রবিবার, ২২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১০ ফাল্গুন ১৪৩২
সর্বশেষ বিশেষ সংবাদ জাতীয় সারাদেশ আন্তর্জাতিক খেলা বিনোদন বাণিজ্য লাইফস্টাইল আইন-আদালত মতামত অন্যান্য
/ বিশেষ সংবাদ

পাটগ্রামে প্রসবকালীন গাফিলতিতে প্রসূতি মায়ের মৃত্যুর অভিযোগ


প্রকাশ :

লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার জোংড়া মডেল ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে প্রসবকালীন গাফিলতির কারণে এক প্রসূতি মায়ের মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। 

ওই প্রসূতি মায়ের নাম ঝর্ণা রাণী। তাঁর স্বামীর নাম নিরঞ্জন রায়। বাড়ি উপজেলার জোংড়া ইউনিয়নের সরকারেরহাট এলাকায়। ১১ জুন রংপুরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওই প্রসূতির মৃত্যু হয়। 

অভিযোগ উঠেছে ওই স্বাস্থ্য কেন্দ্রের পরিদর্শিকা চিনু বালা রায় ও আয়া রত্না রাণী প্রসূতি মায়ের সন্তান প্রসবের সময় ও প্রসব পরবর্তী সময়ের চিকিৎসাসেবায় অবহেলা এবং গাফিলতি করেছেন। প্রসূতির পরিবারের দাবি সন্তান জন্ম দেওয়ার আগ মুহূর্তে প্রয়োজনীয় ওষুধ প্রয়োগ না করে অতিরিক্ত ও অপ্রয়োজনীয় ইনজেকশন এবং ওষুধ দিয়ে চাপ দিয়ে বাচ্চা প্রসব বা বের করেছেন। এতে প্রসূতি ঝর্ণার টানা/অনবরত বমি ও রক্তক্ষরণ হয়। প্রায় সাত ঘন্টা স্বাস্থ্য কেন্দ্রটিতে রেখে প্রসূতির শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে (প্রসূতিকে) পাটগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্রে পাঠানো হয়। 

জানা গেছে, নীলফামারী জেলার ডিমলা থানার চাপানি গ্রামের রাম দয়াল রায়ের মেয়ে ঝর্ণা রাণীর সাথে ১০ বছর আগে পাটগ্রাম উপজেলার জোংড়া ইউনিয়নের নিরঞ্জন রায়ের বিয়ে হয়। নিরঞ্জন ও ঝর্ণা দম্পত্তির ৮ বছরের এক কন্যা সন্তান রয়েছে। 

উপজেলার একাধিক ডায়াগনস্টিকে ঝর্ণা রাণীর গর্ভ সংক্রান্ত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে বাচ্চার অবস্থান ও শারীরিক অবস্থা ভালো ছিল বলে জানায় তাঁর স্বামী নিরঞ্জন। গত ০৮ জুন/ ঈদের পরদিন প্রসবজনিত লক্ষণ দেখে বেলা ১২ টায় বাড়ির পাশের ওই স্বাস্থ্য কেন্দ্রে যায় ঝর্ণা। এ সময় কেন্দ্রের আয়া রত্না রাণী স্বাভাবিক/নরমাল সন্তান প্রসব হবে জানিয়ে পরিদর্শিকা চিনু বালা রায়কে খবর দেন। চিনু বালা ২ ঘন্টা পর এসে প্রসূতির প্রসবজনিত ব্যথা না থাকায় ইনজেকশন ও অন্যান্য ওষুধ প্রয়োগ করে। এতে বিকেল ৫ টার দিকে ছেলে সন্তান প্রসব করেন ঝর্ণা। ২ ঘন্টা পর শিশুসহ প্রসূতিকে নিয়ে যেতে বলে পরিদর্শিকা ও আয়া। পরবর্তীতে ৩ ঘন্টা পরও প্রসূতিকে ছেড়ে না দিলে সন্দেহ হয় প্রসূতির স্বামী নিরঞ্জনের। 

