রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩
সর্বশেষ বিশেষ সংবাদ জাতীয় সারাদেশ আন্তর্জাতিক খেলা বিনোদন বাণিজ্য লাইফস্টাইল লালমনিরহাট মতামত অন্যান্য

বহুমেরুকরণ বিশ্ব গড়ার পথে ব্রিকসের তাৎপর্য ও গুরুত্ব


প্রকাশ : (১ ঘন্টা আগে)
বহুমেরুকরণ বিশ্ব গড়ার পথে ব্রিকসের তাৎপর্য ও গুরুত্ব

বিশ্ব রাজনীতির গতিপথ আবারও একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল, তার কেন্দ্রবিন্দু ছিল পশ্চিমা শক্তি। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর সেই ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের একক প্রভাব আরও দৃঢ় হয়। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে এসে সেই এককেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার ভিত আর আগের মতো শক্ত নেই। অর্থনীতি, প্রযুক্তি, সামরিক সক্ষমতা, জনসংখ্যা ও বাজার—সব ক্ষেত্রেই বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে নতুন নতুন শক্তিকেন্দ্রের উত্থান ঘটছে। এই পরিবর্তনের বাস্তব প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে ব্রিকসের বিস্তার এবং এর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে।

নয়াদিল্লিতে ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত ১৮তম ব্রিকস সম্মেলন তাই কেবল একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন নয়; পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তাও বহন করছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে সর্বসম্মতিতে নয়াদিল্লি ঘোষণাপত্র গৃহীত হয়েছে। বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার সংস্কার, সন্ত্রাসবাদের নিন্দা এবং একতরফাভাবে যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়ার বিরোধিতার মতো বিষয় ঘোষণাপত্রে স্থান পেয়েছে। ব্রিকসের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যে মার্কিন ডলারের ওপর অতিনির্ভরতা কমিয়ে স্থানীয় ও নিজস্ব মুদ্রার ব্যবহার বাড়ানোর বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। আগামী বছরের সম্মেলন চীনে অনুষ্ঠিত হবে।
এখানেই ব্রিকসের রাজনৈতিক তাৎপর্য। ব্রিকসকে শুধু কয়েকটি উদীয়মান অর্থনীতির জোট হিসেবে দেখলে এর মূল গুরুত্ব ধরা যাবে না। এর গভীরে রয়েছে বিশ্বব্যবস্থার সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামোকে প্রশ্ন করার একটি প্রবণতা। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল, বিশ্বব্যাংকসহ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বহু আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতার কাঠামো সেই সময়কার বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তৈরি হয়েছিল। কিন্তু আজকের পৃথিবীর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলে গেছে। এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার বহু দেশ বিশ্ব অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তাদের প্রতিনিধিত্ব ও প্রভাব এখনো সেই অনুপাতে বাড়েনি। ব্রিকসের উত্থান সেই অসামঞ্জস্যের বিরুদ্ধে একটি নতুন চাপ সৃষ্টি করছে।

বহুমেরুকরণ বলতে তাই একটি শক্তির জায়গায় আরেকটি শক্তিকে বসানো বোঝায় না। চীন যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে বিশ্বের নতুন একক নিয়ন্ত্রক হবে—বহুমেরুকরণের অর্থ এমন নয়। রাশিয়া, চীন, ভারত, ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র, লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকা এবং এশিয়ার বিভিন্ন শক্তিকেন্দ্র নিজেদের স্বার্থ ও সক্ষমতা নিয়ে বিশ্বব্যবস্থায় ভূমিকা রাখবে—এটাই বহুমেরুকরণের মৌলিক ধারণা। অর্থাৎ কোনো একটি রাষ্ট্র বা জোট যেন বিশ্বের অন্য রাষ্ট্রগুলোর ওপর নিজের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক কিংবা সামরিক সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে না পারে, সেই ভারসাম্য তৈরি করাই এর লক্ষ্য হওয়া উচিত।

এই জায়গায় ব্রিকসের সবচেয়ে বড় শক্তি তার বৈচিত্র্য। ব্রিকস কোনো সামরিক জোট নয়, কোনো একক রাজনৈতিক মতাদর্শের সংগঠনও নয়। এর সদস্যদের মধ্যে রাজনৈতিক ব্যবস্থা, অর্থনৈতিক কাঠামো, জাতীয় স্বার্থ এবং পররাষ্ট্রনীতিতে যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে। এই পার্থক্য যেমন ঐক্যের পথে বাধা সৃষ্টি করতে পারে, তেমনি ভিন্ন মত ও স্বার্থের দেশগুলো যদি অভিন্ন স্বার্থের জায়গায় সহযোগিতা করতে পারে, তাহলে সেটিই হতে পারে বহুমেরুকরণের সবচেয়ে বাস্তব ভিত্তি। কারণ বহুমেরুকরণ মানে অভিন্ন মতের পৃথিবী নয়; বরং ভিন্ন মতের রাষ্ট্রগুলোর সহাবস্থান ও পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে সহযোগিতার পৃথিবী।

