দৃশ্যে দৃশ্যে দৃশ্যমান একটি বাংলাদেশ
নূরিতা নূসরাত খন্দকার: ১. বাংলাদেশে এই প্রথম একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের জন্মশতবার্ষিকী পালিত হলো, সগৌরবের সাথে;  সেই সঙ্গে বাংলাদেশ স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পূর্তি উৎসব; একজন মানুষের বয়স দেশের বয়সের চেয়ে বেশি।  মত-দ্বিমত ইতিহাসের পৃষ্ঠায় তবু সত্যটি হলো, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আর বাংলাদেশের স্বাধীনতা - এক সমন্বিত অধ্যায়। তাই, এদেশে 'মুজিব বর্ষ' নামে একটি বছর পালিত হওয়া জাতীয় ইতিহাসে অত্যন্ত গৌরবের এবং যথেষ্ট গুরুত্ব বহন করে। পাশা-পাশি দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আন্তর্জাতিক বলয়ে এ বছরটাতেই অতিমারী করোনা বা কোভিড-১৯ ভাইরাসের মৌন গ্রাস জনজীবনে দুর্ভোগ, দুর্গতি, উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু আমরা বাঙালি বলেই হয়তো এমন একটা 'চরিত্রহীন' ভাইরাসকে তেমন একটা পাত্তা না দিয়ে রোজকার জীবনযুদ্ধে ঠিকই ছুটছি। গতবছর এমন একটা পরিস্থিতি সৃষ্টি হলো যে, করোনা ভাইরাসের চেয়ে মানুষের না খেয়ে মরারই আতঙ্ক জন্মালো। যাদের অর্থনৈতিক অবস্থা পোক্ত, তাদের ক্ষেত্রে দেখা গেলো লকডাউনে আটক থেকে বন্দীর মতোন জীবনযাপনের উর্ধ্বচাপ-নিম্নচাপে মানুষের দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ব্যক্তিবিশেষ বাদেও শ্রমিক শ্রেণির পেশাজীবি মানুষের জন্য, সাংস্কৃতিক কর্মী-সংগীত শিল্পীদের জন্য দেশময় ছোট ছোট সংগঠন সৃষ্টি হলো ত্রাণ বা সাহায্যের জন্য। মানবিক মানুষের দল আর সাংগঠনিক শক্তিতে কিছু মানুষ সাহায্য পেলো ঠিকই, কিন্তু এরও তো একটা সীমা আছে, ত্রাণ ক্ষমতারওতো লিমিটেশন আছে। মানুষের এমন দমবন্ধ পরিস্থিতিতে আবারও সবকিছু স্বাভাবিক পথে ফিরতে শুরু করলো। আর এখন সবই স্বাভাবিক। সব কিছুই নিয়ন্ত্রণে। কিন্তু চরিত্রহীন কোভিড-১৯?
শুরুদিকে এমনও খবর পাওয়া গেছে যে, কেউ কেউ করোনা আক্রান্ত হলেও তা আশপাশের লোকজনকে বুঝতে দেয়নি বা প্রকাশ করেনি। যারফলে একটা অচেতন বর্গও এই ভাইরাসটি ছড়ানোর জন্য দায়ী হয় বৈকি! বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, টীকা দিয়েও করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর পথে পাড়ি দিয়েছে অনেকে। করোনা একটা চরিত্রহীন ভাইরাস, প্রতিনিয়তই এর চরিত্র পাল্টায়। মিউটেশনে শক্তির ধরণ বদলে ফেলে। এমন একটি ভাইরাসের প্রতিপক্ষ হিসেবে আর কোনো ভাইরাস আপাতত আবিষ্কার হয়নি। তাই প্রশ্ন