অবৈধ যানবাহনের দাপটে পুরো ট্রাফিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে রংপুর নগরীতে ৮ হাজার লাইসেন্সে চলছে ৫০ হাজার অটোরিকশা
রংপুর নগরীতে অটোরিকশার অবাধ চলাচলে প্রতিদিন যানজট তীব্র আকার ধারণ করেছে। সিটিকর্পোরেশনের প্রয়োজনীয় লোকবলের অভাব ও অবৈধ যানবাহনের দাপটে পুরো ট্রাফিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন নগরবাসী সহ সাধারন মানুষ।
রংপুর সিটি করর্পোরেশন সূত্রে জানা যায়, ২০১২ সালের ২৮ জুন সিটি করপোরেশন প্রতিষ্ঠার পর থেকে দ্রুত নগরীর জনসংখ্যা বাড়তে থাকে। ২০৫ দশমিক ৭ বর্গকিলোমিটারের এই নগরীতে এখন প্রায় ১০ লাখ মানুষ বাস করে। বিপুলসংখ্যক মানুষের চলাচলে নগরীতে নেই সিটি বাস বা গণপরিবহনব্যবস্থা। এ জন্য নগরীতে ৫ হাজার ২৪০টি অটোরিকশা ও ৫ হাজার ১০৭টি চার্জার রিকশার লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে।চার লেনের প্রধান সড়ক হলেও দুই পাশে হকারদের দোকানপাট, ফুটপাত দখল ও যত্রতত্র বাইক বা ভ্যান পার্কিং করায় সড়কগুলো সংকীর্ণ হয়ে পড়ায় পায়ে হেটে চলাচল দুরহ হয়ে পড়েছে।পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে ট্রাফিক বিভাগের জনবল সংকট।২‘শ বর্গকিলোমিটারের এ নগরীতে ট্রাফিক পুলিশের সার্জেন্ট পদমর্যাদার কর্মকর্তা আছেন মাত্র আটজন। তাদের মধ্যে নিয়মিত ছুটিতে থাকেন দু-একজন। মাত্র পাঁচ থেকে ছয়জন সার্জেন্ট দিয়ে পুরো নগরীর ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ অসম্ভব হয়েগেছে।
নগরী ঘুড়ে দেখা যায়, মেডিকেল মোড় থেকে ধাপ, সিটি বাজার, জাহাজ কোম্পানির মোড় এবং শাপলা চত্বর হয়ে স্টেশন ও লালবাগ,সাতমাথা থেকে জাহাজকোম্পানির মোড় পর্যন্ত সড়কগুলোতে প্রতিদিন স্থবিরতা নেমে আসছে।সিটি বাজার থেকে জাহাজ কোম্পানির মোড় পর্যন্ত সকাল ৯টা থেকে রাত ৯-১০টা পর্যন্ত একটানা হাজার-হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশার জানজট লেগে থাকে।
এদিকে নগরীর যানজট কমাতে প্রথম ২০১৯ সালের ২০ মে সিটি বাস সার্ভিস চালু করেন তৎকালীন মেয়র মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা। বিআরটিসির দুটি ডাবল ডেকার বাস দিয়ে একাধিক রুটে যাত্রী পরিবহনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। কিন্তু পরবর্তীতে নগরীতে সিটি বাস চলাচল নিয়ে বেঁকে বসে অটোরিকশা মালিক-শ্রমিক সংগঠন। তাদের বাধার মুখে নগরীর ব্যস্ততম সড়কে আর সেই বাস চলাচল করতে পারেনি।পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি আবার সিটি বাস সার্ভিস চালুর উদ্যোগ নেয় রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ। তৎকালীন পুলিশ কমিশনার মোঃ মনিরুজ্জামান সিও বাজার এলাকায় সার্ভিসটির উদ্বোধন করেন। বিআরটিসির দুটি বাস সাতমাথা থেকে শাপলা চত্বর, কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল ও মেডিকেল মোড় হয়ে সিও বাজার পর্যন্ত চলাচল শুরু করে। পরবর্তী সময়ে নগরীর ব্যস্ততম সড়কগুলোতে বাস চলাচলের পরিকল্পনা থাকলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি।রংপুর নগরীর সেই চিরচেনা যানজট দিন দিন প্রকট আকার ধারণ করছে।
সিটি বাজারে সামনে স্বাস্থ্যপ্রকৌশল অধিদপ্তরের চাকরিজীবী আঃ খালেক সহ অনেকেই বলেন,অফিস থেকে বের হয়ে জাহাজ কোম্পানির মোড় পার হতেই ৩০ থেকে ১ ঘন্টা লেগে যায়। সড়কে যেন কোনো শৃঙ্খলা নেই। ফুটপাত ও সড়ক দখল এবং অটোরিকশার দৌরাত্ম্যে নগরীতে চলাচল কঠিন হয়ে পড়েছে। ধাপ এলাকা, কাচারী বাজার, সিটি বাজার, পায়রা চত্বর, জাহাজ কোম্পানি মোড় ও শাপলা চত্বরে প্রায়ই যানজট লেগে থাকে। এতে কর্মজীবী মানুষের মূল্যবান সময় নষ্ট হচ্ছে।
রংপুর সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মাসুদা বেগম, ফারহাদিবা বেগম সহ অনেক শিক্ষার্থী জানায়,স্কুল ছুটির পর দীর্ঘ সময় সড়কে আটকে থাকতে হয়। এমনকি স্কুলে যাওয়ার সময়ও নির্ধারিত সূচি রক্ষা করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়েছে।
সাবেক নগর পরিকল্পনাবিদ হাসান সোবহান বলেন, যে সড়কের ধারণক্ষমতা ১০ হাজার যানবাহনের, সেখানে চলছে লাখের বেশি যানবাহন। অবৈধ যান বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ না নিলে যানজট কমানো সম্ভব নয়।
রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের উপকমিশনার মারুফ আহাম্মেদ জানান, মাত্র আটজন সার্জেন্ট দিয়ে বিশাল এই নগরীর ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হচ্ছে না।প্রয়োজনীয় লোকবল চেয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
রংপুর সিটিকর্পোরেশনের প্রসাশক অ্যাডভোকেট মাহফুজ-উন-নবী ডন বলেন, নগরীতে বর্তমানে সিটি বাস সার্ভিস নেই।পরিকল্পিতভাবে এমন বাস সার্ভিস চালু করতে হবে যাতে তা টেকসই হয়।