রবিবার, ২২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১০ ফাল্গুন ১৪৩২
সর্বশেষ বিশেষ সংবাদ জাতীয় সারাদেশ আন্তর্জাতিক খেলা বিনোদন বাণিজ্য লাইফস্টাইল আইন-আদালত মতামত অন্যান্য
/ জাতীয়

রংপুর বিভাগের চারটি চিনিকল লোকসানের অজুহাত ও আধুনিকায়নের নামে চার বছর ধরে বন্ধ


প্রকাশ :

রংপুর বিভাগের চারটি চিনিকল লোকসানের অজুহাত এবং আধুনিকায়নের নামে চার বছর ধরে বন্ধ হয়ে পড়ে আছে।চিনি মিলগুলো রংপুরের শ্যামপুর সুগার মিল, দিনাজপুরের সেতাবগঞ্জ সুগার মিল, গাইবান্ধার রংপুর সুগার মিল ও পঞ্চগড় সুগার মিল। চারটি চিনিকলের শ্রমিক, কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা ছিল লাখের উপরে। মিল বন্ধ থাকায় পরিবার-পরিজন নিয়ে তারা মানবেতর জীবন-যাপন করছেন।

কবে নাগাদ মিলগুলো চালু হবে তা কেউ জানেন না। লোকসানের অজুহাত এবং আধুনিকায়নের নামে এসব চিনিকল বন্ধ করা হলেও চালু করার ব্যাপারে নেই কোনো উদ্যোগ। দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকার কারণে মিলগুলোর সব যন্ত্রাংশই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। রাতের আঁধারে চুরি হচ্ছে সেখানে থাকা বিভিন্ন জিনিস পত্র। এদিকে চিনিকল গুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শুধু স্থানীয় অর্থনীতিই সংকটে পড়েনি, অনিশ্চয়তায় পড়ে রয়েছে লক্ষাধিক মানুষের জীবন ও জীবিকা।

রংপুরের শ্যামপুর চিনিকল ঘুরে দেখা গেছে, কারখানার টিনের চালে তৈরি হয়েছে অসংখ্য ছিদ্র। কোথাও কোথাও আবার পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। মরিচা পড়েছে অধিকাংশ যন্ত্রপাতিতে। আবার কোনোটি বৃষ্টির পানি থেকে রক্ষায় ঢেকে রাখা হয়েছে পলিথিন দিয়ে। এক সময়ের কর্মমূখর শ্যামপুর সুগার মিলের বর্তমান চিত্র এখন খুবই নাজুক। বাইরের চিত্র আরও ভয়াবহ। পুরো কারখানা ঢেকে গেছে ঝোপঝাড়, জঙ্গলে। অলস পড়ে থাকতে থাকতে নষ্টের পথে অসংখ্য যানবাহন। যে কজন কারখানা দেখভালের দায়িত্বে আছেন, তাদেরও বেতন বন্ধ পাঁচ মাস ধরে। অথচ ষাটের দশকে গড়ে ওঠা এসব কারখানাই উত্তরের অর্থনীতির বড় শক্তি ছিল। ২০২০ সালে লোকসানের অজুহাত দেখিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয় দেশের ছয়টি রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকল। যার চারটি রংপুর বিভাগে। তৎকালীন সরকারের আধুনিকায়নের মধ্যদিয়ে এসব সুগার মিল চালুর কথা থকলেও দীর্ঘ সময়ে তার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বন্ধ হওয়া এসব চিনিকলের দৈনিক আখ মাড়াইয়ের সক্ষমতা ছিল গড়ে দেড় হাজার মেট্রিক টন। বছরে চিনি উৎপাদন সক্ষমতা ১১ হাজার মেট্রিক টন। ফলে চাহিদার বড় অংশ জোগান আসতো এসব চিনিকল থেকে।

জানাযায়, রংপুরের শ্যামপুর সুগার মিল ১৯৬৪ সালে ১‘শ একর জমির ওপর গড়ে ওঠে। এর উৎপাদন শুরু হয় ১৯৬৭ সালে। ২০০০ সাল পর্যন্ত চিনির মিলটি লাভজনক থাকলেও পরে লোকসানের মুখে পড়ে। এতে ২০২০-২১ মাড়াই মৌসুমে মিলের কার্যক্রম বন্ধ করে দেয় বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করর্পোরেশন। বন্ধ হয়ে যায় মিল এলাকায় আখ চাষ। 

