তিস্তা নদীর সার্বিক ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প বাস্তবায়ন জরুরী
স্টাফ রিপোর্টার: মহান মুক্তিযুদ্ধের গৌরবদীপ্ত রংপুরাঞ্চল। অথচ স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর দ্বারপ্রাপ্তে দাঁড়িয়ে কুড়িগ্রাম জেলার ৭১% ও লালমনিরহাট জেলার ৫৬% মানুষ দরিদ্র। এই দারিদ্রতার অন্যতম কারণ হচ্ছে প্রতি বছর নদী-ভাঙ্গন, নাব্যতা হ্রাস, কর্মসংস্থানের অভাব। বর্ষা মৌসুমে ব্যাপক বন্যা ও ভাঙ্গন, শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাব। বন্যায় লাখ লাখ মানুষ পানিবন্দী হয়। ভাঙ্গনের ফলে ঘরবাড়ী, ভিটা-মাটি নদী গর্ভে চলে যায়। নদীর পাড়ের এককালে স্বচ্ছল পরিবারের মানুষগুলো সবকিছু হারিয়ে ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরের মুঠে মজুর, কুলি, শ্রমিক, গৃহকর্মী, রিক্সা চালক, জাহাজ ভাঙ্গা শ্রমিক, ইট ভাটার শ্রমিকসহ নানা পেশায় নিয়োজিত হয়ে বস্তিতে কিংবা ফুটপাতের ঝুপড়িতে বসবাস করতে বাধ্য হয়। দুর্বিষহ এদের জীবন। এরা মৌলিক ও মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত।
নদী ভাঙ্গনে এই নিঃস্ব পরিবারের সন্তানদের অনেকেই টোকাই, অনেকেই আবার ঢাকা, চট্রগ্রাম, খুলনাসহ বিভিন্ন শহরে বাসাবাড়িতে ঝি চাকরানীর কাজ করে। মেয়ে শিশুরা দু’মুঠো ভাত ও বস্ত্রের জন্য অন্যের বাসা বাড়ীতে ক্ষুদে ঝি ও চাকরানীর কাজ করে। গৃহকর্তী কর্তৃক নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়। রাতে বাসায় করি ডোরে ঘুমায়, প্রতিনিয়ত মার, ডাং, গালি-গুপ্তা, গরম ছেকা সহ্য করে। যৌন হয়রানীসহ নানা রুপ নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হয়। অনেকেই হত্যাকান্ডের শিকার হয়। বিচার পায় না, এমনকি লাশও পায় না। এ সকল অসহায় মানুষগুলো কপালের দোষ দিয়ে মহান আল্লাহ পাকের কাছে হাত তুলে অশ্রু ঝড়ায়। রোনাজারি করে। গৃহকর্তী তিস্তার ভাঙ্গনে ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারের ক্ষুদে চাকরানী হাতে দিয়েছে পানির গ্লাস। অপর দিকে তার শিশু সন্তানকে দিয়েছে দুধের গ্লাস। ক্ষুদে চাকরানী দুধের পরিবর্তে পানি পান করে অভিনয় করে গৃহকর্তীর সন্তানকে বলছে, আপু আমি দুধ পান করছি, তুমিও দুধ পান করো। ক্ষুদে চাকরানী পানি পান শেষ। গৃহকর্তীর সন্তানের দুধ পান শেষ। শিশুর প্রতি কি নির্মম বৈষম্য। এটি উত্তরাঞ্চলের মানুষকে যুগ যুগ ধরে নিরবে নিভৃতে মেনে চলতে হচ্ছে। অথচ এই বৈষম্যের জন্য পাকিস্তানদের বিরুদ্ধে বাংগালী জাতির সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ। ৩০ লক্ষ মানুষের আত্মহুতি, ২ লক্ষ নারীর সম্ভ্রমহানী ও অপরিসীম ত্যাগ-তিতিক্ষায় অর্জিত স্বাধীনতা।  
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৯ সালের জুলাই মাসে চীন সফর করেন। সে সময় বাংলাদেশে আগত রোহিঙ্গা স্মরণার্থীদের মায়ানমারে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে আলোচনার পাশাপাশি ডেল্টাপ্লান ২১০০, ক্লাইমেট  অ্যাডপটেশন সেন্টার প্রতিষ্ঠা ও তিস্তা রিভার ম্যানেজমেন্ট এন্ড রেস্টোরেশন প্রজেক্ট বাস্তবায়নে চীন সরকারের সহযোগিতা কামনা করেন। চীন সরকার প্রধানমন্ত্রীর আহবানে সারা দিয়ে চীনের একটি কোম্পানীকে দিয়ে তিস্তা নদী সার্বিক ব্যবস্থাপনা পুনরুদ্ধার প্রকাল্পের সামব্যতা যাচাই পূর্বক একটি প্রতিবেদন সরকারের নিকট দাখিল করেন। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১০ হাজার ৫শ’ কোটি টাকা। চীন সরকার এই প্রকল্পে ঋণ দেয়ারও প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন। এই প্রকল্পের আওতায় তিস্তা নদী গর্ভে ড্রেজিং, পাড় সংস্কার ও বাঁধানো এবং ভূমি উদ্ধার ও বাঁধ মেরমাত করা হবে। নদী ড্রেজিং ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ গ্রীষ্মকালে পানি সংকট দূর  ও নদী ভাঙ্গন প্রতিরোধ হবে। বর্তমানে তিস্তা নদীর পার্শ্বের বিস্তৃতি অর্থাৎ চওড়ার দিক থেকে ৫ থেকে ১০ কিলোমিটার। নদী ড্রেজিংয়ের ফলে তিস্তা নদীর পার্শ্বের বিস্তৃতি অর্থাৎ চওড়া দুই থেকে আড়াই কিলোমিটারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে। ফলে তিস্তার দু’ধারে হাজার হেক্টর জমি উদ্ধার হবে। তিস্তা থেকে সৃষ্ট শাখা নদী ও অন্যান্য নদীগুলোতে ড্রেজিং ও পাড় নির্মান করে পানি প্রবাহ সঠিক রাখা ও কৃষিকাজে ভূগর্ভস্থ পানির পরিবর্তে  নদীর পানি ব্যবহার করা হবে।
