সোমবার, ১১ মে ২০২৬, ২৮ বৈশাখ ১৪৩৩
সর্বশেষ বিশেষ সংবাদ জাতীয় সারাদেশ আন্তর্জাতিক খেলা বিনোদন বাণিজ্য লাইফস্টাইল আইন-আদালত মতামত অন্যান্য
/ মতামত

তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও চীন সফর: প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তবায়নের সময় এখন


প্রকাশ :

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের মানুষের কাছে তিস্তা নদী শুধু একটি নদী নয়—এটি বেঁচে থাকার শেষ ভরসা। অথচ এই নদীই আজ তাদের জন্য অনিশ্চয়তা, দারিদ্র্য ও বঞ্চনার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে পানির জন্য হাহাকার, আর বর্ষায় বন্যা ও ভাঙনের তাণ্ডব—এই দ্বিমুখী সংকটের স্থায়ী সমাধান হিসেবে বহুদিন ধরে আলোচনায় রয়েছে “তিস্তা মহাপরিকল্পনা”। কিন্তু বাস্তবতা হলো—প্রতিশ্রুতি যত দ্রুত এসেছে, বাস্তবায়ন ততটাই ধীর।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাম্প্রতিক চীন সফর নতুন করে আশার সঞ্চার করেছে। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা তাঁর সফরের শীর্ষ এজেন্ডা। প্রশ্ন হচ্ছে—এই সফর কি আবারও আশার বেলুন হয়ে আকাশে মিলিয়ে যাবে, নাকি সত্যিই বাস্তব অগ্রগতির সূচনা করবে?

তিস্তা মহাপরিকল্পনা কোনো সাধারণ অবকাঠামো প্রকল্প নয়; এটি একটি সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা। নদী খনন, পানি সংরক্ষণ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, আধুনিক সেচব্যবস্থা এবং নদীকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন—সবকিছু মিলিয়ে এটি উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতিকে পুনর্গঠনের একটি মহাপরিকল্পনা। চীনের সহায়তায় প্রণীত সমীক্ষায় তিস্তাকে ঘিরে একটি উন্নয়ন করিডোর গড়ে তোলার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যেখানে নদী হবে উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু।

২০১৬ সালে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর তিন বছরব্যাপী সমীক্ষা শেষে একটি পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা প্রস্তুত হয়। প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ৯৮৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এখন প্রথম ধাপের ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা। অর্থায়নের বড় অংশ চীনের ঋণের মাধ্যমে আসার কথা। সব প্রস্তুতি প্রায় শেষ—এখন বাকি শুধু চূড়ান্ত চুক্তি। অর্থাৎ, বাস্তবায়নের দরজা খোলা, কিন্তু সেই দরজায় এখনো তালা ঝুলছে।

এই তালার নাম—ভূ-রাজনীতি।

তিস্তা একটি আন্তঃসীমান্ত নদী। এর প্রবাহ ভারতের ভেতর দিয়ে বাংলাদেশে আসে। ফলে ভারতের কৌশলগত উদ্বেগ এখানে একটি বড় ফ্যাক্টর। অন্যদিকে, চীনের সম্পৃক্ততা দক্ষিণ এশিয়ার শক্তির ভারসাম্যের সঙ্গে জড়িত। এই দুই শক্তিধর দেশের প্রতিযোগিতার বলি হয়ে তিস্তা প্রকল্প বছরের পর বছর আটকে আছে।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে ভারত ও চীনের সম্পর্কের কিছুটা উষ্ণতা নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। বাংলাদেশ যদি দক্ষ ও ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি পরিচালনা করতে পারে, তাহলে প্রতিযোগিতাকে সহযোগিতায় রূপান্তর করা অসম্ভব নয়। বরং হিমালয় বেসিনে অবস্থিত - চীন,ভারত,বাংলাদেশ, নেপাল ও ভূটান মিলে  একটি বহুপক্ষীয় নদী ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তোলা গেলে তিস্তা হতে পারে আঞ্চলিক সহযোগিতার একটি মডেল।

কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই কূটনৈতিক সম্ভাবনার মধ্যে কতটা জায়গা পাচ্ছে তিস্তা পাড়ের মানুষের বাস্তব জীবন?

উত্তরাঞ্চলের কৃষকরা বছরের পর বছর সেচের পানির অভাবে ফসল হারাচ্ছেন। আবার বর্ষায় নদীভাঙনে হারাচ্ছেন ঘরবাড়ি, জমি, জীবনযাপন। তাদের কাছে তিস্তা মহাপরিকল্পনা কোনো “মেগা প্রজেক্ট” নয়—এটি বাঁচা না-বাঁচার প্রশ্ন।

এই বাস্তবতা থেকেই গড়ে উঠেছে "জাগো বাহে তিস্তা বাঁচাই শ্লোগানে ' তিস্তা নদী রক্ষা আন্দোলন ও তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদ'। তাদের  এখন একটাই দাবি—প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তবায়ন চাই। তারা সুনির্দিষ্টভাবে বলছে: দ্রুত প্রকল্প অনুমোদন, নির্দিষ্ট সময়সূচি, স্বচ্ছ অর্থায়ন এবং একটি শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। “তিস্তা বন্ড” চালু করা, বালু-পাথর উত্তোলনের আয় প্রকল্পে বিনিয়োগ এবং “তিস্তা বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ” গঠন—এসব প্রস্তাব আর উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

সরকারগুলো বারবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। নির্বাচন এসেছে, গেছে—তিস্তা ছিল বড় ইস্যু। কিন্তু প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের দৃশ্যমান অগ্রগতি এখনো অনুপস্থিত। ফলে মানুষের আস্থা ক্রমেই ক্ষয়ে যাচ্ছে।

এই অবস্থায় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর চীন সফর একটি বড় সুযোগ। যদি এই সফরের মাধ্যমে চূড়ান্ত চুক্তি সম্পন্ন হয়, তবে সেটিই হতে পারে বহু প্রতীক্ষিত অগ্রগতির সূচনা। কিন্তু যদি আবারও এটি কেবল আশ্বাসের পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তা উত্তরাঞ্চলের মানুষের জন্য আরেকটি হতাশার অধ্যায় হয়ে থাকবে।

সময় এখন খুব স্পষ্ট—তিস্তা মহাপরিকল্পনাকে আর কাগজে আটকে রাখা যাবে না। এটি বাস্তবায়ন করতে হবে, দৃশ্যমানভাবে, সময়মতো, এবং জনগণের স্বার্থকে সামনে রেখে।

কারণ তিস্তা এখন শুধু একটি নদীর নাম নয়—এটি রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতার পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় পাস করতেই হবে।

লেখক : নজরুল ইসলাম হক্কানী, সভাপতি, তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদ ।   Email: [email protected]