ব্রিকসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অর্থনৈতিক স্বাধীনতার প্রশ্ন। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন ডলার প্রধান ভূমিকা পালন করে আসছে। ডলারের এই আধিপত্য শুধু বাণিজ্যিক সুবিধার বিষয় নয়; এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক অর্থনীতি, নিষেধাজ্ঞা, ঋণব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রগুলোর নীতিনির্ধারণের ওপরও ক্ষমতার সম্পর্ক জড়িত। ব্রিকসের দেশগুলো নিজেদের মধ্যে স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য বাড়াতে চাইছে। এর অর্থ আগামীকাল থেকেই ডলারের অবসান ঘটবে—এমন নয়। বরং এর অর্থ হলো আন্তর্জাতিক লেনদেনে একক মুদ্রার ওপর অতিনির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা। তবে সেই ব্যবস্থা কার্যকর করতে হলে পারস্পরিক আস্থা, স্থিতিশীল মুদ্রা, শক্তিশালী আর্থিক কাঠামো এবং নির্ভরযোগ্য লেনদেনব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

ব্রিকসের সাফল্য তাই ঘোষণাপত্রে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। বহুমেরুকরণ বাস্তব অর্থে শক্তিশালী হবে তখনই, যখন ঘোষণার সঙ্গে বাস্তব অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে। সদস্য দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য বাড়াতে হবে, স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেনের সুযোগ সম্প্রসারিত করতে হবে, উন্নয়ন অর্থায়নের বিকল্প পথ তৈরি করতে হবে, প্রযুক্তি বিনিময় বাড়াতে হবে এবং খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তায় পারস্পরিক সহযোগিতা গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারের দাবিকে কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগে পরিণত করতে হবে।

তবে এখানেই একটি মৌলিক প্রশ্ন রয়েছে। বহুমেরুকরণ যদি শুধু বৃহৎ শক্তিগুলোর পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার নতুন মঞ্চে পরিণত হয়, তাহলে ছোট ও মাঝারি রাষ্ট্রগুলোর জন্য তার সুফল সীমিত থাকবে। একটি আধিপত্যের জায়গায় একাধিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হলে তাকে প্রকৃত বহুমেরুকরণ বলা যাবে না। বহুমেরুকরণের সার্থকতা তখনই, যখন ছোট রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং উন্নয়নের অধিকারও সমানভাবে স্বীকৃত হবে। কোনো রাষ্ট্রকে বৃহৎ শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পক্ষ বেছে নিতে বাধ্য করা নয়, বরং নিজের জাতীয় স্বার্থ অনুযায়ী স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ তৈরি করাই হওয়া উচিত বহুমেরুকরণ বিশ্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

বাংলাদেশের জন্য এই পরিবর্তনের তাৎপর্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি হওয়া উচিত কোনো একটি শক্তির ওপর নির্ভরতা নয়, বরং জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা। ভারত আমাদের প্রতিবেশী ও গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার, চীন বড় অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন সহযোগী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে রয়েছে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক। তাই বাংলাদেশকে কারও শিবিরে দাঁড় করিয়ে নয়, বরং সবার সঙ্গে সম্পর্ক রেখে নিজের স্বার্থ আদায়ের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। বহুমেরুকরণ বাংলাদেশের জন্য সেই কূটনৈতিক পরিসরকে আরও বিস্তৃত করতে পারে।

বিশেষ করে উন্নয়ন, অবকাঠামো, প্রযুক্তি, জ্বালানি, খাদ্য নিরাপত্তা ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বিষয়ে ব্রিকসের সহযোগিতা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কিন্তু শুধু ঋণ বা প্রকল্প পাওয়ার জন্য কোনো জোটের দিকে তাকালে হবে না। বাংলাদেশের প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থভিত্তিক কৌশল। কোথায় প্রযুক্তি দরকার, কোথায় বিনিয়োগ দরকার, কোথায় বাজার দরকার এবং কোথায় রাজনৈতিক সমর্থন দরকার—তা নির্ধারণ করে বহুমুখী সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে।

