একজন নারী উদ্যোক্তা এবং সহযোগিতার অন্তরালে (সফল উদ্যোক্তা)
জিনিয়া হাসনাত জুঁই: একজন মানুষের যখন প্রথম দেখা হয় আমরা তার নামটা আগে জানতে চাই তারপর আনুষাঙ্গীক সবকিছু ধীরে ধীরে কথা বলার মাধ্যমে জানা হয়ে যায়। আর নামের পাশে যখন ভাল একটা কর্ম যুক্ত হয় তখন সে নামের ওজন আরো বেড়ে যায়।
আমি বরাবর মানুষের সাথে মিশতে ভীষণ ভালবাসি, চুপচাপ থাকা মানুষ গুলোকে আমার একদম পছন্দ না, মন খুলে কথা বলতে না পারলে কথাগুলি ভেতরে ছটফট করতে থাকে। তাই যখন কথা বলার মতো কাউকে পেতাম না তখন ডাইরি লিখতাম, ছোট বেলা থেকে এই অভাসটা আমার প্রতিদিন এর ছিল। ডাইরির চেয়ে ভাল শ্রোতা আমি আজ পর্যন্ত কাউকে পাইনি মনের কথা গুলো বলার জন্য, যদিও কারণটা ছিল বাল্যবিবাহ।
গ্রাজুয়েশন শেষ করে, এল এল বি কমপ্লিট করেছি, কিন্তু সার্টিফিকেট রেখেছি বস্তাবন্দি করে, চাকরি-বাকরি ও আমার দ্বারা হবে না। সবকিছুর পাশাপাশি ১৮ বছর বয়স থেকে উদ্যোগ নেই ব্যবসা করার, কিন্তু অর্থ সংকট ছিল অন্যতম বাধা, তাই টিউশন করার সিদ্ধান্ত নেই এবং শুরু করি, যখন আমার হাতে ১০ হাজার টাকা জমে গেল তখন ৩ মাসের পার্লার কোর্স করি এবং বাসায় চেম্বার করে নিজেদের মতো নারীদের সেবা দেয়া আরম্ভ কার। কাজের ফাকে ফাকে সময় পেলেই অনেক নারীদের সাথে তাদের জীবন কাহিনী শোনা এবং শেয়ার করা ছিল একটি অন্যতম কাজ, এর পিছনে কারন ছিল আমি যা জানি তা অন্যের কাছে পৌঁছে দেবো এবং অন্যদের বাস্তবতা থেকে নিজে কিছু শিখবো।
নিজের ছোট একটা উদ্যোগ মাত্র ৩ মাসের অভিজ্ঞতায়, যদিওবা ১৪ বছর হল মার্কেট এ আমার প্রতিষ্ঠান। কিন্তু ১ দিনে সেটা সম্ভব হয়নি এর জন্য প্রচুর সময়, ধৈর্য্য ও শারীরিক শ্রম দিতে হয়েছে আমায়। আর এটা আমার অক্লান্ত পরিশ্রম এর ফল যার বয়স প্রায় ১৫ বছর।
সংসার, স্বামী, এক কন্যা ও এক পুত্র সন্তান, ব্যবসা সব মিলিয়ে ব্যস্তময় জীবন, হারিয়ে ফেলেছি আমি নিজেকে কখন নিজেই জানিনা। কিন্তু থেমে থাকেনি আমার নারীদের সাবলম্বী করার ভাবনা, কারন নারীর উন্নয়ন ছাড়া একটি দেশ কখনো সাবলম্বী হতে পারে না। তাই বিভিন্ন এনজিও ফোরাম ও ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় হত দারিদ্র, স্বামী পরিত্যাক্তা, স্কুল যেতে না পারা নারীদের বেছে বেছে প্রশিক্ষণ এর আওতায় নিয়ে আসি যার আনুষাঙ্গিক সংখ্যা প্রায় ৫শত, যারা অনেকেই এখন সাবলম্বী যা আমায় অনেক আনন্দ দেয় বটে কিন্তু নারীদের সাবলম্বী করতে শুধু প্রশিক্ষণ যথেষ্ট নয় দরকার অর্থ, যা একটা নারীর জন্য চরম বাধার কারণ। আমরা যাই করিনা কেন টাকার কোন বিকল্প নেই, আমাদের সমাজে যা একজন মহিলার জন্য অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। এর একটি বড় কারণ মহিলাদের নামে কোন সম্পদ না থাকা, আর সে ক্ষেত্রে কোন আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে লোন নেয়া বা পাওয়ার আশঙ্কা কমে যায়। ফলে যা থাকে তা হচ্ছে জমানো কিছু টাকা। খুব কম মানুষ আছে যারা অনেক কষ্টে জমানো টাকা নিয়ে কোন ব্যবসা শুরু করতে চান। তাই একজন নারী উদ্যোক্তা হিসেবে আমি মনে করি যথেষ্ট টাকা না থাকা একজন নারী উদ্যোক্তার ব্যবসায়ীক সফলতার পিছনে সবচেয়ে বড় বাধা। সরকার নারীদের সফলতার শীর্ষে নিয়ে যেতে যে কর্মসূচিগুলি নিয়েছে, বাস্তবে আমরা যখন সেইগুলি ব্যাংকের কাছে তুলে ধরি তখন ব্যাংককর্তৃপক্ষ ও সরকারের কথায় ভিন্নতা পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরে আসি। ট্রেড লাইসেন্স, ডিও, ইনকাম ট্যাস্ক থাকা সত্বেও একজন নারীর ব্যাংক লোন পেতে গিয়ে হতাশ হয়ে ফিরে আসতে হয়, কারণ তারা সাবলম্বীদের ঋন প্রদান করেন যা আমাকে অনেক আহত করে।
