রবিবার, ২২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১০ ফাল্গুন ১৪৩২
সর্বশেষ বিশেষ সংবাদ জাতীয় সারাদেশ আন্তর্জাতিক খেলা বিনোদন বাণিজ্য লাইফস্টাইল আইন-আদালত মতামত অন্যান্য
/ মতামত

নাপাই চন্ডি মেলা : ইতিহাসের পাঠ


প্রকাশ :

" কোন কিছুতেই  না পারা  কে রংপুরের ভাষায় বলা হয় ' নাপাইম মুই, না পাই হামরা'।যুদ্ধ ক্ষেত্রে চন্ডি হেরে গিয়েছিলেন  বলেই ' নাপাইচন্ডি' মেলার গোড়াপত্তন। 

চন্ডি দেবী (দেবীচৌধুরানী)  ছিলেন রংপুরের ফকির-সন্ন্যাসী ও ঐতিহাসিক প্রজা বিদ্রোহের কিংবদন্তির নেতা।চন্ডিপুর গ্রামের জঙ্গলে ঘেরা আলাইকুড়ি নদী তীরে ছিল চন্ডিদেবীর মন্দির ও বিশাল বাড়ি।পরিখা সাদৃশ্য এখানেই ছিল দেবীচৌধুরানীর গোপন ডেরা।এলাকার হিন্দু সম্প্রদায়ের জনগণ দেবী চৌধুরানীকেই চন্ডিদেবী বলেই ডাকতেন।কথিত আছে,চন্ডিদেবীর এই গোপন আস্তানায় ফকির মজনু শাহ্ ( ফুলচকির নবার নূরুদ্দীন বাকের জং)ভবানী পাঠক,ইটাকুমারীর মোঘল জমিদার শিবচন্দ্র রায় আলাইকুড়ি নদীপথে নৌকা যোগে বৃটিশ বিরোধী সংগ্রামের কলাকৌশল নির্ধারণে গোপন সভায় মিলিত হতেন।আলাইকুড়ি নদী তীর ঘেঁষা জঙ্গলাকীর্ণ ফকিরটারি, চন্ডিপুর ও পবিত্রঝাড় গ্রামের  চারপাশেই বসবাস করতেন মাদারী সম্প্রদায়ের ফফির এবং গিরিয়া সম্প্রদায়ের সন্ন্যাসী'রা।সেই সময়কালে পীরগাছার ওই ফকির-সন্ন্যাসীরাই ছিলেন " বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়"।এতদাঞ্চলে এই সম্প্রদায়ের বিচরণ ভূমির কারণে এলাকার নাম হয় ' পীরগাছা'।পীরগাছা নামে কোন মৌজা নেই; এটি একটি ভাসমান নাম। এই দুই সম্প্রদায়ের মূলমন্ত্র ছিল,  'সবার উপর মানুষ সত্য'।নিস্কর জমিতে পীর-ফকির- সন্ন্যাসীদের তীর্থকেন্দ্র গুলোতে কোম্পানি  খাজনা ধার্য করলে ফকির সন্ন্যাসীরা প্রতিরোধ সংগ্রামে শামিল হয়।  এরাই ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানি নিযুক্ত কুখ্যাত  ইজারাদার দেবীসিংহ আরোপিত কৃষকের ওপর মাত্রাতিরিক্ত খাজনা আদায়ের জুলুম -  শোষণ  - অত্যাচারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু করে।পীরগাছার মন্থনার তৎকালিন জমিদার জয় দুর্গা দেব্যা ( ছদ্মনাম দেবীচৌধুরানী) গোপনে এ বিদ্রোহে যুক্ত হয়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন।তাঁর নেতৃত্বে ছিল বিশাল বরকন্দাজ বাহিনী।চন্ডিপুরের মতো অনেক গোপন আস্তানা ছিল দেবীচৌধুরানীর।উল্লেখযোগ্য আস্তানাগুলোর মধ্যে ; চৌধুরানী মোংলা কুটির বজরার খাল,কাউনিয়ার তপসিডাঙ্গা ও ধুমের কুটি।  নৌকা যোগে নদীপথে তিনি তাঁর সৈন্যসামন্ত নিয়ে  ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির নৌযানে আক্রমণ পরিচালনা করতেন।লুষ্ঠিত মালামাল বিলিয়ে দেওয়া হতো অনাহারক্লিষ্ট মানুষের মাঝে।জোসনা রাতে চন্ডিপুর স্কুল মাঠে জমায়েত হতেন অনাহারক্লিষ্ট -বুভুক্ষু মানুষ।চন্ডিদেবী গোপন ডেরা থেকে এখানে আসতেন। নিজহাতে অভাবী- দারিদ্র্যপীড়িত মানুষের হাতে খাদ্য ও আর্থিক সহায়তা তুলে দিতেন।ইংরেজ বাহিনীর হাতে ভাবানী পাঠক মারা গেলে ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ স্তিমিত হয়।এরপর শুরু হয়  ১৭৮৩ সালের ইতিহাসখ্যাত ' রংপুর ফতেপুর চাকলার কৃষক বিদ্রোহ'।এ বিদ্রোহের নেতা ছিলেন দেবীচৌধুরানী ও ইটাকুমারী ফতেপুর চাকলার জমিদার রাজা শিবচন্দ্র রায়। সবার মাথার ওপরে ছিলেন মোগল বংশীয় নবাব নূরুলদ্দিন বাকের জং। দক্ষিণরণাঙ্গনের বিদ্রোহ দমনে চন্ডিপুর ঘেরাও করে আধুনিক সমরাস্ত্রে সজ্জিত বৃটিশ বাহিনী।চন্ডিপুরের অসমযুদ্ধে বীরবিক্রমে লড়াই করে নিহত হন চন্ডিদেবী।যুদ্ধে হেরে গেলে স্থানীয় জনগণ   বাহের দ্যাশের ভাষায় বলেন, ' না পাই চন্ডি'।

