সোমবার, ১১ মে ২০২৬, ২৮ বৈশাখ ১৪৩৩
সর্বশেষ বিশেষ সংবাদ জাতীয় সারাদেশ আন্তর্জাতিক খেলা বিনোদন বাণিজ্য লাইফস্টাইল আইন-আদালত মতামত অন্যান্য
/ জাতীয়

“বাংলাদেশে সুস্থ রাজনীতি চাই ”


প্রকাশ :

বাংলাদেশের রাজনীতিতে যা চলছে, তাতে প্রকৃত রাজনীতি নেই। গনতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও আন্তর্জাতিকতাবাদ ইত্যাদি বলা হয় বটে, কিন্তু এগুলো সম্পর্কে কোনো রাজনৈতিক নেতা কিংবা বুদ্ধিজীবীর পরিচ্ছন্ন কোনো লিখিত বক্তব্য পাওয়া যায় না। জনসাধারণের মধ্যেও কোনো রাজনীতি নিয়ে আগ্রহ লক্ষ্য করা যায় না।

দেশে সুস্থ রাজনীতি গড়ে  না ওঠার কারণে এনজিও,  সিভিল সোসাইটি ১৯৮০ সাল থেকে বাংলাদেশের  রাজনীতিকে বিরাজনীতিকরণের অপচেষ্টা চালিয়ে আসছিল। প্রথমে তারা ওয়ান-ইলেভেন সৃষ্টিতে মুখ্য ভূমিকা  করেছিল, কিন্তু সেসময় তারা সফল হতে পারেনি। ২০২৪ সালে জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোলনকে মেটিকুলাস ডিজাইনে বৈষম্য-বিরোধী আন্দোলনে রূপ দান করে।

আবু সাঈদ  নিহত হওয়ার পর গণ-অভ্যুত্থানে পরিণত করে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটিয়ে তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করে। ড. ইউনুস গ্রামীন ব্যাংক পরিবার ও এনজিও, সিভিল সোসাইটিদের সমন্বয়ে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করেন।  দু-একজন ব্যতীত সবাই পশ্চিমা কর্তৃত্ববাদীদের এজেন্ট এবং প্রায় সবাই দ্বৈত নাগরিক। 

যাঁরা এদেশে বসবাস করে না, যাদের এদেশের জন্য কোনো মায়া-মমতা নেই, যাঁরা পশ্চিমা কর্তৃত্ববাদীদের অর্থে পরিচালিত হয়, তাঁরা কী এদেশের গণমানুষের সর্বজনীন মঙ্গল কামনা করতে পারে?

 ড. ইউনুস রাষ্ট্র সংস্কারের নামে দেশে রাজনীতিকে বিরাজনীতিকরণ ও জাতিকে মেধাশূন্য করার জন্য সূক্ষ্ম পরিকল্পনা করেছিল। তরুণদের অর্থ ও ক্ষমতার লালসা তৈরি করে মব সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল। তরুণ শিক্ষার্থীদের শিক্ষাবিমুখ করে  অর্থ ও অপক্ষমতার 

কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছিল। ছাত্রদের হাতে  কলম ও বই থাকার কথা ছিল। কিন্তু ইউনুসের শাসনকালে তরুণ  ছাত্রদেরকে দিয়ে চর দখলের ন্যায় প্রায় ৪৫০০ শিক্ষকদের ওপর মব সন্ত্রাসের মাধ্যমে যেভাবে জুলুম-নির্যাতন করা হয়েছে, তা পৃথিবীর ইতিহাসে কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবে লেখা থাকবে। মব সন্ত্রাসের ভয়ে একজন শিক্ষকও এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে সাহস করেনি। 

 রাষ্ট্রসংস্কার কমিশনের জন্য আমেরিকা থেকে অধ্যাপক আলী রিয়াজকে ভাড়া করে এনেছিল। রাষ্ট্রসংস্কারের জন্য অধ্যাপক আলী রিয়াজের চেয়ে অনেক অভিজ্ঞ লোক দেশে ছিল।   আমাদের একটি কথা মনে রাখতে হবে, ভারত আমাদের প্রতিবেশী হলেও তাদের আধিপাত্য প্রভাব বিস্তারের ফলে আমরা তাদেরকে শত্রু  মনে করি, কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শাসকবর্গ পৃথিবীর মানবজাতির শত্রু। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ ও তাদের প্রেসক্রিপশন নিয়ে যাঁরা কাজ করে, তাঁরাও মানবজাতির শত্রু। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কারোর বন্ধু হতে পারে না। অন্তর্বর্তী সরকারে কোনো রাজনৈতিক নেতা, পেশাজীবী, আইনজীবী, সাংবাদিক ও গণমানুষের বুদ্ধিজীবী ছিল না। অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের মাধ্যমে এনজিও, সিভিল সোসাইটি তাদের উদ্দেশ্য শতভাগ সফলতা অর্জন করেছিল এবং অন্তর্বর্তী সরকারের  সবাই দীর্ঘমেয়াদি ক্ষমতায় থাকার জন্য পরিকল্পনাও করেছিল। ড. ইউনুস যদি পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকতে পারতো, তাহলে বাংলাদেশে কোনো রাজনৈতিক দলের অস্তিত্ব টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়তো। জঙ্গিবাদের উত্থান হতো। তবে ড. ইউনুস জনগণের পালস্ বুঝতে পেরে সেদিকে অগ্রসর হতে সাহস করেনি এবং দীর্ঘমেয়াদি ক্ষমতায় থাকার জন্য সেনাবাহিনীও সমর্থন করেননি। 

যার ফলে ড. ইউনুস ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। 

সেনাবাহিনীর সমর্থন পেলে ডঃ ইউনুস নির্বাচন দিত না। এক্ষেত্রে দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী জাতির জন্য মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে। এতে দেশের ও ইউনুসেরও মঙ্গল হয়েছে। ইউনুস নির্বাচন দিয়ে শুভবুদ্ধির পরিচয় দিয়েছে। 

বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলেও গত ৫৫ বছরে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার এবং জনগণের অধিকার  ও  আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়নি। রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি হলো রাজনৈতিক দল। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে সুস্থ ধারার একটিও জনগণের  রাজনৈতিক দল গড়ে ওঠেনি। সুস্থ ধারার রাজনৈতিক দল গড়ে ওঠলে,  সুস্থ ধারার রাজনীতি গড়ে উঠতো। গণতন্ত্রের জন্য প্রয়োজন সুস্থ ধারার রাজনীতি। গণতন্ত্র বিকাশশীল। যে দেশে  গণতন্ত্র দুর্বল, সেখানে স্বৈরাচারের আবির্ভাব হয় এবং স্বৈরাচার থেকে একনায়কতন্ত্র ফ্যাসিবাদের জন্ম নেয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯১৯ সালে ইতালিতে বিনিটো মুসোলিনি “ Fascist di Combattimento” নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলেন এবং এটির মাধ্যমে বিশ্বে প্রথম ফ্যাসিবাদের সূচনা করেন। ১৯২২ সালে March on Rome ঘটনার মাধ্যমে মুসোলিনি ক্ষমতায় আসেন এবং ইতালিতে ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৩৩ সালে জার্মানিতে এডলফ হিটলার এর নেতৃত্বে নাৎসি শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ফ্যাসিবাদের জন্ম নেয়। এরপর পর্যায়ক্রমে স্পেন ও পর্তুগালে ফ্যাসিবাদ শুরু হয়। এছাড়াও ইউরোপসহ  বিশ্বের আরও অনেক দেশে ছড়িয়ে পড়ে। ফ্যাসিবাদ হঠাৎ করে ট্যাঙ্কের গর্জনে, কিংবা বন্দুকের নলে জন্ম নেয়নি। আধুনিক বিশ্বে ফ্যাসিবাদ জন্ম নিয়েছে সংবাদের শিরোনামে, ক্যামেরার ফ্রেমে, আর নিয়ন্ত্রিত শব্দ চয়নে। যেদিন সংবাদমাধ্যম সত্য প্রচারের দায়িত্ব ছেড়ে ক্ষমতার প্রচারক হয়ে ওঠে, সেদিন একটি সমাজ প্রথমবারের মতো ফ্যাসিবাদের দিকে পা বাড়ায়। বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদ সৃষ্টিতে সংবাদমাধ্যম মুখ্য ভূমিকা পালনে চারদিক থেকে কাজ করেছে। যেমন- সত্য বিকৃতির মাধ্যমে জনমত নিয়ন্ত্রণ, ভয় ও ঘৃণার রাজনীতি তৈরি, ভিন্নমত প্রদানে বৈধতা প্রদান ও জনগণকে নিরব দর্শকে পরিণত করা। সংবাদমাধ্যম যখন সম্পূর্ণ মিথ্যা বলে না অর্থাৎ আংশিক সত্য বলে, সত্যের একাংশ আমাদেরকে দেখায় এবং অন্যান্য অংশ সম্পূর্ণভাবে আড়াল হয়ে যায়, তখনই শুরু হয় সবচেয়ে ভয়ংকর নিয়ন্ত্রণ। সংবাদমাধ্যম যখন তথ্যবিকৃতিকে অশ্রুত রূপ  দান করে, তখন আর জনমত স্বাধীন থাকে না। সেটি পরিণত হয় ফ্যাসিবাদের দাসে। যখন মিথ্যা সত্যের পোশাক পড়ে,যখন নিপীড়ণকে শৃঙ্খলা বলা হয়, যখন প্রশ্নকারী অপরাধী হয়, যখন নিরব দর্শক আদর্শ নাগরিকে পরিণত হয় এবং সমালোচনাকারী শত্রুতে পরিণত হয়, তখন আমাদের বুঝে নিতে হবে ফ্যাসিবাদ আজ ক্ষমতায় না চিন্তায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। দুর্নীতি যেমন মানুষের রক্ত কণিকার শিরা-উপশিরায় মিশে গিয়েছে, তেমনি ফ্যাসিবাদ মানুষের মনন জগতে প্রবেশ করেছে।

বাংলাদেশে প্রয়োজন সুস্থ ধারার রাজনীতি। সুস্থ ধারার রাজনীতি প্রতিষ্ঠিত না হলে গণতন্ত্র বিকশিত হবে না। প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত না হলে আবারও ওয়ান-ইলেভেন সৃষ্টি হবে, নয়া ফ্যাসিবাদের জন্ম নিবে, নয়া গণ-অভ্যুত্থান তৈরি হবে এবং রাজনীতিকে বিরাজনীতিকরণের জন্য  এনজিও, সিভিল সোসাইটি ও পশ্চিমা কর্তৃত্ববাদীদের এজেন্টরা আবার ক্ষমতায় আসবে, আর জনগণকে দিতে হবে এর মাশুল।

বাংলাদেশের জন্য প্রথমে সূচনা করা দরকার রাজনীতির উন্নতি। রাজনীতির উন্নতি ছাড়া উন্নয়নের যেসব পরিকল্পনা দেখা যায়, সেগুলো অল্পই সাফল্য অর্জন করে। রাজনীতির উন্নতির জন্য  আমাদের দরকার রাজনীতিক নেতা, রাজনীতিক দল, রাজনীতিক আদর্শ ও  উপস্থিত কালের জন্য পরিচ্ছন্ন রাজনীতিক বক্তব্য। এই সবকিছুই জনগণের ভিতর থেকে গড়ে  তুলতে হবে। রাজনীতিতে জনগণের সক্রিয়তা দরকার।

নেতৃত্ব গড়ে তোলা যাবে রাজনীতিক দলের  দ্বারা। বাংলাদেশে এখন  রাজনীতিক দল গঠনেই কেন্দ্রীয় গুরুত্ব দিতে হবে। চলমান অবস্থায় রাজনীতি সংক্রান্ত সবকিছুই বিশৃঙ্খলা  ও বিভ্রান্তির মধ্যে আছে। এ অবস্থায় রাজনীতিক দল গঠন ও নেতৃত্ব সৃষ্টি অত্যন্ত কঠিন কাজ। কঠিন মানে অসম্ভব নয়। কঠিন পথে চলেই রাজনীতিক দল, রাজনীতিক নেতৃত্ব ও নতুন রাজনীতিক ধারা গড়ে তুলতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। 

(লেখকঃ এম এ আলীম সরকার : প্রাবন্ধিক ও  রাজনৈতিক বিশ্লেষক,   সভাপতি, বাংলাদেশ গণমুক্তি পার্টি (বিজিপি)।)