প্রয়োজনীয়তাই উদ্ভাবনের জনক। মানবসভ্যতার বিকাশে যা কিছুই আবিষ্কার হয়েছে তার মূলেই রয়েছে প্রয়োজনীয়তা। প্রযুক্তির আবিষ্কার থেমে নেই। একটার আবিষ্কার আর একটা আবিষ্কারের পথকে উন্মুক্ত করছে। সব থেকে জনপ্রিয় প্রযুক্তির মধ্যে অন্যতম হলো মোবাইল ফোন। বিজ্ঞানের উত্তরোত্তর উন্নতির ফলে মোবাইল ফোনের আকার-আকৃতি ও ব্যবহারে এসেছে বৈচিত্র্য ও অভাবনীয় পরিবর্তন যা এর জনপ্রিয়তার প্রধান কারণ। এর ফলে এক সময়ের এনালগ মোবাইল ফোন এখন স্মার্ট মোবাইল ফোনে রূপ নিয়েছে। বর্তমানে কম্পিউটারের এক-তৃতীয়াংশ কাজ স্মার্ট মোবাইল ফোনে করা সম্ভব হচ্ছে। যার দরুণ মানুষের কাছে এর গ্রহণযোগ্যতা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই স্মার্ট মোবাইল ফোনে ইন্টারনেটের ব্যবহার মানুষের জীবনকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছে। এটি যেন পকেট কম্পিউটারে পরিণত হয়েছে। অদূর ভবিষ্যতে এর দ্বারা হয়তো কল্পনাতীত আরও কিছু করা সম্ভব হবে।
মানুষের সঙ্গে মানুষের বিচ্ছেদ হচ্ছে কিন্তু মানুষ মোবাইল ফোনের সঙ্গ ছাড়তে পারছে না। যোগাযোগ ব্যবস্থায় নবদিগন্তের দ্বারোন্মোচক ও অপার সম্ভাবনার আধার হওয়া সত্ত্বেও কোথায় যেন একটি প্রশ্ন থেকে যায়- মোবাইল ফোন ছাত্রদের কী দিয়েছে? যত দিন যাচ্ছে মানুষের কাজকর্ম তত প্রযুক্তি নির্ভর হচ্ছে। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায়ও এর ব্যতিক্রম নয়। ভর্তি থেকে শুরু করে ফি প্রদান, পরীক্ষার ফলাফল প্রদান ও গ্রহণ, অনেক সময় ভার্চুয়াল ক্লাসসহ বিভিন্ন কার্যক্রমে এখন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। আর এসব কার্যক্রম সম্পাদনের সকল সুবিধা রয়েছে স্মার্ট মোবাইল ফোনে। শুধু তাই নয়, শিক্ষার্থীরা পড়ালেখা সংক্রান্ত কোনো সমস্যায় পড়লে অনায়সেই ইন্টারনেটে সার্স দিয়ে সেটার সমাধান পাওয়ার চেষ্টা করে। এসব দিক বিবেচনায় শিক্ষার্থীদের জন্য স্মার্ট মোবাইল ফোনের ব্যবহার অযৌক্তিক কিছু নয়।
কিন্তু শঙ্কার বিষয় হলো- তারা পড়ালেখা ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্যে স্মার্টফোন ব্যবহার করছে কি না? এটা নির্ভর করছে শিক্ষার্থীরা দিনের কতটা সময় স্মার্টফোন ব্যবহার করে তার ওপর। সাধারণ দৃষ্টিকোণ থেকে শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় কাজের জন্য বেশি সময় স্মার্টফোন ব্যবহারের সুযোগ নেই। কিন্তু বর্তমানে লক্ষ্য করা যাচ্ছে, শিক্ষার্থীরা স্কুল-কলেজে না গিয়ে এবং পড়ার টেবিলে না বসে স্মার্টফোনে বেশি সময় দিচ্ছে। এতে তাদের মধ্যে স্মার্টফোন আসক্তি তৈরি হচ্ছে। এই আসক্তির কারণে শিক্ষার্থীরা দারুণভাবে ঝুঁকে পড়েছে স্মার্টফোনের বিভিন্ন অ্যাপসভিত্তিক গেম, পর্নোগ্রাফি ভিডিওসহ ইউটিউব, ফেসবুক, টুইটারের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রতি।