জাগে, এই চরিত্রহীন ভাইরাসটি দমন করতে টীকায় কি এমন পদার্থের ব্যবহার আছে যে এত দ্রুত টীকাটি আবিষ্কারও হলো আবার সেটি প্রয়োগও হলো,  দেশের কতিপয় মানুষও গিনিপিগ হলো নাতো! সহজ চিন্তায়, যে ভাইরাসটির চরিত্র বোঝারই সুযোগ পাওয়া যাচ্ছে না তাকে ঠেকানো বা দমনের হাতিয়ার এতদ্রুত আবিষ্কার না হওয়াই স্বাভাবিক। তবুও আমরা বাঙালি বলেই হয়তো সবকিছুকে পাত্তা না দেওয়াই আমাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য যেন। আর আমরা তো খেতাব পাওয়া 'বীর বাঙালি', তাই হয়তো একটি টীকা আসার সাথে সাথে এফোঁড়ওফোঁড় না ভেবেই লোকজনকে উৎসাহিত করতে থাকি এই বলে, টীকা হয়তো সমাধান নয় কিন্তু টীকা নিলে আপাতত সুরক্ষা হবে। এই 'আপাতত সুরক্ষা'র চেতনা এখন এদেশী বাঙালির জাতীয় চেতনায় পরিণত হয়েছে। জাতীয় পর্যায় থেকে আমরা এই 'আপাতত সুরক্ষার' জন্য উৎসাহিত হয়েছি। আর তাই সামাজিকভাবেও হয়েছি, নিজে টীকা নিয়ে তার ছবি তুলে সামাজিক মাধ্যমগুলোতে পোস্ট আপলোড করে অন্যকে উৎসাহিত করতেও দেখা গেছে। কিন্তু আমরা করোনার শাসনে পরাধীনই রয়ে গেছি আজও।
 
স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পেরিয়ে, আমাদের জাতীয় চেতনা দাঁড়িয়েছে 'আপাতত সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ'- যা করোনা পরিস্থিতির ফলে আরও সুস্পষ্ট হয়েছে। নিজ নিজ আখের গোটাতে আমরা অতিশয় ব্যস্ত। আপাতত সুরক্ষা নিশ্চিতকরণে আমরা হাতের কাছে যা সুযোগ পাই তা সবই পারলে লুফে নিই। যথাযথ সামাজিক দূরত্ব বজিয়ে চলার বদলে আমরা উৎসব হেঁকে গণসমাগমের জন্য মুখিয়ে থাকি। কারণ ঘরবন্দী থাকলে আমাদের দমবন্ধ লাগে, রোজগারে ভাটা পড়ে। আমরা বাইরে ছুটে বেড়ানোতেই জীবনের নিঃশ্বাস খুঁজে পাই। স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পেরিয়ে আমরা টের পাই, জাতীয়ভাবে আমাদের দেখভালের জন্য কেউ নেই। যার যার জীবন তার তার। ত্রাণের লিস্টেও নাম লিখতে সিন্ডিকেট লাগে, লাগে সাংগঠনিক নয়তো দলীয় পরিচয়! জনসংখ্যার এতোই চাপ যে জনশক্তির বদলে গণ দুর্গতির কারণ হয়েছে; বৃদ্ধিশীল নাগরিকরাই দেশের বোঝা আজ। যেকোনো দুর্যোগ, আর বর্তমানের অতিমারী মোকাবেলায় আমাদের ভরসা ত্রাণ, তহবিল আর সাহায্যের বিদেশী হাত। ব্যক্তিগত সমৃদ্ধি আর জাতীয় সমৃদ্ধির সাথে আমাদের আকাশ পাতাল বৈষম্য। সামাজিক অবক্ষয়ের কারণও এই বৈষম্যই। স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পূর্তিতেও আমরা দাঁড়িয়ে আছি এমন একটি প্রেক্ষাপটে যেখানে আমাদের রাজধানীর মাথার ওপর মেট্রোরেল প্রস্তুতি, পদ্মাসেতুর অহংকার, যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবনীয় উন্নতি কিন্তু পায়ের তলায় সামাজিক অবক্ষয়ের স্তূপ। পাশের বাড়ির হেঁসেলে রান্না হলো কি হলো না -তা ভাববার কিম্বা দেখভালের মানসিকতা, ফুরসৎ আজ আমাদের কারোরই নেই। 