প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের টাঙ্গাইলের সন্তোষ আগমন উপলক্ষে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর পরিবারের পক্ষ থেকে একটি খোলা চিঠি প্রদান করা হয়েছে। চিঠিতে ‘সন্তোষ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠাসহ বিভিন্ন ঐতিহাসিক দাবি বাস্তবায়নের আহ্বান জানানো হয়েছে। ভাসানী পরিষদের সদস্য সচিব আজাদ খান ভাসানীর স্বাক্ষরিত চিঠিতে মওলানা ভাসানীর অসমাপ্ত স্বপ্ন বাস্তবায়নের বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে তুলে ধরা হয়।
খোলা চিঠিটি হুবহু নিচে তুলে ধরা হলো:
“মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান-এঁর টাঙ্গাইলের সন্তোষ আগমন উপলক্ষে- খোলা চিঠি:
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
আসসালামুয়ালাইকুম। প্রথমেই মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী পরিবারের পক্ষ থেকে আপনার সন্তোষে আগমন ও তাঁর মাজার জিয়ারত উপলক্ষে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও স্বাগত জানাচ্ছি। গণমানুষের ন্যায্য প্রত্যাশা ও ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধতার আলোকে, মওলানা ভাসানীর অসমাপ্ত স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আমরা ভাসানী পরিবারের পক্ষ থেকে আপনার নিকট কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী দাবি উপস্থাপন করছি।
মওলানা ভাসানীর শেষ স্বপ্ন ছিল ‘সন্তোষ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়’। আজীবন সংগ্রাম, ত্যাগ ও আদর্শিক লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে তিনি যে রাষ্ট্র ও সমাজ নির্মাণের স্বপ্ন লালন করেছিলেন, তার পূর্ণ বাস্তবায়ন আজও অধরাই রয়ে গেছে। জীবনের অন্তিম সময়ে তিনি তাঁর জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও আদর্শের সারাংশ দিয়ে এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু করেছিলেন।
পীর শাহজামানের পুণ্যভূমি হিসেবে খ্যাত ঐতিহাসিক কাগমারী পরগণা (পূর্ব নাম খোশনদপুর) থেকে ১৯৩২ সালে মওলানা ভাসানী বহিষ্কৃত হন। পরবর্তীতে ১৯৪৬ সালে তিনি কাগমারী পরগণা পুনরুদ্ধারে সক্ষম হন। ১৯৫৭ সালের ঐতিহাসিক কাগমারী সম্মেলনের মাধ্যমে তিনি সর্বপ্রথম এই পরগণার সন্তোষে একটি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ধারণা উত্থাপন করেন। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে তৎকালীন পাকিস্তানের পাঁচজন ভাইস-চ্যান্সেলরকে নিয়ে একটি বাস্তবায়ন পরিষদ গঠন করা হয়।
আদর্শের প্রশ্নে আপোষহীন মওলানা ভাসানী তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর প্রস্তাবিত ২৫ লক্ষ টাকার অনুদান গ্রহণ করেননি। একইভাবে ১৯৭০ সালে ইয়াহিয়া খানের এলএফও-সমর্থন শর্তযুক্ত প্রস্তাব এবং আহমদিয়া সংগঠনের সহযোগিতাও তিনি দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেন। সব ধরনের শর্ত ও আপস নাকচ করে ১৯৭০ সালের ৮ সেপ্টেম্বর তিনি নিজ উদ্যোগে আনুষ্ঠানিকভাবে সন্তোষ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্বোধন করেন।
১৯৭৪ সালের ১ ফেব্রুয়ারি 'সন্তোষ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়' -এর প্রাতিষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। চার স্তরে বিভক্ত শিক্ষা কাঠামোর আওতায় ১৯টি একাডেমি (অনুষদ) ও ৬০টি বিভাগ অনুমোদিত হয়, যার মধ্যে ৩০টি ছিল প্রত্যক্ষ বিজ্ঞানভিত্তিক। একই বছরের ২৭ জুলাই ১০০ জন শিক্ষার্থীর মধ্য থেকে নির্বাচিত ১৮ জনকে নিয়ে থিসিস কোর্স চালু করা হয়, যার উদ্বোধন করেন স্বয়ং মওলানা ভাসানী। পরবর্তীকালে তিনি এই স্বপ্নভূমিতে নিজ হাতে প্রায় ২৫টি প্রতিষ্ঠান ও ১২টি প্রকল্প গড়ে তোলেন।
