কিছু মানুষ চলে যান, কিন্তু তাঁদের জীবন থেকে যায় মানুষের স্মৃতিতে, সমাজের ইতিহাসে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে। বীর মুক্তিযোদ্ধা, সমাজসেবক, সংগঠক, সাংবাদিক ও মানবিক মানুষ আকবর হোসেন ছিলেন তেমনই একজন। তাঁর জীবন ছিল একই সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনে সাহসিকতার ইতিহাস এবং স্বাধীনতার পর মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিবেদিত রাখার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
২০২৫ সালের ৬ আগস্ট রংপুর কমিউনিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৭২ বছর। ২০২৬ সালের ৬ আগস্ট তাঁর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী পালিত হয়েছে। এই দিনে তাঁকে স্মরণ করতে গিয়ে শুধু একজন প্রয়াত মানুষকে স্মরণ করা নয়; বরং রংপুরের সামাজিক ও নাগরিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে ফিরে দেখা জরুরি।
রণাঙ্গনের সাহসী যোদ্ধা: ১৯৫৩ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর রংপুর নগরীর ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের নীলকণ্ঠ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন আকবর হোসেন। তাঁর পিতা মৃত নছর উদ্দিন এবং মাতা আলিফজান বিবি। কৈশোর পেরিয়ে যৌবনে পদার্পণের সময়ই তিনি প্রত্যক্ষ করেন বাঙালির ওপর পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বৈষম্য, নিপীড়ন ও নির্যাতনের চরম রূপ।১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যখন বাঙালির স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে রক্তাক্তভাবে দমন করতে শুরু করে, তখন আকবর হোসেনও দেশের স্বাধীনতার জন্য অস্ত্র হাতে তুলে নেন। বৃহত্তর রংপুর অঞ্চল ছিল মুক্তিযুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ রণাঙ্গন। মুক্তিযুদ্ধের ৬ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার এম. খাদেমুল বাশারের দিকনির্দেশনা এবং কোম্পানি কমান্ডার শহীদ আজারুল ইসলামের নেতৃত্বে তিনি যুদ্ধে অংশ নেন। ‘হিট অ্যান্ড রান’ কৌশলে পরিচালিত গেরিলা অভিযান, সম্মুখযুদ্ধ, ব্রিজ-কালভার্ট ধ্বংস এবং সীমান্তবর্তী বিওপি ক্যাম্পে আক্রমণের মতো ঝুঁকিপূর্ণ কর্মকাণ্ডে তিনি অংশগ্রহণ করেন। তাঁর কাছে মুক্তিযুদ্ধ ছিল কেবল একটি রাজনৈতিক ঘটনা নয়; ছিল নিজের দেশ ও মানুষের মুক্তির জন্য জীবন বাজি রাখার অঙ্গীকার। যে বয়সে একজন তরুণ নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখে, সেই বয়সে আকবর হোসেন বেছে নিয়েছিলেন একটি স্বাধীন দেশের স্বপ্ন। তাঁর প্রজন্মের অসংখ্য তরুণের মতো তিনিও বিশ্বাস করেছিলেন—একটি স্বাধীন ভূখণ্ড, একটি স্বাধীন পতাকা এবং মানুষের মর্যাদার জন্য প্রয়োজনে জীবনও উৎসর্গ করতে হবে।
স্বাধীনতার পরও থামেনি তাঁর সংগ্রাম: মুক্তিযুদ্ধ শেষ হয়েছিল ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। কিন্তু আকবর হোসেনের সংগ্রাম শেষ হয়নি। স্বাধীনতার পর তিনি উপলব্ধি করেছিলেন—যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করা যেমন জরুরি, তেমনি সেই স্বাধীন দেশকে মানুষের বাসযোগ্য করে তোলাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ তখন নানা সংকটে বিপর্যস্ত। অর্থনীতি দুর্বল, অবকাঠামো বিধ্বস্ত, মানুষের জীবনে অভাব-অনটন। এমন এক সময়ে আকবর হোসেন নিজেকে সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করেন। জাতীয় ও আঞ্চলিক বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃত্বে থেকে মানুষের জন্য কাজ করতে থাকেন। তাঁর জীবনের একটি বড় বৈশিষ্ট্য ছিল—তিনি কোনো একটি পরিচয়ের মধ্যে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তাঁর পরিচয় যেমন গৌরবের, তেমনি সমাজসংগঠক, সাংবাদিক, সাহিত্য-সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক এবং মানবিক কর্মী হিসেবেও তিনি ছিলেন সমানভাবে সক্রিয়।
