রক্তস্নাত বাংলাদেশে মহান মুক্তিযুদ্ধের অর্থাৎ ৭১ সালে বিজয়ের প্রাক্কালে ডিসেম্বর মাস থেকে শুরু হয়েছিল লুটপাট, দখলের ও আত্মউন্নয়নের জঘন্য সংস্কৃতি! এই সংস্কৃতি ৫৪ বছর ধরে অব্যাহত রয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে মুক্তিযোদ্ধারা নয় মাসে শত শত কিলোমিটার এলাকা মুক্ত করে সামনে এগিয়ে চলছে।তাদের রক্ত ঘামে তৈরি মুক্তাঅঞ্চলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য,বিচার ব্যবস্থা, নির্বাচিত গণপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতৃত্ব বলতে কিছুই ছিল না। জনগণ নিজের দায়িত্বে নিয়ন্ত্রিত এবং পরিচালিত হয়েছিল। লুটপাট, ডাকাতি,দুর্নীতি,দুর্বৃত্তায়ন, ধর্ষণ,রাহাজানি দখল ও চাদাবাজীসহ অন্যান্য অপরাধ ছিল না বললেই চলে। সে সময়ও কিছু কিছু এলাকায় রাজনৈতিক দুর্বৃত্ত,সন্ত্রাসী ও গণপ্রতিনিধিদের দৌড়াত্ম ছিল।অবশ্য এরা সর্বদাই মুক্তিযোদ্ধাদের তপ্তগুলির ভয়ে আতঙ্কে ছিল।
ডিসেম্বর ৭১,মুক্তিযোদ্ধা ও ভারতীয় বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত যৌথ বাহিনীর আক্রমণ তীব্র হতে তীব্রতর হতে থাকে , বাড়তে থাকে নতুন নতুন মুক্তাঞ্চল। মুক্তিযোদ্ধরা ভারতীয় বাহিনীর সহায়তায় প্রাণপণ লড়াই চালিয়ে যেতে থাকে। এদিকে মুক্তা অঞ্চলে বিশেষ করে শহর সমৃদ্ধ গ্রামাঞ্চলগুলোতে রাজনৈতিক নেতাও নেতাকর্মী , মুক্তিযোদ্ধাদের পরিচয় অমুক্তিযোদ্ধারা শুরু করেছিল লুটপাট ও দখল। ভারতীয় বাহিনী এই সুযোগে কাজে লাগিয়ে লুটপাটে উন্মত্ত হয়ে উঠে। বাংলার সম্পদ ভারতীয় বাহিনী তাদের সেনাবাহিনীর ট্রাক, কনভয়, জিপ মোটরগাড়ি ও অন্যান্য যান্ত্রিক যানবাহনের ভারতে পাচার করতে থাকে। এমতাবস্থায় ভারতীয় শরণার্থী শিবিরে কিংবা বিভিন্ন স্থানেব কর্মরত ও বসবাসরত ব্যক্তিবর্গ, সন্ত্রাসী বাহিনী, যুবক এবং সিক্সটিন ডিভিশনের অমুক্তিযোদ্ধারা ভারতীয় বাহিনীকে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাটের সহায়তা করে। এরা ব্যাংক,ব্যাংকের রক্ষিত টাকা-পয়সা সোনাদানা,রুপা কাঁসা-পিতল, শিল্প কারখানা, বড় বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, রেলওয়ে কারখানা বিভিন্ন সরকারি দপ্তর মেডিকেল কলেজ, টেকনিক্যাল কলেজ হাসপাতাল বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমনকি সেনানিবাস এবং অবাঙালি, পরাজিত রাজাকার, আলবদর ও স্বাধীনতা বিরোধী রাজনৈতিক দল তাদের সমর্থক ও তাদের আত্মীয়-স্বজনদের দোকানপাট, বাসাবাড়ি, আসবাবপত্রসহ অস্থাবর সম্পত্তি অবাধে লুটপাট করে নিয়ে যায়।অবশ্য উচ্ছিষ্ট কিছু অংশ রাজনৈতিক দুর্বৃত্ত ও অমুক্তিযোদ্ধারা লুটপাট করতে পেরেছিল। একমাত্র মেজর জলিল ছাড়া এদের বিরুদ্ধে কেহই প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সাহস পারেনি। এজন্য অবশ্য মেজর জলিলকে গ্রেফতার, নির্যাতন সহ অনেক মূল্য দিতে হয়েছে ।
