১২ই ফেব্রুয়ারি , বুধবার ২০২৫ সাল সকালে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ইউনূস ঢাকার আগারগাঁও, কচুক্ষেত ও উত্তরায় অবস্থিত তিনটি পরিত্যক্ত গোপন বন্দিশালা পরিদর্শন করেন। বিগত সরকারের আমলে ‘আয়নাঘর’ নামে কুখ্যাতি পাওয়া তিনটি গোপন ব*ন্দিশা*লা ঘুরে দেখেছেন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস; দেখেছেন নি*র্যাতনে ব্যবহৃত বৈদ্যুতিক চেয়ার, দেয়ালে লেখা কলেমা, দাগ কাটা দিনের পরিসংখ্যানসহ বহু কিছু। এর দুটি র্যাব ও একটি ডিজিএফআই পরিচালনা করত।
পরিদর্শনকালে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে ছিলেন ছয়জন উপদেষ্টা, গুম কমিশনের প্রধানসহ পাঁচজন এবং গুমের শিকার আটজন।
কেমন অত্যাচার হত হাসিনা জমানার ‘আয়নাঘরে’? ঘুরে দেখলেন ইউনুস
এবার সেই আয়নাঘর ঘুরে দেখলেন ইউনুস। তার একাধিক ছবি সামনে এসেছে ইউনুসের প্রেস উইং মারফতও। সেখানে ইউনুসকে দেখা যাচ্ছে গোটা ঘরটি ঘুরে দেখতে। একজন তাঁকে বুঝিয়ে দেন কীভাবে হাসিনার আমলে অত্যাচার করা হত।
একটা সময় এই আয়নাঘরে বন্দি ছিলেন এমন কয়েকজনও ইউনুসের সঙ্গে ছিলেন। এই আয়নাঘর আগারগাঁও, কচুক্ষেত ও উত্তরা এলাকায় ছিল বলে খবর। গোপন বন্দিশালা। দেখলেই গা ছমছম করে। কী হত সেখানে? প্রাক্তন বন্দিরা সেটাই দেখান ইউনুসকে। একাধিক ঘর, বিশেষ ধরনের চেয়ার দেখেন মহম্মদ ইউনুস।
আয়নাঘরে কেমন হত অত্যাচার? ঘরে দেখলেন মহম্মদ ইউনুস। (Photo by Bangladesh's Chief Advisor Office of Interim Government / AFP) (AFP)
তারা গুম করা ব্যাকতিকে কিভাবে ইলেকট্রিক শক দেয়া হতো।চেয়ারসহ অন্যান্য উপকরন সমুহ স্বচক্ষে দেখেন। তিনি চেয়ারটা দেখে রাখা জরুরি। 'হাই ভ্যালু' বন্দিদের ইলেক্ট্রিক শক দিতে ব্যবহার হতো এই চেয়ার।ডিজিএফআই-এর কাউন্টার টেরোরিজম ইন্টিলিজেন্স ব্যুরো (সিটিআইবি) এই আয়নাঘরের দায়িত্বে ছিল। সারাক্ষণ একজস্ট ফ্যান চলত এই ঘরগুলিতে, ফ্যান বন্ধ হলেই কান্না আর গোঙানির শব্দ শুনতে পাওয়া যেত। আজ থেকে গোটা বিশ্ব আয়নাঘরের সব ছবি দেখবে।ভারতীয় সাংবাদিক অর্ক দেব,যিনি এই দলে ছিলেন তিনি বলেছেন-বাংলাদেশের ইতিহাসে সবথেকে বর্বরতম চিত্র আর লজ্জার নাম আয়নাঘর। পৃথিবীর কোনও শাসক এতটা জালিম হয়ে না উঠুক এমনটাই প্রত্যাশা এদেশের খেটে খাওয়া মানুষের।
আয়নাঘর’ নিয়ে তিক্ত অনুভূতি প্রকাশ করলেন উপদেষ্টা মাহফুজ।
আয়নাঘর’ পরিদর্শন শেষে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটি পোস্ট দিয়েছেন উপদেষ্টা মাহফুজ আলম।
পোস্টে তিনি লেখেন, নৃশংস! এটাই আমাদের দেখা সবচেয়ে ভয়ংকর ‘আয়নাঘর’। তিন ফুট বাই এক ফুটের সেল। দুই বিঘত জায়গায় টয়লেট। বাকি দুই ফুটে হাঁটু মুড়ে বসে থাকার জায়গা।
