বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকার ও জাতীয় ঐকমত্য কমিশন দেশ এবং জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে, যা কখনোই প্রত্যাশিত ছিল না।
আজ শুক্রবার রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল–জেএসডির ৫৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন তিনি।
জুলাই জাতীয় সনদ এবং তা বাস্তবায়নের সুপারিশ প্রসঙ্গে বিএনপির মহাসচিব বলেন, “যখন জাতীয় ঐকমত্য কমিশন তাদের সুপারিশ উপস্থাপন করল অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার কাছে, দেখা গেল তা মূল খসড়া থেকে ভিন্ন। বিশেষ করে যেসব বিষয়ে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দেওয়া হয়েছিল, সেগুলো চূড়ান্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি। আমরা তাদের প্রতি আস্থা রেখেছিলাম, কিন্তু সেই বিশ্বাসেরই অপব্যবহার করা হয়েছে।”
ফখরুল বলেন, বিএনপি সংস্কারের পক্ষে থাকা একটি দল। মতভেদ থাকলেও তারা জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছে। যেসব প্রস্তাবে দ্বিমত ছিল, সেখানে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দেওয়া হয়েছে। “জনগণ যদি আমাদের ভোট দেয়, তাহলে আমরা সেই বিষয়গুলো সংসদে এনে বাস্তবায়ন করব; আর ভোট না দিলে তা করব না—এটাই গণতন্ত্র,” বলেন তিনি।
বিএনপিকে সংস্কারবিরোধী দল হিসেবে উপস্থাপন করার সমালোচনা করে তিনি বলেন, “বিএনপির জন্মই হয়েছে সংস্কারের মধ্য দিয়ে। ১৯৭৯ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান একদলীয় শাসন ভেঙে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।”
আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিলম্বিত করার চেষ্টা চলছে উল্লেখ করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, “গণভোট নির্বাচনের আগে করার সুযোগ এখন নেই। আমরা পরিষ্কার করে বলেছি—গণভোট নির্বাচনের দিনই হবে। ভোটারদের হাতে থাকবে দুটি ব্যালট—একটি গণভোটের জন্য, আরেকটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য।”
কোনো দলের নাম না নিয়ে তিনি বলেন, “যারা গণভোটের দাবিতে রাস্তায় নেমেছে, দয়া করে জনগণকে বিভ্রান্ত করবেন না। এই দল ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল। আজ যেন তারা জনগণের নির্বাচনী আকাঙ্ক্ষার বিরোধিতা না করে।”
সভায় বিএনপি মহাসচিব জেএসডি সভাপতি আ স ম আব্দুর রবের রাজনৈতিক অবদানের কথা স্মরণ করেন। তিনি বলেন, “মুক্তিযুদ্ধের পর একদলীয় শাসনের বিরুদ্ধে আ স ম আব্দুর রবের মতো নেতারা দেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।” তাঁর দ্রুত সুস্থতা কামনা করেন ফখরুল।
তিনি আরও জানান, নির্বাচনে জয়ী হলে বিএনপি ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত দলগুলোকে নিয়ে জাতীয় সরকার গঠন করবে।
সভায় নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, “দেশ এখন গভীর সংকটে। অন্তর্বর্তী সরকার জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করছে। যারা ভবিষ্যতে নির্বাচন আয়োজন করবে, যদি তারাও প্রতারক হয়, তাহলে জনগণের সামনে আর বিকল্প কী থাকবে?” তিনি মনে করেন, নির্বাচনের আগে গণভোট আয়োজনের মতো পরিস্থিতি এখন দেশে নেই। বর্তমান সংকট থেকে উত্তরণের একমাত্র উপায় দ্রুত জাতীয় নির্বাচন আয়োজন।
আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, “আমাদের ইতিহাসের দুর্ভাগ্য—প্রতিবার স্বৈরাচারকে সরিয়ে আবার নিজেদের মধ্যেই স্বৈরাচার জন্ম দিই। আমরা ভেবেছিলাম গণ–অভ্যুত্থানের পর নতুন রাজনীতি শুরু হবে, কিন্তু এখন বিএনপি–জামায়াতের দ্বিদলীয় কাঠামোই প্রাধান্য পাচ্ছে।”
গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর বলেন, গণভোট এখন অনেকের কাছে সংসদের আসন নির্ধারণের হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, “ডিসেম্বরে যদি জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হয়, এক মাসের মধ্যে আবার গণভোট আয়োজন কি সম্ভব?”
বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, বর্তমান অবস্থায় দেশে একসঙ্গে দুটি নির্বাচন আয়োজনের ঝুঁকি নেওয়ার সুযোগ নেই। তিনি জানান, “অন্তর্বর্তী সরকারকে আমরা নির্দিষ্ট বিষয়ে সমর্থন দিয়েছি। কিন্তু তাদের নির্বাহী ক্ষমতা দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।”
জেএসডির সাধারণ সম্পাদক শহীদ উদ্দিন মাহমুদ স্বপন জানান, অসুস্থতার কারণে দলের সভাপতি আ স ম আব্দুর রব সভায় উপস্থিত থাকতে পারেননি, তবে তিনি সকল অতিথিকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।
সভায় সভাপতিত্ব করেন জেএসডির সহসভাপতি তানিয়া রব। তিনি বলেন, “জেএসডি অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের জন্য গঠিত হয়েছিল। আজও আমরা সেই অবস্থানে আছি।”
আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ হাসিবউদ্দীন হোসেন, ভাসানী জনশক্তি পার্টির চেয়ারম্যান শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলু, গণফোরামের সভাপতি সুব্রত চৌধুরী, জেএসডির স্থায়ী কমিটির সদস্য তৌহিদ হোসেন ও জাতীয় যুব পরিষদের সভাপতি এস এম শামসুল আলম নিক্সন।