সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১৮ কার্তিক ১৪৩৩
☰ সর্বশেষ বিশেষ সংবাদ জাতীয় সারাদেশ আন্তর্জাতিক খেলা বিনোদন বাণিজ্য লাইফস্টাইল লালমনিরহাট মতামত অন্যান্য

পদ্মা ব্যারাজে বদলে যাবে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের চিত্র, উপকৃত হবেন ৭ কোটি মানুষ


প্রকাশ : (৩ ঘন্টা আগে)
পদ্মা ব্যারাজে বদলে যাবে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের চিত্র, উপকৃত হবেন ৭ কোটি মানুষ

ঢাকা, ২ নভেম্বর ২০২৬: দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পানিসংকট, লবণাক্ততা, নদীভাঙন ও জলাবদ্ধতা নিরসনে বড় সম্ভাবনা তৈরি করছে সরকারের পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশের চার বিভাগের ১৯টি জেলার প্রায় ৭ কোটি মানুষ প্রত্যক্ষভাবে উপকৃত হবেন। পাশাপাশি কৃষি উৎপাদন, মৎস্যসম্পদ, নৌ-চলাচল, পরিবেশ ও অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) হিসাব অনুযায়ী, পদ্মা ব্যারাজ বাস্তবায়িত হলে বছরে প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার টন মাছের উৎপাদন বাড়বে। সব মিলিয়ে বছরে ৭ হাজার ১২৭ কোটি টাকার অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়া যাবে।

পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ বাসসকে জানান, পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের কাজ এগিয়ে চলছে। এ জন্য পানি ভবনে পৃথক অফিস স্থাপন করা হয়েছে। গত ১১ সেপ্টেম্বর রাজবাড়ীর পাংশার হাবাসপুর এবং ২৫ অক্টোবর পাবনার সুজানগর উপজেলার সাতবাড়িয়া কাঞ্চনপার্ক এলাকায় প্রস্তাবিত প্রকল্পের স্থান পরিদর্শন করা হয়েছে।

তিনি বলেন, সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ফেব্রুয়ারি মাসে প্রধানমন্ত্রী পদ্মা ব্যারাজের দৃশ্যমান কাজের উদ্বোধন করবেন।

প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পানিসংকট ও লবণাক্ততা কমবে। কৃষি ও অর্থনীতিতে ব্যাপক ইতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং কয়েক লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, পদ্মা নদীর পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদ-নদীগুলো নাব্যতা সংকট, পলি জমা ও লবণাক্ততার সমস্যায় ভুগছে। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে পদ্মার পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতি, চন্দনা-বারাশিয়া, ইছামতী ও বড়াল নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে।

এর প্রভাবে কৃষি, মৎস্যসম্পদ, নৌ-যোগাযোগ ও সুন্দরবনের জীববৈচিত্র‍্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। উপকূলীয় অঞ্চলে সুপেয় পানির সংকটও বাড়ছে। অন্যদিকে বর্ষা মৌসুমে পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হওয়ায় বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দিচ্ছে।

গত ১৩ মে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রাথমিকভাবে ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা বরাদ্দ অনুমোদন করেছে সরকার। সম্পূর্ণ অর্থায়ন করা হবে সরকারি তহবিল থেকে। চলতি বছরের জুলাইয়ে কাজ শুরু হয়ে ২০৩৩ সালের জুনে প্রকল্পটি শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।

প্রকল্পের আওতায় রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলায় পদ্মা নদীর ওপর ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ ব্যারাজ নির্মাণ করা হবে। এতে থাকবে ৭৮টি পানিনিষ্কাশন কপাট, ১৮টি তলদেশ নির্গমন পথ, দুটি ফিশ পাস, নৌ-লক, গাইড বাঁধ ও অ্যাপ্রোচ বাঁধ। ব্যারাজে প্রায় ২ হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি সংরক্ষণের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি ১১৩ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থাও থাকবে।

প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বৃহত্তর কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, যশোর, খুলনা, বরিশাল, পাবনা ও রাজশাহী অঞ্চলের প্রায় ২৮ লাখ ৮০ হাজার হেক্টর কৃষিজমিতে সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি গঙ্গা-কপোতাক্ষ (জি-কে) সেচ প্রকল্প ও প্রস্তাবিত উত্তর রাজশাহী সেচ প্রকল্পেও পানি সরবরাহে সহায়তা করবে।

বুয়েটের বন্যা ও পানি ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মাশফিকুস সালেহীন বাসসকে বলেন, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লবণাক্ততার কারণে সুপেয় পানির সংকট রয়েছে। ভবিষ্যতে এ সংকট আরও বাড়তে পারে। পাশাপাশি পলি জমার কারণে জলাবদ্ধতার সমস্যাও বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে ওই অঞ্চলে মিঠাপানির সরবরাহ ও প্রবাহ নিশ্চিত করা জরুরি। পদ্মা ব্যারাজ এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

তিনি বলেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীব্যবস্থা পুনরুজ্জীবিত হওয়ার পাশাপাশি পানি ও মাটির লবণাক্ততা কমতে পারে। তবে নির্মাণের ক্ষেত্রে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, পলি জমা, নদীভাঙন এবং পরিবেশগত ভারসাম্যের বিষয়গুলো সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

সাংস্কৃতিক প্রতিমন্ত্রী ও পদ্মা ব্যারাজ-দ্বিতীয় পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন জাতীয় কমিটির সভাপতি আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম বলেন, পদ্মা ব্যারাজ জাতীয় জীবনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফারাক্কা বাঁধের প্রভাবে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি, নৌ-চলাচল, সুপেয় পানির প্রাপ্যতা ও সুন্দরবনের জীববৈচিত্র‍্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এসব সমস্যা মোকাবিলায় পদ্মা ব্যারাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

তিনি আরও বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান প্রথম পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। পরে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ২০০৪ সালের দিকে এ উদ্যোগ পুনরায় সামনে আনেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কাজ এগিয়ে যাচ্ছে।

প্রকল্পের আওতায় খুলনা বিভাগের কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, মাগুরা, যশোর, নড়াইল, বাগেরহাট, খুলনা ও সাতক্ষীরা; ঢাকা বিভাগের রাজবাড়ী, ফরিদপুর ও গোপালগঞ্জ; রাজশাহী বিভাগের পাবনা, রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং বরিশাল বিভাগের পিরোজপুর জেলায় সুবিধা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।

এ ছাড়া সুন্দরবনে মিঠাপানির প্রবাহ নিশ্চিত করা, লবণাক্ততা কমানো, জীববৈচিত্র‍্য সংরক্ষণ, যশোরের ভবদহসহ বিভিন্ন এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসন, ভূগর্ভস্থ পানির পুনঃসঞ্চয়ন এবং আর্সেনিক দূষণ কমানোর লক্ষ্যও রয়েছে প্রকল্পটিতে।

সংশ্লিষ্টদের আশা, পদ্মা ব্যারাজ বাস্তবায়িত হলে দীর্ঘদিনের পানিসংকট ও পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে কৃষি, অর্থনীতি ও জনজীবনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলবে।

সূত্র: বাসস

বিজ্ঞাপন