তিনি আরও লেখেন, আমার মনে হয় জুলাই অভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তিগুলোর একটি হলো গুমের শিকার মানুষদের মুক্তি। বাংলাদেশে যেন আর কখনও গুমের মতো মানবতাবিরোধী কিছু না ঘটে, সেটা নিশ্চিত করতে আমরা কাজ করছি।উপদেষ্টা মাহফুজ আলম লিখেছেন, আমরা সরকার গঠনের মাত্র ১৯ দিনের মাথায় গুম কমিশন গঠন করেছি, যারা দিনরাত কাজ করে নৃশংসতার বিবরণগুলো ডকুমেন্ট করেছেন। ২১ দিনের মাথায় আন্তর্জাতিক গুমবিরোধী কনভেনশনে সই করেছি। আজকে মিডিয়ার মাধ্যমে বিশ্ববাসী দেখবেন হাসিনার নৃশংসতার কিছু নমুনা। আরও শত শত, নমুনা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে আছে।তিনি লেখেন, গত ৬ মাস গুম কমিশন গুমের ভিক্টিমদের সাক্ষ্য নিয়ে, তদন্ত করে গুমের স্থান, কাল ও সত্যতা নিরূপণ করেছেন। সে সূত্রে আইসিটি ট্রাইব্যুনালে মামলা হয়েছে। বিচারের কাজও শুরু হয়েছে। গুমের শিকার প্রতিটা মানুষের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা গণঅভ্যুত্থানের সরকারের অঙ্গীকার।
যে খুপড়ির মধ্যে তাদেরকে রাখা হয়েছে, গ্রামে মুরগির খাঁচাও এর থেকে বড় হয়। তাদেরকে মাসের পর মাস, বছরের পর বছর এভাবে বন্দি করে রাখা হয়েছে। মানুষ হিসেবে সামান্যতম মানবিক অধিকার থেকেও তাদের বঞ্চিত করা হয়েছে।'ছোট খুপড়ির পেছনের অংশে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা ছিল, এটাই ছিল বন্দিদের টয়লেট, পাশে থাকা-খাওয়ার স্থান। এই টর্চারসেলের ভেতরে দুপুর ১২টায়ও ঘুটঘটে অন্ধকার। ভেতরে শ্বাস নেওয়ার অবস্থা নাই। ভেতরে ২ মিনিটও যদি কষ্ট করে থাকতে পারেন বাইরে আসার পর আপনার বমি পাবে। অথচ এখানে শেখ হাসিনার নির্দেশে মাসের পর মাস, বছরের পর বছর নির্বিচারে মানুষকে আটকে রাখা হতো। এটা একটা হিডেন টর্চারসেল। এটার অস্তিত্ব গোপন করার জন্য সামনে দেয়াল তৈরি করা হয়েছিল। গুমের শিকার ব্যক্তিদের বর্ণনা অনুযায়ী খোঁজ করতে করতে গুমকমিশনের সদস্যরা এটা খুঁজে পায়, পরে দেয়াল ভেঙে এই রকম কয়েকটি টর্চারসেল বের করা হয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি টর্চার সেল র্যাবের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা জারির পর লুকিয়ে ফেলার জন্য দেয়াল তৈরি করা হয়েছিল। আর কয়েকটি সেল দেয়াল তৈরি করে লুকানো হয়েছে ৫ আগস্টের পর।
আয়নাঘরের বন্দী এক দেয়ালে লেখা I LOVE MY FAMILY ঠিক নিচে লিখা মাসুদ ইব্রাহীম , ফজরের নামাজ পড়তে বের হলে এই মাসুদ ইব্রাহীমকে জ/ ঙ্গি সন্দেহে গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নামধারীরা , দুই মাস এই আয়নাঘরে রাখা হয় ,পরে ওখান থেকে বের করে জ*ঙ্গি আস্তানায় তল্লাশীর নামে কথিত বন্দুকযুদ্ধে ছেলেটিকে শহীদ করে ফেলে হাসিনার এই ভয়ঙ্কর খুনিরা।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। তিনি বলেন, গোপন বন্দিশালাগুলোর আয়নাঘর নামে পরিচিত কক্ষ ছোট এবং হাঁটার জায়গা অনেক সরু বলে সেখানে সবাইকে নিয়ে যাওয়া কঠিন।