'চাচা আপনা প্রাণ বাঁচা', 'নিজে বাঁচলে বাপের নাম'- এসব (একদা) বর্গীজাত বুলিই আমাদের বর্তমান সামাজিক, রাষ্ট্রিক জীবন আদর্শ। অথচ, স্বাধীনতা পূর্ববর্তী বাঙালির আদর্শ বচন ছিলো, 'প্রত্যেকে আমরা পরের তরে', 'দশে মিলে করি কাজ হারি জিতি নাহি লাজ'। বর্তমানে তো কে কার গ্রাস লুটে নিজে ধনী হবে তারই কৃষ্টি স্বাভাবিক হয়ে গেছে।
 
বাঙালির কৃষ্টিতে হালচাষের স্থলে কলমচাষ প্রবেশ করেছে বহু আগেই। সেসব ইতিহাস ঘাঁটতে গেলে লেখার পরিধী বাড়বে বৈ কমবে না। তাই, সে পথে না গিয়ে ভিন্ন পথে চলাই  শ্রেয়। তাছাড়া, যে কথাগুলো বলা হচ্ছে তারজন্য ডকুমেন্টস প্রয়োজন নেই, এসবকিছুই আমাদের সমাজের চলমান দৃশ্য। মুক্ত গদ্যের এই একটাই সুবিধে, ডকুমেন্টস ছাড়াও চলমান দৃশ্য থেকেই লেখকের অপার স্বাধীনতা থাকে। তো, হলকর্ষণ একটি দলীয় পদ্ধতি। এখানে 'দশে মিলে করি কাজ' নীতি খাটে। কিন্তু কেরানীর এক কলমের খোঁচাই যথেষ্ট, বিল পাশ হবে কি হবে না তা একাউন্ট ম্যানেজারের এক সইই যথেষ্ট। কেবল সরকারী অফিসগুলোতে ঘুষের রাজ্যে সিন্ডিকেট থাকতে হয়। কারণ কোনো উৎকট অফিসার যদি ঘুষের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেন তবে সেই সিন্ডিকেটই দলবলে এমন পদক্ষেপ নিবে যে ঐ উৎকট অফিসারই চোর বনতে বাধ্য হবেন। আবার স্বাধীন দেশের বুকে শিশুদের প্রকৃত শৈশব ছিনতাই করা 'শিক্ষা প্রতিষ্ঠান' নামের মহাবতারে দেশ ভরে গেছে। লকডাউন থেকে শুরু করে সেই যে অনলাইন ক্লাসের ধূম লেগেছে ঘরে ঘরে - সে দৃশ্য দেখলে আমার মতোন স্বল্প মগজী প্রজাতির আক্কেলগুড়ুম হয়ে যায়। ইন্টারনেট, ল্যাপটপ, মোবাইল, জুম, স্ট্রিমিয়ার্ড মনে হয় আবিষ্কারই হয়েছিলো লকডাউনে অনলাইন ক্লাস করার জন্য। ক্লাস কন্টিনিউ না করলে বাচ্চাদের ভবিষ্যৎ রসাতলে যাবে। তা কী করে মানা যায়! বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে আমাদের সন্তানেরা একদিন নাসায় যাবে, মঙ্গলগ্রহে মাছ চাষ করবে, চাঁদে বসে হাউজবিল্ডিংয়ের প্রজেক্ট বানাবে- এটাই তো উন্নত জীবন! আর সন্তানকে উন্নতজীবনের পথে এগিয়ে নেওয়াই তো আজকালকার বাবামায়ের কৃষ্টি। আরেকদিকে স্বাধীন দেশে বেড়ে যাচ্ছে বৃদ্ধাশ্রমের দালান। হয়তো আগামী একশো বছর এই স্বাধীনতার শতবর্ষ পালনে এদেশে বৃদ্ধাশ্রমগুলোই কার্যকরী পদক্ষেপ নিবে। আর সন্তানেরা তো উন্নত জীবন যাপনের জন্য উন্নতির আকাশচুম্বী দেশগুলোতে চলে যাবে। হলকর্ষণের চেয়ে বিকাশের দোকান খুলে সারাদিন টাকা ইধার উধার করাই আজকের স্মার্ট বাঙালির লক্ষ্যণ। গ্লাবাল সংস্কৃতির লেনদেন যুগে নিজের সংস্কমতি বলে কিছু থাকে কি না সন্দেহ।
 
