রবিবার, ২২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১০ ফাল্গুন ১৪৩২
সর্বশেষ বিশেষ সংবাদ জাতীয় সারাদেশ আন্তর্জাতিক খেলা বিনোদন বাণিজ্য লাইফস্টাইল আইন-আদালত মতামত অন্যান্য
/ জাতীয়

এপ্রিল নির্বাচনকে ঘিরে জটিলতার মুখে সরকার: বিশ্লেষণ বিবিসি বাংলার


প্রকাশ :

বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস আগামী বছর এপ্রিলের প্রথমার্ধে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের সময়সীমা ঘোষণা করেছেন। তবে এ ঘোষণার পরপরই দেশের প্রধান বিরোধীদল বিএনপি ও তাদের সমমনা রাজনৈতিক দলগুলো হতাশা প্রকাশ করে এই সিদ্ধান্তের পেছনে গণতান্ত্রিক ঐকমত্যের অভাবের অভিযোগ তুলেছে।

বিবিসি বাংলার একটি বিশ্লেষণী প্রতিবেদন অনুসারে, সরকার নির্ধারিত এই সময়সীমা মেনে নিলেও একটি অংশগ্রহণমূলক, গ্রহণযোগ্য, নিরপেক্ষ এবং উৎসবমুখর নির্বাচন আয়োজনের পথে সরকারের সামনে রয়েছে নানামুখী জটিল চ্যালেঞ্জ।

বিশেষ করে, রাজনৈতিক ঐকমত্য ছাড়াই নির্বাচন তফসিল ঘোষণার কারণে ইতোমধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আগামী দশ মাসে সরকারকে শুধু নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নয়, একইসাথে 'জুলাই সনদ' অনুযায়ী কাঠামোগত সংস্কার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাসহ প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার দিকেও দৃষ্টি দিতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জোবাইদা নাসরীন বিবিসি বাংলাকে জানান, “প্রধান উপদেষ্টা ও তার উপদেষ্টামণ্ডলীর এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ হচ্ছে নিজেদের নিরপেক্ষতা জনগণের সামনে প্রমাণ করা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর আস্থা অর্জন করা।”

বিএনপি ইতোমধ্যেই সরকারকে 'বিচারপতি ও প্রশাসনে পক্ষপাতদুষ্ট' বলে দাবি করে দুই উপদেষ্টার পদত্যাগ দাবি করেছে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, আসন্ন নির্বাচন হতে পারে একটি "সম্ভাব্য ডাকাতি", যা সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ নিয়েই প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে।

নির্বাচন কমিশন এখনও পর্যন্ত ভোটার তালিকা হালনাগাদ ছাড়া নির্বাচনি কার্যক্রমে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি দেখাতে পারেনি বলে বিশ্লেষকেরা বলছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোহাম্মদ সাইফুল আলম চৌধুরী জানান, “একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য অন্তত দশটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ থাকে, কিন্তু কমিশন তেমন কিছুই এগিয়ে নিতে পারেনি।”

বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে আরও উঠে এসেছে, নির্বাচনি আসনের সীমানা নির্ধারণ পুরনো আইন অনুযায়ী হবে, নাকি নতুন আইনে—সে প্রশ্নের উত্তর এখনও পরিষ্কার নয়। আবার যদি নতুন আইন করা হয়, তবে অল্প সময়ের মধ্যে সে অনুযায়ী পূর্ণাঙ্গ সীমানা পুনর্নির্ধারণ ও জনমত গ্রহণের কাজ শেষ করা আদৌ সম্ভব কিনা, সে নিয়েও সংশয় আছে।

বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, বর্তমানে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের লাখো সমর্থক রয়েছে, যারা দেশের বড় একটি ভোটব্যাংক। তাদের ভোটাধিকার ও অন্তর্ভুক্তি ছাড়াই একটি নির্বাচন কতটা গ্রহণযোগ্য হতে পারে, তা নিয়েও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রশ্ন উঠতে পারে বলে সতর্ক করছেন বিশ্লেষকরা।

জাতিসংঘের আবাসিক প্রতিনিধি গোয়েন লুইস সম্প্রতি ঢাকায় বলেন, অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন বলতে বোঝানো হয়, "সব শ্রেণির ভোটার যেন নির্বিঘ্নে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন।" এতে বোঝা যায়, শুধুমাত্র দলের অংশগ্রহণ নয়, বরং সাধারণ জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করাটাই অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের মূল সার্থকতা।

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়েও আশঙ্কা রয়ে গেছে। যদিও জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ আশাবাদী হয়ে বলেন, “রাজনৈতিক দলগুলোর সহযোগিতা অব্যাহত থাকলে জুলাই সনদসহ সংস্কার কর্মসূচি আগামী মাসেই চূড়ান্ত করা সম্ভব হবে।”

তবে সংশয় থেকেই যায়, কারণ গত এগারো মাসে সরকার সংস্কার ইস্যুতে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি দেখাতে পারেনি। এমনকি মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার নিয়ে দ্বিতীয় ট্রাইব্যুনাল গঠনের পরও প্রশ্ন উঠেছে—এই বিচার প্রক্রিয়া আদৌ ‘গ্রহণযোগ্য’ হবে কিনা।

প্রধান উপদেষ্টা তার ভাষণে বলেছেন, “সংস্কার, বিচার ও নির্বাচন—এই তিনটি ম্যান্ডেট নিয়েই আমরা দায়িত্ব নিয়েছি। রোজার ঈদের আগেই সংস্কার ও বিচারের বিষয়ে একটি গ্রহণযোগ্য অবস্থানে পৌঁছানো সম্ভব হবে।”

তবে বাস্তবতা বলছে, সরকার যদি সত্যিকার অর্থে একটি গ্রহণযোগ্য, অংশগ্রহণমূলক ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজন করতে চায়, তাহলে আগামী দশ মাস তাদের জন্য হতে যাচ্ছে কঠিনতম সময়। শুধুমাত্র সময় ঘোষণা করেই আস্থা অর্জন সম্ভব নয়—তার জন্য প্রয়োজন হবে দৃশ্যমান পরিবর্তন, স্বচ্ছতা, এবং রাজনৈতিক সহযোগিতার এক অভূতপূর্ব পরিবেশ।