ্চয়তা


প্রকাশ :

আগামী জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে অন্তর্বর্তী সরকার ও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল, তা সাম্প্রতিক লন্ডন বৈঠকের পর খানিকটা কমেছে বলে মনে করা হলেও, সংস্কার ইস্যুতে রাজনৈতিক ঐকমত্য এখনও বেশ জটিল হয়ে আছে। বিশেষ করে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-এর মধ্যে সংস্কার প্রক্রিয়া, সময় ও বাস্তবায়ন নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য চূড়ান্ত ঐকমত্যে পৌঁছাতে বড় বাঁধা হয়ে উঠেছে।

এই পরিস্থিতি নিয়ে বিবিসি বাংলা সম্প্রতি একটি বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যেখানে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্য তুলে ধরে সংকটের গভীরতা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।

মৌলিক সংস্কার ইস্যুতে গভীর মতবিরোধ

জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের উদ্যোগে চলমান ধারাবাহিক বৈঠকে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে সব দলের মধ্যে আলোচনা হলেও সংবিধান, রাষ্ট্রের কাঠামো, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ, সাংবিধানিক পরিষদ গঠন ও ক্ষমতার ভারসাম্য-সংক্রান্ত বিষয়ে মতানৈক্য প্রকট হয়েছে।

বিএনপি চায়:

  • যেসব বিষয়ে ঐকমত্য হবে, সেগুলো নিয়েই জুলাই সনদ প্রণয়ন।
  • ‘একই ব্যক্তি দুইবারের বেশি প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন না’—এমন প্রস্তাবে বিএনপি একমত নয়।
  • দলীয় প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী একসঙ্গে থাকা নিয়ে দলটির আপত্তি নেই।

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য, বিবিসিকে বলেন: “যেসব বিষয়ে ঐকমত্য হবে, সেগুলো নিয়েই আগাতে হবে। বাকি ইস্যুতে জনগণের রায় নেওয়া যেতে পারে নির্বাচনের মাধ্যমে।”

জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি চায়:

  • নির্বাচনের আগে সংস্কার বাস্তবায়ন।
  • মৌলিক সংস্কার ছাড়া জাতীয় ঐকমত্য অর্থহীন।
  • প্রয়োজনে গণভোটের মাধ্যমে মতপার্থক্যের সমাধান।

হামিদুর রহমান আযাদ, জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল বলেন: “সব দল একমত না হলেও মৌলিক বিষয়গুলো ঠিক করতেই হবে। না হলে তা দেশের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।”

  • সংবিধান পুনর্লিখন না সংশোধন?
  • এখানেও দৃষ্টিভঙ্গিতে বড় পার্থক্য।
  • এনসিপি চায় নতুন সংবিধান।
  • বিএনপি-জামায়াত চায় বিদ্যমান সংবিধানেই সংশোধন।

আখতার হোসেন, এনসিপির সদস্যসচিব বিবিসিকে বলেন, “সংবিধান ঘষামাজা করলে ভবিষ্যতে বাতিলের ঝুঁকি থেকেই যাবে। আমরা চাই মৌলিক ভিত্তির ওপর নতুন সংবিধান হোক।”

কমিশনের অবস্থান

জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি ড. আলী রীয়াজ বিবিসিকে বলেন: “১৬৬টি প্রস্তাব রয়েছে, সবগুলোতে একমত হওয়া সম্ভব নয়। তবে মৌলিক বিষয়গুলোতে ঐকমত্য হলে সেটিই হবে জাতীয় ঐকমত্য।”

তিনি আরও বলেন: “আমরা কাউকে বাধ্য করতে পারব না, তবে আশা করি রাজনৈতিক দলগুলো কিছুটা ছাড় দিলে ঐক্য গড়ে উঠবে।”

নির্বাচনের আগে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ

এ মুহূর্তে মূল চ্যালেঞ্জ:

  • সংস্কার বাস্তবায়নের সময়
  • সরকারের নিরপেক্ষতা
  • ঐকমত্যের ভিত্তি তৈরি

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, বিএনপি আগে যেমন সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে, তেমনি এখন জামায়াত, এনসিপিও সেই প্রশ্ন তুলছে। নাহিদ ইসলাম, এনসিপির আহ্বায়ক বলেন: “মৌলিক বিষয় ছাড়া শুধু পরিপূরক কিছু সংস্কারে ঐকমত্য হলেও তাতে রাষ্ট্র ব্যবস্থার কোনো বাস্তব পরিবর্তন হবে না।”

একদিকে জাতীয় ঐকমত্যের প্রক্রিয়া চললেও অপরদিকে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির ভিন্নমত এই উদ্যোগকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিচ্ছে। যে সংস্কারের কথা বলে বিরোধীরা এতদিন আন্দোলন করে এসেছে, সেই সংস্কার নিয়েই এখন তাদের মধ্যে মতপার্থক্য—এটি নিঃসন্দেহে নির্বাচনের আগে একটি বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ।

তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা, সম্পাদনা ও পরিবেশনা: লালমনিরহাট বার্তা অনলাইন