তিস্তার কান্না আর কতকাল? - নজরুল ইসলাম হক্কানী
‘ওইটা মোর ভিটা না, মোর কলিজা ভাঙছে।’এটি কোনো সাহিত্যিক উপমা নয়; এটি রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার নোহালী ইউনিয়নের কাচারীপাড়া গ্রামের মোতালেব মিয়ার বুকফাটা আর্তনাদ। ২২ জুলাই তাঁর চোখের সামনে তিস্তার গর্ভে বিলীন হয়ে যায় ৯ কক্ষবিশিষ্ট পাকা বাড়িটির শেষ চিহ্ন। ২০০৮ সালে প্রায় ১৪ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত সেই বাড়ির আজ আর কোনো অস্তিত্ব নেই। নদীর দিকে তাকিয়ে তাঁর উপলব্ধি ভাঙছে শুধু মাটি নয়, ভেঙে যাচ্ছে জীবনের সমস্ত সঞ্চয়, স্মৃতি ও স্বপ্ন।
পাশেই বৃদ্ধা সুলতানা বেগম। ৩৫ বছরের সংসারজীবনে অন্তত দশবার তিস্তার ভাঙনের শিকার হয়েছেন তিনি। নদীগর্ভে হারিয়েছেন ৪০ বিঘারও বেশি কৃষিজমি। দশ বছর আগে শেষ সম্বল দিয়ে কাচারীপাড়ায় নতুন করে ঘর তুলেছিলেন। আজ সেই ভিটাও তিস্তার বুকে বিলীন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তাঁর প্রশ্ন এখন কোথায় যাম, কী করিম?’
এই প্রশ্ন শুধু সুলতানা বেগমের নয়; এটি তিস্তা তীরের লাখো মানুষের প্রশ্ন। কুড়িগ্রামের বিদ্যানন্দ, গতিয়াশাম, বুড়িরহাট, উলিপুরের থেতরাই, গোরাইপিয়ার, দলদলিয়া ও বজরা; লালমনিরহাটের মহিষখোঁচা, রাজপুর ও হাতীবান্ধা; নীলফামারীর ডিমলার ছাতুনামা, কেল্লাপাড়া, ভেন্ডাবাড়ী ও ঝুনাগাছ; রংপুরের গঙ্গাচড়া, কাউনিয়া ও পীরগাছা; গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ তিস্তার দুই তীরজুড়ে বিস্তৃত জনপদের মানুষ বছরের পর বছর একই দুর্ভোগের ভার বহন করছে। দেড় যুগেরও বেশি সময় ধরে এই কান্না থামেনি। এটি কেবল নদীভাঙনের গল্প নয়; এটি উত্তরাঞ্চলের দীর্ঘদিনের উন্নয়ন-বৈষম্যের নির্মম দলিল।
প্রতি বর্ষায় একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি ঘটে। আগে বন্যা, পরে পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় ভয়াবহ নদীভাঙন। বিপৎসীমার নিচে নেমে যাওয়া নদীর পানিও তখন প্রচণ্ড স্রোতে মুহূর্তের মধ্যে শত শত ফুট নদীতীর গ্রাস করে। কয়েক মিনিটেই বিলীন হয়ে যায় মানুষের আজীবনের সঞ্চয়। এরপর প্রশাসনের তৎপরতা, ক্ষয়ক্ষতির তালিকা, কিছু জিও ব্যাগ, কিছু ত্রাণসামগ্রী, কয়েকটি আশ্বাস সবই আসে। সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম বদলে যায়, কিন্তু তিস্তার পাড়ের মানুষের ভাগ্য বদলায় না।
আজ শুধু গঙ্গাচড়ার কাচারীপাড়া নয়; তিস্তার দুই তীরজুড়ে অন্তত ৩০টি স্থানে ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। হাজার হাজার পরিবার চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। কেউ আগেভাগেই ঘরের টিন, দরজা-জানালা খুলে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে রাখছেন, কেউ ইট-কাঠ সরিয়ে নিচ্ছেন, আবার কেউ খোলা আকাশের নিচে বসে অপেক্ষা করছেন পরবর্তী ধসটি কখন তাদের শেষ আশ্রয়টুকুও কেড়ে নেবে।
প্রশ্ন হলো আর কত বছর আমরা এই একই চক্রের পুনরাবৃত্তি দেখব?