জাতি আজ আয়নাঘরের ব্যাপারে রাষ্ট্রীয় স্বীকারোক্তি পেলো। ভবিষ্যতের বাংলাদেশ নির্মাণে আজকের দিন একটা বৈপ্লবিক দিন হিসেবে বিবেচিত হবে। আর কোনো আয়নাঘর আমরা দেখতে চাই না, ইভেন যারা আয়নাঘর তৈরি করে নৃশংসতা চালিয়েছে, তাদের জন্যও আয়নাঘর চাই না। এই ক্রিমিনালদের বিচারের মুখোমুখি করতে হবে ফ্রি এন্ড ক্রেডিবল কোর্টের মাধ্যমে; দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।
আয়নাঘরে ব্রিগ্রেডিয়ার জেনারেল (অব.) আমান আযমী এবং ব্যারিস্টার আহমাদ বিন কাশেমকে দেখে অশ্রু ধরে রাখতে পারিনি। দেশের সেরা মেধাবীদের এভাবে ছোট্ট ঘরে চোখ বেঁধে ফেলে রেখেছিল এক নিকৃষ্ট শাসক।পরিদর্শনের সময় এক ভুক্তভোগী সদস্যা নিজের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন। তিনি জানান, ২০২০ সালে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে চাকরি করার সময় নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি ফেসবুকে দুই লাইনের একটি স্ট্যাটাস দেন। এর পরদিন, অফিসে যাওয়ার পথে হাতিরঝিল এলাকা থেকে তাঁকে অপহরণ করা হয়। প্রথমে তাঁকে নারায়ণগঞ্জের র্যাব অফিসে নিয়ে যাওয়া হয় এবং পরদিন আয়নাঘরে পাঠানো হয়।তিনি আরও বলেন, “আয়নাঘরে আমাকে এমন ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে, যা মনে পড়লেই শিউরে উঠি। আমাদের কোনো কথা বলার অনুমতি ছিল না, আমরা শুধু ইশারায় যোগাযোগ করতাম। আমি আয়নাঘরে ২০২০ সালের ১ মার্চ থেকে ১০ মার্চ পর্যন্ত ছিলাম। এই দশ দিন ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে অন্ধকারময় সময়।”
রাহাত, একজন গার্মেন্টস ব্যবসায়ী, র্যাব দ্বারা অপহরণ করা হয়েছিল। তারা তার থেকে এক কোটি টাকা দাবি করেছিল। তিনি ৬০ লাখ টাকা দিতে চেয়েছিল। তারা তাকে মুক্তি দেয়নি। পরিবর্তে, তাকে ইসলামি স*ন্ত্রাসবা*দী হিসাবে ঘেরাফেরা করা হয়েছিল এবং বাধ্যতামূলক নিখোঁজ হওয়ার শিকার হয়েছিল। রাহাত প্রফেসর ইউনুসকে তার আয়নাঘরের দিনগুলোর কাহিনী শোনায়, সে বলে আয়না ঘরের অনেক ছবি সামনে এসেছে কিন্তু এই ছবিটা আমাকে নাজুক করে ফেলেছে। চোখের সামনে বড় হওয়া জমজ দুই ভাই। হাসি খুসি, ইসলামী সংস্কৃতির সাথে জড়িত, নাটক-অভিনয়ে পারদর্শী অনুপমের ক্রিয়েটিভ দুই শিশু শিল্পী ছিল ইব্রাহীম ও ওর ভাই।
২০১৬ সালে হটাৎ ইব্রাহিমের মৃত্যুর সংবাদটি সামনে আসে। দীর্ঘদিন গুম, অতঃপর ক্রসফায়ার, এখানেই শেষ না, পরিবারকে লাশ পর্যন্ত না দেয়ার ধৃষ্টতা।
