বুধবার, ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ২১ আশ্বিন ১৪৩৩
☰ সর্বশেষ বিশেষ সংবাদ জাতীয় সারাদেশ আন্তর্জাতিক খেলা বিনোদন বাণিজ্য লাইফস্টাইল লালমনিরহাট মতামত অন্যান্য

বিতর্কে যুক্তির লড়াই, জ্ঞানের আলোয় শিক্ষার্থীদের উৎসব


প্রকাশ : (৬ ঘন্টা আগে)
বিতর্কে যুক্তির লড়াই, জ্ঞানের আলোয় শিক্ষার্থীদের উৎসব

‘বিতর্ক মানেই যুক্তি, জ্ঞানেই মুক্তি’ এই স্লোগানকে সামনে রেখে কুড়িগ্রাম সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত হলো দিনব্যাপী বিতর্ক উৎসব। মঙ্গলবার(৬ অক্টোবর) সকাল থেকে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ছিল শিক্ষার্থীদের প্রাণবন্ত উপস্থিতি। কখনো যুক্তির তীক্ষ্ণতায় প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার চেষ্টা, কখনো তথ্য-উপাত্ত দিয়ে নিজের বক্তব্যের পক্ষে অবস্থান সব মিলিয়ে উৎসবের দিনটি পরিণত হয় জ্ঞান ও যুক্তির মিলনমেলায়।
বিতর্কের মঞ্চে একের পর এক বক্তব্যে উঠে আসে শিক্ষার্থীদের চিন্তাশক্তি, উপস্থিত বুদ্ধি ও বিশ্লেষণী ক্ষমতার পরিচয়। প্রতিপক্ষের বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শুনে তার পাল্টা যুক্তি তুলে ধরা, তথ্যের ব্যবহার এবং সাবলীল উপস্থাপনায় মুগ্ধ হন উপস্থিত দর্শক ও বিচারকেরা।

দিনব্যাপী এ আয়োজনে ৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ২৪ শিক্ষার্থী অংশ নেন। অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো হলো,কুড়িগ্রাম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, কুড়িগ্রাম সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, কুড়িগ্রাম রিভার ভিউ হাই স্কুল, বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুল, নীলারাম স্কুল অ্যান্ড কলেজ, করিমের খামার উচ্চ বিদ্যালয়,  ফুলবাড়ি রাবাইতারি এসবি বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় ও কুড়িগ্রাম কালেক্টরেট স্কুল এন্ড কলেজ।
চূড়ান্ত পর্বে মুখোমুখি হয় কুড়িগ্রাম রিভারভিউ হাই স্কুল ও বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুল। জমজমাট এ প্রতিযোগিতায় যুক্তি, তথ্য ও উপস্থাপনার দিক থেকে এগিয়ে থেকে বিজয়ের মুকুট ছিনিয়ে নেয় বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুল। দলের হয়ে প্রতিযোগিতায় অংশ নেন শাহরিয়ার হোসেন, তাসফিয়া জান্নাত ত্বোহা ও নাইফ আব্দুল্লাহ নীড়।

অন্যদিকে রানার্সআপ দলের সদস্য ছিলেন রাজিব হোসেন, আবু ওয়াসি ও আমিনুর ইসলাম। প্রতিযোগিতার পাশাপাশি ব্যক্তিগত নৈপুণ্যেও নজর কাড়েন শিক্ষার্থীরা। বিজয়ী দলের শাহরিয়ার হোসেন নির্বাচিত হন শ্রেষ্ঠ বক্তা।

বিতর্কের মঞ্চে শিক্ষার্থীদের বক্তব্য যেমন ছিল যুক্তিনির্ভর, তেমনি ছিল আত্মবিশ্বাসী। নির্দিষ্ট বিষয়ের পক্ষে-বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে তারা তুলে ধরেন নানা যুক্তি ও উদাহরণ। অনেকের বক্তব্যে বয়সের তুলনায় পরিণত চিন্তার ছাপও দেখা যায়। এতে বোঝা যায়, শ্রেণিকক্ষের পাঠ্যবইয়ের বাইরেও যুক্তিনির্ভর চিন্তা ও মত প্রকাশের চর্চা শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাসী করে তুলছে।