বাস্তবতা হলো, ২০০ বা ৪০০ জিও ব্যাগ, বাঁশের বান্ডাল কিংবা জরুরি ত্রাণ দিয়ে তিস্তার সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। এগুলো সাময়িক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে, কিন্তু নদীর দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার স্থায়ী সমাধান দিতে পারে না। তিস্তার সংকটের মূল কারণ কেবল নদীভাঙন নয়। নাব্যতা হ্রাস, অনিয়ন্ত্রিত পলি জমা, নদীর গতিপথের পরিবর্তন, অপরিকল্পিত নদী ব্যবস্থাপনা এবং সমন্বিত পরিকল্পনার অভাব সব মিলিয়ে পরিস্থিতি দিন দিন জটিল হয়েছে। ফলে বিচ্ছিন্ন প্রকল্প বা তাৎক্ষণিক উদ্যোগ দিয়ে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।
এ কারণেই দীর্ঘদিন ধরে তিস্তা অববাহিকার মানুষের একটিই দাবি মহাপরিকল্পনার দ্রুত বাস্তবায়ন।
তিস্তা মহাপরিকল্পনা কেবল একটি নদীশাসন প্রকল্প নয়; এটি উত্তরাঞ্চলের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের একটি কৌশলগত পরিকল্পনা। নদীর বৈজ্ঞানিক পুনর্বিন্যাস, পরিকল্পিত ড্রেজিং, স্থায়ী তীর সংরক্ষণ, জলাধার নির্মাণ, আধুনিক সেচব্যবস্থা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশ পুনরুদ্ধার এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে কৃষি উৎপাদন বাড়বে, সেচের সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলা সহজ হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে দুর্যোগ মোকাবিলায় রাষ্ট্রের ব্যয়ও কমে আসবে। অর্থাৎ এটি কেবল ব্যয়ের প্রকল্প নয়; বরং জাতীয় অর্থনীতি, খাদ্যনিরাপত্তা ও টেকসই উন্নয়নের একটি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ।
দুঃখজনক হলেও সত্য, এক যুগেরও বেশি সময় ধরে এই প্রকল্প নানা প্রতিশ্রুতির মধ্যে আটকে আছে। সরকার বদলেছে, আশ্বাস বদলেছে, কিন্তু বাস্তবায়ন শুরু হয়নি। সর্বশেষ সরকারও ঘোষণা দিয়েছে ‘যে কোনো মূল্যে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে।’ কিন্তু তিস্তা তীরের মানুষ এখন আর প্রতিশ্রুতি শুনতে চায় না; তারা বাস্তব কাজ দেখতে চায়।
একটি মৌলিক প্রশ্ন রাষ্ট্রের কাছে আজও রয়ে গেছে যে গ্রাম নদীর গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে, সেটি কি ত্রাণ দিয়ে ফিরিয়ে আনা সম্ভব? পূর্বপুরুষের কবর, কৃষিজমি, ফলের বাগান, বসতভিটার ক্ষতি কি কয়েক বান্ডিল টিন কিংবা কিছু শুকনো খাবার দিয়ে পূরণ করা যায়?
উত্তর একটাই না।
তিস্তা অববাহিকার মানুষ শুধু নিজেদের জীবিকার জন্য নয়, দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। উত্তরাঞ্চলের কৃষি উৎপাদন জাতীয় অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। অথচ উন্নয়নের বড় বড় প্রকল্পে এই অঞ্চল বারবার উপেক্ষিত হয়েছে। ফলে তিস্তার সংকট আজ শুধু নদীভাঙনের সমস্যা নয়; এটি আঞ্চলিক বৈষম্য, ন্যায্য উন্নয়ন এবং রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতার প্রশ্ন।
তিস্তা তাই কেবল একটি নদীর নাম নয়; এটি বাংলাদেশের জলসম্পদ নিরাপত্তা, কৃষি অর্থনীতি, পরিবেশ সুরক্ষা এবং আঞ্চলিক ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি। যেসব দেশ নদীকে দুর্যোগ হিসেবে নয়, উন্নয়নের সম্পদ হিসেবে পরিকল্পিতভাবে ব্যবস্থাপনা করেছে, তারা কৃষি, শিল্প ও আঞ্চলিক অর্থনীতিতে টেকসই সাফল্য অর্জন করেছে। বাংলাদেশের জন্যও তিস্তা সেই সম্ভাবনার অন্যতম বড় ক্ষেত্র হতে পারে। প্রয়োজন কেবল রাজনৈতিক সদিচ্ছা, বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা এবং দ্রুত বাস্তবায়নের দৃঢ় অঙ্গীকার।
এখন সরকারের সামনে তিনটি জরুরি করণীয়। প্রথমত, নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর নিরাপদ ও টেকসই পুনর্বাসন নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়ত, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর কার্যকর নদীশাসন ও তীর সংরক্ষণ দ্রুত বাস্তবায়ন করা। তৃতীয়ত, আর কোনো বিলম্ব না করে তিস্তা মহাপরিকল্পনার প্রথম পর্যায়ের কাজ শুরু করা।
প্রতিটি বর্ষায় একই কান্না, একই প্রতিশ্রুতি আর একই ত্রাণের পুনরাবৃত্তি চলতে পারে না। মোতালেব মিয়ার ‘কলিজা ভাঙার’ আর্তনাদ কিংবা সুলতানা বেগমের অসহায় প্রশ্ন কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়; এগুলো রাষ্ট্রের কাছে এক কঠিন জবাবদিহির প্রশ্ন।
তিস্তার পাড়ের মানুষ রিলিফ চায় না, ভিক্ষাও চায় না। তারা চায় বেঁচে থাকার অধিকার, নিরাপদ বসতি, বৈজ্ঞানিক নদী ব্যবস্থাপনা এবং উন্নয়নের সমান সুযোগ।
তিস্তার কান্না থামানোর সময় এখনই। কারণ প্রতিটি বিলম্ব মানে আরেকটি গ্রাম নদীগর্ভে হারিয়ে যাওয়া, আরেকটি পরিবারের স্বপ্ন ভেঙে পড়া এবং আরেকটি শিশুর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়া। রাষ্ট্রের উন্নয়নের প্রকৃত মানদণ্ড রাজধানীর উঁচু ভবন নয়; বরং কাচারীপাড়ার মতো তিস্তা তীরের মানুষ কতটা নিরাপদে নিজেদের ভিটেমাটিতে বসবাস করতে পারছে সেটিই একটি রাষ্ট্রের মানবিকতা, ন্যায়বিচার এবং উন্নয়নদর্শনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।