রবিবার, ২২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১০ ফাল্গুন ১৪৩২
সর্বশেষ বিশেষ সংবাদ জাতীয় সারাদেশ আন্তর্জাতিক খেলা বিনোদন বাণিজ্য লাইফস্টাইল আইন-আদালত মতামত অন্যান্য
/ মতামত

কেন এ স্বপ্ন ??


প্রকাশ :

পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইন্ডাস্ট্রী হলো পরিবার, যা ভেঙ্গে গেলে সমাজ একদিন ভেঙ্গে যায়। বাস্তবতা আজ বড়ই কঠিন পৃথিবীটা সবার হাতের মুঠোয় কিন্তু দেখা হয় বহুদূর থেকে। বাবা মায়ের স্বাদ স্বপ্ন ছেলে-মেয়েদেরা একদিন উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হবে। দেশ ও জাতির সেবায় কাজ করবে। এ আশায় ভালোবাসার সন্তানগুলোকে জীবনের সর্বোচ্চ ত্যাগের বিনিময়ে বিদেশে পাঠায়। সেখানে সন্তানেরা লেখাপড়া করে বড় হয়, চাকরি নেয় কিংবা ব্যবসা করে সংসার পাতে কিনতু ফিরে আসা হয় না দেশে নানান অজুহাতে। বৃদ্ধ বাবা মা বাড়িতেই পরে থাকে। শেষ জীবনে সন্তানকে দেখার হাহাকারে দিন কাটায়। হতাশা কিংবা বয়সের ভারে বাবা মার মৃত্যু হলে ইউরোপ আমেরিকা জাপান কিংবা অস্ট্রলিয়ার কোন এক দেশ থেকে ভিডিও কলে বাবা মার শেষকৃত্য দেখে জন্মদাতার বিদায় অবলোকন করে।

বৃদ্ধাশ্রম আজ বিলাসিতা নয় আসল ঠিকানা হতে চলেছে। নরক তো এখন সাজানো ফ্ল্যাটেই। সযত্নে গড়ে তোলা ফ্যামিলি অ্যালবাম অনেকের এখন শুধুই সৃতি। বাবা-মায়ের সাথে হাসিমুখে সন্তানের ছবি দেখে কতোই না পুরানো সৃতিসুখ ভাবছেন, "ছবির সন্তান তার কত ভালো সন্তান"? ছবির আড়ালের সত্যটা বড়ই কঠিন বেদনাদায়ক। কারণ আধুনিক ফ্ল্যাটের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরের ভেতরেই জন্ম নিচ্ছে এক ভয়ংকর নীরবতা, যা বৃদ্ধাশ্রমের একাকীত্বকেও হার মানায়। যা কোনো গল্প নয়, যা সবার ঘরের দরজায় কড়া নাড়া এক শীতল বাস্তবতা।

