১৯৭১ সালের এই দিনে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী মওলানা ভাসানীর সন্তোষের বসতবাড়ি, ইসলামী বিশ্বিবদ্যালয়ের জন্য নির্মিত ও নির্মানাধীন গৃহাদী ও দরবার হল পুড়িয়ে দেয়।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাত্রি দ্বিপ্রহরে পাকিস্তানি হানাদাররা সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে নিরীহ নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর। আক্রমণ করে আধাসামরিক বাহিনীর সদর দপ্তর পিলখানা, পুলিশ সদর দপ্তর রাজারবাগ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোতে।
এর মধ্য দিয়েই ২৬ মার্চ শুরু হয় প্রতিরোধ ও স্বাধীনতা যুদ্ধ। এই যুদ্ধে ইয়াহিয়া-টিক্কা বাহিনীর একটি প্রধান আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু ছিল টাঙ্গাইল, বিশেষত সন্তোষ। ৩ এপ্রিল তারা টাঙ্গাইলে এবং ৪ এপ্রিল মওলানা ভাসানীর খোঁজে সন্তোষে প্রবেশ করে। সেখানে তাঁকে না পেয়ে তারা তাঁর বসতবাড়ি এবং ইসলামী বিশ্বিবদ্যালয়ের জন্য নির্মিত ও নির্মানাধীন গৃহাদীতে আগুন ধরিয়ে দেয়। মুহুর্তেই ছাঁই হয়ে যায় তাঁর স্বপ্নের ক্যাম্পাস, বসতবাড়ি। পুড়ে যায় সম্রাট আওরঙ্গজেবের হাতে লেখা কোরআন শরীফসহ অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ দলিল-দস্তাবেজ। এরপর তারা পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয় তাঁর প্রিয় সন্তোষ দরবার হলে। কিন্তু অলৌকিকভাবে কিছুক্ষণের মধ্যে তা নিভে যায়। ৫ এপ্রিলও হানাদার বাহিনী সন্তোষ ও এর আশপাশ অঞ্চলে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ ও অগ্নিসংযোগ চালিয়ে যায়। এই হামলায় নেতৃত্ব দেয় তাঁরই প্রতিষ্ঠিত মওলানা মুহম্মদ আলী কলেজের অধ্যাপক টাঙ্গাইল জামাতে ইসলামীর সভাপতি আবদুল খালেক।
অতপরঃ সন্তোষে মওলানা ভাসানীকে না পেয়ে ৬ এপ্রিল রোজ মঙ্গলবার বর্বর হানাদাররা মাইল দু'য়েক পশ্চিমে বিন্যাফৈর গ্রামে প্রবেশ করে। গ্রামটিকে হানাদার বাহিনী চতুর্দিক থেকে ঘিরে ফেলে এলোপাথাড়ি গোলাগুলি শুরু করলে গ্রামবাসী দিক-বিদিক ছুটে পালাচ্ছিল। এই অপারেশনে নেতৃত্ব দিচ্ছিল একজন মেজর ও দু’জন ক্যাপ্টেন; সাথে ছিল কথিত দালাল আকালু মণ্ডল। এসময় তারা সাথে করে একটি মিলিটারী এ্যামবুলেন্সও নিয়ে এসেছিল। তাদের ভাষায় কাফের ভাসানীর আহত দেহ কিংবা লাশ এই এ্যামবুলেন্সে করে টিক্কা খানের কাছে পাঠাতে হবে। পাগলা কুকুরের ন্যায় গ্রামবাসী, বৃদ্ধ, যুবক যাকেই তারা সামনে পেল বেদম মারধর শুরু করলো। তবুও কেউ মুখ খুললো না হুজুর ভাসানী কোথায় আছেন।
এদিকে মওলানা ভাসানী হানাদার বাহিনীর বিন্যাফৈর উপস্থিতি টের পেয়ে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে প্রথমে বাড়ির উত্তর দিকের পুকুর পাড়ে অবস্থান নেন এবং পরবর্তীতে গান-পয়েন্টে এগিয়ে আসা হানাদারদের পাশ দিয়ে চাঁদর মুড়ি হয়ে হাটুরে জনতার সাথে মিশে পশ্চিম দিকে চলে যান। এর আগে তিনি বিন্যাফৈরে তাঁর কিছু রাজনৈতিক কর্মীদের সঙ্গে গোপন বৈঠক করছিলেন। তাদের উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, "জনবল আছে, শুধু অস্ত্র চাই।" বিন্যাফৈর ত্যাগের সময়ও তিনি বলেছিলেন, "কাপুরুষের মত ধরা পড়লে চলবে না, কাজ করতে হবে।”
মওলানা ভাসানীকে বাড়িতে না পেয়ে ওরা ক্ষুব্ধ হয়ে স্ট্রেচার বুলেট দিয়ে দূর থেকে আগুন ধরিয়ে দেয়। কার্যত এখানে একটা একতরফা যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। মওলানা ভাসানী আক্রান্ত হয়েছিলেন এবং প্রত্যুৎপন্নমতিত্বে ছদ্মবেশে তা মোকাবেলা করে যমুনার চরের দিকে চলে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে সিরাজগঞ্জ হয়ে নৌকাযোগে ধলেশ্বরী-যমুনা হয়ে রৌমারীর নামাজের চর সীমান্ত দিয়ে তিনি ১৫-১৬ এপ্রিল ভারতে প্রবেশ করেন।
আজাদ খান ভাসানী।