একবার এক গারো পরিবারে বেড়াতে গিয়ে কল্পনার মধ্যে গারো কৃষ্টির যা যা বইয়ের পাতা ঘুরছিলো, বাস্তবে তার লেশমাত্রও দেখা গেলো না। ঐ বাংলা-ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত গারো পরিবারটি চলনেবলনে, খাবারে, রীতিতে নিজেদেরকে বাঙালি বানিয়ে ফেলেছে। আমাদেরও অবস্থা ঠিক তাই। পিৎজা, বার্গার, নুডুলস আমাদের নিত্য খাদ্য। এসবতো খুব স্বাভাবিক, কিন্তু গানের সুর, বাদ্যযন্ত্র, নৃত্যশিল্প -এসবে এখন কতটুকু দেশি চেতনা বিরাজ করছে তা বিশ্লেষণ করার প্রয়োজন নেই। একটি মঞ্চ সংগীত অনুষ্ঠান কীবোর্ড, অক্টোপ্যাড, গিটার ছাড়া কি আজ ভাবা যায়! বাংলা গানের নাচের মধ্যে বলিউডি স্টেপ, এরাবিয়ান, রাশান এক্রোবেটের মারপ্যাঁচ থাকবে না তা কি ভাবা যায়! গানের কথাটুকুনই শুধু বাংলা কিন্তু সুর আর বাদ্যের মধ্য দিয়ে পারলে গোটা বিশ্বের বাদ্যযন্ত্র ঢুকে যায়। আবার উচ্চারণেও এসেছে ভিন্নতা। স, র, ল, ফ এসব বাংলা সিলেবল এখন যেন আমেরিকান সিলেবলের সাথে মিলিয়ে গেছে। গল্প, উপন্যাসে ঢুকে গেছে মাল্টিপল চরিত্র। সোঁদা পুকুরে বালিকার অবাধ সাঁতারের জায়গায় টাইলস পাতা সুইমিংপুলেই  গল্পের চরিত্র আজ ডুব দিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। প্রাকৃতিক চিত্রের চেয়ে উন্নয়নের পথঘাট, হাইরেইজ ঝকঝকে বিল্ডিংয়ের কদর যথেষ্ট বেশি গল্পদৃশ্যে। আপাতত সুরক্ষা নিশ্চিত জীবন যাপন করতে করতে একদিন হাতে মাখা নলা নয়, নব টিবে বাঙালি ভাতের বদল আধুনিক বিশ্বের খাবার খাবে। অবশ্য ফুডপান্ডা এখন থেকেই সেই আলামত দিচ্ছে। এসব দৃশ্যের ভীড় ঠেলে ঠেলে মুক্তিযুদ্ধের সেইসব দিনের পাতা ওল্টালে মনে হয়, ওসব দাবী দাওয়া আজ বড্ড সেকেলে। ওসব দাবী আর চেতনা নিয়ে আজকের বাংলাদেশীরা বসে নেই। রাজনৈতিক মঞ্চ বাদে আর কোথাও ওসব চর্চাও হয় না। মাত্র পঞ্চাশ বছর আগেই ওসব দাবী দাওয়া এতোই প্রকোপ ছিলো যে, সাধারণ মানুষ জানপ্রাণের মায়া ছেড়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো। কিন্তু স্বাধীন দেশের প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট নিয়ে নির্লজ্জ টানাটানি, কে কতবড় ত্যাগ স্বীকার করেছিলেন তারই ইতিহাস