শুরুটা খুব সূক্ষ্মভাবে, বাবা রিটায়ার করার পর তার পেনশন বা ফিক্সড ডিপোজিটের টাকার হিসাবটা ছেলে বা মেয়ের হাতে চলে যায়। মুখে বলা হয়, "বাবা, তুমি আর কত চিন্তা করবে? এবার আরাম করো।" আসলে এটা আরাম নয়, এটা হলো আর্থিক পরাধীনতার প্রথম ধাপ। যে মানুষটা একদিন পুরো সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছিলেন, তাকে আজ নিজের টাকার জন্য সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়। এটা হলো সেই বিষ, যা ধীরে ধীরে আত্মসম্মানকে মেরে ফেলে। এরপর শুরু হয় মানসিক অত্যাচার। একসাথে খেতে বসলে বাবা হয়তো একটু শব্দ করে খান, কিংবা মা হয়তো পুরনো দিনের গল্প বলতে শুরু করেন। আর সাথে সাথেই ভেসে আসে বিরক্তির দীর্ঘশ্বাস বা চোখের ইশারা। "আঃ, মা! রোজ রোজ এক কথা শুনতে ভালো লাগে?"-এই একটা বাক্যই যথেষ্ট একজন মানুষকে জীবন্ত লাশ বানিয়ে দেওয়ার জন্য। তিনি বোঝেন, এই সংসারে তার কথার আর কোনো দাম নেই। তিনি এখন আসবাবপত্রের মতোই একটা পুরনো জিনিস, যাকে ফেলে দেওয়া যায় না, কিন্তু যার উপস্থিতিটাও অসহ্য। সবচেয়ে ভয়ংকর খেলাটা শুরু হয় সম্পত্তি নিয়ে। কিছু "শিক্ষিত" এবং "প্রতিষ্ঠিত" সন্তান তাদের বাবা-মাকে আবেগের ফাঁদে ফেলে। "এই ফ্ল্যাটটা তো একদিন আমাদেরই হবে, তার চেয়ে আগেই আমাদের নামে লিখে দাও। অথবা বিক্রি করে আমাদের কাছে চলে এসো। সরল বিশ্বাসে বাবা-মা তাদের জীবনের শেষ সম্বলটুকু সন্তানের হাতে তুলে দেন। আর ঠিক সেদিন থেকেই তারা হয়ে যান নিজ বাড়িতে থাকা এক অসহায় ভাড়াটে। তাদের ঘরটা বদলে দেওয়া হয়, সবচেয়ে ছোট বা অন্ধকার ঘরটা তাদের জন্য বরাদ্দ হয়। তাদের বলা হয়, "অতিথি আসবে, তোমরা ঐ ঘরে থাকো।" এই "অতিথি" নামক অদৃশ্য ছায়াটা আর কোনোদিন তাদের জীবন থেকে সরে না। মনে প্রশ্ন জাগে এই সন্তানরা কি এক ধরনের মানসিক কসাই। যারা ছুরি দিয়ে নয়, অবহেলা আর অপমান দিয়ে প্রতিদিন একটু একটু করে তাদের বাবা-মাকে হত্যা করে? বৃদ্ধাশ্রম কিংবা রিটায়ারহোমে সমবয়সী কিছু মানুষের সাথে কথা বলার সুযোগ থাকলেনও কিন্তু নিজের ফ্ল্যাটে, নিজের সন্তানের সংসারে বাবা-মায়েদের কথা বলার সঙ্গী থাকে শুধু চার দেওয়াল আর ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকা বোবা দৃষ্টি। তাদের কান্নাটাও শব্দহীন। কারণ জোরে কাঁদলে যদি ছেলে-বউমার ঘুমের অসুবিধা হয়। এ সমাজে এই ভণ্ডামিকে প্রশ্রয় দেওয়া হচছে। "মাদার্স ডে" বা "ফাদার্স ডে"-তে বাবা-মায়ের সাথে ছবি দিয়ে লম্বা ক্যাপশন লেখা ছেলেটাকেই সবাই "সুপুত্র" বলে বাহবা দেয়। কিন্তু কেউ প্রশ্ন করে না, ছবির বাইরে এই বাবা-মায়ের জীবনটা কেমন? আত্মীয়-স্বজন সব দেখেও চুপ করে থাকে। কারণ "পারিবারিক বিষয়"-এ নাক গলানোটা নাকি অভদ্রতা। এই ভদ্রতার মুখোশের আড়ালেই প্রতিদিন খুন হন হাজারো বাবা-মায়ের স্বপ্ন আর শেষ জীবনের শান্তি। 

তাই বিবেক একদিন দরজায় আঘাত করবেই:

 ১) আপনার কি মনে হয় না, বাবা-মায়ের সম্পত্তি কেড়ে নিয়ে তাদের বোঝা মনে করাটা ঠান্ডা মাথায় করা একটা অপরাধ, যা ডাকাতির থেকেও ভয়ংকর?