কে এই চন্ডিদেবী!  তিনি হলেন, পীরগাছা মন্থনার মোগল পক্ষীয় মানবপ্রেমিক জমিদার দেবীচৌধুরানী। পীরগাছার কৃতিসন্তান আব্দুল গফুর সরকার, ' কে এই দেবী চৌধুরানী শীর্ষক এক লেখায় ঐতিহাসিক রহস্য উন্মোচন করেছেন।

চন্ডিদেবী যুদ্ধে হেরে গেলে জনগণ ঐতিহাসিক এই স্থানটির নাম রাখেন  " নাপাই চন্ডি।" চন্ডিদেবীর বীরত্ব গাঁথা  স্বর্ণালি অধ্যায়কে স্বরণীয় রাখতে 'নাপাই চন্ডি' মেলার প্রচলন করেন সেই  সময়ের সাহসী জনতা।প্রথা মতে, ' বৈশাখ মাসের প্রতি বৃহস্পতিবার এ মেলা স্বারম্ভরে হয়ে আসছে প্রায় আড়াই শত বছর ধরে।পীরগাছা,রংপুরের নাপাই চন্ডী নামে কোন মৌজা নাই।এ স্থানটি ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতি স্মারক।এটিই ছিল পীর-ফকির - সন্ন্যাসীদের তীর্থকেন্দ্র।তীর্থকেন্দ্রের পশ্চিমে রয়েছে বিশাল দিঘি।এগুলো সৃষ্টি  হয়েছিল দেবীচৌধুরাণীর দানকৃত জমিতে।এখানে দাঁড়িয়ে থাকা প্রতিকী মসজিদ, মসজিদ লাগোয়া ভেঙে যাওয়া মন্দিরের ধ্বংসাবশেষটিই হলো ;অসাম্প্রদায়িক  ঐতিহ্যের অমূল্য প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন।

 এখানকার যুদ্ধে আরো যাঁরা নিহত হয়েছেন তাঁরা হলেন ইটাকুমারীর জমিদার শিবচন্দ্র রায়,দেবীচৌধুরানীর ছোটভাই কেষ্ট কিশোর চৌধুরীসহ অসংখ্য  ফকির -সন্নাসী ও অনুগামী মুসলিম,হিন্দু প্রজা।এই বিদ্রোহের অনন্য বৈশিষ্ট্য ছিল হিন্দু - মুসলিম প্রজাদের সম্মিলিত অভিযান।