এই যন্ত্রটির ব্যবহার এমন একটি নেশা, যার কারণে খুনও হতে হচ্ছে। গড়ে উঠছে দেশের বিভিন্ন বড়ো বড়ো শহরে কিশোরগ্যাংও। পারিবারিক কলহ তো বেড়েই চলছে। এক সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, মোবাইল আসক্তির কারণে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা চরম মানসিক অস্থিরতায় ভুগছে। ২৮ শতাংশ তরুণ-তরুণী দিনে ছয় ঘণ্টারও বেশি সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যয় করে। ২৬ শতাংশ দিনে চার থেকে ছয় ঘণ্টা এবং ৩১ শতাংশ দুই থেকে চার ঘণ্টা বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সময় দিয়ে থাকে।
অপরদিকে যুক্তরাজ্যের এক গবেষক বলেছেন, মোবাইল অতিমাত্রায় ব্যবহারের কারণে চোখের জ্যোতি আনুপাতিক হারে কমে যাবে। এই বিষয়ে যুক্তরাজ্যের চক্ষুবিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, মোবাইল ফোনের অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে দৃষ্টিশক্তি কমে যাবে। কানে কম শুনবে, তবে এই বিষয়টি নির্ভর করে মোবাইল ব্যবহারকারী কানের কতটুকু কাছাকাছি এটি ব্যবহার করে এবং উচ্চ শব্দে গান শুনে কি না তার উপর। এছাড়া শারীরিক বিভিন্ন অসংগতি দেখা দেবে। যেমন শরীরের অস্থিসন্ধিগুলোর ক্ষতি হতে পারে। কমে যেতে পারে শুক্রাণু। গবেষকরা জানান, মোবাইল ফোন থেকে হাই ফ্রিকোয়েন্সির ইলেকট্রো-ম্যাগনেটিক রেডিয়েশন নির্গত হয়। এই ক্ষতিকর তরঙ্গের সঙ্গে মস্তিষ্কে ক্যানসারের যোগসূত্র থাকতে পারে। এছাড়া শরীরের অন্য কোষকলা এই ক্ষতিকর তরঙ্গের প্রভাবে ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে পুরুষের প্রজননতন্ত্রেরও।
ছাত্রজীবন অনাগত ভবিষ্যতে সাফল্যের বীজ বপনকাল, জ্ঞানার্জনের মাধ্যমে নিজেকে যোগ্য নাগরিক রূপে গড়ে তোলার সময়, শরীর চর্চার মাধ্যমে নিজের মন ও শরীরকে বিকশিত করার সময়, সে মহামূল্যবান রত্মকে তারা হেলায় নষ্ট করছে। একটু অবসর পেলেই, এমনকি পড়ার টেবিলে বসে চুপিসারে মোবাইলে গেমস খেলায় মেতে উঠছে।
শারীরিকভাবে সুস্থ থাকতে হলে একজন মানুষের প্রতিদিন ছয় থেকে আট ঘণ্টা ঘুমের প্রয়োজন হয়। কিন্তু মানুষের এই ঘুমের সময়টা যদি বৈদ্যুতিক যন্ত্রের ব্যবহার দখল করে নেয় তাহলে ঘুমের সমস্যা দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা প্রবল হয়ে ওঠে। এর কারণে ইনসমনিয়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়। ইনসমনিয়া বলতে অনিদ্রা বা স্বল্প নিদ্রাকে বোঝায়। অনিদ্রা যখন এক মাস বা তার বেশি সময় ধরে চলতে থাকে, তখন তাকে দীর্ঘমেয়াদি ইনসমনিয়া বলে। আর এই সমস্যা হলে মানুষের শরীরে ঘুমের চাহিদা অপূর্ণ থেকে যায়। ঘুমের অভাবে মানুষের ক্লান্তি বোধ ও মেজাজ খিটখিটে হয় এবং একাগ্রতা হ্রাস পায়। এরফলে দৈনন্দিন কাজ সম্পাদন করার ক্ষমতা কমে যায়। এমনকি দীর্ঘস্থায়ী রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।
