বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির কল্যাণে মানুষের ভাত কাপড়ের সমস্যা অনেকটা মিটেছে। কিন্তু মানুষের জীবনের চাহিদা কেবল ভাত-কাপড়ের সমস্যার সমাধানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের দৈহিক এবং মানসিক চাহিদা অনেক। তার জন্য আরও অনেক কিছু করা প্রয়োজন। বর্তমানে জাতিসংঘ কর্তৃক পরিচালিত বিশ্বব্যবস্থা নিয়ে সন্তুুষ্ট থাকার প্রশ্নই অবান্তর। মানুষের পারস্পরিক সম্প্রীতি ও সংস্কৃতিক দাবি অনেক বেশি। বর্তমান রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং জাতিসংঘ কেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা তার জন্য নিতান্তই অপ্রতুল। সেজন্যে রাষ্ট্রব্যবস্থা ও বিশ্বব্যবস্থা উন্নতিশীল প্রয়োজন। ধর্ম, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র এবং বিশ্ব-মানবতার প্রচলিত ব্যবস্থা ও ধারণাসমূহ প্রচলিত ব্যবস্থা ও আদর্শগত ধারণাও অপ্রতুল। এসব নিয়ে সৃষ্টিশীল চিন্তাভাবনা কমই খুঁজে পাওয়া যায়।
বিজ্ঞান এবং তথ্যপ্রযুক্তির আবিষ্কার ও উদ্ভাবন মানুষের জীবনযাত্রাকে নতুন সমস্যার মুখোমুখি করেছে। একবিংশতাব্দীর তৃতীয় দশকে এসে বিশ্বব্যবস্থা এক গভীর রূপান্তরের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। শীতল যুদ্ধ-পরবর্তী একমেরু বিশ্ব থেকে আজ আমরা ক্রমশ বহুমেরু শক্তি কাঠামোর দিকে অগ্রসর হচ্ছি। অর্থনৈতিক বৈষম্য, প্রযুক্তিগত বিপ্লব, জলবায়ু সংকট, ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত, গণতন্ত্রের চ্যালেঞ্জ এবং আইনের শাসন- সব মিলিয়ে রাষ্ট্রব্যবস্থা ও বিশ্বরাজনীতি এক জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে।
প্রথমত, বিশ্বব্যবস্থার রূপান্তর: ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন বিলুপ্তির পর যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বরাজনীতিতে একক পরাশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। বিশ্ব এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একক কর্তৃত্বের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৯৮০ সাল থেকে যুদ্ধবাজ নীতি গ্রহণ করে গোটা পৃথিবীকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে। পশ্চিমা কর্তৃত্ববাদীরা পানামার প্রেসিডেন্ট ম্যানুয়েল রনিয়েগাকে অপহরণ, মধ্যপ্রাচ্যে ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন ও লিবিয়ার প্রেসিডেন্ট কর্নেল গাদ্দাফিকে হত্যা, গাজা-ইসরাইল যুদ্ধ, সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার-আল- আসাদকে ক্ষমতাচ্যুত করে তাদের তেল সম্পদ দখলে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের মনোনীত পুতুল সরকার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ মদদে গাজায় জাতি নিধনের জন্য ইসরায়েল যুদ্ধ চালিয়েছে। গাজায় প্রায় এক লাখের বেশি লোক নিহিত হয়েছে। প্রায় দুই লাখের বেশি লোক আহত হয়েছে এবং গাজা উপত্যকা কার্যত ৯০% ধ্বংসস্তুূপে পরিণত হয়েছে। যুদ্ধবিরতি থাকা সত্ত্বেও চলমান সময়ে আন্তর্জাতিক যুদ্ধবিরতি আইন লঙ্ঘন করে ইসরায়েল প্রতিদিন বোমা হামলা করে মানুষ হত্যা করছে। মধ্যপ্রাচ্যের প্রত্যেক দেশে গৃহযুদ্ধ লেগেই আছে। ভেনেজুয়েলার নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে জোরপূর্বক অপহরণ করে তুলে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কারাগারে বন্দী করে রাখা হয়েছে এবং স্বাধীন রাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার তেল আমেরিকা বিক্রি করছে। সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন-ইসরায়েলি বাহিনী ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে নৃশংস ও বর্বরোচিতভাবে হত্যা করে ইসলামী প্রজাতন্ত্র সরকারকে উৎখাত করে তাদের মনোনীত পুতুল সরকার বসানোর নীল নকশা তৈরি করেছে। কিন্তু ইরানি জাতি ঐক্যবদ্ধভাবে যুদ্ধের প্রতিরোধ গড়ে তোলে হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে উপযুক্ত জবাব দিচ্ছে। ট্রাম্পের এই হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একক কর্তৃত্ববাদের বিশ্ব নিয়ন্ত্রণ করার মানববিধ্বংসী অপচেষ্টা। ইসরায়েল-মার্কিন বাহিনী যৌথভাবে ইরানে যেভাবে হামলা করে শিশু সহ নিরাপরাধ মানুষ হত্যা করছে, যা গণহত্যার শামিল। পরাশক্তি অন্যান্য দেশগুলােও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করছে না। এর ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যাকে মনে চাবে অপহরণ করে তুলে নিয়ে যাবে, যাকে মনে করবে হত্যা করবে এবং শক্তিহীন রাষ্ট্রগুলাের সরকার পরিবর্তন করবে। ইরান ও ইসরায়েল-আমেরিকা যুদ্ধ বন্ধ করতে চীন ও রাশিয়াকে কঠিন উদ্যোগ নেওয়া উচিত । চীন ও রাশিয়া উদ্যোগ নিলে আরও আগে এই যুদ্ধ বন্ধ হয়ে যেত। ৮ এপ্রিল দুই সপ্তাহের শর্তসাপেক্ষে যুদ্ধবিরতি কার্যকরের মধ্যে দিয়ে পাকিস্তানের মধ্যেস্থতায় ইসলামাবাদে প্রথম দফা ১১ ও ১২ এপ্রিল ২১ ঘন্টা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার শান্তি আলোচনা কোনো চুক্তি ছাড়াই শেষ হয়েছে। এর ফলে দুই দেশের মধ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার বিষয়টি প্রশ্নের মুখে পড়েছে। দ্বিতীয় দফা ২০ এপ্রিল শান্তি আলোচনা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল কিন্তু ইরানের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি, তবে আলোচনা চলমান আছে। পাকিস্তান অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে, যা প্রশংসার যোগ্য। ট্রাম্পের একগুয়েমি কথাবার্তা ও উসকানিমূলক আক্রমণাত্মক বক্তব্যে শান্তি আলোচনা বিঘ্নিত হচ্ছে। শান্তি আলোচনার স্বার্থে উভয় পক্ষকেই সংযত হতে হবে এবং উভয় পক্ষের মধ্যে শ্রদ্ধা ও আত্মগঠনমূলক ভাষার ব্যবহার অত্যন্ত জরুরি। স্থায়ী শান্তি আলোচনার স্বার্থে হরমুজ প্রণালীতে আমেরিকার নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার করা উচিত। শান্তি চুক্তি যত তাড়াতাড়ি হবে, ততই বিশ্বের সর্বজনীন মঙ্গল হবে। আগামী দুই-তিন সপ্তাহের মধ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার স্থায়ী শান্তি চুক্তি প্রতিষ্ঠিত না হলে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে রূপ নিতে পারে । তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পতন অতি সন্নিকটে। এই যুদ্ধ বন্ধে জাতিসংঘ কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারছে না। এভাবে জাতিসংঘ কর্তৃক বিশ্ব ও রাষ্ট্রব্যবস্থা চলতে পারে না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৫ সালে জাতিসংঘ বিশ্বশান্তি ও সহযোগিতার উদ্দেশ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তা আজকে যথাযথ কার্যকর পদক্ষেপ নিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। জাতিসংঘ একটি অকার্যকর সংস্থায় পরিণত হয়েছে। জাতিসংঘ পুনর্গঠন করে বিশ্বরাষ্ট্রসংঘ প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। পৃথিবীর কোনো রাষ্ট্রে সেনাবাহিনী না রেখে বিশ্ব রাষ্ট্রসঙ্ঘের অধীনে সেনাবাহিনী গড়ে তুলতে হবে। এখন সময় এসেছে ইঙ্গ-মার্কিন বিরোধী রাশিয়া চীন, ইরান ও ভারত সহ অন্যান্য সমমানের রাষ্ট্র নিয়ে জোট গঠন না করলে বিশ্ব হুমকির সম্মুখীন হবে। গাজার মত অনেক রাষ্ট্রে জাতি নিধন করার চেষ্টা করবে যুক্তরাষ্ট্র। আরও অনেক দেশ মার্কিন কর্তৃত্ববাদীদের আগ্রাসনের