পানি ও নদীর প্রশ্নেও বহুমেরুকরণের নতুন দৃষ্টিভঙ্গি বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তিস্তা ও গঙ্গার মতো আন্তঃসীমান্ত নদীকে শুধু দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সংকীর্ণ কাঠামোয় দেখলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান কঠিন। হিমালয় থেকে উৎপন্ন নদীগুলোর পানি, বিদ্যুৎ, কৃষি, মৎস্য, যোগাযোগ ও পরিবেশকে বৃহত্তর নদী অববাহিকার সমন্বিত পরিকল্পনার আওতায় আনা প্রয়োজন। বাংলাদেশ, ভারত, চীন, নেপাল ও ভুটানকে নিয়ে হিমালয় অববাহিকার দেশগুলোর সহযোগিতার একটি নতুন কাঠামো গড়ে উঠতে পারে। বহুমেরুকরণ যদি সত্যিই সহযোগিতার নতুন বিশ্ব তৈরি করতে চায়, তাহলে নদী ও পরিবেশের মতো অভিন্ন সম্পদ ব্যবস্থাপনাও তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়া উচিত।

ব্রিকসের সামনে অবশ্য বড় চ্যালেঞ্জও রয়েছে। সদস্যদের জাতীয় স্বার্থের পার্থক্য, পারস্পরিক অবিশ্বাস, ভূরাজনৈতিক বিরোধ এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতার বৈষম্যকে অতিক্রম করা সহজ নয়। শুধু পশ্চিমা আধিপত্যের বিরোধিতা করলেই একটি নতুন ন্যায়ভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থা তৈরি হবে না। নিজেদের মধ্যেও গণতান্ত্রিক আচরণ, পারস্পরিক সম্মান, স্বচ্ছতা এবং ছোট রাষ্ট্রের স্বার্থের প্রতি সংবেদনশীলতা থাকতে হবে। ব্রিকসকে প্রমাণ করতে হবে যে এটি কেবল পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন ব্যবস্থার সমালোচক নয়; বরং একটি কার্যকর, ন্যায়সংগত ও সহযোগিতামূলক বিকল্প আন্তর্জাতিক কাঠামো নির্মাণে সক্ষম।

নয়াদিল্লি সম্মেলনের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য এখানেই যে, বিশ্ব এখন আর এককেন্দ্রিক বাস্তবতায় স্থির নেই। অর্থনীতি ও রাজনীতির শক্তি বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে। ব্রিকস সেই পরিবর্তনকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছে। আগামী বছর চীনে অনুষ্ঠিতব্য সম্মেলন তাই এই প্রক্রিয়াকে আরও এগিয়ে নেওয়ার একটি সুযোগ। ঘোষণাপত্রের ভাষাকে বাস্তব কর্মসূচিতে রূপ দিতে পারলে ব্রিকসের প্রভাব আরও গভীর হতে পারে।

শেষ পর্যন্ত বহুমেরুকরণ কোনো দেশের বিজয় আর কোনো দেশের পরাজয়ের নাম নয়। এর প্রকৃত অর্থ হলো—বিশ্বের প্রতিটি রাষ্ট্রের নিজের ভাগ্য নির্ধারণের অধিকার থাকবে, বৃহৎ শক্তির প্রতিযোগিতায় ছোট রাষ্ট্রগুলোকে বলির পাঁঠা হতে হবে না, উন্নয়ন হবে পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে এবং আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে পৃথিবীর বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর স্বার্থ প্রতিফলিত হবে। ব্রিকস সেই সম্ভাবনার একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ক্ষেত্র তৈরি করেছে। এখন প্রশ্ন হলো, এই সম্ভাবনাকে তারা কতটা বাস্তব শক্তিতে পরিণত করতে পারে।

বাংলাদেশের জন্যও বার্তাটি স্পষ্ট—কোনো একক শক্তির ছায়ায় নয়, নিজের জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও জনগণের উন্নয়নের অধিকারকে সামনে রেখে বহুমুখী আন্তর্জাতিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। কারণ আগামী দিনের বিশ্ব যদি সত্যিই বহুমেরুকরণে এগোয়, তাহলে সেখানে শুধু বড় শক্তির জন্য নয়, বাংলাদেশসহ ছোট ও মাঝারি রাষ্ট্রগুলোর জন্যও নিজেদের অধিকার ও স্বার্থ প্রতিষ্ঠার নতুন সুযোগ তৈরি হবে।


লেখক: শিক্ষাবিদ, প্রাবন্ধিক ও সভাপতি,তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদ 
ইমেইল : nazrul.hakkani.com

বিজ্ঞাপন