লালমনিরহাটের পাটগ্রামে বিদ্যুতায়িত হয়ে একজন ও আঘাত পেয়ে অপরজনের মৃত্যুর ঘটনাকে হত্যাকাণ্ড দেখিয়ে প্রায় ১১ মাস পর পাটগ্রাম থানায় দু’টি পৃথক হত্যা মামলা করা হয়েছে। এ মামলার একটির বাদীকে চিনেন না শহীদ ব্যক্তির স্ত্রী। অপর মামলার বাদীকে চিনেন না শহীদ ছেলের পিতা- মাতা।
জানা গেছে, এ বছরের গত ৩০ জুন পার্শ্ববর্তী হাতীবান্ধা উপজেলার সিংগীমারী গ্রামের আব্দুস সালামের ছেলে মোশারফ হোসেন বাদী হয়ে পাটগ্রাম থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দুপুরে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আন্দোলনের সময় পাটগ্রাম উপজেলার কাউয়ামারী বাজারে আসামীরা মোশারফ হোসেন প্রধান কলেজের গেটের বৈদ্যুতিক খুঁটি ফেলে দিয়ে শিক্ষার্থী আজিজুলকে (১৯) হত্যা করার উল্লেখ করেন তিনি। এতে অজ্ঞাত ৪০ থেকে ৫০ জনসহ জেলার চার উপজেলার ৪৪ জনের নাম আসামী হিসেবে উল্লেখ করা হয়। একইদিন পাটগ্রাম উপজেলার শ্রীরামপুর গ্রামের আলী হোসেন বাদী একই থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় অজ্ঞাত ৫০ থেকে ৬০ জনসহ হাতীবান্ধা এবং পাটগ্রাম উপজেলার ৪১ জনকে আসামী করা হয়। মামলায় ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আনন্দ মিছিল শেষে বিকেলে ফেরার পথে শ্রীরামপুর ইউনিয়নের আউলিয়ারহাট বাজারে ফ্যাসিস্ট সরকারের নেতাকর্মী ও অজ্ঞাত আসামীরা নুরুজ্জামানকে (৪৫) এলোপাতারী মারপিট করে। আহত অবস্থায় প্রথমে পাটগ্রাম হাসপাতালে ও পরে রংপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৮ আগস্ট মারা যায় নুরুজ্জামান।
স্থানীয় সূত্রমতে, ওইদিন কলেজের প্রধান ফটকে বিদ্যুতের তারে জড়িয়ে আজিজুল মারা যান। একইদিন আনন্দ মিছিলের সময় আউলিয়ারহাট বাজারে সড়কে হোঁচট খেয়ে পড়ে আহত অবস্থায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান নুরুজ্জামান। মৃত ব্যক্তিদের উভয় পরিবার প্রথম থেকেই দাবি করে আসছিল, মৃত্যুর ঘটনা নিছক দুর্ঘটনা। কোনো ধরণের পরিকল্পিত ঘটনায় বা হামলায় মৃত্যু নয়।
আজিজুলের বাবা আব্দুর রহিম বলেন, ‘আমার ছেলে একজন কুরআনের হাফেজ। সে বিজয় মিছিল থেকে কলেজের সাইনবোর্ড ভাঙতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যায়। আমরা তাকে দাফন করেছি। রাষ্ট্র তাকে শহীদের মর্যাদা দিয়ে গেজেট প্রকাশ করেছে। ছেলের মৃত্যু একটি দুর্ঘটনা। মৃত্যুর ১০ মাস পর পাটগ্রাম থানার ওসি মিজানুর রহমান আমাদেরকে মামলা করার চাপ দেয়। মামলা করিনি। পরবর্তীতে মোশারফ নামে অপরিচিত একজন লোক বাদী হয়ে মিথ্যা মামলা করেছে। ওই মামলা প্রত্যাহারে আবেদন করেছি।’
মামলার বাদী মোশারফ হোসেন বলেন, ‘শহীদ আজিজুল আমার সহযোদ্ধা ছিলেন। তাঁর পরিবার মামলা করার সাহস পায়নি। পরিবারের নির্দেশে আমি বাদী হয়ে মামলা করেছি। মামলা নিয়ে ব্যবসা করার অভিযোগ ভিত্তিহীন।’
অপরদিকে শহীদ নুরুজ্জামানের মামলার ব্যাপারে তাঁর স্ত্রী সুফিয়া বেগম সাংবাদিকদের বলেন, ‘বাদীকে চিনি না। তাকে মামলা করতে বলিনি। আমার স্বামী মিছিলে গিয়ে আহত হয়ে মারা যায়। মিছিলে হাজার হাজার মানুষ ছিল। আমার স্বামীর কি হয়েছিল, এটা জানিনা। আমি কি মামলা করবো, কার বিরুদ্ধে মামলা করবো। স্বামীর লাশ না তুলতে আদালতে আবেদন দিয়েছি।’
এই মামলায় স্থানীয় বিএনপির ৫ থেকে ৭ জন নেতাকর্মীকেও আসামী করা হয়েছে।
নুরুজ্জামান হত্যা মামলার ২৭ নম্বর আসামী শ্রীরামপুর ইউনিয়ন কৃষকদলের সহসভাপতি হিটলার হোসেন বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনে ফ্যাসিস্ট হটাতে আন্দোলন করেছি। অথচ সেই আন্দোলনে হত্যা মামলায় আমাকে আসামী করা হয়েছে।’
মামলার বাদী আলী হোসেনও মামলা প্রত্যাহার চেয়ে থানার ওসি, জেলা পুলিশ সুপার, পুলিশের আইজিকে আবেদন দিয়েছেন।
আলী হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি কারও নাম বলিনি, এমনকি কারা ঘটনার সাথে জড়িত তাও জানি না। কিন্তু মামলায় যাদেরকে আসামী করা হয়েছে, আমি তাদেরকে চিনি না। এজন্য আমি আদালতের কাছে মামলা প্রত্যাহারের আবেদন করেছি।’
পাটগ্রাম থানার ওসি মিজানুর রহমান বলেন, ‘পাটগ্রাম থানায় বাদী মামলা দিলে তো আমাকে নিতে হবে। মামলা প্রত্যাহারের আবেদন আমি পাইনি।’