হাতীবান্ধায় বাতাসে নড়ে সরকারি ঘর
স্টাফ রিপোর্টার, হাতীবান্ধা: লামনিরহাটের হাতীবান্ধায় নিন্মমানের সামগ্রী দিয়ে ‘দুর্যোগ সহনীয় ইটের ঘর’ তৈরি করা হয়েছে। আর তাই একটু বাতাস হলেই ঘর নড়ে। যেকোন সময় ভেঙে পড়তে পাড়ে।
এই ‘ঘর’ বানাতে গিয়ে যেন দুর্নীতির সব পথেই হেঁটেছেন প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। অভিযোগ উঠেছে, কোটি টাকার এ প্রকল্পের অর্ধেকটাই লোপাট হয়েছে।
এই প্রকল্প দেখাশোনা করার জন্য কাগজে-কলমে বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের সভাপতি করে এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। কিন্তু বাস্তবে এই কমিটির কেউই মাঠে ছিলেন না।
নিয়ম রয়েছে, সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি পিআইসির মাধ্যমে সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে এ ঘরগুলো নির্মাণ করবে। কিন্তু প্রকল্পের নকশা ডিজাইনের তোয়াক্কা না করে গৃহহীন মানুষের টাকা আত্মসাৎ করার লক্ষ্যে নিজেদের ইচ্ছামতো নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে ঘর তৈরি করা হয়েছে।
জানাগেছে, ‘যার জমি আছে ঘর নেই, তার নিজ জমিতে গৃহ নির্মাণ’ প্রকল্পের মোড়কে গৃহহীনদের জন্য সরকারের উপহার ‘দুর্যোগ সহনীয় ইটের ঘর’। লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলা ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অফিস সূত্রে জানা যায়, ২০১৯-২০ অর্থবছরে গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ (টিআর) ও ‘যার জমি আছে ঘর নেই’ প্রকল্পের আওতায় দুর্যোগ সহনীয় বাসগৃহ নির্মাণ প্রকল্পে ১২২টি ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়।ঘরের বরাদ্দ ছিল প্রতিটি দুই লাখ ৯৯ হাজার টাকা।
নকশা অনুযায়ী, ২লাখ ৯৯হাজার টাকা বরাদ্দের দুই কক্ষের প্রতিটি ঘর তৈরি করার কথা ২০ ফুট লম্বা ও আট ফুট প্রস্থের। চারদিকে ইটের দেয়াল আর ওপরে ৪৬ মিলিমিটার রঙিন ঢেউটিন দিয়ে ছাউনি করার কথা। ঘরের ছাউনির কাজে শাল, গর্জন, জারুল, কড়ই, শিশু, তাল, পিতরাজ, দেবদারু বা আকাশমনি কাঠ ব্যবহার করার নির্দেশনা আছে। ঘরের মেঝেতে ইটের সোলিংয়ের ওপরে তিন ইঞ্চি সিসি ঢালাই দেওয়ার কথা। রান্নাঘর ও শৌচাগার করার কথা ১৩ ফুট। কিন্তু বাস্তবে এসব নিয়মের কোনোটাই মানা হয়নি।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ঘর নির্মাণে নিম্নমানের ইট, বালু, টিন, কাঠ, বাঁশ ও রড ব্যবহার করা হয়েছে। মানা হয়নি ঘরের নকশা। এই ঘরে যারা বাস করছে তারা যেমন নাখোশ, তেমনি এলাকার মানুষজন এমন দুর্নীতিকান্ডে ক্ষুব্ধ।
স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ, ২৭৫ বর্গফুটের ঘর নির্মাণে ১ নম্বর ইটের বদলে ব্যবহার করা হয়েছে ২ থেকে ৩ নম্বর ইট। ০.৩৬ এমএমের বদলে ব্যবহার করা হয়েছে ০.৩২ এমএমের ঢেউটিন। নকশায় ফাউন্ডেশন ঢালাইয়ের কথা থাকলেও তা করা হয়নি। মেঝে ও পিলারে ব্যবহার করা হয়েছে একেবারেই নিম্নমানের ইটের খোয়া। এ কারণে ঘরের মেঝে ও দেয়ালে দেখা দিয়েছে ফাটল। মাত্র তিনটি রডে বানানো হয়েছে পিলার। ছয়টির বদলে জানালা হয়েছে দুটি। ঘরের বেড়া ও চালে ব্যবহার করা হয়েছে কম দামি কাঠ ও বাঁশ। আর বালু, তারকাঁটা, পেরেক, তার, কবজা, ছিটকিনি, স্ক্রু, ওয়াশার, মেঝের রঙের সব কিছুই নেওয়া হয়েছে উপকারভোগীর কাছ থেকে। প্রতিটি ঘরের ভিত দেওয়া হয়েছে খুবই কম। এ কারণে একটু বাতাস হলেই ঘর নড়ে। যেকোন সময় ভেঙে পড়তে পাড়ে। ঘর নির্মাণের সময় শ্রমিকদের দুপুরের খাবারও খাওয়াতে হয়েছে উপকারভোগীদের। অনেকে আবার টাকা ঘুষ দিয়ে এই ঘর বরাদ্দ নিয়েছেন।
ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন, সরকারি এসব ঘর বরাদ্দ নিতে তাদের কাছ থেকে ঘর নির্মাণের জায়গায় মাটি ও বালু ভরাটের কথা বলে পাঁচ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ঘরের প্লাস্টার ও দরজা-জানালা ভুক্তভোগীরা নিজেরাই লাগিয়ে নিয়েছেন। বেশির ভাগ ঘরের শৌচাগারের কাজ শেষও করা হয়নি।
নিম্নমানের ঘর নির্মাণের ব্যাপারে একাধিক সুবিধাভোগীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এসব নিয়ে কারোর সঙ্গে কথা না বলার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে তাঁদের।
জানা গেছে, মূলত কমিশন লেনদেনের মাধ্যমে এই ফেরদৌস আহমেদ তাঁর নিজস্ব লোক ও মিস্ত্রি দিয়ে প্রকল্পের প্রতিটি কাজ করেছেন। শুধু তাই নয় টাকার বিনিময় নিয়ম নীতির তোয়াক্তা না করে পছন্দের লোকজনদের ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়ে। এর ফলে সরকারি খাস জমি ও রেলওয়ের খাস জমিতে অনেক ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে হাতীবান্ধা উপজেলা ত্রাণ ও দুর্যোগ প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) ফেরদৌস আহমেদ বলেন, নকশা অনুযায়ী ঘর তৈরি করা হয়েছে। ঘরগুলো এখনো হস্তান্তর করা হয়নি।
এ বিষয়ে হাতীবান্ধা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সামিউল আমিন বলেন, বিষয়টি আমার জানা নেই। অনেক আগে ঘর হস্তাান্তর করা হয়েছে।
এক নজরে- এর অন্যান্য খবর