সাংবাদিকতায় দায়িত্বশীল ভূমিকা: রংপুরের নাগরিক ও সামাজিক জীবনের নানা অসঙ্গতি, মানুষের সমস্যা এবং জনস্বার্থের বিষয়কে সামনে নিয়ে আসতে তিনি সাংবাদিকতাকে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। রংপুর প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ১৯৮২–৮৩ সালে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। সাংবাদিকতা তাঁর কাছে কেবল পেশা ছিল না; এটি ছিল মানুষের কথা বলার এবং সমাজের নানা অসঙ্গতি তুলে ধরার একটি দায়িত্বশীল ক্ষেত্র। দৈনিক যুগের আলো পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেন। সংবাদপত্র ও নাগরিক সমাজের মধ্যে যে সেতুবন্ধন একটি গণতান্ত্রিক সমাজে প্রয়োজন, তাঁর কর্মকাণ্ডে সেই ভূমিকার প্রতিফলন দেখা যায়।
সংগঠক হিসেবে বহুমাত্রিক ভূমিকা: আকবর হোসেন ছিলেন সংগঠনপ্রিয় মানুষ। তবে তাঁর সংগঠন ছিল কেবল পদ-পদবির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; মানুষের সমস্যা সমাধান এবং সামাজিক উদ্যোগকে এগিয়ে নেওয়াই ছিল তাঁর সংগঠকসত্তার মূল লক্ষ্য। মুক্তিযোদ্ধা সংসদ গঠনের ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও মুক্তিযোদ্ধাদের মর্যাদা রক্ষায় তিনি সক্রিয় ছিলেন। সুশাসনের জন্য নাগরিক—সুজন-এর রংপুর জেলা সভাপতি হিসেবে তিনি নাগরিক অধিকার, সুশাসন ও জবাবদিহিতার প্রশ্নে কাজ করেছেন। দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির জেলা সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও তিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার কাজে যুক্ত ছিলেন। এই কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে তাঁর চিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক স্পষ্ট হয়—তিনি স্বাধীনতাকে কেবল রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা হিসেবে দেখেননি; সুশাসন, জবাবদিহি, দুর্নীতিমুক্ত সমাজ এবং নাগরিক মর্যাদাকেও স্বাধীনতার অপরিহার্য অংশ মনে করতেন।
সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি দায়বদ্ধতা: রংপুরের সাংস্কৃতিক ইতিহাসেও আকবর হোসেনের অবদান স্মরণযোগ্য। রঙ্গপুর সাহিত্য পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে তিনি সাহিত্যচর্চা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে সংগঠিত করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। একটি শহরের প্রাণ কেবল তার রাস্তা, ভবন বা বাজারে নয়; তার সাহিত্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও মানুষের সৃজনশীলতায়। রংপুরের সাংস্কৃতিক পরিসরকে সমৃদ্ধ করার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা সেই নাগরিক দায়বদ্ধতারই প্রকাশ। লায়ন্স ক্লাবের সভাপতি হিসেবেও তিনি মানুষের কল্যাণে বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন।
প্রতিবন্ধী মানুষের পাশে: আকবর হোসেনের মানবিক জীবনের অন্যতম উজ্জ্বল অধ্যায় ছিল প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার ও জীবনমান উন্নয়নের জন্য তাঁর কাজ। প্রতিবন্ধী ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে তিনি প্রতিবন্ধী মানুষের সামাজিক মর্যাদা, অধিকার ও জীবনমান উন্নয়নের জন্য কাজ করেছেন। যে সমাজে প্রতিবন্ধী মানুষ দীর্ঘদিন অবহেলা ও বৈষম্যের শিকার হয়েছেন, সেখানে তাঁদের পাশে দাঁড়ানো ছিল নিঃসন্দেহে একটি মানবিক ও প্রগতিশীল উদ্যোগ। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা মানুষের প্রতি আচরণে। দুর্বল, প্রান্তিক ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোই সেই চেতনার বাস্তব রূপ। আকবর হোসেন তাঁর সামাজিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সেই মানবিকতারই প্রকাশ ঘটিয়েছেন।