আয়োজনে মডারেটরের দায়িত্ব পালন করেন কুড়িগ্রাম রিভার ভিউ হাই স্কুলের সিনিয়র সহকারী শিক্ষক সাধনা সরকার। বিচারকের দায়িত্ব পালন করেন কুড়িগ্রাম সিটি কলেজের বাংলা বিভাগের
প্রভাষক পুনম জামান, কুড়িগ্রাম বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সিনিয়র সহকারী শিক্ষক মোশারফ হোসেন মিয়া এবং সাংবাদিক আব্দুল্লাহ আল মুজাহিদ। তাঁদের মূল্যায়নে শিক্ষার্থীদের বক্তব্যের বিষয়বস্তু, যুক্তির শক্তি, উপস্থাপনার দক্ষতা ও তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার সক্ষমতা গুরুত্ব পায়।
বিতর্ক উৎসবকে ঘিরে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে তৈরি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি সহপাঠী ও শিক্ষকরা উৎসাহ জোগান প্রতিযোগীদের। একটি বক্তব্য শেষ হওয়ার পর প্রতিপক্ষের পাল্টা বক্তব্যের অপেক্ষা মঞ্চের এমন প্রতিটি মুহূর্তেই ছিল উত্তেজনা ও কৌতূহল।
শিক্ষকদের মতে, বিতর্ক শুধু প্রতিযোগিতা নয়; এটি শিক্ষার্থীদের চিন্তা করতে শেখায়। কোনো বিষয়ে একপাক্ষিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে তার পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তি খুঁজে দেখা, তথ্য যাচাই করা এবং নিজের মতামত অন্যের সামনে উপস্থাপন করার দক্ষতা তৈরি করে বিতর্কচর্চা। একই সঙ্গে ভিন্নমতকে সম্মান করার মানসিকতাও গড়ে ওঠে।
পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে কুড়িগ্রাম জেলা প্রতিনিধি সুজন মোহন্তের সভাপতিত্বে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কুড়িগ্রাম জেলা তথ্য অফিসের উপপরিচালক মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন, কুড়িগ্রাম প্রেসক্লাবের সভাপতি ও সিনিয়র সাংবাদিক শফি খান, কুড়িগ্রাম বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবু হোসেন সরকার, কুড়িগ্রাম রিভার ভিউ হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক নুরুল ইসলাম, সমকালের উলিপুর প্রতিনিধি মোন্নাফ আলী এবং চিলমারী সংবাদদাতা রিয়াদুল ইসলাম বাবু।
অনুষ্ঠানে অতিথিরা বিজয়ী ও অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের হাতে পুরস্কার ও সম্মাননা তুলে দেন। এ সময় শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছিল উচ্ছ্বাস ও আনন্দ। তবে পুরস্কারের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে তাদের অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতা মঞ্চে দাঁড়িয়ে কথা বলা, প্রতিপক্ষের যুক্তি শোনা এবং নিজের বক্তব্যকে আরও শক্তিশালী করার শিক্ষা।

অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, বর্তমান সময়ে তথ্যের অভাবের চেয়ে সঠিক তথ্য বাছাই এবং যুক্তিনির্ভরভাবে তা বিশ্লেষণ করার সক্ষমতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই দক্ষতা গড়ে তুলতে বিতর্কচর্চার বিকল্প নেই। নিয়মিত বিতর্ক আয়োজন হলে শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস বাড়ার পাশাপাশি নেতৃত্বগুণ, ভাষা দক্ষতা ও সমালোচনামূলক চিন্তার বিকাশ ঘটবে।

দিনশেষে বিজয়ী দলের উল্লাস আর পরাজিত দলের পরবর্তীবার আরও ভালো করার প্রত্যয়ের মধ্য দিয়ে শেষ হয় বিতর্ক উৎসব। তবে শেষ হয়নি যুক্তির চর্চা। বরং একটি দিনের প্রতিযোগিতা শিক্ষার্থীদের মনে নতুন করে প্রশ্ন করার, যুক্তি খোঁজার এবং জ্ঞানকে আরও গভীরভাবে জানার আগ্রহ তৈরি করে গেল।
‘বিতর্ক মানেই যুক্তি, জ্ঞানেই মুক্তি’ স্লোগানটি তাই শুধু অনুষ্ঠানের ব্যানারে সীমাবদ্ধ থাকেনি। দিনভর শিক্ষার্থীদের কণ্ঠে, যুক্তিতে ও আত্মবিশ্বাসী উপস্থাপনায় যেন তার বাস্তব প্রতিফলনই দেখা গেল।#

বিজ্ঞাপন