ক্ষমতার পট পরিবর্তনে উপমহাদেশে সম্পদ লুণ্ঠনের ইতিহাস অনেক প্রাচীন। মুঘল সাম্রাজ্যকে বিতরিত করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি মুঘল সম্রাটদের আবার ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে পরাজিত করে তৎকালীন ভারতীয়রা তাদের সম্পদ লুণ্ঠন করেছিল। হিন্দু মুসলিমএর ভিত্তিতে সৃষ্ট পাকিস্তান ও ভারতে মুসলমানরা হিন্দুদের, হিন্দুরা মুসলমানদের সম্পদ লুণ্ঠন করেছিল।১৯৭১ সালে বিজয়ের আনন্দে পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিরা এখানে কার অবাঙ্গালীদের সম্পদ লুন্ঠনে উন্মত্ত হয়ে উঠেছিল।এরই ধারাবাহিকতায় জুলাই আগস্ট ২৪'এর পরিবর্তনের এক পর্যায়ে কর্তৃত্ববাদী ও স্বৈরাচারিনী হাসিনা পালায়নের পর বিজয়ের আবেগে আপ্লুত হয়ে গণভবনে লুটপাট করা হয়েছিল যে দৃশ্য বাংলার প্রতিটি মানুষ প্রত্যক্ষ করেছে। শুধু গণভবন নয় মব জাস্টিসের নামে আওয়ামী লীগের মন্ত্রী, নেতা-নেত্রী কর্মী,তাদের আত্মীয়-স্বজন বন্ধুবান্ধব ও সমর্থকদের বাসা বাড়ি আক্রমণ করে অগ্নিসংযোগ, অর্থ, সোনা দানা ও অন্যান্য সম্পদসহ বিভিন্ন মালামাল লুটপাট করা হয়েছিল। এমনকি গ্রেফতার,হত্যা মামলার আসামি করার ভয়ভীতি ও হুমকি প্রদর্শন করে তাদের কাছ অর্থ সম্পদ, সোনাদানা লুটপাঠ এবং চাদাবাজী করা হয়েছিল। তা এখনও অব্যাহত রয়েছে।
পতিত আওয়ামী লীগের মন্ত্রী, নেতা-নেত্রী কর্মী, সমর্থক আত্মীয়-স্বজন এর সম্পত্তি ও প্রতিষ্ঠানের পরিচালক ও মালিক হয়েছে অনেকেই। তারা দিব্যি স্বৈরাচার ও তাদরদের সহযোগীদের দোকানপাট,ব্যবসা প্রতিষ্ঠান,আড়ত, গদি, ক্লিনিক, হাসপাতাল,শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের দখল নিয়ে কিংবা কর্মকর্তার নিয়োগ নিয়ে বিশেষ কায়দায় সম্পদের মালিক বনে যাচ্ছে।এ সকল লুটেরা,চাঁদাবাজ, রাজনৈতিক দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে কোন কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে না। দিনের পর দিন এরা আঙ্গুল ফুলে কলা গাছে পরিণত হচ্ছে যা দৃশ্যমান। এভাবে এরা নির্যাতন, নিপীড়ন ও লুটপাট সহ নানার অপকর্ম অব্যাহত রেখেছে। এদের অনেকেই বর্তমানে শত কোটি টাকার মালিক হয়েছে।
সর্বশেষ ৭ এপ্রিল গাজায় নরপশু ইহুদি বাহিনীর নির্মম ও পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে সারাদেশে বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়। নরপশু ইহুদিদের তৈরি পণ্য বর্জনের ডাক দেওয়া হয়।এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিক দুর্বৃত্ত ও ধর্মব্যবসায়ীরা ইহুদির মালিকানাধীন ও তৈরি মালামাল লুটপাটে উন্মত্ত হয়ে ওঠে। বাটার দোকান অন্যান্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে আক্রমণ চালিয়ে জুতা, স্যান্ডেল ও অন্যান্য পন্য দ্রব্যাদি লুটপাট করতে থাকে।অর্থাৎ আবারো নতুন করে লুটপাটের সংস্কৃতি চালু করা হয়।লুটপাটের একটু সুযোগ পেলেই এরা হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। নিজেদের আখের গোছানোর জন্য তৎপর হয়ে ওঠে।
এই আখের গোছানোর প্রতিযোগিতায় রাজনৈতিক দুর্বৃত্ত,ধর্মব্যবসায়ী, লুটেরা ডাকাত ও সন্ত্রাসীরা জড়িত হয়ে পড়ে। আইন এসকল লুটেরা ও দুষ্কৃতিকারীদের স্পর্শ করতে পারেনি।পুলিশ অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে ছিল। সেনাবাহিনী এসে অনেক জায়গায় লুটপাট প্রতিরোধ করেছিল। সময় এসেছে ভিডিও ফুটেজ কিংবা ছবি দেখে মুসলিম লেবাসধারী টুপিদাড়ি মন্ডিত দুষ্কৃতিকারী ও ডাকাতদের গ্রেপ্তার করে আইনের শাসন নিশ্চিত করা।
তা না হলে জনপ্রিয় প্রবাদ বাক্য " একবার খুলে দে মা, লুটে পুটে চেটে খাই" এর সংস্কৃতি অব্যাহত থাকবে।