বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৯ আশ্বিন ১৪৩৩
সর্বশেষ বিশেষ সংবাদ জাতীয় সারাদেশ আন্তর্জাতিক খেলা বিনোদন বাণিজ্য লাইফস্টাইল লালমনিরহাট মতামত অন্যান্য

জ্বালানি সরবরাহে একাধিক বিদেশি প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রতিনিধিত্ব একই ব্যবসায়িক বলয়ে


প্রকাশ : (১ সপ্তাহ আগে)
জ্বালানি সরবরাহে একাধিক বিদেশি প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রতিনিধিত্ব একই ব্যবসায়িক বলয়ে

রাষ্ট্রীয় জ্বালানি ক্রয়ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করা বিপিসি ও এর অধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাবেক কর্মকর্তাদের একটি অংশ অবসরের পর যুক্ত হয়েছেন বেসরকারি একটি ব্যবসায়িক বলয়ের সঙ্গে। তাঁদের কেউ ছিলেন শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তা, কেউ জ্বালানি ক্রয়, বিপণন, দরপত্র, আন্তর্জাতিক সরবরাহকারী ও মূল্যসংক্রান্ত কার্যক্রমের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, এসব সাবেক কর্মকর্তার অন্তত ১০ জন বিভিন্ন সময়ে ডা. এজাজুর রহমানের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান সেভেন মার্ক ও ট্রান্সবাংলা কমোডিটিজ লিমিটেডের সঙ্গে কাজ করেছেন বা যুক্ত হয়েছেন বলে বিপিসির বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তা এবং জ্বালানি খাতের সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র দাবি করেছে।

এতে প্রশ্ন উঠেছে, সরকারি চাকরিতে থাকার সময় অর্জিত জ্বালানি ক্রয়, দরপত্র, সরবরাহকারী নির্বাচন, মূল্য নির্ধারণ ও প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগের অভিজ্ঞতা অবসরের পর কোনো নির্দিষ্ট ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর জন্য বাড়তি সুবিধা তৈরি করছে কি না।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, রাজধানীর কারওয়ান বাজার এলাকায় একই ভবন থেকে সেভেন মার্ক ও ট্রান্সবাংলা কমোডিটিজ লিমিটেডের কার্যক্রম পরিচালিত হয়। একই ভবনে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) ঢাকা লিয়াজোঁ কার্যালয়ও রয়েছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে।

একই ভবনে রাষ্ট্রীয় জ্বালানি ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানের কার্যালয় এবং বিপিসির তালিকাভুক্ত আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীদের স্থানীয় প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিষ্ঠানের অফিস থাকা আইনত নিষিদ্ধ, এমন সুনির্দিষ্ট বিধান অনুসন্ধানে পাওয়া যায়নি। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, আন্তর্জাতিক দরপত্রে প্রস্তাবিত দর, প্রিমিয়াম ও অন্যান্য বাণিজ্যিক তথ্যের গোপনীয়তার বিষয়টি বিবেচনায় নিলে এমন ভৌগোলিক নৈকট্য প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি দরপত্রে প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রস্তাবিত দর ও বাণিজ্যিক শর্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো প্রতিযোগীর প্রস্তাব সম্পর্কে আগাম ধারণা পাওয়া গেলে সামান্য ব্যবধানেও কম দর দিয়ে সর্বনিম্ন দরদাতা হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

বিপিসির কয়েকজন বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন, দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগকে কাজে লাগিয়ে এজাজ-সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়িক বলয় বিভিন্ন দরপত্রে সুবিধাজনক অবস্থান তৈরি করে থাকে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন প্রমাণ এই প্রতিবেদনে উপস্থাপন করা হয়নি।

ছয় আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীর সঙ্গে স্থানীয় যোগাযোগ

