দেশের চলমান বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ালেই হবে না, একই সঙ্গে সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থার আধুনিকায়ন জরুরি। বিশেষ করে পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় দীর্ঘদিনের পুরোনো ওভারহেড লাইন, দীর্ঘ ফিডার, যন্ত্রপাতির সীমাবদ্ধতা, জনবল সংকট ও দ্রুত ত্রুটি শনাক্ত করতে না পারার কারণে ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট হচ্ছে।
বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংকটের কথা স্বীকার করে তা মোকাবিলায় সরকারের প্রচেষ্টার কথা তুলে ধরেছেন। তবে বিদ্যুৎ সংকটকে শুধু বর্তমান সরকারের সময়ের সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বিদ্যুৎ খাতের অবকাঠামোগত বিভিন্ন দুর্বলতা দীর্ঘদিনের। ফলে এ সংকটের প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করে সমাধানে দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ প্রয়োজন।
পল্লী বিদ্যুৎ বিতরণব্যবস্থার অন্যতম বড় সমস্যা দীর্ঘ ওভারহেড বিদ্যুৎলাইন। গ্রামাঞ্চলে একটি ফিডারকে অনেক দূর পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে হয়। কোনো নির্দিষ্ট স্থানে ত্রুটি দেখা দিলে তা শনাক্ত ও মেরামতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। ফলে স্থানীয় একটি সমস্যা অনেক বড় এলাকার বিদ্যুৎ বিভ্রাটে পরিণত হতে পারে।
ঝড়-বৃষ্টি ও বজ্রপাতের সময় গাছের ডালপালা বিদ্যুৎলাইনে পড়ে শর্ট সার্কিট তৈরি করতে পারে। এছাড়া ইনসুলেটর, ট্রান্সফরমারসহ বিভিন্ন সরঞ্জামে ত্রুটি দেখা দিলেও বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘ ফিডারের ক্ষেত্রে কোথায় ত্রুটি হয়েছে তা খুঁজে বের করতে লাইনম্যানদের অনেক দূর পর্যন্ত লাইন পরিদর্শন করতে হয়। এরপর ত্রুটি মেরামত করে পুনরায় বিদ্যুৎ সরবরাহ চালু করতে হয়।
দীর্ঘ লাইনের কারণে ভোল্টেজ কমে যাওয়াও পল্লী বিদ্যুতের একটি বড় সমস্যা। এর পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ায় অনেক ফিডার ও ট্রান্সফরমারের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ধারণক্ষমতার বেশি লোডের কারণে ট্রান্সফরমার অতিরিক্ত গরম হয়ে সুরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় হয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়।
জাতীয় পর্যায়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন বা জ্বালানি সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হলেও এর প্রভাব পড়ে বিতরণব্যবস্থায়। একই সময়ে রাজধানী ও শিল্পাঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহের চাহিদা বেশি থাকায় বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হয়। ফলে জাতীয় পর্যায়ের ঘাটতির প্রভাব গ্রামাঞ্চলের বিপুলসংখ্যক গ্রাহকের ওপরও পড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যুৎ সংকটের স্থায়ী সমাধানে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি বিতরণব্যবস্থার দুর্বলতা দূর করা প্রয়োজন। আধুনিক স্মার্ট গ্রিড, অটোমেটিক রিক্লোজার ও ফল্ট লোকেটর স্থাপন করা গেলে দ্রুত ত্রুটির স্থান শনাক্ত করা সম্ভব হবে। এতে দীর্ঘ সময় ধরে ম্যানুয়ালি লাইন পরীক্ষা করার প্রয়োজন কমবে।
এ ছাড়া দীর্ঘ ফিডারের সমস্যা কমাতে নতুন সাবস্টেশন ও উপকেন্দ্র নির্মাণ, গ্রাহকসংখ্যা ও ফিডারের দৈর্ঘ্য বিবেচনায় জনবল বৃদ্ধি এবং প্রত্যন্ত এলাকায় ট্রান্সফরমার, ইনসুলেটর, ফিউজসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের পর্যাপ্ত মজুত নিশ্চিত করা জরুরি। জরুরি যন্ত্রপাতি দ্রুত সরবরাহের জন্য আঞ্চলিক পর্যায়ে রিজার্ভ ব্যবস্থাও গড়ে তোলা যেতে পারে।
বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় সরকার, বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারী, ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তা এবং গ্রাহকসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর বিষয়েও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, দেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের চাহিদা পূরণে শুধু নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ নয়, উৎপাদনের পাশাপাশি সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থার আধুনিকায়নই হতে পারে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার অন্যতম প্রধান পথ।
বিশ্ব বাস্তবতায় জাতিসংঘের ঘোষিত ছয় অগ্রাধিকার
৬ ঘন্টা আগে