ইব্রাহীম যখন শহীদ হয় তখন এই ঘটনাকে প্রসাশন এতোটা ভয়ংকর ভাবে সামনে আনে যে পরিবার বা তার কোন বন্ধু বা সহপাঠী তাকে তার পরিচিত বলে স্বীকৃতি দেওয়াটাও রিস্কি। আমারা তখন ইব্রাহীমের মৃত্যুর সঠিক তথ্য ধারণা করতে পেরেও ধারণ করতে বা প্রকাশ করতে যে কাপুরুষতা দেখিয়েছি তার বিপরীতে আয়না ঘরে বসেও ইব্রাহীম তার সাহসীকতা দেখিয়েছে। এই যে আজ প্রায় ৯ বছর পর ইব্রাহীম আমাদের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠেছে ছবি দিয়ে। ভাবা যায় আয়না ঘরের দিন গুলো কেমন ছিল? পরিবারকে সে কতোটা মিস করেছে? এই একাকিত্বে তার মায়ের স্পর্শ পাবার জন্য কতটা উদগ্রীব ছিল। একটু চিন্তা করুনতো আয়না ঘরের দেয়ালে লেখা "I love my family" এর ভারত্ব কতটুকু? ইব্রাহিম তুমি আমাদেরকে ক্ষমা করো। উড়তে থাকো জান্নাতের পাখি হয়ে। আমরাও বেচে আছি জিন্দা লাশ হয়ে যাস্ট অপেক্ষা তোমার মিছিলে শামিল হওয়ার।
ফজরের নামাজ পড়তে বের হলে জঙ্গী সাজিয়ে আয়নাঘরে নেয়া হয় মাদ্রাসা ছাত্র ইব্রাহীমকে বিশিষ্ট অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট আসিফ সৈকত তাঁর ব্যাক্তিগত ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে এক পোস্টে শহীদ ইব্রাহীম বিন আজীমকে আয়নাঘরে নেয়ার ঘটনা জানিয়েছেন। আসিফ সৈকত লিখেছেন, সকালে ফজরের নামাজ পড়তে বের হলো বাচ্চাটা, তাকে তুলে নিয়ে আয়নাঘরে আটকে রাখলেন। কি নিস্পাপ মুখ বাচ্চাটার। মুক্তির উন্মাদনায় দিশেহারা হয়ে দেয়ালে খোদাই করে লিখলো বাচ্চাটা “আই লাভ মাই ফ্যামিলি”।
সে জানেও না তার অপরাধ কী? বাচ্চাটাকে জঙ্গী নাটক সাজিয়ে ক্রসফায়ারে মেরে ফেললেন। লাশটাও পরিবারকে দিলেন না। মাদ্রাসার ছাত্র, জঙ্গী তকমা।
২০১৩ সালের ৪ ডিসেম্বর। রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা থেকে নিখোঁজ হন ঢাকা মহানগর ৩৮ (বর্তমান ২৫) নং ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাজেদুল ইসলাম সুমন। এর পর আর খোঁজ মেলেনি তার।
পরিদর্শক দলের সদস্য একজন ব্রিলিয়ান্ট সাংবাদিক তাসনিম খালিল আয়না ঘর দর্শন সম্বন্ধে যা লেখেছেন তা হল-সম্ভবত আয়না ঘর ভিজিট করা youngest সাংবাদিক আমি। এটা অত্যন্ত ট্রমাটিক ছিল, কিছু লেখার ভাষা পাচ্ছিলাম না। অন্যদিকে বাংলা টাইপ করাটা আমার জন্য একটা মহা ঝামেলা। যাইহোক, আমি কয়েকটি FAQ করব এবং কিছু পর্যবেক্ষণ বলব, যেগুলো হয়তো আপনি এখনো জানেন না বা মিডিয়ায় আসেনি।
১. ওয়ালে কীভাবে লেখা হতো?
উত্তর: প্রধানত মাছের কাঁটা। খাইতে দিলে সেগুলো জমিয়ে রাখতেন। এ ছাড়া কোনো ধারালো কণা বা কিছু পেলে। অনেককেই লেখার জন্য কলম ও কাগজ দেওয়া হতো, তারা সেই কলম ব্যবহার করেছে।
২. আয়না ঘর দেখাতে এতদিন লাগল কেন?