কোভিডকালীন সময়ের প্রেক্ষাপটে ব্রাকের জরিপে বলা হয়েছে, উদ্যোক্তাদের জন্য এক হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা বরাদ্দ হয়েছে, তবে নারী পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত মাত্র ১০ শতাংশ ছাড় হয়েছে। কোভিড ১৯- এ সামাজিক নিরাপত্তা জালের আওতায় নেই অর্ধেকের বেশি নারীকর্মী। ৫৭ শতাংশ কোন সহায়তা পাননি। নারী উদ্যোক্তাদের একটা বড় অংশ গৃহকর্মে যুক্ত ছিলেন। তারা এই সময়ে অর্থের অভাবে ঋনগ্রস্থ হয়ে পড়েছেন। নারী উদ্যোক্তাদের চাহিদার তুলনায় ছোট ও মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তারাই ঋন পাননা। ঋন দেওয়ার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে অন্য ব্যাংক হয়ে এনজিওর কাছে যখন বরাদ্দ আসে, তখন ৪-৫ শতাংশ কেটে নেয়া হয়ে যায়। এভাবে প্রণোদনার সহায়তা অকেজো হয়ে পড়ে।
আমি একজন নারী উদ্যোক্তা হিসেবে মনে করি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যদি প্রনোদনা সম্পর্কে বিশেষসচেতন করেন, ব্যাংকগুলিকে নির্দেশ করেন প্রণোদনা পাওয়ার সুযোগ করে দেন এবং যথাযথ ভাবে নারী উদ্যোক্তাদের ডাটাবেস তৈরী করেন তাহলেই সম্ভব নারী উদ্যোক্তাদের ঝুকিমুক্ত করে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া, অন্যথায় চরম দুর্ভাগ্য পোহাতে হবে আমাদের যা একটি উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের জন্যও বাধার সম্মুখীন বটে।
আমি জানিনা আমার এ লেখা কতটা গ্রহণযোগ্য হবে, লিখতে গিয়েও থেমে গেছি অনেকবার। তবুও ক্ষুধা পেটে আর কতক্ষণ, তাই সাহস করে লিখে ফেললাম, কারন আমি খুঁজে পেতে চাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্নের বাংলাদেশের অন্যতম সহযোগী ক্ষুদ্র ও মাঝারী উদ্যোক্তাদের যারা বাঁচলে বাঁচবে বাংলাদেশ। আমি স্বপ্ন দেখি এবং দেখাতে চাই সফল উদ্যোক্তা হবার।
আমি গত ২০১৬ সালে বাংলাদেশ সরকার এর মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের জয়িতা অন্বেষন এ বাংলাদেশ থেকে উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় এওয়ার্ড পাই অর্থনৈতিকভাবে সাফল্য অর্জনকারী নারী হিসেবে। ২০১৭ সালে বিডব্লিউসিসিআই আয়োজিত শ্রেষ্ঠ উদ্যোক্তা হিসেবে এওয়ার্ড পাই রংপুর বিভাগ এর মধ্যে, এছাড়া উদ্যোক্তা উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন ব্যাংক, এনজিও, বিডব্লিট সিসি আই থেকে প্রায় অর্ধ শতাধিক প্রশিক্ষণ এ অংশগ্রহণ। আমার সর্বপরি চাওয়া উন্নয়নশীল দেশ গড়তে সরকারকে যেকোনভাবে সহযোগীতা করতে, যে কোন সহায়ক ভূমিকা পালনে নিজেকে নিয়োজিত রাখতে।
করোনাকালে নারী নেতৃত্ব গড়বে নতুন সমতার বিশ্ব

জিনিয়া হাসনাত জুঁই
সত্ত্বাধীকারি:- তাকিয়া হিজাব জোন এন্ড রাজকন্যা বিউটি পার্লার
উত্তরন সুপার মার্কেট, গোশালা রোড, লালমনিরহাট।
এক নজরে- এর অন্যান্য খবর