২৭ মে (মঙ্গলবার) ডিমেনশিয়া সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে আলঝেইমার সোসাইটি অব বাংলাদেশ এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যৌথ আয়োজনে “ডিমেনশিয়া: ব্যাপকতা ও সামাজিক সচেতনতা” শীর্ষক একটি সেমিনার এবং ডিমেনশিয়া কেয়ার লেভেল-৩ কোর্স সম্পন্নকারী ১৪ জন প্রশিক্ষণার্থীর মধ্যে সনদপত্র বিতরণ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য ছিল, ডিমেনশিয়া সংক্রান্ত সামাজিক কলঙ্ক (Stigma) ও ভুল ধারণা দূর করা, সচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং কেয়ারগিভারদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা। যাতে করে ডিমেনশিয়া আক্রান্ত ব্যক্তি, তাঁদের কেয়ারগিভার এবং পরিবারের সদস্যরা সম্মানজনক ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন যাপন করতে পারেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ও সাবেক রাষ্ট্রদূত সুপ্রদীপ চাকমা। স্বাগত বক্তব্য রাখেন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (এনডিসি) ড. রাশিদা ফেরদৌস। কি-নোট বক্তব্য উপস্থাপন করেন আলঝেইমার সোসাইটি অব বাংলাদেশের সেক্রেটারি জেনারেল মো. আজিজুল হক।
সভাপতিত্ব করেন আলঝেইমার সোসাইটি অব বাংলাদেশের উপদেষ্টা এবং জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডা. হালিদা হানুম আক্তার, যিনি ডিমেনশিয়া বিষয়ক একটি পাওয়ারপয়েন্ট উপস্থাপনা করেন।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক (অ্যাডজাঙ্কট) ড. ইমদাদুল হক তালুকদার। ঢাকার যত্নশীল প্রশিক্ষক ও ডিমেনশিয়া সেন্টারের স্বেচ্ছাসেবক সালাহুদ দীন আহমেদ, উইমেন অ্যান্ট্রাপ্রেনারস অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশের সভাপতি রোটারিয়ান সেজান খান, ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্রী এবং বাংলাদেশ মেডিকেল স্টুডেন্টস সোসাইটির সদস্য সুমেহরা কবির.
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, পথিকৃৎ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. লিয়াকত আলী, বাংলাদেশ বিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য মো. সাইদুর রহমান খান।
এছাড়াও বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সদস্য, রোটারিয়ান, বিএমএসএস এবং অন্যান্য যুব সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, বর্তমানে দেশে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জনসংখ্যা ১৬ লাখ ৫০ হাজার ১৫৯ জন। এদের মধ্যে অধিকাংশই চট্টগ্রাম বিভাগের তিন পার্বত্য জেলায় বসবাস করেন। বাংলা ভাষায় ডিমেনশিয়া সম্পর্কে কিছু সচেতনতামূলক প্রচার-প্রচারণা থাকলেও, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নিজস্ব মাতৃভাষায় এমন কার্যক্রম নেই বললেই চলে। ফলে সচেতনতার অভাবে আক্রান্ত ব্যক্তি, তাঁদের পরিচর্যাকারী এবং পরিবারগুলি নানাবিধ সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) সেপ্টেম্বর ২০২৩-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রতি বছর প্রায় ১ কোটি মানুষ নতুনভাবে ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছেন। বর্তমানে বিশ্বে প্রায় ৫ কোটি ৫০ লক্ষ মানুষ এই রোগে আক্রান্ত। ২০৩০ সালের মধ্যে এই সংখ্যা বেড়ে ৭ কোটি ৮০ লক্ষ এবং ২০৫০ সালের মধ্যে ১৫ কোটিতে পৌঁছাবে। এর ৭১% লোক নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে বসবাস করবে, যা একটি নীরব মহামারিতে পরিণত হতে চলেছে।
বাংলাদেশে ২০২০ সালে প্রায় ১১ লক্ষ মানুষ ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ছিলেন। ২০৪১ সালের মধ্যে এ সংখ্যা প্রায় ২৪ লক্ষে পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। অথচ, এ বিষয়ে জনসচেতনতা এখনও সীমিত।
এ সময় উপদেষ্টার প্রতি অনুরোধ জানিয়ে বক্তারা আরো বলেন, ডিমেনশিয়া আক্রান্ত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য কৌশলগত পরিকল্পনা গ্রহণের অনুরোধ জানানো হয়। এই পরিকল্পনার মাধ্যমে তাঁদের অধিকার নিশ্চিত, সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা এবং পরিবারগুলোর দুঃখ লাঘব সম্ভব হবে। একইসঙ্গে সাধারণ জনগণের মধ্যেও ডিমেনশিয়া সম্পর্কিত সচেতনতা বৃদ্ধি পাবে এবং ভুল ধারণার অবসান ঘটবে।
অনুষ্ঠানে প্রস্তাবিত পদক্ষেপসমূহ তুলে ধরা হয়:
১. জাতীয় ডিমেনশিয়া নীতিমালা প্রণয়ন: চিকিৎসা, যত্ন ও সামাজিক সহায়তা নিশ্চিত করার জন্য একটি জাতীয় নীতিমালা।
২. জনসচেতনতা বৃদ্ধি: স্কুল, কলেজ ও কমিউনিটিতে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা।
৩. দক্ষ ডাক্তার তৈরি: রোগ নির্ণয় ও ব্যবস্থাপনার জন্য দ্রুত প্রশিক্ষণ প্রদান।
৪. বিশেষায়িত সেবা কেন্দ্র স্থাপন: হাসপাতাল, পুনর্বাসন কেন্দ্র ও ডে কেয়ার সেন্টার নির্মাণ।
৫. দক্ষ কেয়ারগিভার তৈরি: প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ কেয়ারগিভার গড়ে তোলা।
৬. আইনি সহায়তা: আক্রান্তদের অধিকার রক্ষায় আইনগত সহায়তা নিশ্চিত করা।
ডিমেনশিয়া শুধুমাত্র একটি চিকিৎসাজনিত সমস্যা নয়, এটি একটি সামাজিক, অর্থনৈতিক ও আইনি চ্যালেঞ্জও বটে। একযোগে স্বাস্থ্য, সমাজকল্যাণ, শিক্ষা ও আইন মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এর কার্যকর মোকাবেলা সম্ভব নয়। এখনই সময় একটি শক্তিশালী, বাস্তবসম্মত এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক ডিমেনশিয়া নীতিমালা গ্রহণের