উত্তর: ডিজিএফআই বা স্পেসিফিক্যালি আর্মি আসলে কোনো দিনই এটা দেখাতে চায়নি, কারণ এটা তাদের ইমেজের জন্য হুমকি। কিন্তু নেত্র নিউজ এটার জন্য কাজ করে গেছে। গত বুধবারে আমাদের রিপোর্ট করা হয়েছিল যে আর্মি আয়না ঘর ভিজিট দিচ্ছেন না; এর পরের দিন সরকার আয়না ঘর ভিজিটের কথা জানান। আর্মি দোষী, তাই অবশ্যই তারা চায়নি তাদের পাপ সামনে আসুক। কিন্তু মিডিয়ার চাপে তা করতে বাধ্য হয়েছে।
৩. রিভলভিং চেয়ার নাকি কী?
উত্তর: এটাকে প্রথমে অনেকেই ইলেকট্রিক শক চেয়ার ভেবে ভুল করেছেন। মূলত এটাতে হাত-পা মাথায় বেঁধে জোরে ঘুরানো হয়। আর এটা ইলেকট্রিক, তার প্রমাণ আছে—এটার সাথে লাগানো তারের লেজ ছিল। মানে তার কেটে ফেলার পরেও কিছু তার রয়ে গেছে। যেহেতু অনেকেই রিভলভিং চেয়ার শাস্তির সাথে পরিচিত না, তাই এটাকে ইলেকট্রিক শক দেওয়ার চেয়ার ভেবেছেন। এটা নরমাল।
৪. একটি মাত্র চেয়ার কেন?
উত্তর: এত মানুষকে একটা চেয়ারে কীভাবে শাস্তি দিতো? প্রথমত ডিজিএফআই অনেক আলামত নষ্ট করে ফেলেছে। গুম কমিশন এই চেয়ারটাও অনেক কষ্ট করে খুঁজে পেয়েছে। এটাও লুকানো হয়েছিল। আর সবাইকে একই শাস্তি দিতো না। অনেক রকম সাজার ব্যবস্থা ছিল। যেমন এই রুমে ঝুলিয়ে মারার মতো ব্যবস্থা ছিল, যা পুরোপুরি মুছে ফেলা সম্ভব হয়নি।
৫. তাসনিম খালিলের ছবিতে করোনা আইসোলেশন সেন্টার লেখা কেন?
উত্তর: ছবিটি আমিই তুলেছি এবং লেভেলটা ইচ্ছে করেই ফ্রেমে রাখা হয়েছে।আইসোলেশন সেন্টার আসলে একটা ভ্রম। এর ভিতরেই রাখা হতো বন্দীদের। আর এই কল্যাপসিবল গেটের কথা একাধিক সারভাইভার আমাদের বলেছেন।
৬. এতদিন শুনে আসলাম আয়না ঘর হল অনেক ছোট রুম, আলো-বাতাস অসহ্য। এখন দেখি অনেক রঙ করা, আলো ভরা—এগুলো কেন?
উত্তর: যতগুলো গোপন বন্দিশালা আছে (ডিজিএফআই হেডকোয়ার্টারসহ), সবগুলাতে আলাদা মাপের রুম আছে। কোথাও রুমের ভিতরেই টয়লেট, কোথাও কয়েকটি সেলের জন্য বাইরে শেয়ার্ড টয়লেট। আর সেখানে সব টয়লেটের দরজায় ফুটো করা থাকত, যেন বন্দী টয়লেটে গিয়ে কী করছে দেখা যায়। একদম ছোট—৩ হাত যায় এমন রুমও আছে। আল্লাহ জানেন এগুলোর ভিতরে মানুষ কীভাবে বেঁচেছে! আবার একদম অন্ধকার, চারপাশ কালো ওয়াল, ছাদও কালো রঙ করা এমন রুম আছে। আমি যেটা ক্যামেরায় ঠিকমতো আনতে পারিনি আলোর অভাবে। কিছু রুম তুলনামূলক ভালো ছিল, সেগুলোকে ভিআইপি রুম বলা যায়।
৭. একটি লাল তোয়ালে কীভাবে এলো? উত্তর: লাল তোয়ালেটা আমার চোখে পড়েনি। তবে র্যাব-২-এ এখন নতুন করে যারা কাজ করতে আসছেন, তাদের অনেক সেনা সদস্যের ট্রাঙ্ক, জিনিসপত্র আছে। হতে পারে তাদের কেউ এটা রেখেছে।
এবার আমার কিছু শকিং পর্যবেক্ষণ:
১. প্রথমত ওয়াশরুমের দরজায় ফুটো করা। দ্বিতীয়ত, ওয়াশরুমগুলো এত ছোট যে কমোডগুলো সোজা বসানো যায় না—ডায়াগোনালি বসাতে হয়েছে! আমি জানি না ওরা এখানে কীভাবে বসতেন। নিশ্চয় অর্ধেক বসেই কাজ সারতে হতো! তার ওপর ফুটো দিয়ে গার্ড এসে দেখবে! ভাবা যায়! সারভাইভারদের মুখে শোনা কিছু কোথাও কোথাক ওয়াশরুমেও সিসি ক্যামেরা লাগানো।
২. যতটা সম্ভব এটাকে ট্রান্সফর্ম করার চেষ্টা হয়েছে। অনেক জায়গায় ওয়াল রং করা হয়েছে, লেখা মুছে ফেলার চেষ্টা হয়েছে। অনেক জায়গায় নতুন ওয়াল তুলে দেওয়া হয়েছে, আবার কোথাও ওয়াল ভেঙে ফেলা হয়েছে। গুম কমিশন অনেক কষ্ট করে এসব খুঁজে বের করেছে। ডিজিএফআইয়ের আয়না ঘর ের দুপাশের ওয়াল ভেঙে ফেলা হয়েছে, যার কারণে রুমগুলোতে এখন অনেক আলো। রুমের সামনে এই ওয়ালগুলো থাকলে নিশ্চিত এখানে একটা ভৌতিক পরিবেশ হতো! এমনকি র্যাব-১-এর একটা ওয়াল না ভাঙলে গুম কমিশন সবচেয়ে ছোট খুপরির মতো রুম খুঁজে পেত না। অথচ কেউ ভাবেনি এর ভিতরে রুম থাকা সম্ভব!
৩. স্কুইড গেম সিরিজ হয়তো দেখেছেন, যেখানে গার্ডদের আইডেন্টিটি যেন না বোঝা যায়—তারা একই জামাকাপড়-মুখোশ পরে থাকে। এখানেও কিছু ব্যবস্থা নেওয়া হতো। যেমন এক গার্ড আরেক গার্ডকে শিস দিয়ে ডাকত, নাম ধরে ডাকত না। বন্দীদের সাথে ফিসফিস করে কথা বলত, যাতে তাদের আসল ভয়েস শোনা না যায়।
৪. আরমানকে যে রুমে ৮ বছর রাখা হয়েছিল, তার সামনে সাদা টাইলস ছিল। ওরা টাইলস চেঞ্জ করার চেষ্টা করছে। টাইলসগুলো ফ্লোর থেকে তুলে একটা সেলের মধ্যে ঢুকিয়ে, সেলের সামনে আরেকটা ওয়াল তুলে রং করে দিয়েছে। আবার সেলের ভিতরে ছোট একটা ওয়াশরুম—তার সামনেও আলাদা ওয়াল তুলে দেওয়া হয়েছে।
৫. জঙ্গি নাটক বানানোর জন্য ওদের স্টকে অনেক ইসলামিক বই আছে। যেগুলোর একটা স্ট্যাক পাওয়া গেছে।
৬. আমি প্রিজন ব্রেক মুভি পছন্দ করি—শশ্যাঙ্ক রিডেম্পশন, এস্কেপ প্ল্যান, প্রিজন ব্রেক—এমন অনেক সিরিজ দেখেছি। সেই এক্সপেরিয়েন্স থেকে মনে হয়, আয়না ঘর থেকে পালানোর কোনো সুযোগ আছে বলে আমার মনে হয় না।
৭. উপদেষ্টা আসিফ ও নাহিদ তাদের সেলগুলো চিনতে পারে। আসিফ প্রথমে চিনলেও একটু কনফিউজ ছিল, তারপর আমরা যখন ওকে ওয়াশরুম দেখাই, সে ওয়াশরুম ও ওয়াশরুমের আয়না, বেসিন এগুলো দেখে চিনতে পারে যে এটাই সেই রুম। একই বিল্ডিংয়ে নাহিদও তাকে যে রুমে রাখা হয়েছিল, সেই রুম খুঁজে পায়। তবে রুমগুলাতে কিছু মডিফিকেশন করা হয়েছে, ভিন্ন দরজা লাগানো হয়েছে, এক্সস্ট ফ্যান খুলে ফেলা হয়েছে, অনেক জায়গায় দুটি রুম ভেঙে একটি রুম বানানো হয়েছে। কিন্তু তাদের এই ট্রমা কাটানোর জন্য একটি ক্লোজার দরকার ছিল।যেটা তারা পেয়েছে।
৮, এটি মেনে নেওয়া কঠিন! মোবাইলের ফ্ল্যাশলাইট জ্বালিয়ে দেখেছি—কালো দেয়ালে লেখা আছে মানুষের ফোন নম্বর, কাকুতি-মিনতি, ঠিকানা, বন্দিদের জন্য মেসেজ! ভাবাই যায় না, একজন মানুষ দিনের পর দিন, মাসের পর মাস এই বন্দিশালায় কাটিয়েছেন! প্রতিদিন ঘুম ভাঙতেন একটা হোপলেস পৃথিবীতে! ক্ষণে ক্ষণে মৃত্যুভয়! এভাবে কি বেঁছে থাকা যায়?
আয়নাঘরের একটি সেলের দেয়ালে লেখা রয়েছে, ‘লা ইলাহ ইল্লাহ আন্তা সোবহানাকা ইন্নি কুন্তু মিনহাশ জোয়ালেমিন’। অপর এক সেলের দেয়ালে ওপর-নিচ করে রোমান হরফে তিনটি নম্বর লেখা রয়েছে। এগুলো হলো ‘১৬৩, ১৫০, ১১৩’।
কুখ্যাত টর্চারসেল আয়নাঘরের অপর সেলের দেয়ালে রোমান হরফে রয়েছে ‘জেড ১৭৪’। আরেক টর্চার চেয়ালের কালো রঙের দেয়ালে লেখা রয়েছে অনেক কথাই। যার অধিকাংশই অস্পষ্ট। এ দেয়ালে রোমান হরফে লেখা রয়েছে, ‘আই লাভ মাই ফ্যামিলি’। এ ছাড়া রোমান হরফে ‘১২৩০ দিন’ লেখা রয়েছে। এর নিচে বাংলায় ওপর-নিচ করে দুটি নাম লেখা রয়েছে। একটি নাম মাসুদ, আরেকটি ইব্রাহিম।
আমাকে গুম করা হয়েছিলো এইচএসসি পরীক্ষার ৬০ দিন আগে। আমি পরীক্ষার ব্যাপারে পুরোপুরি অনিশ্চিত ছিলাম। যাই হোক বাসায় জোর তদবীর চালায়, টাকা পয়সা ঢালে এবং আমাকে পরীক্ষার ১ সপ্তাহ আগে জানানো হয় যে আমি পরীক্ষা দিতে পারবো এবং জেল থেকে দিতে হবে। জেইল গেটের বাইরে ফ্যামিলি বই,গাইড,খাতা সব রেখে গেছে। যেহেতু আমার বোর্ড ছিলো কুমিল্লা এবং আমি ছিলাম কাশিমপুর আমাকে পরীক্ষার জন্য কুমিল্লা পাঠাতে হতো। সকালে ডাক দিয়ে নিয়ে যায় ডান্ডা বেরী পড়াইতে এবং আমি জানতাম যে প্রিজন ভ্যানেই ট্রান্সফার করা হবে! মোটা ডান্ডাবেড়ী পড়ানো হলো এবং জেল থেকে পুলিশের কাছে হ্যান্ডওভার করা হলো! কিন্তু আমাকে ট্রান্সফারের জন্য তারা লোকালি যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। সেই গাজীপুর থেকে লোকাল বাসে এই ডান্ডাবেড়ী পড়া অবস্থায় তোলে। সাথে ৪টা বড় বড় বই খাতার ব্যাগ এবং জামাকাপড়ের ব্যাগ৷ অটো, লোকাল বাস এ যাতায়াতের সময় চারপাশের মানুষ লিট্রেলি হতবাক হয়েছিলো! এই ছোট্ট ছেলে কি এমন করলো(!) যে একে ডান্ডাবেড়ী পড়ানো হয়েছে। এভাবে ঢাকা থেকে কুমিল্লাগামী বাসে তুললো, সেখানেও একই অবস্থা! যেনো আমি একটা না-মানুষ। যার কোনো মান সম্মান থাকতে পারে না!যার কোনো ইজ্জত থাকে না! এভাবেই কুমিল্লা নামায়, আমার শহরে আমি ডান্ডাবেড়ী পড়া অবস্থায় বাস থেকে নামি! পরে অটোতে করে জেলে নেয়া হয়! এর চেয়ে মাটি ফুড়ে নিচে ঢুকে যাওয়াই হয়তো ভালো ছিলো!