কচলানো, কে ঘোষক আর কে নয় তারই ক্যাচাল - যারফলে আজও একটি সুনির্দিষ্ট সুঠাম বলিষ্ঠ ইতিহাস গ্রন্থ আমরা যারা স্বাধীন দেশের পতাকাতলে জন্মেছি তারা কেউই পাইনি। আমাদেরকে রাজনৈতিক মদদপুষ্টতা এড়িয়ে ইতিহাসের পাতা তোলপাড় করে সত্যকে খুঁজতে হয়। আজও মাথার ঘাম ঝরে যায় একটি সুনির্দিষ্ট, পক্ষপাতহীন, সত্য উচ্চারিত, সর্বজন মনোনীত বাংলাদেশ জন্ম ঠিকুজির সঠিক তথ্য সম্বলিত গ্রন্থ খুঁজে বের করতে। আর এ কারণে কখনো কখনো মনে হয় এসব অনর্থক।
 
২. একটি দেশের ইতিহাস সম্পর্কে ধারণা যদি অস্পষ্ট থাকে তাতে কিতাবি ইতিহাস সমন্বিত করলেও ঐতিহাসিকতার বিচার বুদ্ধির ক্ষমতা আয়ত্তে আসে না। অনর্থক লাগে মুখস্থ করানো রাজনৈতিক ইতিহাস সমূহ, তখন সংস্কৃতে হলেও শঙ্করাচার্যের বচনটি তখন মগজে প্রকটভাবে চড়াও হয়-
'অর্থমনর্থং ভাবয় নিত্যং
নাস্তি ততঃ সুখলেশঃ সত্যম'।।
(অর্থকে অনর্থ বলে জেনো, তাতে সুখও নেই এবং সত্যও নেই)
তো এসব সত্য ইতিহাসও আজ আর কারো খোঁজার সময় নেই। স্কুল না থাকলেও অনলাইনে ছেলেমেয়েরা ক্লাস-পরীক্ষা নিয়ে ব্যস্ত। মা বাবা সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে ব্যস্ত। বুদ্ধিজীবীরা কে কত বড় বোদ্ধা তা প্রমাণ করতেই ব্যস্ত। দেশপ্রেমিকরা কে কত বড় দেশপ্রেমিক তা প্রমাণের জন্য ব্যস্ত। সাংস্কৃতিক কর্মীরা মঞ্চ অথবা অনলাইন লাইভ অনুষ্ঠান নির্মাণে ব্যস্ত। কিন্তু এগুলোও হয়তো খুব স্বাভাবিক। মানুষ নিজেকে প্রতিষ্ঠা দিতে যে ক্ষেত্রে সুযোগ পাবে সেখানেই আত্ম নির্ভরশীলতা তৈরী করবে। হয়তো এসবই মানুষের কর্তব্য, এসবেই দেশের মানুষের মঙ্গল দ্বার উন্মোচিত হয়। কিন্তু তবুও কোথায় যেন কি এক অসংগতির অদৃশ্য ইঙ্গিতে এসব দৃশ্যের ভীড় ঠেলে দেড়শো বছরেরও বেশি বয়সী কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের বাণী মগজে উঁকি দিয়ে বলে যায়, ‘দেশের লোকের হিতের সঙ্গে এই হিতৈষার যোগ নাই’ (ছাত্রদের প্রতি সম্ভাষণ/ শিক্ষা)। কথায় কথা বাড়ে, বেড়েও গেলো। আবার কথা বাড়ার প্রসঙ্গে মনে পড়লো, কথার ওপরও আজকাল আইনকানুনি বাছবিচার চলছে। তাই লেখকসত্তারও লাগাম টেনে রাখতেই হয়।
 
পঞ্চাশ বছর পেরিয়েও কন্যাদায়গ্রস্ত পিতার মতোন বাংলাদেশটা দাঁড়িয়ে আছে আজও। না পারছে সম্পূর্ণ সাংস্কৃতিক মুক্তি, না পারছে সবকিছু ভুলে পরের কৃষ্টিতে মুক্তমনে সাবলীল হতে। বিদেশি শাসনামলে যতটা দেশি সংস্কৃতি-কৃষ্টি চর্চার প্রতি বাঙালির ঐক্যবদ্ধ হওয়ার দৃশ্য দেখা যায়, দেশি শাসনামলে বরং তার উল্টো দৃশ্যই অধিক। এখন আমাদের দায় নেই দেশি কৃষ্টি