বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬, ১৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
সর্বশেষ বিশেষ সংবাদ জাতীয় সারাদেশ আন্তর্জাতিক খেলা বিনোদন বাণিজ্য লাইফস্টাইল লালমনিরহাট মতামত অন্যান্য

রেলে ভয়াবহ ইঞ্জিন সংকট, লোকোমোটিভ ক্রয় নিয়ে বিতর্ক; জাতীয় সম্পদ রক্ষায় সরকারের জরুরি পদক্ষেপের দাবি


প্রকাশ : (১৩ ঘন্টা আগে)
রেলে ভয়াবহ ইঞ্জিন সংকট, লোকোমোটিভ ক্রয় নিয়ে বিতর্ক; জাতীয় সম্পদ রক্ষায় সরকারের জরুরি পদক্ষেপের দাবি

বাংলাদেশ রেলওয়ের ইতিহাসের অন্যতম বড় সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে আছে দেশের রেলসেবা। ভয়াবহ ইঞ্জিন সংকট, ঘন ঘন ট্রেন বিকল, যাত্রীসেবায় বিঘ্ন, শত শত কোটি টাকার সম্ভাব্য রাজস্ব ক্ষতি, ৭০টি মিটারগেজ লোকোমোটিভ ক্রয় প্রকল্প বাতিল এবং নতুন ৩০টি লোকোমোটিভ ক্রয়কে ঘিরে বিতর্ক সব মিলিয়ে রেলের অভ্যন্তরে গভীর উদ্বেগ ও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।

এমন প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ রেলওয়ে পোষ্য সোসাইটি দাবি করেছে, রেলওয়েকে দুর্বল ও ব্যর্থ প্রমাণের একটি অপচেষ্টা দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় রয়েছে। একই সঙ্গে তারা রেলের চলমান সংকট নিরসনে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।

মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) সকালে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির পক্ষ থেকে এসব দাবি তুলে ধরা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে বাংলাদেশ রেলওয়ে পোষ্য সোসাইটির কেন্দ্রীয় সভাপতি মো. মনিরুজ্জামান মনির বলেন, দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় পরিবহন প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ রেলওয়ে বর্তমানে ইঞ্জিন সংকট, প্রশাসনিক জটিলতা, জনবল সংকট এবং বিভিন্ন বিতর্কের কারণে চরম চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।

তিনি দাবি করেন, প্রতিদিন বাংলাদেশ রেলওয়ের ২৬৮টি লোকোমোটিভের প্রয়োজন হলেও বর্তমানে গড়ে সচল রয়েছে মাত্র ১৮০টি। ফলে প্রতিদিনই পূর্বাঞ্চলে ৩২টি এবং পশ্চিমাঞ্চলে ৩৬টিসহ মোট ৬৮টি ট্রেন বাতিল করতে হচ্ছে। এতে একদিকে যাত্রীসেবা ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে পণ্য ও জ্বালানি পরিবহনও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, শুধু গত ডিসেম্বর মাসেই ৫৫টি ইঞ্জিন বিকলের ঘটনা ঘটেছে। বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে তিনটি লোকোমোটিভ বিকল হচ্ছে। ইঞ্জিন সংকটের কারণে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় মেরামতও সম্ভব হচ্ছে না। এর ফলে ট্রেনের সময়সূচি বিপর্যস্ত হচ্ছে এবং সাধারণ যাত্রীদের দুর্ভোগ দিন দিন বাড়ছে।
সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলে প্রতিদিন প্রায় ৮৫টি লোকোমোটিভ প্রয়োজন হলেও সচল অবস্থায় পাওয়া যায় মাত্র ৭০ থেকে ৭২টি। এ সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ছে কনটেইনার পরিবহন, জ্বালানি তেল সরবরাহ এবং পণ্য পরিবহনে। এতে জাতীয় অর্থনীতিও ক্ষতির মুখে পড়ছে।

রেলওয়ে পোষ্য সোসাইটির দাবি, ইঞ্জিন সংকটের কারণে বাংলাদেশ রেলওয়ে বছরে প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকার সম্ভাব্য রাজস্ব হারাচ্ছে। তাদের মতে, প্রয়োজনীয় সংখ্যক ইঞ্জিন সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে রেলওয়ের আয় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেত এবং সেবার মানও উন্নত হতো।

সংবাদ সম্মেলনে ৭০টি মিটারগেজ লোকোমোটিভ ক্রয় প্রকল্প বাতিলের বিষয়েও প্রশ্ন তোলা হয়। সংগঠনটির অভিযোগ, প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রিতা ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে এটি বাতিল হয়ে যায়। তারা এ বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ীদের চিহ্নিত করার দাবি জানিয়েছে।

এদিকে, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে ৩০টি নতুন মিটারগেজ লোকোমোটিভ ক্রয়ের উদ্যোগকে রেলের বর্তমান সংকট নিরসনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করা হয়। তবে এই প্রকল্পের দরপত্র, এক্সেল লোড এবং কারিগরি বিষয়াদি নিয়ে চলমান বিতর্কের কারণে ক্রয় প্রক্রিয়া বিলম্বিত হওয়ার আশঙ্কাও প্রকাশ করেছে সংগঠনটি।

সংবাদ সম্মেলনে রেলওয়ের নিয়োগ বিধিমালা-২০২০ দ্রুত সংশোধন, দীর্ঘদিনের জনবল সংকট নিরসন এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। একই সঙ্গে রেলওয়ের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদকে ঘিরে চলমান ‘নোংরা প্রতিযোগিতা’ বন্ধেরও দাবি জানানো হয়।

সংগঠনটি সরকারের কাছে আট দফা দাবি তুলে ধরে। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে এডিবির অর্থায়নে ৩০টি লোকোমোটিভ দ্রুত ক্রয়, ৭০টি লোকোমোটিভ প্রকল্প বাতিলের কারণ উদঘাটন, রেলওয়ের নিয়োগ বিধিমালা সংশোধন, অপপ্রচার ও ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তদন্ত এবং রেলওয়ের উন্নয়ন প্রকল্পে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।

সংবাদ সম্মেলনের শেষ বক্তব্যে বাংলাদেশ রেলওয়ে পোষ্য সোসাইটির সভাপতি বলেন, “বাংলাদেশ রেলওয়ে একটি জাতীয় সম্পদ। ব্যক্তিগত স্বার্থ, পদোন্নতির প্রতিযোগিতা কিংবা কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর প্রভাব যেন দেশের রেলসেবাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে না পারে। রাষ্ট্রের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে প্রতিটি বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।”

সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ রেলওয়ে কারিগর পরিষদের সাধারণ সম্পাদক এস কে বারী, বাংলাদেশ শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ) চট্টগ্রাম মহানগরের সহ-সভাপতি আনোয়ারুল হক হনি, বাংলাদেশ রেলওয়ে শ্রমিক ইউনিয়নের অর্থ সম্পাদক হারুন-অর-রশীদসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

বিজ্ঞাপন