বিপিসির সরবরাহকারী তালিকা পর্যালোচনায় দেখা গেছে, তালিকাভুক্ত ১১টি আন্তর্জাতিক পরিশোধিত জ্বালানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অন্তত ছয়টির স্থানীয় প্রতিনিধিত্ব বা ব্যবসায়িক যোগাযোগ রয়েছে ডা. এজাজুর রহমানের সেভেন মার্ক ও ট্রান্সবাংলা কমোডিটিজ লিমিটেডের সঙ্গে বলে অনুসন্ধানে তথ্য পাওয়া গেছে।

সেভেন মার্কের মাধ্যমে সিঙ্গাপুরের ইউনিপেক এবং ইন্দোনেশিয়ার বিএসপি-জাপিনের প্রতিনিধিত্ব করা হয় বলে জানা গেছে।

অন্যদিকে ট্রান্সবাংলা কমোডিটিজ লিমিটেডের সঙ্গে পেটকো ট্রেডিং লাবুয়ান কম্পানি লিমিটেড, পিটিটি ইন্টারন্যাশনাল ট্রেডিং, ভিটল এশিয়া এবং সায়নোকেম ইন্টারন্যাশনালের স্থানীয় প্রতিনিধিত্বের সম্পর্ক রয়েছে বলে অনুসন্ধানে তথ্য পাওয়া গেছে।

অর্থাৎ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিষ্ঠানগুলো আলাদা হলেও বাংলাদেশে তাদের স্থানীয় ব্যবসায়িক যোগাযোগের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ একই ব্যবসায়িক বলয়ের দুটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত বলে তথ্য মিলেছে।

সাবেক কর্মকর্তাদের যোগ দেওয়ার প্রশ্ন

এজাজের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিপিসির সাবেক কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ততার একটি উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুস্তফা কুদরুত-ই-ইলাহীর নাম।

বিপিসির একাধিক সূত্র জানিয়েছে, চলতি বছরের মার্চ থেকে তিনি ট্রান্সবাংলা কমোডিটিজ লিমিটেডের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। ডা. এজাজুর রহমান দেশের বাইরে থাকলে জ্বালানি ব্যবসাসংক্রান্ত বিভিন্ন কার্যক্রমে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন বলেও সূত্রগুলোর দাবি।

তবে ট্রান্সবাংলা কমোডিটিজে তাঁর নির্দিষ্ট পদ, দায়িত্বের ধরন এবং আনুষ্ঠানিকভাবে যোগদানের সঠিক তারিখ সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

বিপিসিসংশ্লিষ্ট কয়েকজনের অভিযোগ, সরকারি দায়িত্ব পালনের সময় গড়ে ওঠা সম্পর্ক, অভিজ্ঞতা ও যোগাযোগ অবসরের পর বেসরকারি ব্যবসায়িক কার্যক্রমে ব্যবহৃত হচ্ছে। তাঁদের প্রশ্ন, রাষ্ট্রীয় জ্বালানি খাতের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালনের পর সংশ্লিষ্ট খাতের বড় সরবরাহকারীর স্থানীয় এজেন্ট প্রতিষ্ঠানে যোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে স্বার্থসংঘাতের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে কি না।

দরপত্র নিয়ে আরও যাচাইয়ের দাবি

বিপিসির কর্মকর্তাদের একটি অংশের দাবি, গত কয়েক বছরের কিছু দরপত্রে এজাজ-সংশ্লিষ্ট স্থানীয় প্রতিনিধিত্ব থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিযোগীদের তুলনায় অল্প ব্যবধানে কম দর দিয়ে সর্বনিম্ন দরদাতা হয়েছে।

তাঁদের মতে, বিষয়টি যাচাই করতে হলে গত কয়েক বছরের আন্তর্জাতিক দরপত্রের বিড শিট বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। বিশেষ করে প্রথম ও দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতার প্রিমিয়ামের ব্যবধান, দরপত্রের সময়সূচি এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর ধারাবাহিক অংশগ্রহণ পাশাপাশি পর্যালোচনা করা হলে কোনো অস্বাভাবিক প্রবণতা আছে কি না, তা বোঝা সম্ভব।