কবলে পড়বে। পৃথিবীর মাঁনচিত্র থেকে অনেক রাষ্ট্র বিলীন হয়ে যাবে। ট্রাম্পের পৃথিবীব্যাপী বৈশ্বিক অর্থনীতি ও সামরিক আগ্রাসনের ঘটনা ইতিহাসের কুখ্যাত আগ্রাসন হিসেবে অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে। সাম্প্রতিক সময়ে কুখ্যাত যৌন নিপীরক জেফরি এপেস্টেইনের ৩০ লাখের বেশি নথি যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ প্রকাশ করেছে। এপেস্টেইনের নথিতে যেসব ভয়ংকর তথ্য প্রকাশিত হয়েছে, তা গোটা পৃথিবীব্যাপী মানুষের হৃদয়ে নাড়া দিয়েছে। বিশ্বের এলিটদের মুখোশ উন্মোচিত হয়েছে। যারা পৃথিবীব্যাপী মানবাধিকারের কথা বলে, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য জন্যে কাজ করছে, তারাই আজকে মানবাধিকারের রক্ষকের পরিবর্তে ভক্ষক হয়েছে। বৈজ্ঞানিক থেকে শুরু করে যুবরাজ ও বিশ্ব পরিচালনার রাষ্ট্রনায়করাও এপেস্টেইন যৌন কেলেঙ্কারিতে যুক্ত রয়েছে। এ এক রোমহর্ষক ভয়াবহ চিত্র। পৃথিবীসৃষ্টি হওয়ার পর থেকে দুর্বলের প্রতি সবলের অত্যাচার নির্যাতন চিরাচরিত নীতিতে পরিণত হয়েছে । এই চিরাচরিত নীতি আধুনিক সভ্যযুগে আরও ভয়ংকর রূপ নিচ্ছে। এপেস্টেইন তার যৌন কেলেঙ্কারিতে রাষ্ট্রনায়কদের যুক্ত করে বিশ্ব রাজনীতিতে তার প্রভাব বিস্তার করেছে। কুখ্যাত এপস্টেইন ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জে এলিটদের জন্য পৃথিবীর স্বর্গরাজ্য তৈরি করেছিল। পৃথিবীব্যাপী এলিট বনাম জনগণ দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছে। ক্ষমতাবানদের আইনকানুন এবং সাধারণ জনগণের আইনকানুন এক নয়। কার্যত আইন ক্ষমতাবানদের সুরক্ষা দেওয়ার জন্য। গত দুই দশকে চীনের অর্থনৈতিক উত্থান, রাশিয়ার সামরিক পুনরুত্থান, ভারতের ক্রমবর্ধমান প্রভাব বিশ্বশক্তির ভারসাম্যকে কিছুটা পরিবর্তিত করার চেষ্টা করছে মাত্র। কিন্তু তা দৃশ্যমান নয়। বর্তমান বিশ্বে ভূ-রাজনীতি গঠিত হচ্ছে প্রতিযোগিতা, কৌশলগত জোট এবং অর্থনৈতিক নির্ভরতার জটিল সমীকরণে। ইউক্রেন যুদ্ধ, তাইওয়ান ইস্যু, গাজা, ইরান ও লেবাননের যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা প্রমাণ করে যে শক্তির দ্বন্দ্ব এখনও বিশ্বব্যবস্থার কেন্দ্রীয় উপাদান। মানুষবিধ্বংসী সামরিক খাতে অর্থ ব্যয় করার পরিবর্তে মানবকল্যাণের জন্য সুদূরপ্রসারী চিন্তা করার সময় এসেছে। ক্ষুধামুক্ত বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই। আমরা যুদ্ধমুক্ত পৃথিবী চাই। শান্তিময় বিশ্ব চাই।
দ্বিতীয়ত, বৈশ্বিক অর্থনীতি ও বৈষম্য: বিশ্বায়ন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করলেও বৈষম্য কমাতে ব্যর্থ হয়েছে। উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের মধ্যে আয়ের ব্যবধান যেমন বিদ্যমান, তেমনি একই দেশের ভেতরেও ধনী-দরিদ্র বৈষম্য দিনে দিনে বৃদ্ধি পাচ্ছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল, বিশ্বব্যাংক ও বহুজাতিক কর্পোরেশনসমূহ বৈশ্বিক অর্থনীতির গতিপথ নির্ধারণে প্রভাবশালী ভূমিকা রাখছে। ডিজিটাল অর্থনীতি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রসার উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের কাঠামো বদলে দিচ্ছে। এতে একদিকে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হচ্ছে, অন্যদিকে কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা বাড়ছে।