ড. ইউনূস বলেন, মানুষের মনুষ্যত্ববোধ বলতে কিছু আছে, সেটা থেকে বহু গভীরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে নিশ্চিহ্ন করার জন্য। যাতে মানুষের মনুষ্যত্ববোধ না থাকে। প্রতিটি জিনিস এখানে যা হয়েছে নৃশংস, যতটাই শুনি অবিশ্বাস্য মনে হয়।
তিনি প্রশ্ন রাখেন, এটা কী আমাদেরই জগৎ? এটা আমাদেরই সমাজ? আমরা এটা করলাম?প্রধান উপদেষ্টা বলেন, যাঁরা এটার শিকার হয়েছেন, তাঁরা আমাদের সঙ্গে আছেন, তাঁদের মুখে শুনলাম কিভাবে হয়েছে। কোনো ব্যাখ্যা নেই, এটা বিনা কারণে, বিনা দোষে করা হয়েছে। কতগুলো সাক্ষী ঢুকিয়ে দিয়ে বলছে, তুমি জঙ্গি। এগুলো বলে তাঁকে নিয়ে আসা হয়েছে।
এ রকম টর্চার সেল বাংলাদেশজুড়ে আছে উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘আমার ধারণা ছিল শুধু এখানে আয়নাঘর বলতে কয়েকটা আছে। এখন শুনছি আয়নাঘরের বিভিন্ন ভার্সন দেশজুড়ে আছে। কেউ বলে সাত শ, কেউ বলে আট শ। সে সংখ্যাটা এখনো নিরূপণ করা যায়নি, কতটা জানা আছে, কতটা অজানা রয়ে গেছে।’
আয়নাঘর ঘুরে দেখে অধ্যাপক ইউনূস সাংবাদিকদের বলেন, ‘একজন বলছিলেন খুপরির মধ্যে রাখা হয়েছে।এর থেকে তো মুরগির খাঁচাও বড় হয়। বছরের পর বছর এভাবে রাখা হয়েছে। এটা আমাদের সবারই অপরাধ, এটা আমরা হতে দিয়েছি এ দেশে।’প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘মুক্ত বাংলাদেশে আমরা যেন নতুন করে সমাজ গড়তে পারি। এটা জাতির জন্য এক বড় ডকুমেন্ট হবে। ডকুমেন্টেশন হিসেবে থাকবে। পাঠ্য হিসেবে আমাদের পড়তে হবে। যারা এটা করেছে তাদের বিচার করতে হবে। নইলে আমরা এ থেকে নিষ্কৃতি পাব না। যারা করেছে, তাদের বিচার করা হবে।’ সমাজকে এসব থেকে বের করে না আনা গেলে সমাজ টিকবে না বলে উল্লেখ করেন প্রধান উপদেষ্টা।আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা নতুন বাংলাদেশ ও নতুন পরিবেশ গড়তে চাই। সরকার সে লক্ষ্যে বিভিন্ন কমিশন করেছে। যে ঘটনাগুলো ঘটেছে তার পুনরাবৃত্তি যেন না হয়, সরকার সে লক্ষ্যে কাজ করবে।এ সময় উপস্থিত ছিলেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল, পরিবেশ বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান, উপদেষ্টা মাহফুজ আলম, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মো. নাহিদ ইসলাম এবং স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া প্রমুখ।
সংগ্রহে - মোহাম্মদ ইয়ার আলী