তাঁর বিদায়ও হয়ে উঠেছিল জনমানুষের ভালোবাসার প্রকাশ: ২০২৫ সালের ৬ আগস্ট তাঁর মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পর রংপুরে নেমে আসে শোকের আবহ। বিকেল চারটায় তাঁর মরদেহ শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য লায়ন্স স্কুল অ্যান্ড কলেজ মাঠে নেওয়া হয়। পরে পাবলিক লাইব্রেরি মাঠে ফুলেল শ্রদ্ধা নিবেদন, গার্ড অব অনার এবং প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। শেষবারের মতো তাঁকে দেখতে সেখানে সমবেত হয়েছিলেন মুক্তিযোদ্ধা, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মী, সাংবাদিক, পেশাজীবী এবং তাঁর অসংখ্য শুভাকাঙ্ক্ষী। বাদ মাগরিব নীলকণ্ঠ সোটাপীর মাজার এলাকায় দ্বিতীয় জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়। কোনো মানুষের শেষ বিদায়ে এত মানুষের উপস্থিতি তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় মূল্যায়নগুলোর একটি। আকবর হোসেন মানুষের জন্য কাজ করেছিলেন বলেই তাঁর বিদায়ের মুহূর্তে মানুষ তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে ছুটে এসেছিল।
যে উত্তরাধিকার রেখে গেলেন : আকবর হোসেনের জীবনকে শুধু একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার জীবনী হিসেবে দেখলে তাঁর প্রতি সুবিচার করা হবে না। তাঁর জীবনকে দেখতে হবে একটি ধারাবাহিকতার মধ্য দিয়ে—মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গন থেকে স্বাধীন দেশের নাগরিক সমাজ নির্মাণের সংগ্রাম পর্যন্ত। তিনি অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছেন দেশের স্বাধীনতার জন্য। পরে কলম হাতে নিয়েছেন মানুষের কথা বলার জন্য। সংগঠনের নেতৃত্ব দিয়েছেন সুশাসনের জন্য। সাহিত্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন সমাজের মননশীল বিকাশের জন্য। প্রতিবন্ধী মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য। এই ধারাবাহিকতাই তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা। আজ যখন স্বাধীনতার ইতিহাস নিয়ে নানা ধরনের বিতর্ক, বিকৃতি ও রাজনৈতিক টানাপোড়েন তৈরি হয়, তখন আকবর হোসেনের মতো মুক্তিযোদ্ধাদের জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মুক্তিযুদ্ধ শুধু অতীতের একটি অধ্যায় নয়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করতে হলে মানুষের অধিকার, মর্যাদা, ন্যায়বিচার, সুশাসন ও সামাজিক সমতার জন্যও কাজ করতে হয়।
প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধা : এক বছর আগে তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। কিন্তু একজন মানুষের মৃত্যু তাঁর কাজকে শেষ করে দেয় না। বরং তাঁর রেখে যাওয়া কর্ম, আদর্শ ও স্মৃতি নতুন প্রজন্মের কাছে প্রশ্ন হয়ে ফিরে আসে—আমরা তাঁর স্বপ্নের সমাজ কতটা নির্মাণ করতে পেরেছি? রংপুরের সামাজিক ও নাগরিক ইতিহাসে আকবর হোসেনের নাম তাই কেবল একজন প্রয়াত ব্যক্তির নাম নয়; এটি একটি কর্মময় জীবনের প্রতীক। তিনি ছিলেন রণাঙ্গনের যোদ্ধা, আবার শান্তিকালেও মানুষের পাশে থাকা এক নিরলস কর্মী। প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই। বীর মুক্তিযোদ্ধা আকবর হোসেনের জীবন আমাদের শেখায়—দেশকে ভালোবাসা শুধু যুদ্ধের ময়দানে অস্ত্র ধারণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; মানুষের পাশে দাঁড়ানো, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলা এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ নির্মাণের নিরন্তর প্রচেষ্টাও দেশপ্রেমেরই অংশ।তাঁর স্মৃতি অমর হোক। তাঁর কর্ম নতুন প্রজন্মকে মানবিক, গণতান্ত্রিক ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাসম্পন্ন সমাজ নির্মাণে অনুপ্রাণিত করুক।
লেখক: তিস্তা বাচাঁও নদী বাচাঁও সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি।