রবিবার, ২২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১০ ফাল্গুন ১৪৩২
সর্বশেষ বিশেষ সংবাদ জাতীয় সারাদেশ আন্তর্জাতিক খেলা বিনোদন বাণিজ্য লাইফস্টাইল আইন-আদালত মতামত অন্যান্য
/ জাতীয়

শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে আনতে ঢাকায় গোপনে প্রশিক্ষণ


প্রকাশ :

রাজনৈতিক অঙ্গনে ফের ষড়যন্ত্রের গন্ধ। দীর্ঘদিন ধরেই ক্ষমতার বাইরে থাকা এবং দেশে ফেরার পথ রুদ্ধ হওয়া শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে আনতে সক্রিয় হয়েছে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের একটি প্রভাবশালী অংশ। গোয়েন্দা সংস্থার নির্ভরযোগ্য সূত্র বলছে—দেশকে অস্থিতিশীল করে সরকার উৎখাতের লক্ষ্যে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গোপনে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনাটি অত্যন্ত সুসংগঠিত ও কৌশলগত। 

গোয়েন্দা সংস্থার তদন্তে উঠে এসেছে, অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারকে সরিয়ে দিতে আগস্ট মাসকে কেন্দ্র করে একটি বিস্তৃত নাশকতার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে আওয়ামী লীগের নিষিদ্ধ অংশটি। এ লক্ষ্যে ছাত্রলীগসহ দলের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের প্রায় আড়াই হাজার ‘বিশ্বস্ত’ ক্যাডারকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। রাজধানীর মিরপুর, ভাটারা, কাটাবন ও পূর্বাচল এলাকায় পর্যায়ক্রমে এই প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালিত হয়।

বিশেষ করে গত ৮ জুলাই রাজধানীর ভাটারা থানা এলাকার একটি কনভেনশন সেন্টারে গোপনে একটি কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে এই কার্যক্রম, যেখানে প্রায় ৪০০ জন প্রশিক্ষণার্থী অংশ নেয়। অংশগ্রহণকারীদের আগে থেকেই নির্দিষ্ট টোকেন সরবরাহ করা হয়, যা মিরপুর ডিওএইচএসে আয়োজিত এক গোপন বৈঠকের মাধ্যমে বিতরণ করা হয়। প্রশিক্ষণস্থলে প্রবেশের শর্ত ছিল ওই টোকেন প্রদর্শন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, প্রশিক্ষণ চলাকালে কনভেনশন সেন্টারের সমস্ত সিসিটিভি ক্যামেরা বন্ধ রাখা হয়—ম্যানেজমেন্টের সরাসরি সহযোগিতায়।

এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এখন পর্যন্ত ২২ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন বরগুনার যুবলীগ নেতা সোহেল রানা, গোপালগঞ্জের আওয়ামী লীগ নেত্রী শামীমা নাসরিন শম্পা এবং মেহেরপুর জেলা যুবলীগ আহ্বায়ক মাহফুজুর রহমান রিটন। সোহেল ও শম্পাকে রাজধানীর উত্তরা পশ্চিম থানার বিভিন্ন বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। শম্পার স্বামী স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। এই তিনজনের বিরুদ্ধে গোটা প্রশিক্ষণ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সক্রিয় ভূমিকার অভিযোগ রয়েছে।

রিমান্ডে নেওয়া সোহেল ও শম্পার মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদে উঠে আসে মেজর সাদেকুল হকের নাম। তদন্তকারীরা জানান, এ পরিকল্পনায় মেজরের স্ত্রী, সহকারী পুলিশ সুপার (এএসরী পুলিশ সুপার (এএসপি) সুমাইয়া জাফরিনও জড়িত রয়েছেন। তারা কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার সময় ঢাকায় প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করেন এবং শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগে ছিলেন বলেও গোয়েন্দা তথ্য উঠে এসেছে।

তদন্ত সূত্র আরও জানায়, শেখ হাসিনার দেশে প্রত্যাবর্তন এবং সরকার উৎখাতের গোটা প্রক্রিয়াটি কলকাতা থেকে পর্যবেক্ষণ ও তদারকি করছেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। সেখানে তাকে সহযোগিতা করছেন ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান এবং আরও কয়েকজন সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা ও আওয়ামী লীগ নেতা। পাশাপাশি, ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর সমন্বয়ে চলমান এই পরিকল্পনায় কৌশলগত সহায়তা করছেন দিল্লিতে অবস্থানরত পলাতক অতিরিক্ত আইজিপি মনিরুল ইসলাম এবং ডিজিএফআইয়ের সাবেক প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল মুজিবুর রহমান।

ঢাকার প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে অংশগ্রহণকারী সব ক্যাডারকে ইতোমধ্যে শনাক্ত করেছে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। তাদের গতিবিধি নজরদারির আওতায় রাখা হয়েছে। একইভাবে প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে অর্থায়নকারী ব্যবসায়ীদেরও নজরদারিতে রাখা হয়েছে। শুধু মেজর সাদেক দম্পতি নয়—এই ষড়যন্ত্রের পেছনে আরও কেউ জড়িত কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

পুলিশের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, সোহেল ও শম্পা জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছেন যে প্রশিক্ষণে মেজর সাদেক ছাড়াও আরও কয়েকজন প্রশিক্ষক ছিলেন। ভাটারার যে কনভেনশন সেন্টারটিতে প্রশিক্ষণ চলছিল, সেটি সাবেক মালিক বায়জিদের মাধ্যমে ভাড়া নেওয়া হয়। বায়জিদের বাড়ি গোপালগঞ্জে। প্রশিক্ষণ চলাকালে সেন্টারের ম্যানেজার সিসিটিভি ক্যামেরা বন্ধে সরাসরি সহযোগিতা করেন।

এ বিষয়ে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে ৩১ জুলাই ঢাকা সেনানিবাসের অফিসার্স মেস ‘এ’-তে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে সেনাসদরের মিলিটারি অপারেশনস পরিদপ্তরের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. নাজিম-উদ-দৌলা জানান, “মেজর সাদেকের বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। তিনি বর্তমানে আমাদের হেফাজতে রয়েছেন। তদন্ত চলছে। যদি তদন্তে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তবে সেনাবাহিনীর প্রচলিত বিধি অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

এদিকে ভাটারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রাকিবুল হাসান জানান, সোহেল রানা ও শামীমা নাসরিন শম্পাসহ বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং বর্তমানে তারা কারাগারে রয়েছেন। তদন্ত চলমান রয়েছে।

ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মুহাম্মদ তালেবুর রহমান বলেন, “গ্রেপ্তারকৃতদের বিষয়ে জোরালো তদন্ত চলছে। দেশে কোথাও নাশকতা সংগঠনের কোনো চেষ্টার ইঙ্গিত মিললে তা কঠোরভাবে প্রতিহত করা হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ সবসময় প্রস্তুত।”