২) যে সন্তান তার জন্মদাতার চোখের জলকে অবহেলা করে নিজের সুখ খোঁজে, সে কি মানুষ না কি একটা স্বার্থপর শকুন, যে জীবন্ত শরীরের মাংস খুবলে খেতে ভালোবাসে?

৩) আপনি কি আপনার চারপাশে এমন কোনো পরিবারকে চেনেন, যেখানে বাবা-মা থাকা সত্ত্বেও অদৃশ্য? তাদের দীর্ঘশ্বাস কি কখনো আপনার কান পর্যন্ত পৌঁছায়?

৪) আপনি আপনার বাবা-মায়ের সাথে আজ যা করছেন, কাল আপনার সন্তান সেই আয়নাটা আপনার সামনেই ধরবে না তো? ভেবে দেখুন

৫) আপনার জন্য কোন ফ্ল্যাটটা তৈরি হচ্ছে-আপনার স্বপ্নের ফ্ল্যাট, নাকি আপনার সন্তানের কাছে আপনি যখন 'অসুবিধা' হয়ে যাবেন, তখন আপনাকে রাখার গোডাউন?

৬) জাপানে প্রতি দশ জনে এক জন একাকি মৃত্যু বরণ করে। একটি রুমে মরে পচে গলে গন্ধ বের হলে লোকে জানতে পারে। এই ঘরে একাকী বাস করা বৃদ্ধটি মারা গেছে!

৭) (পাকা মাকড় মশা মাছিতে ভরপুর এসব মৃত দেহ পরিষ্কারের জন্য জাপানে গড়ে উঠেছে সাফাই নামক অসংখ্য কোম্পানি, মৃত্যুর আগে অনেক বৃদ্ধ এসব কোম্পানীর সাথে চুক্তি করে রাখেন যাতে তারা মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করে এবং আত্মার শান্তির জন্য প্রার্থনা করে। শান্তিতে মরা কত গুরুত্বপূর্ণ একটু খেয়াল করে দেখুন!

৮) আধুনিক সমাজে সবচেয়ে বড় সমস্যা একাকীত্ব! বিয়ে করেও একা না করেও একা! টাকা পয়সা বাড়ি গাড়ি সব আছে শুধু একাকীত্ব গোছানোর মানুষ নেই। কাছে থেকেও যেনো সবাই অচেনা!

৯) মনে হচ্ছে সবাই খুব কাছাকাছি আছি কিন্তু সবাই কাছে থেকেও অনেক দূরে সরে গেছে। পৃথিবী হাতে মুঠোয় চলে আসছে কিন্তু হাতের দৈর্ঘ্য এতো বেশী যে প্লেন দিয়েও এপাশ থেকে ওপাশ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না!

১০) সমাজে একাকী মরে যাওয়া বাবামাকে মরে যাওয়ার খবরে সন্তানরা দেশে আসতে পারে না। টেলিফোনে বিদায় দেয়। সমাজের এই নিষ্ঠুর বেদনাদায়ক একাকীত্ব আর অবহেলায় বৃদ্ধ বাবা মার মৃত্যুর জন্য অনেকাংশেই দায়ী। মানুষ ধর্মের মৌলিক শিক্ষা হতে যত দূরে সরে যাচ্ছে। এই নির্মম বাস্তবতা ততই সকলের সামনে ভেসে উঠছে। ধর্মই একমাত্র পারিবারিক বন্ধনের হাতিয়ার। ধর্মকেই সবাই আঁকড়ে ধরি জীবনকে সুখী করি।

ধর্ম যাদের পারিবারিক জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে। অবহেলায় দিন কাটাচ্ছেন। আমরা তাদের জন্যই তৈরি করতে চাচ্ছি যে আলী জেরিয়াটিক রিটায়ারমেন্ট হোম। আপনারাও হতে পারেন এই মহৎ কর্মের গর্বিত অংশীদার।

 লেখক : মোঃ ইয়ার আলী, চেয়ারম্যান, আলী গ্রুপ অব কোম্পানি। মোবাইল: ০১৭১৬৬৪২৩৪৩