পুনরুদ্ধারকৃত জমিতে আধুনিক চাষাবাদ সহ অর্থনৈতিক জোন গড়ে তোলা, পর্যটন কেন্দ্র নির্মান ও শিল্পকারখানা গড়ে তোলা হবে। ইতিমধ্যে জাপান তিস্তা তীরবর্তী এলাকার শিল্প কারখানা গড়ে তোলার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এতে হাজার হাজার যুবক ও যুব মহিলার কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। ভূমিহীন ব্যক্তিরাও পুর্নবাসিত হবে। তিস্তা নদীতে নৌযান চলাচল করবে। কৃষি উৎপাদন, কৃষি পণ্যের বাজারজাত করন ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে বৈপ্লাবিক পরিবর্তন আসবে। এই প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে রংপুর বিভাগের ৫টি জেলার ২ কোটি মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে উপকৃত হবে। তাছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট খরা, বন্যা,নদীভাঙ্গন, অতিবৃষ্টি, দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা, উষ্ণতা, তাপপ্রবাহ, মরুভূমিকরনসহ বহুবিধ সমস্যা থেকে উত্তরাঞ্চল তথা সারা দেশ উপকৃত হবে।
পরবর্তীতে এই প্রকল্পের সুফলকে কাজে লাগিয়ে দেশের অন্যান্য দেশের অন্যান্য বড় বড় নদীগুলোতে অনুরুপ প্রকল্প গ্রহণ করা সম্ভব হবে। সর্বপরি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বপ্নের তিস্তা মহাপরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়নের মাধ্যমে উত্তরাঞ্চলের মানুষের দুঃখ-দূর্দশা লাঘব করে তিনি চীরস্মরনীয় হয়ে থাকবেন।   
তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদের পক্ষে তিস্তা নদীর ব্যবস্থাপনায় মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করায় প্রধানমন্ত্রীকে অভিভন্দন  জানিয়ে তিস্তা নদী সার্বিক ব্যবস্থাপনা ও পুনঃরুদ্ধার প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন, ক্ষতিগ্রস্থদের ক্ষতিপূরণ, পুনঃবার্সন এবং তিস্তা তীরবর্তী কর্মহীনদের জন্য প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক জোন ও শিল্প কারখানায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কর্মসংস্থানের দাবীতে ২০২০ সালে ১ নভেম্বর তিস্তা নদীর বাম ও ডান তীরে দু’শত ৩০ কিলোমিটারে ৮৫টি এলাকায় লক্ষাধিক মানুষ মানববন্ধনে অংশ নেয়।
তাছাড়াও তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদের ৬ দফা দাবী বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রী বরাবরে গণস্বাক্ষরতা অভিযান শুরু হয়েছে। ৬ দফা দাবীসমূহে রয়েছে ১। তিস্তা নদী সুরক্ষায় ‘মহাপরিকল্পনা’ দ্রুত বাস্তবায়ন। অভিন্ন নদী হিসেবে ভারতের সঙ্গে ন্যায্য হিস্যার ভিত্তিতে তিস্তা চুক্তি সম্পন্ন, তিস্তা নদীতে সারা বছর পানির প্রবাহ ঠিক রাখতে জলাধার নির্মাণ ২। তিস্তার ভাঙন, বন্যা ও খরায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের স্বার্থ সংরক্ষণ ৩। ভাঙনের শিকার, ভূমিহীন ও গৃহহীনদের পুনর্বাসন ৪। তিস্তা নদী সুরক্ষায় বিজ্ঞাপনসম্মত খনন, মহাপরিকল্পনায় তিস্তা নদী ও তিস্তা তীরবর্র্তী কৃষকের স্বার্থ সুরক্ষায় ‘কৃষক সমবায় এবং কৃষিভিত্তিক শিল্প কারখানা গড়ে তোলা’। ৫। তিস্তা নদীর শাখা-প্রশাখা ও উপ শাখাগুলোর সঙ্গে নদীর পূর্বেকার সংযোগ স্থাপন এবং দখল-দূষণমুক্ত করা। নৌ চলাচল পুনরায় চালু। ৬। মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ এবং প্রস্তাবিত প্রকল্প এলাকায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তিস্তা পাড়ের মানুষদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা।


সম্পাদকীয়- এর অন্যান্য খবর