মওলানা ভাসানী নিজে ছিলেন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর এবং ভাইস-চ্যান্সেলর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন প্রফেসর ড. মীর ফখরুজ্জামান। তিনি ওআইসির তৎকালীন মহাসচিব ড. করিম ঘাইকে চিঠি লিখে প্রস্তাবিত ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়টি সন্তোষে স্থাপনের আহ্বান জানান।
দুঃখজনকভাবে ১৯৭৬ সালের ১৭ নভেম্বর তাঁর ইন্তেকালের পর এই ঐতিহাসিক উদ্যোগ কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। ১৯৭৭ ও ১৯৭৮ সালে মওলানা ভাসানীর মাজার প্রাঙ্গণ এবং টাঙ্গাইলের জনসভায় শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, "সন্তোষে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় বাস্তবায়িত হবেই।" কিন্তু পরিতাপের বিষয়, আজ পর্যন্ত সেই ঘোষণা বাস্তবায়িত হয়নি। বরং তাঁর শাসনামলেই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শাহ আজিজুর রহমানের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়টি কুষ্টিয়ার শান্তিডাঙ্গায় স্থানান্তরিত হয়।
পরবর্তীতে ১৯৮৩ সালে রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ একই প্রতিশ্রুতি প্রদান করলেও তা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হন। যদিও ‘সন্তোষ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় বোর্ড অব ট্রাস্টিজ’ গঠনের মাধ্যমে একটি প্রাথমিক উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছিল, তা শেষ পর্যন্ত অসম্পূর্ণই থেকে যায়।
১৯৯৯ সালের ১২ অক্টোবর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সন্তোষ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন, যা ২০০১ সালে ৩৭ নম্বর আইন অনুযায়ী পূর্ণাঙ্গ রূপ লাভ করে।
পরবর্তীতে ২০০৫ সালে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও সন্তোষ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ট্রাস্টি বোর্ডের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। সেই চুক্তি অনুযায়ী ট্রাস্টি বোর্ডের সব সম্পদ ও দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে হস্তান্তর করা হলেও বাস্তবে প্রায় ২৫টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অন্তত ১২টিই বিলুপ্ত করা হয়, যা স্পষ্টতই চুক্তি লঙ্ঘনের শামিল।
ফলে মওলানা ভাসানীর মাজার, মসজিদ, মুসাফিরখানা, দরবার হলসহ তাঁর প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো তাঁর নিজস্ব দর্শন ও আদর্শ অনুযায়ী পরিচালিত হতে পারছে না। ‘বিশ্ববিদ্যালয় বনাম ভাসানীর প্রতিষ্ঠান’- এই কৃত্রিম বিভাজন সৃষ্টি করে তাঁর ঐতিহাসিক দর্শনকে আড়াল করা হয়েছে। আমরা মনে করি, এই ঐতিহাসিক অবিচার ও অবহেলা সংশোধন করা সময়ের দাবি।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনার পিতার দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সন্তোষ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এখনো বাস্তবায়নের অপেক্ষায়। এটি শুধু একটি দাবি নয়, বরং একটি নৈতিক দায়িত্ব। একইভাবে যমুনা সেতুর নামকরণসহ অন্যান্য ন্যায্য দাবিও দীর্ঘদিন ধরে উপেক্ষিত রয়েছে। আমরা বিশ্বাস করি, বর্তমান বাস্তবতায় তাঁর স্বপ্ন বাস্তবায়নের মাধ্যমে একটি ন্যায়ভিত্তিক, বৈষম্যহীন ও মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা যাবে।
আপনার সন্তোষ আগমন উপলক্ষে যদি আপনি এ বিষয়ে একটি সুস্পষ্ট ও দৃঢ় প্রতিশ্রুতি প্রদান করেন, তবে তা জাতীয় ঐক্য ও সংহতির পথে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে।
আমরা এমন একটি বাংলাদেশ দেখতে চাই, যেখানে দেশের সকল মহান ব্যক্তিত্ব যথাযোগ্য মর্যাদা পাবে এবং জনগণের অধিকার নিশ্চিত হবে।
মহান আল্লাহ আপনার সহায় হোন।
শুভেচ্ছান্তে,
আজাদ খান ভাসানী
সদস্য সচিব, ভাসানী পরিষদ।”