বাংলাদেশের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের চাপ দ্রুত বাড়ছে—এমন সতর্কবার্তা দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। তাদের নতুন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ার যেসব দেশ জলবায়ু–ঝুঁকিতে সবচেয়ে বেশি, বাংলাদেশের অবস্থান সবার আগে। আগামী দশকে এই অঞ্চলের বিপুল সংখ্যক মানুষ চরম তাপমাত্রা আর ভয়াবহ বন্যার ঝুঁকিতে পড়বে। উপকূলজুড়ে বাড়তে থাকা লবণাক্ততা ইতিমধ্যে দেশের লাখো মানুষের জীবিকা কঠিন করে তুলেছে।
সোমবার (২৪ নভেম্বর) প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ অ্যান্ড আদার সাউথ এশিয়ান কান্ট্রিজ: ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স উইল বি প্রাইভেট সেক্টর লেড’ শীর্ষক প্রতিবেদনে সংস্থাটি বলছে, পরিবার ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানই এখন জলবায়ু অভিযোজনের মূল ভার বহন করছে। জরিপে দেখা গেছে, দক্ষিণ এশিয়ার তিন ভাগের দুইয়ের মতো পরিবার ও প্রতিষ্ঠান আগামী ১০ বছরের ভেতর কোনো না কোনো আবহাওজনিত ধাক্কা আসবে বলে ধরে নিচ্ছে। যদিও অনেকে ইতিমধ্যে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে, তবু বেশিরভাগ উদ্যোগই সীমিত এবং কম খরচের সমাধান।
উপকূলের ২৫০টি গ্রাম নিয়ে করা এক জরিপে দেখা যায়, দুর্যোগ–সুরক্ষা অবকাঠামো এখানকার সবচেয়ে বড় অমেট চাহিদা। দীর্ঘমেয়াদে ৫৭ শতাংশ পরিবার জানায়, যথেষ্ট নিরাপদ কাঠামো না থাকায় তারা ঝুঁকির মধ্যে বসবাস করছে। আরও ৫৬ শতাংশ পরিবার মনে করে, অভিযোজনের জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক সক্ষমতাই তাদের নেই। প্রতিবেদনে বলা হয়, এই সংকট পরিবেশগত ঝুঁকির পাশাপাশি মানুষের জীবন, আয়-রোজগার এবং বিশেষ করে দরিদ্র কৃষিভিত্তিক পরিবারকে সবচেয়ে বেশি আঘাত করছে।
বিশ্বব্যাংক জানায়, বাঁধ নির্মাণ, সাইক্লোন শেল্টার ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি অতীতে অনেক প্রাণ বাঁচিয়েছে। তবে সরকারি বাজেট সংকুচিত হয়ে আসায় বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ সহজ করা এখন জরুরি। তাদের ভাষায়, উপযুক্ত নীতিগত সহায়তা পেলে বেসরকারি খাত জলবায়ু অভিযোজনকে বড় পরিসরে এগিয়ে নিতে পারে।
সংস্থার বাংলাদেশ ও ভুটানবিষয়ক পরিচালক জ্যঁ পেসমে বলেন, দেশের স্থিতিস্থাপকতা বারবার নতুন চ্যালেঞ্জে পড়ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, সামাজিক সুরক্ষা জোরদারকরণ, জলবায়ু–স্মার্ট কৃষি, অভিযোজন অর্থায়ন এবং শহর এলাকায় লক্ষ্যভিত্তিক বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন।
প্রতিবেদনের সুপারিশে বলা হয়েছে, অভিযোজন কার্যকর করতে বহুমুখী ও সমন্বিত উদ্যোগ দরকার। আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানো, বীমা ও আনুষ্ঠানিক ঋণের সুযোগ বিস্তৃত করা এবং বিনিয়োগকে ঝুঁকিপ্রবণ অঞ্চল থেকে দূরে সরানো গেলে জলবায়ু–সম্পর্কিত সম্ভাব্য ক্ষতির বড় অংশই এড়ানো সম্ভব। পাশাপাশি পরিবহন ও ডিজিটাল নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করা এবং দরিদ্র মানুষের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা বাড়ানো হলে অভিযোজন আরও সহজ হবে।
সহ–লেখক সিদ্ধার্থ শর্মা মনে করেন, বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা যেমন শিক্ষণীয়, তেমনি বড় পরীক্ষারও নাম। মানুষ ও প্রতিষ্ঠান নিজেদের মতো করে অভিযোজন করছে, কিন্তু জটিল ও বিস্তৃত সংকট সামাল দিতে সরকারি ও বেসরকারি খাতের শক্তিশালী যৌথ উদ্যোগ প্রয়োজন।
প্রতিবেদনটির শেষ অংশে বলা হয়, বাংলাদেশ ইতিমধ্যে দুর্যোগে প্রাণহানি কমানোর দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে। লক্ষ্যভিত্তিক বিনিয়োগ ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান দেখিয়েছে, স্থানীয় মানুষের অভিযোজন ক্ষমতা কীভাবে দ্রুত বৃদ্ধি পেতে পারে। সরকার, বেসরকারি খাত এবং স্থানীয় কমিউনিটি একসঙ্গে কাজ করতে পারলে জলবায়ু–স্মার্ট সমাধান দেশজুড়ে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব—যা শুধু ঝুঁকি কমাবে না, টেকসই উন্নয়নকেও আরও শক্তিশালী করবে।