রংপুরে বকসা বৃদ্ধাশ্রমে বসবাস করছেন শিক্ষক রেজাউল হারুন (৭০)। ঢাকার সরকারী বাঙলা কলেজ, সরকারী তিতুমীর কলেজ ও সরকারী কবি নজরুল ইসলাম কলেজে শিক্ষকতা করেছেন। জীবনভর তিনি শিক্ষার আলো ছড়িয়েছেন অধ্যাপনা করেছেন একাধিক সরকারী কলেজে। শিক্ষার্থীদের পড়িয়েছেন নৈতিকতা-মানবিকতা। ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে তার বসবাসের স্থান এখন বৃদ্ধাশ্রমে। জীবনের সন্ধ্যা বেলায়
পাশে নেই পরিবার-পরিজন। শিক্ষকতা জীবনের অভিজ্ঞতা শোনানোর মত পাশে কেউ নেই। আছেন তাঁর মত কিছু বৃদ্ধসঙ্গী। এদের মধ্যে বেশিরভাগ অসুস্থ্য, মানসিক সমস্যায় ভূগছেন। গ্রীষ্মের আগমনী রৌদ্রজ্বল দিনে আর কবিতা বলা হয় না অবসর প্রাপ্ত শিক্ষক রেজাউল হারুনের। বৈশাখের রং যেন ফিকে হয়ে পড়েছে তার জীবনে। রংপুরের বকসা বৃদ্ধাশ্রমে একাকীত্বে ভরা জীবনের করুন বাস্তবতার মুখোমুখি তিনি। কথাবলে জানাগেছে,শিক্ষক রেজাউল হারুন কুড়িগ্রাম জেলার চিলমারী শাখাহাতীর বাসিন্দা।কারমাইকেল কলেজ থেকে লেখাপড়া করেছেন।এরপর ঢাকার সরকারী বাঙলা কলেজ, সরকারী তিতুমীর কলেজ ও সরকারী কবি নজরুল ইসলাম কলেজে শিক্ষকতা
করেছেন। রাজধানীর খিলগাঁওয়ে নিজস্ব ফ্ল্যাটে থাকতেন।ছেলের সাথে অভিমান করে প্রায় তিন বছর আগে ঘরে ছেড়ে রংপুরে বকসা বৃদ্ধাশ্রমে বসবাস শুরু করেন। চলে আসার আগে অসুস্থ্য স্ত্রীর নামে ফ্ল্যাটটি লিখে দিয়ে এসেছেন রেজাউল হারুন। অবসরকালীন ভাতাও দিয়ে এসেছে স্ত্রীকে। রেজাউল হারুন বলেন, আমার পরিবারের কোন কথা কাউকে বলতে চাই না। অতীত নিয়ে কোন আলোচনা নয়। দেশে বৃদ্ধাশ্রমে বাবা-মায়েদের ঠাঁই হওয়ার পেছনে দায়ী আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় ধর্মীয়-নৈতিক শিক্ষার বড় অভাব রয়েছে। আর সেটার প্রভাব পড়ছে জীবনে। ধর্মীয়-নৈতিক শিক্ষার বিষয়ে বেশি গুরুত্ব দিলে কোন বাবা-মাকে বৃদ্ধাশ্রমে থাকতে হবে না। এছাড়া মানুষের জীবন-যাপনের ব্যয় বেড়েছে। বেতনের সাথে সংসার পরিচালন ব্যয়ের যে বিস্তর ফারাক, তা এই সমাজে বৃদ্ধাশ্রম প্রতিষ্ঠিত করার সুযোগ করে দেয়। বৃদ্ধাশ্রমে নতুন নিবাসী রংপুর নগরীর মাহিগঞ্জের আনোয়ার হোসেন (৬৫)। ৩ এপ্রিল রাতে এসেছেন। হাসি-খুশি ও সরল প্রকৃতির আনোয়ার হোসেন। তিনি জানান, মাহিগঞ্জের আজিজুল্ল্যাহ এলাকার বাসিন্দা । নিজ নামে ১৩ শতক জমি রয়েছে। স্ত্রী ও এক মেয়েকে নিয়ে সংসার ছিল আনোয়ার হোসেনের। হঠাৎ করে স্ত্রী মারা গেলে মেয়েকে নিয়ে বিপাকে পড়েন। এসএসসি পাস করা মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দেন। এরপর একাকীত্বের জীবনে পাশে দাঁড়ান এক ভাতিজা। বাড়ির সামনে একটি দোকান