রক্ষার জন্য আওয়াজ তোলার যুদ্ধে যাওয়ার; এখন কারো রুচি নেই সুইমিং ছেড়ে পুকুরে গিয়ে শীতল হবার। জীবনযাপনে এসে গেছে উন্নয়ন আর উন্নতির দৌড়ঝাঁপ, বিশ্বের সাথে তাল মেলানোর তালছন্দ। তাই আর দেশি কৃষ্টি রক্ষার দায় নেই গ্লোবালাইজড সংস্কৃতির যুগে। এখন বৈশ্বিক চেতনায় মানচিত্রেরও তেমন অহংকারবোধ নেই, আগামী ভবিষ্যতে এই চেতনা আরও পোক্ত হয়ে যাবে স্বাভাবিকভাবেই। কানাঘুষায় চলছে সাইবার ওয়ার আতঙ্ক, হয়তো তা আসন্ন। সে যুদ্ধের সাক্ষী হয়তো আমরাই থাকবো। হয়তবা না। কিন্তু পূর্ব কথিত ঐ গারো পরিবারের বাঙালি হওয়ার মতোই নিজেদেরকে কাকের লেজে ময়ূর পূচ্ছ পরার মতোই দেখতে লাগে। একদিকে সাম্প্রদায়িকতার চাষে বুঝতেই অসুবিধা হয় আমরা আসলে কোন জাতি, কোথায় গিয়ে আমাদের প্রার্থনারত সম্মিলিত হাতগুলো মিলিত হতে পারে!  আরেকদিকে ঠিক কোন সুরটি বাজালে আমাদের প্রাণের সুরের সাথে মিলবে - তাও আমাদেরই সংগীতে খুঁজে পাওয়া কষ্ট। বাউলকে ধরে এনে বিদেশি সংগীতায়নের মাঝে ছেড়ে দিয়ে আমরা ইদানীং গানেরও সার্কাস-জিমনাস্টিক  দেখি। আর এতেই স্পষ্ট হয়, স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পূর্তির মেকি অহংকার আমাদের আছে ঠিকই। কিন্তু স্বাধীনতার ঐতিহ্য এবং বোধ বহন করার মতোন দায়বদ্ধতা আমাদের কৃষ্টিতে নেই। এদেশের খবরের পৃষ্ঠাগুলোই বলে, দেশ স্বাধীন হওয়ার পরপর এক শ্রেণির মানুষ পটাপট ধনাঢ্য হয়েছিলো আর কয়েক শ্রেণির মানুষ দুর্ভিক্ষে অনাহারে নিপীড়িত হয়েছিলো। ঠিক পঞ্চাশ বছর পর (করোনা ভাইরাস আসার পর) একই দৃশ্য ফিরে এসেছে। বেশ কয়েকশ্রেণির মানুষ ত্রাণের জন্য বেঁচে গেছিলো কাজ হারিয়ে। আর কিছু শ্রেণির তেমন কোনো সমস্যা হয়নি। বরং হলিডে ইমেজেই কয়েক মাস দিব্যি কাটিয়েও তাদের হাসফাঁসানি সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে; তারা  পাবসে, পার্টিতে কোথাও এনজয় করতে যেতে পারছিল না। তো বর্তমানে এমন উদ্ভট বারোমেশালি চেতনার দেশে কিছু শ্রেণি পেশাজীবি মানুষ বসবাস করতেও কুণ্ঠা করে। নিজেরা না পারলেও ‘আপাতত সুরক্ষা’ নিশ্চিত করতে সন্তানদের বিদেশে পাঠিয়ে নিশ্চিন্ত থাকে। মাত্র পঞ্চাশ বছর আগের একটা সম্মিলিত ‘স্বাধীনতা’ স্বপ্নেরই রঙ বদলে গেছে। জুয়ার আসরের মতোন রাজনৈতিক চেতনার ভাগ বাটোয়ারা কিম্বা বিকিই হয় বলা যায়। এক চালে ভুল তো,  সমস্ত আদর্শেরই ভরাডুবি একালে, অথচ এককালে আদর্শের রক্ষায় মানুষ জীবন বাজী রাখতেও কুণ্ঠা করেনি। তবুও যাদের পরানে লালন শাঁই-রবীন্দ্রনাথ-নজরুল বসত করেন, আধ্যাত্মিকতা যাদের