তৃতীয়ত, রাষ্ট্রব্যবস্থার সংকট ও গণতন্ত্রের চ্যালেঞ্জ: বিশ্বের অনেক দেশে গণতন্ত্র মার্কিন কর্তৃত্ববাদীদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। বর্তমানে বিশ্বে যে উদার গণতন্ত্র চলছে তা ৫% লোকের জন্য প্রযোজ্য। এই পশ্চিমা উদার গণতন্ত্রে ৯৫% লোক নির্যাতিত, নিপীড়িত এবং তাদের রক্ত শোষণ করা হচ্ছে। নির্বাচন ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা, মতপ্রকাশের ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং গণমাধ্যমের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। কিছু দেশে কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, আবার কোথাও রাজনৈতিক মেরুকরণ চরমে পৌঁছেছে।
জাতিসংঘসহ বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানসমূহ বৈশ্বিক সমস্যার সমাধানে কাঙ্ক্ষিত কার্যকারিতা দেখাতে পারছে না। ফলে রাষ্ট্রগুলো ক্রমশ নিজস্ব কৌশলগত স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। বিশ্বের অনেক রাষ্ট্র আজকে গণতন্ত্র হুমকির সম্মুখীন হয়েছে। স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হলেও গত ৫৫ বছরে গণতন্ত্র আলোর মুখ দেখেনি। ২০২৪ সালে জুলাই ছাত্রদের কোটা-সংস্কার আন্দোলন থেকে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়। ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা ভারতে যেতে বাধ্য হন। ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা হয়। ড. ইউনুসের নিকট জাতির অনেক প্রত্যাশা ছিল, কিন্তু তা পূরণে তিনি সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন। ইউনূসের সবচেয়ে বড় সফলতা হলো মব সন্ত্রাস সৃষ্টি । মব সন্ত্রাসের মাধ্যমে ইউনূস ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল। ইউনুসের শাসনামলে মব সন্ত্রাসের ভয়ে মানুষ দীর্ঘ নিঃশ্বাস নিতে পারেনি, নির্ভয়ে ঘুমাতে পারেনি, চলতে পারেনি। এখন মানুষ স্বস্তি পেয়েছে। ড. ইউনূস ক্ষমতায় বসার পরে দেশের চেয়ে নিজের ব্যক্তিস্বার্থ আগে সিদ্ধি করেছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনকালে শেখ হাসিনার চেয়ে তুলনামূলকভাবে বেশি গত ১৮ মাসে ড. মুহাম্মদ ইউনুস তাঁর নিজস্ব স্বার্থ হাসিল করেছে। তিন মাসের মধ্যে গ্রামীন বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন, গ্রামীণ কল্যাণ ট্রাস্টের ৬৬৬ কোটি টাকা কর মওকুফ করে নিয়েছেন। গ্রামীণ ব্যাংককে পাঁচ বছরের জন্য কর অব্যাহতি দিয়েছে- তাতে সরকার প্রায় এক হাজার কোটি টাকা রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হবে। বিচার বিভাগে ক্ষমতার অপব্যবহার করে দুর্নীতি মামলাসহ সাতটি মামলা থেকে মুক্তি দিয়েছে নিজেকে। কার্যত ক্ষমতার অপব্যবহার করে এই কাজগুলি করেছেন। তিনি তাঁর স্বার্থে প্রধান উপদেষ্টার পদ ব্যবহার করেছেন। কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট তিনি দায়ী হয়ে গেছেন। সংবিধানের ১৪৭ ধারা অনুযায়ী সাংবিধানিক পদে থেকে এসব কর্মকাণ্ড নৈতিকতা, জবাবদিহিতা ও সংবিধানের সীমা লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। জাতীয় পত্রিকায় এসব তথ্য সহ আরও অনেক কর্মকাণ্ড প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে শপথ ভঙ্গ করে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন। ইউনূসের এসব কর্মকাণ্ড বাতিল এবং তাঁর শাসনকালে মব সন্ত্রাস সহ সকল হত্যার বিচার হওয়া উচিত। এই সরকারের কাছে জাতি এটা প্রত্যাশা করে। সংবিধান পরিপন্থী কোনো কর্মকান্ড জাতি মেনে নেবে না। ৮৪টি প্রশ্নের ওপর গণভোট আদৌ কী যৌক্তিসঙ্গত? ড. ইউনুস গণভোটের নামে জাতির ওপর জগদ্দল পাথর চাপিয়ে দিয়েছিল। বিএনপি সরকার গণভোট অধ্যাদেশ রহিতকরণের মাধ্যমে গণভোটের কার্যকারিতা বাতিল করে দিয়েছে। এক্ষেত্রে বিএনপি সরকার রাজনৈতিক দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছে। বিএনপি সরকারকে জনগণের স্বার্থে আরও বলিষ্ঠ পদক্ষেপ নিতে হবে। সাম্প্রতিক সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেছেন, ‘ডিপ স্টেট’ থেকে তাদের সরকারকে ২০২৯ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার প্রস্তাব দিয়েছিল। তবে ‘ডিপ স্টেট’ বলতে কাদের বুঝিয়েছেন, তিনি তা প্রকাশ করেননি। আসলে বাংলাদেশের রাজনীতি ও ভবিষ্যৎ এখন আর বাংলাদেশের জনগণের ও রাজনীতিবিদদের নিয়ন্ত্রণে নেই। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ ও রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করছে পশ্চিমা কর্তৃত্ববাদী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
চতুর্থত, জলবায়ু সংকট ও মানবিক ভবিষ্যৎ: জলবায়ু পরিবর্তন মানবজাতির জন্য সবচেয়ে বড় অস্তিত্বগত হুমকি। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ- সবকিছু উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর তুলনামূলক বেশি প্রভাব ফেলছে।
বাংলাদেশ জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। উপকূলীয় অঞ্চল, কৃষি উৎপাদন এবং জলসম্পদ ব্যবস্থাপনা ভবিষ্যতে আরও বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। ভারত আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে পদ্মা, তিস্তা ও অভিন্ন নদীর অবাধ পানি প্রবাহ বন্ধ করে দিয়েছে। এর ফলে উত্তরবঙ্গ মরুভূমিতে পরিণত হচ্ছে। স্বাধীনতার পর থেকে ভারতের নিকট থেকে নতজানু পররাষ্ট্র নীতির কারণে কোনো সরকারই পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় করতে পারেনি। টেকসই উন্নয়ন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং পরিবেশ ও ন্যায়বিচার আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে আসা জরুরি।
পঞ্চমত. বিজ্ঞান, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মানবাধিকার:
চতুর্থ শিল্পবিপ্লব বিশ্বব্যবস্থাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং, সাইবার প্রযুক্তি রাষ্ট্রক্ষমতার নতুন উপকরণে পরিণত হয়েছে। কিন্তু এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নজরদারি রাষ্ট্র, সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তার সংকট। প্রযুক্তি মানবকল্যাণে ব্যবহৃত হবে নাকি নিয়ন্ত্রণ ও বৈষম্যের হাতিয়ার হবে- তা নির্ভর করছে নীতি, নৈতিকতা ও বৈশ্বিক সহযোগিতার ওপর। বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তির উন্নতি হলেও মানুষের মনন জগতে উন্নতি হয়নি। সাম্প্রতিক সময়ে মানুষের মনন জগতের উন্নতি হওয়া বেশি প্রয়োজন।
ষষ্টত. মানবজাতির ভবিষ্যৎ:
মানবজাতির ভবিষ্যৎ তিনটি মূল স্তম্ভের ওপর নির্ভরশীল
* ন্যায়ভিত্তিক বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থা
* অর্থনৈতিক অধিকার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন
* মত প্রকাশের স্বাধীনতা, সংস্কৃতিক অধিকার, আইনের শাসন ও পরিবেশ সুরক্ষা।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের জন্য কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষা, অর্থনৈতিক বহুমুখীকরণ, শিক্ষা ও প্রযুক্তি বিনিয়োগ এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমান বাস্তবতায় বিশ্ব ও রাষ্ট্রব্যবস্থা এক গভীর সংকটের যুগে প্রবেশ করেছে। প্রতিযোগিতা ও সংঘাতের মধ্যেও সহযোগিতা ও সম্প্রীতিময় সহাবস্থানের পথ খুঁজে নিতে হবে। মানবজাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে আমরা কতটা ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও টেকসই সম্প্রীতিময় বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারি তার ওপর।
(লেখকঃ এম এ আলীম সরকার : প্রাবন্ধিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সভাপতি, বাংলাদেশ গণমুক্তি পার্টি (বিজিপি)।)