করে জীবন পাড় করছিলেন আনোয়ার হোসেন। এক পর্যায়ে ভাতিজার বিয়ে হলে ভাতিজা বউ নানা সময় কটু কথা শোনাতো আনোয়ার হোসেনকে। এরপর মেয়ে ও ভাতিজা বুঝিয়ে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে যান। বর্তমানে আনোয়ার হোসেনের বাড়ি ভিটায় তার মেয়ে-জামাই ও শ্বশুরবাড়ির লোকজন বসবাস করছে। অথচ বৃদ্ধ বয়সে তার ঠাঁই হয়েছে বৃদ্ধাশ্রমে। আনোয়ার হোসেন বলেন, ভাতিজা ও মেয়ে এখানে দেয়ার সময় বলেছিল কোন চিন্তা
করবেন না। আমরা সব সময় আপনার খোঁজ-খবর নিব। আমি সেই বিশ্বাস নিয়ে এখানে আছি। কিন্তু ২০ দিনের বেশি সময় হলেও কেউ একটা ফোনও দেয়নি, দেখা করতেও আসেনি। এরপরেও বিশ্বাস নিয়ে আছি, তারা দেখা করার জন্য আসবে।আমি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ি। ঠিকমত খাবার পাই, গোসল করি, নামাজ পড়ি, একটা থাকার জায়গা আছে। এখানে আমার কোন সমস্যা নেই। বৃদ্ধাশ্রমের নিবাসী আবুল হোসেন এক সময় সম্পদশালী ছিলেন।জেলার কাউনিয়ায় তার পরিবারে সুখের কমতি ছিল না। তিস্তা নদীর কড়াল গ্রাসে সর্বস্ব হারান তিনি। এরপর তিস্তা রেলব্রীজ এলাকায় বাড়ি করেন। এরই মধ্যে স্ত্রী স্ট্রোক নানা অসুখে ভুগছিলেন আবুল হোসেন। ছেলে বিয়ে করে বাবাকে ফেলে শ্বশুরবাড়ি ভায়ারহাট এলাকায় বসবাস শুরু করে ছেলে। আবুল হোসেন বলেন, ছেলের কথা জিজ্ঞাসা করিয়েন না।ওর উপর আল্লাহর গজব পড়ুক। বাপ অসুস্থ্য, থাকে বৃদ্ধাশ্রমে।আর ছেলে শ্বশুরবাড়িতে পাকা ঘড়ে ঘুমাচ্ছে। এমন ছেলে যেন আর কাউকে আল্লাহ না দেয়। এই কথা বলতে বুকটা ফাটি যায় বাবা। অনেক কষ্ট হয়, বলতে পারি না। নিবাসী আমেনা বেগম (৭২) বার্ধক্য জনিত নানা রোগে আক্রান্ত।হাঁটা-চলা করতে অনেক কষ্ট করতে হয় তাকে। জীবনের গল্প নিয়ে তিনি বলেন, স্বামী মারা গেছে অনেক আগে। এরপর এক মেয়ে ছিল সেও মারা গেছে। পরিবারে কেউ নেই। ভাই-বোনেরা দেখে না। একজন মানুষকে দেখাশোনা করার কেউ নাই। তাই বৃদ্ধাশ্রমে এসে আছি। রংপুর নগরীর ৭নং ওয়ার্ডের বকসা বৃদ্ধাশ্রমে ১২ জন নারী ও ১৩ জন পুরুষ বসবাস করছেন। তাদের প্রত্যেকের জীবনের গল্প বিষাদে ভরা। যা সমাজের কিছু পরিবারের সামাজিক-নৈতিক অবক্ষয় ও পারিবারিক মূল্যবোধের পতনকে নির্দেশ করে। বকসা বৃদ্ধাশ্রমের প্রতিষ্ঠাতা অবসর প্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা রেজাউল হক বলেন, পুলিশে কাজ করার কারণে অনেক বিচার-সালিশে বৃদ্ধ বাবা-মাকে সন্তানেরা রাখতে চাইতো না। আবার কোন কোন সময় রাস্তায় পড়ে থাকা অবস্থায় বৃদ্ধ বাবা-মাকে পাওয়া যেত। তাদের নিয়ে এসে এখানে রাখার মাধ্যমে বৃদ্ধাশ্রম প্রতিষ্ঠার চিন্তা আসে। নিজস্ব অর্থায়নে এখানে বৃদ্ধ বাবা-মায়েদের খাওয়া-দাওয়া, দেখভাল করা হয়। একটি এনজিও আমাদের চিকিৎসা সহায়তা দেয়। বৃদ্ধাশ্রমে থাকা প্রত্যেক বাবা-মায়েদের জীবনের অনেক করুন গল্প রয়েছে এখানে। এসব মানুষের পাশে দাঁড়াতে পেরে আমি নিজেকে ভাগ্যবান মনেকরি।
রাজারহাটে ঘরনির্মাণ পিলার পেলো ষাটোর্ধ বৃদ্ধা
২০ ঘন্টা আগে