রবিবার, ০১ নভেম্বর ২০২৬, ১৭ কার্তিক ১৪৩৩
☰ সর্বশেষ বিশেষ সংবাদ জাতীয় সারাদেশ আন্তর্জাতিক খেলা বিনোদন বাণিজ্য লাইফস্টাইল লালমনিরহাট মতামত অন্যান্য

রংপুরের নিভৃত পল্লীতে দুই হাতের কবজি নেই পা দিয়ে লিখেই HSC সাফল্য, স্বপ্ন বিসিএস ক্যাডার হওয়ার


প্রকাশ : (১ ঘন্টা আগে)
রংপুরের নিভৃত পল্লীতে দুই হাতের কবজি নেই পা দিয়ে লিখেই HSC সাফল্য, স্বপ্ন বিসিএস ক্যাডার হওয়ার

রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার নিভৃত পল্লীর বাবা হারা এতিম শারীরিক প্রতিবন্ধি কলি রানী (১৮) তার দুই হাতের কবজি নেই। তিনি ডান পা দিয়ে পরীক্ষার খাতায় লিখে এইচ.এস.সিতে সাফল্য ছিনিয়ে নিয়েছেন।এখন স্বপ্ন দেখছেন বিসিএস ক্যাডার হওয়ার। তার জন্ম থেকেই দুই হাতের কবজি নেই। তবে শারীরিক সীমাবদ্ধতা তাঁর আদম্য মনোবল শিক্ষা জীবনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। ডান পা দিয়ে লিখেই পেরিয়েছেন প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের গন্ডি। এবার এইচএসসি পরীক্ষায় মানবিক বিভাগ থেকে পেয়েছেন জিপিএ ৩.৫০।কলি রানী উপজেলার হরিশ গ্রামের প্রয়াত মনোরঞ্জন রায়ের মেয়ে। তিন ভাই ও তিন বোনের মধ্যে তিনি সবার ছোট কলিরানী। তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় বাবাকে হারান কলি কলিরানী। এই তরুণীর সাফল্যে আনন্দিত খুশি পরিবার ও এলাকাবাসী। উপজেলার হরিশ্বর গ্রামের  অন্যন্য শিক্ষার্থীরা জানান, শারীরিক প্রতিবন্ধি কলি রানীর জীবনের পথটা সহজ ছিল না। ছোট বেলাতেই বাবাকে হারান তিনি। এরপর অভাব-অনটনের মধ্যেও মেয়ের পড়াশোনা চালিয়ে নিতে হাল ছাড়েননি মা রুপালী রানী। কলি রানীর মা রুপালী রানী বলেন,একদিকে ছোটবেলা থেকেই কলি রানী শারীরিক প্রতিবন্ধি হলেও পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ দেখে তাঁকে স্কুলে ভর্তি করান তার বড়ভাই মন্টু রাম রায়।তার লেখাপড়ার আদম্য প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত তার আদম্য প্রতিভা দমাতে পারেনি বাবা হারা এতিম কলি রানীর লেখাপড়া।
কলি রানীর বড় ভাই মন্টু রাম রায় বলেছেন,কলি রানী স্বপ্ন দেখেন বিসিএস ক্যাডার হয়ে মানুষের সেবা করার। এ জন্য রাষ্ট্রকে পাশে চান আমার আদরের ছোট বোন। জন্মগত ভাবে একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী সে। উচ্চতা প্রায় ৪ ফিট। শারীরিক প্রতিবন্ধী হওয়ায় হাঁটাচলা করতেও নানা সমস্যায় পড়তে হয় তাকে। অভাব অনটনের সংসার হওয়ার কারণে বসে না থেকে আমি কখেনো দিনমজুর কখনো নিজের সামান্য জমিতে চাষ আবাদ করে সংসার চালাই।
শারীরিক প্রতিবন্ধি কলি রানী জানান,এখন তাঁর স্বপ্ন উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে বিসিএস ক্যাডার হওয়া। তবে সেই স্বপ্ন পূরণে প্রয়োজন পরিবারের পাশাপাশি সমাজ ও রাষ্ট্রের সহযোগিতা। মানুষের সকল বাধা বিপত্তিকে পিছনে ফেলে আমি আমার ইচ্ছা শক্তি দিয়ে এ পর্যন্ত এসেছি। আমার ইচ্ছে আমি বিসিএসএ পাস করে ম্যাজিস্ট্রেট হতে চাই। আর আমাকে দেখে যেন প্রতিবন্ধীরা সকল প্রতিবন্ধকতাকে জয় করতে পারে। পড়াশোনার পাশাপাশি কলি রানীর রয়েছে বহুমুখী প্রতিভা। ডান পা দিয়েই অনায়াসে মোবাইল ফোন ও কম্পিউটার পরিচালনা করতে পারেন তিনি। শুধু তা-ই নয়, গানের প্রতি রয়েছে তার বিশেষ আগ্রহ। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গান পরিবেশন করে এরই মধ্যে অর্জন করেছেন একাধিক পুরস্কার ও প্রশংসা। উপজেলার বালাপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মোঃ আনছার আলী জানান, ইচ্ছা শক্তি থাকলে যে সব কিছু জয় করা যায় তারই প্রমাণ দিয়েছেন কলি রানী। তিনি শারীরিক প্রতিবন্ধী হয়েও শত প্রতিকূলতাকে জয় করে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেছেন।তার ইচ্ছে বিসিএস পাশ করে একজন ম্যাজিস্ট্রেট হবে। আমি তার সফলতা কামনা করি যাতে তার মনের ইচ্ছা পূরণ হয়। কাউনিয়া মহিলা কলেজ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ও কেন্দ্র সচিব রফিকুল ইসলাম জানান, বোর্ডের নিয়ম অনুযায়ী শারীরিক প্রতিবন্ধী পরীক্ষার্থীদের জন্য আলাদা কক্ষের ব্যবস্থা থাকলেও কলি রানী সবার সঙ্গে বসেই পরীক্ষা দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। তার ইচ্ছা অনুযায়ী ৩০২ নম্বর কক্ষে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পরীক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। নিয়ম অনুযায়ী তাকে অতিরিক্ত ৩০ মিনিট সময় দেওয়া হয়েছিল। অত্যন্ত স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে প্রতিটি পরীক্ষা সম্পন্ন করে সফলভাবে উত্তীর্ণ হয়েছেন। কাউনিয়া কলেজের অধ্যক্ষ ফারুক আজম বলেন, কলি রানী পা দিয়ে লিখে এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৩.৫০ পেয়েছে। তার এই সাফল্যে আমরা অত্যন্ত আনন্দিত ও গর্বিত।এর আগেও পা দিয়ে লিখে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী (পিইসি) ও এসএসসি পরীক্ষায় সফলতার সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়েছেন কলি রানী। এবার তার স্বপ্ন আরও বড়। উচ্চশিক্ষা শেষ করে বিসিএস ক্যাডার হয়ে দেশ ও মানুষের সেবা করতে চায়। তার বিশ্বাস, শারীরিক প্রতিবন্ধকতা কখনো মানুষের স্বপ্নপূরণের পথে বাধা হতে পারে না, যদি থাকে অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও পরিশ্রম।

বিজ্ঞাপন