শিকড়ে, তারাই হয়তো বাঙালি বাঙালি করে চিৎকার করবেন আজীবন, আর মানুষ তাদেরকে পাগল বলেই টিটকারি করবে। এদেশেরই প্রাক ইতিহাসে আছে, রবীন্দ্র চর্চায় নিষেধাজ্ঞা-তাতে অনেককেই উৎসাহিত হতে দেখা যায়। আবার যারা নিষেধাজ্ঞা টপকে ঠিকই নিত্য সাধনায় রবীন্দ্রনাথকেই আদর্শ মেনেছেন তাঁদেরই বৃহৎ অংশ মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। কৃষক, মজুরদের সাথে মিলিত হয়ে ছাত্রসমাজ যুদ্ধ করেছিল বাঙালির সংস্কৃতি রক্ষার জন্য। সেইসব বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে আমরা এখন উৎসব মুখর জাতিতে পরিণত হয়েছি। আন্তরিকতার ঘাটতি যাই থাকুক সবেতেই আমাদের এখন বাহ্যিক চাকচিক্য আর ডামাডোল লাগে। তেমনি অতিমারীতে অভুক্ত মানুষকে খাবার দেওয়ার চাইতেও আতবাজিতে লক্ষ কোটি টাকা ব্যয় করতে পারাটা আমাদের জন্য এখনকার যুগে গর্বের বিষয়। লক্ষ কোটি টাকার আতসবাজি না হলে যেন আজকাল সরকারেরও ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়ে যায়!  ‘অন্য কোনো-এক কালে যে জিনিসটা ছিল এবং যাহা তাহার চরমে আসিয়া মরিয়াছে তাহার নকল করিতে বলা যে পাগলামি, সে কথা আমি খুবই স্বীকার করি। বর্বরদের ধনুর্বাণ যতই মনোহর হউক তাহাতে এখনকার কালের যোদ্ধার কাজ চলে না। কিন্তু অসভ্যযুগের যুদ্ধপ্রবৃত্তির উপকরণ সভ্যযুগে যদিবা অনাদৃত হয়, কিন্তু সেই যুদ্ধের প্রবৃত্তিটা তো আছে’ (ধর্মশিক্ষা/ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)। ঠিক তেমনি করেই লোক দেখানো জৌলস-প্রবৃত্তি থেকে বেরিয়ে না এলে নকল আনন্দেরই পেছনে ছোটা সার। মুখস্থ স্বাধীন দেশের অহমিকা না আউড়িয়ে প্রকৃত দায়বদ্ধতা বোধ থেকে বাংলাদেশের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। মনে রাখতে হবে, নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ কোনো আলাদীনের চেরাগ  থেকে বেরিয়ে আসা জ্বীন করে যায় নি। এদেশের সর্বস্তরের মানুষ, আমাদের অগ্রজের রক্তক্ষয়, জীবনদান, সুকঠিন ত্যাগ আর মর্মান্তিক পরিশ্রমে গড়া-একটি বাংলাদেশ। বিশ্বের সাথে তাল না মিলিয়ে বরং নিজেরাই নিজেদের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারলেই স্বদেশ অহমের স্বাধীন সূর্যের প্রকৃত আলো আমাদের চেতনায় উদিত হবে তথা প্রকৃত রাজনৈতিক চেতনা  মুক্তি পাবে মুখস্থ অভ্যেস থেকে। ধন্যবাদ।
 
লেখক, প্রাবন্ধিক,  কলামিস্ট,  সংগীত গবেষক
সংগীত প্রশিক্ষক- বাংলাদেশ শিশু একাডেমি, প্রধান কার্যালয়।
এডিটরিয়াল এসিস্ট - মাসিক সরগম  পত্রিকা।

এক নজরে- এর অন্যান্য খবর