শ্রমিক নেতাদের অভিযোগ, চিনির বাজার নিয়ন্ত্রণ করতেই বহুজাতিক কোম্পানিগুলো তৎকালীন সরকারের সঙ্গে আঁতাত করে পরিকল্পিতভাবে এসব চিনিকল বন্ধ করেছে যার প্রভাব পড়েছে ভোক্তা পর্যায়ে।রংপুরের শ্যামপুর আখ চাষি কল্যাণ সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক

আতিকুজ্জামান মানিক জানান, করর্পোরেট কোম্পানিগুলো বাজার নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় গুলোর যোগসাজশে বন্ধ করেছে চিনির মিল গুলো।

শ্যামপুর সুগার মিলের ইনচার্জ মোঃ মাসুদ সাদিক জানান, এরই মধ্যে কারখানাগুলোর সক্ষমতা, জনবল সহ নানা বিষয় যাচাই-বাছাই করেছে একটি তদন্ত কমিটি। তাদের সুপারিশের ভিত্তিতে সরকার মিলগুলোর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে। লাখো মানুষের জীবন, জীবিকা ও দেশীয় শিল্প রক্ষার দাবি উঠেছে,‘বন্ধ নয়, যত দ্রæত সম্ভব আধুনিকায়নের মধ্য দিয়ে চিনিকলগুলো চালুর উদ্যোগ নেওয়া হোক।

শ্যামপুর এলাকার আখ চাষি জয়নাল হোসেন বলেন, আমরা বিভিন্ন সময় মিল চালুর জন্য আন্দোলন সমাবেশ করেছি কাজ হয়নি। বর্তমান অন্তর্র্বতী সরকারের মাননীয় প্রধান উপদেষ্টার কাছে আমাদের প্রাণের দাবি হচ্ছে, তিনি যেন চিনিকলটি চালু করে এ অঞ্চলের মানুষকে অর্থনৈতিক দৈন্য থেকে বাঁচান।

এমনই অন্তত ১৫ জন চাষি ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে কারখানাটি বন্ধ থাকায় চিনিকলের অনেক যন্ত্রাংশ চুরি হয়ে যাচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, আখ পরিবহনে এবং কর্মকর্তার কাজে ব্যবহৃত গাড়ির চাকাসহ অন্য যন্ত্রাংশ খুলে বিক্রি করা হচ্ছে।চিনিকলের অফিসিয়াল আসবাবপত্র অনেকে ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করছেন। মিল চত্বরে থাকা গাছ কেটে লুটপাট করা হচ্ছে।

রংপুরের শ্যামপুর আখচাষি কল্যাণ কমিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আলতাফ হোসেন

বলেন, চিনকলটি বন্ধ থাকায় এলাকার অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়েছে। আমাদের এই অঞ্চল থেকে কোটি কোটি টাকা মানি সার্কুলার হতো। গ্রামে থেকেও আমরা শহুরে জীবন যাপন করতাম।বর্তমানে দারিদ্র্যসীমার নিচে আমরা বাস করছি। অন্য ফসল চাষ করে আখচাষিরা সংসারের খরচ চালাতে পারছেন না। আমাদের একমাত্র প্রাণের দাবি শ্যামপুর চিনকল পুনরায় চালু করা হোক।এই অঞ্চলের কৃষক, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের অর্থনৈতির মুক্তি ঘটবে। এতে করে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার হবে।

শ্যামপুর চিনিকলের দায়িত্ব প্রাপ্ত কর্মকর্তা (ইনচার্জ) মাসুদ সাদিক বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা চিনিকলটি পুনরায় চালুর দাবি জানিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে অসংখ্যবার আবেদন করেও ফল হয়নি। আমরা কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিয়মিত বেতন ভাতাও পাচ্ছি না। এ অবস্থায় পরিবার পরিজন নিয়ে ভীষণ কষ্টে আছি।অন্তর্র্বতী সরকার চিনিকলটি চালু করবে এমন আশায় বুক বেঁধে আছি।’ ‘যন্ত্রাংশ পড়ে থাকলে নষ্ট হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়।চিনিকল চত্বরে চুরি ও গাছপালা লুট যেন না হয়, সে ব্যাপারে আমরা সজাগ রয়েছি।’