দুঃখজনক হলেও সত্য যে, তরুণ-তরুণীদের মধ্যে এই ধরনের আসক্তির জন্য অভিভাবকরাও দায়ী। ছেলেমেয়েদের আবদার এবং বায়না মিটাতে অভিভাবকরা প্রুক্তিকে শিক্ষার সহায়ক ভেবে অতি উৎসাহী হয়ে না বুঝেই তুলে দেন নেশা ও নারীর চেয়েও বেশি শক্তিশালী আসক্তির এই উপকরণ মোবাইল ফোন।
সম্প্রতি যৌথ পরিবার কাঠামো ভেঙে একক পরিবার তৈরি হওয়ার কারণে আরো বেশি পরিমাণে ছেলেমেয়েরা স্মার্টফোনের প্রতিও আসক্ত হয়ে পড়ছে বলে মনে করেন গবেষকরা। মোবাইল আসক্তির ভয়াবহ এই প্রবণতায় বিশেষ করে উঠতি বয়সি ছেলেমেয়েরা বর্তমান পরিস্থিতিতে এক বিরাট সংকটকাল অতিক্রম করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গবেষকরা মোবাইল ফোনের সঙ্গে যোগাযোগ হারানোর এই ভয়জনিত অসুখের নাম দিয়েছেন ‘নোমোফোবিয়া’। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশেই নোমোফোবিয়া একটি ক্রমবর্ধমান সমস্যা হিসাবে দেখা দিয়েছে। যুক্তরাজ্যের ৫৩ শতাংশ এবং ২৯ শতাংশ ভারতীয় তরুণরা এই রোগের শিকার। বাংলাদেশেও এখন নোমোফোবিয়া সংক্রামক ব্যাধির মতো ছড়িয়ে পড়েছে।
যোগাযোগ মাধ্যমের সর্বাধুনিক সহজ প্রযুক্তি মোবাইল ফোনের বিকল্প এখনো আবিষ্কৃত হয়নি। এছাড়া নতুন নতুন সুবিধা সংযোজন করায় এর ব্যবহার অনিবার্য হয়ে উঠছে। বিজ্ঞানের এই আবিষ্কার এড়িয়ে চলার উপায়ও নেই। তবে অপব্যবহার যেন না হয়, শিক্ষার্থীরা যেন এর প্রতি আসক্তি বা ঝুঁকে না পড়ে, সেদিকে নজর দেওয়া খুবই জরুরি। এর ভয়াবহতা বা আসক্তি থেকে শিক্ষার্থীদের দূরে রাখতে হলে তাদের হতে তোলে দিতে হবে আকর্ষণীয় বই, পত্রপত্রিকা ও বিভিন্ন ধরনের ম্যাগাজিন। খেলাধুলার পাশাপাশি যোগাযোগ ঘটাতে হবে বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে। এক্ষেত্রে অভিভাবক ও শিক্ষকরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারেন। সময়ের মূল্য অর্থাৎ সময়ের গুরুত্ব সম্পর্কে তাদের বোঝাতে হবে। তাদের বুঝাতে হবে যে, বিনা প্রয়োজনে মোবাইল ফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার পরিহার করা বুদ্ধিমানের কাজ। স্মার্ট মোবাইল ফোনের ব্যবহার প্রতিরোধের ব্যবস্থাও নিতে হবে সচেতনভাবে- যাতে করে এর প্রভাবে কোনো দুর্ঘটনায় না পড়ে উঠতি বয়সের আবেগ প্রবণ শিক্ষার্থীরা।
লেখক : সহকারী তথ্য অফিসার, আঞ্চলিক তথ্য অফিস, পিআইডি, রংপুর