একপর্যায়ে রাত ১২ টায় পরিদর্শিকা ও আয়া প্রসূতির স্বজনদেরকে জানায়, প্রসূতির বমি ও রক্তক্ষরণ হচ্ছে। পাটগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্রে নিয়ে যেতে হবে। প্রসূতিকে উপজেলায় নিলে সেখানকার কর্তব্যরত চিকিৎসক প্রসূতিকে তাড়াতাড়ি রংপুরে নিতে বলেন। স্বজনেরা রাত তিনটার দিকে ঝর্ণাকে রংপুরে নিয়ে যায়। রংপুরের একটি বেসরকারি (ডক্টরস কমিউনিটি হাসপাতাল) হাসপাতালের আইসিইউতে দুইদিন চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় ১১ জুন ভোরে মারা যায় ঝর্ণা রাণী।      

সরেজমিনে বৃহস্পতিবার (১২ জুন) বিকেলে জোংড়া ইউনিয়নের সরকারেরহাট এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ৮ বছরের কন্যা সন্তান ও তিনদিনের বয়সী ছেলে সন্তানকে নিয়ে শোকে স্তব্ধ স্বামী নিরঞ্জন রায় (৩৫)। 

তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘স্ত্রীর প্রসবের সময় ওরা (পরিদর্শিকা ও আয়া) অনেক অবহেলা করছে। ওই স্বাস্থ্য কেন্দ্রের পাশে আমার দোকান। আমার বন্ধু ও পাশের দোকানদারেরাসহ বার বার গিয়ে বলেছি যদি না পারেন বা কোনো সমস্যা হলে ছেড়ে দেন। উনারা শুধু টালবাহানা করে বলে এটা ওষুধ আনেন, ওটা আনেন এভাবে রাত ১২ টা পর্যন্ত রোগীর বারোটা বাজায়ে ছেড়ে দিয়ে বলে উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্রে নিতে। ওখানে নিয়ে গেলে উনারা (দায়িত্বরত চিকিৎসকেরা) জানায় প্রসূতির অবস্থা খুব খারাপ। জরুরীভাবে রংপুর নিয়ে যান। রংপুরের চিকিৎসক বলেছে প্রসূতিকে প্রসব করানোর সময় ভেতরের অবস্থা খুব খারাপ করা হয়েছে। নাড়ি (নাড়ি) ছিরে গেছে। এ কারণে রক্তক্ষরণ ও বমি বন্ধ করা সম্ভব হয়নি।’ 

তিনি আরো বলেন, আমার দুই শিশু সন্তান মা হারা হলো। আমার জীবন শেষ করে দেওয়া হলো। ৭ ব্যাগ রক্ত সংগ্রহ করে প্রসূতির শরীরে দিই। কিন্তু জোর করে বাচ্চা প্রসব করানোর সময় ওই পরিদর্শিকা ও আয়া আমার স্ত্রীকে আধামরা করে ফেলে। অবশ্যই এ ঘটনার তদন্ত করে গাফিলতিকারীদের শাস্তি চাই।’  

এ ব্যাপারে আয়া রত্না রাণী বলেন, ‘ওই প্রসূতির অবস্থা ভালো ছিল। বিকেলে ছেলে সন্তান স্বাভাবিকভাবে প্রসব করে। কোনোঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা ছিলনা। প্রসবের কিছু সময় পর বমি হলে, ওষুধ খাওয়ানো হয়।’   

পরিদর্শিকা (এফডাব্লিউভি) চিনু বালা রায় বলেন, ‘উপজেলার চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করে ওষুধ ও ইনজেকশন দেওয়া হয়। জোরজুলুম করে প্রসব করানো হয়নি। কোনো গাফিলতিও করা হয়নি।’        

পাটগ্রাম মেডিকেল অফিসার ও উপজেলা পরিবার-পরিকল্পনা কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ডাঃ খুরশিদুল ইসলাম বলেন, ‘প্রসূতি মৃত্যুর ঘটনা জেনেছি। প্রসবকালীন কোনো গাফিলতি হয়েছে, মনে হচ্ছেনা। ছুটিতে আছি। ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রসূতির মৃত্যু ও প্রসবের ব্যাপারে খোঁজ-খবর নিয়ে খতিয়ে দেখা হবে।’