এ কারণে বিপিসির বিগত কয়েক বছরের পূর্ণাঙ্গ বিড শিট এবং কারিগরি ও আর্থিক মূল্যায়ন প্রতিবেদন স্বাধীনভাবে পর্যালোচনার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কেউ কেউ।

বিএসপি-জাপিনের যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন

এজাজের স্থানীয় প্রতিনিধিত্ব থাকা কয়েকটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের যোগ্যতা নিয়েও বিপিসির সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা প্রশ্ন তুলেছেন। এর মধ্যে রয়েছে ইন্দোনেশিয়ার বিএসপি-জাপিন।

জি-টু-জি সরবরাহকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠানটিকে অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রে এর নিজস্ব শোধনাগার, শোধনাগারে মালিকানা এবং প্রয়োজনীয় উৎপাদন ও রপ্তানি সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বলে কয়েকজন কর্মকর্তা দাবি করেছেন।

বন্দরসংক্রান্ত নথির তথ্য উল্লেখ করে তাঁরা আরও বলেন, বিপিসির জন্য বিএসপি-জাপিনের নামে আসা কয়েকটি জ্বালানি চালানের উৎস ইন্দোনেশিয়া না হয়ে মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর ছিল।

তবে কোনো চালান কোন দেশ থেকে এসেছে, সেটিই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সরবরাহ-যোগ্যতা বা চুক্তির বৈধতা প্রমাণ করে না। এ বিষয়ে চুক্তির শর্ত, উৎসসংক্রান্ত অনুমোদন এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র সমন্বিতভাবে পর্যালোচনা প্রয়োজন।

স্বচ্ছতা ও স্বার্থসংঘাতের প্রশ্ন

জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, বিষয়টি শুধু কোনো ব্যক্তি বা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের কর্মকাণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে জ্বালানি কেনাকাটার স্বচ্ছতা, প্রতিযোগিতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতার প্রশ্নও জড়িত।

একই স্থানীয় এজেন্ট যদি একাধিক আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীর প্রতিনিধিত্ব করে, একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠানের সাবেক কর্মকর্তারা অবসরের পর সেই এজেন্টের প্রতিষ্ঠানে যোগ দেন এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো ধারাবাহিকভাবে সরকারি কার্যাদেশ পেতে থাকে, তাহলে বিষয়টি নথিনির্ভরভাবে যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশেষ করে বিপিসির সাবেক কর্মকর্তারা কখন অবসর নিয়েছেন, কখন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যোগ দিয়েছেন, সরকারি চাকরিতে থাকাকালে তাঁদের দায়িত্ব কী ছিল এবং তাঁদের নতুন কর্মস্থলের প্রতিনিধিত্ব করা প্রতিষ্ঠানগুলো একই সময়ে কী ধরনের সরকারি কার্যাদেশ পেয়েছে, এসব তথ্য পাশাপাশি বিশ্লেষণ করা হলে সম্ভাব্য সম্পর্কের চিত্র আরও স্পষ্ট হতে পারে।

জ্বালানি রাষ্ট্রের একটি কৌশলগত পণ্য। তাই কম দামে জ্বালানি কেনার পাশাপাশি সরবরাহের নিরাপত্তা, সরকারি অর্থের সর্বোচ্চ সাশ্রয়, প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতাও গুরুত্বপূর্ণ।

এই বাস্তবতায় সরকারি জ্বালানি প্রতিষ্ঠানের সাবেক কর্মকর্তাদের অবসরের পর একই ব্যবসায়িক বলয়ে যোগ দেওয়ার প্রবণতা সরকারি ও বেসরকারি খাতের কর্মপরিবর্তনের কাঠামো বা ‘রিভলভিং ডোর’ নিয়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এর সঙ্গে জ্বালানি আমদানির দরপত্র ও সরকারি কার্যাদেশের কোনো প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা নির্ধারণে প্রয়োজন স্বাধীন ও নথিনির্ভর পর্যালোচনা।

বিজ্ঞাপন