মুক্তিযুদ্ধের অমীমাংসিত ইতিহাস -সায়েদুল ইসলাম মিঠু
স্টাফ রিপোর্টার: বাংলাদেশের বয়স এখন পঞ্চাশ। ঠাকুরগাও এর রাণীশৈংকলের ভ্যান চালক সুধীর বর্মনেরও বয়স এবার পঞ্চাশ হবে। মাতা বীরাঙ্গনা টেপরি বর্মন এবং পিতা অজ্ঞাত। মুক্তিযুদ্ধের সময় পরিবারের জানমাল রক্ষার্থে নিজের ষোড়শী কন্যা টেপরি বর্মনকে পাকসেনাদের ক্যা¤েপ দিয়ে আসেন তার পিতা। সাত মাস পরে দেশ স্বাধীন হলে গর্ভবতী অবস্থায় বাড়ি ফেরেন টেপরি বর্মন। জন্ম হয় যুদ্ধ শিশু সুধীর বর্মনের। পাকসেনাদের নির্যাতনের ফলে সেসময় এ রকম অসংখ্য শিশুর জন্ম হয়েছিল যার সঠিক সংখ্যা আজও নিরূপন করা হয়নি। সরকারের পক্ষ থেকে এরকম কোন উদ্যোগও নেয়া হয়নি। যার ফলে ইতিহাসে এই অধ্যায়ের কথা সাধারণের কাছে একেবারেই অজানা থেকে গেছে। ১৯৭২ সালের জানুয়ারিতে অস্ট্রেলিয়া থেকে আসা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডাঃ জিওফ্রে ডেভিসের মতে শুধু নির্যাতিতা আন্তসত্ত্বা নারীর সংখ্যাই ছিল প্রায় দুই লাখ। যার মধ্যে দেড় লাখ থেকে এক লাখ সত্তুর হাজার নারীর গর্ভপাত করানো হয়েছিল। War Crimes facts findingকমিটির হিসেবে সব মিলিয়ে নির্যাতিতা নারীর সংখ্যা চার লাখ আটষট্টি হাজার। অথচ এদের মধ্যে ক’জনের খবরই বা আমরা রাখি?,আর ক'জনই বা বীরাঙ্গনার স্বীকৃতি পেয়েছে?
২০১৪ সালের ২৩ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুন্যাল একটি রায়ে বলেন, একাত্তুরে যেসব নারী ধর্ষিত হয়েছেন এবং যুদ্ধশিশু হিসেবে যাদের জন্ম হয়েছে তারা আমাদের জাতীয় বীর। সমাজ ও রাষ্ট্র আমরা কেউই তাঁদের প্রতি মনযোগী হইনি। নির্যাতিতা নারী এবং যুদ্ধ শিশুদের পুনর্বাসনে ¯েপশালসোশাল সার্ভিস প্যাকেজ চালু করার পরামর্শ দেয়া হয়েছিল এই রায়ে। কিন্তু বাস্তবে কাজের কাজ কিছুই হয়নি। ঠাকুরগাঁও এর সুধীর বর্মনকে তাই আজও ভ্যান গাড়ি চালিয়ে জীবিকা নির্বাই করতে হয়।
যুদ্ধ শিশুরা না হয় গোল্লায় যাক, মুক্তিযোদ্ধাদেরই এখন পূর্ণাঙ্গ তালিকা করতে পারেনি সরকার। তালিকা প্রকাশের নামে যা হচ্ছে সেটা আসলে জোড়া তালি দেয়া একটা নাটক ছাড়া আর কিছু নয়। ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা নির্ধারণ করে বলেছিলেন যারা পাকসেনাদের সাথে প্রত্যক্ষ যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন কেবলমাত্র তারাই মুক্তিযোদ্ধা বলে অভিহিত হবেন। বর্তমান সরকার এই সংজ্ঞা পরিবর্তন করে যারা শিল্পী, খেলোয়াড়, মুজিব নগর কর্মচারি সকলকেই বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ঘোষণা করেছে। এর ফলে দুটো সমস্যা তৈরি হয়েছে এক, এতে প্রকৃত যোদ্ধারা নাখোশ হয়েছে। দুই, পরবর্তী প্রজন্ম প্রকৃত বীর যোদ্ধাদের আলাদা করতে পারছে না। সরকার চাইলে যে কাউকেই সম্মান জানাতে পারে। তবে সবাই এক কাতারে দাঁড় করিয়ে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করা আসলে ধৃষ্টতার সামিল। সরকারের বারংবার ব্যর্থতা প্রমাণ করে যে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা করা কিংবা উল্লেখযোগ্য ঘটনাবলী লিপিবদ্ধ করা প্রকৃতপক্ষে Experts's Job বিশেষজ্ঞের কাজ। শুধুমাত্র মন্ত্রী এমপি আর আমলাদের দিয়ে কখনও এই কাজ শুদ্ধভাবে করা সম্ভব নয়।  
আমাদের মুক্তিযুদ্ধটা তাহলে কেমন ছিল? শুরুতে কেমন ছিল কিংবা সেক্টর গুলোই বা কবে ভাগ করা হয়েছিল? এমনি হাজারো প্রশ্ন আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে ঘিরে রয়েছে। তাই মুক্তিযুদ্ধকে বুঝতে গেলে এসব প্রশ্নেরও উত্তর জানা অত্যাবশ্যক। সমস্যা হলো আমাদের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে মৌলিক কাজ বা ইতিহাস চর্চ্চা সেভাবে হয়নি বললেই চলে। সাধারণত দু’ভাবে ইতিহাস লেখা হয়, একটি বিশ্লেষণধর্মী এবং অপরটি বর্ণনাধর্মী। বরাবরই আমাদের দেশে যোদ্ধার চাইতে বোদ্ধা বেশী। তাই বোধকরি যুদ্ধের বর্ণনা রয়েছে এমন লেখার সংখ্যা খুবই কম। তবে হাতে গোনা যে কয়েকটি বই আছে তার মধ্যে মুক্তিযোদ্ধা মাহবুব আলমের লেখা `গেরিলা থেকে সম্মুখযুদ্ধ' বইটা অবশ্য পাঠ্য বলে আমার ধারণা। এক্ষেত্রে আরও একটি কারণ উল্লেখ করা যেতে পারে। মুক্তিযোদ্ধাদের শ্রেনী চরিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে যে যুদ্ধে নি¤œবিত্ত শ্রেনীর লোকের অংশগ্রহন সবচেয়ে বেশী ছিল। এদের অধিকাংশই নিরক্ষর এবং এদের স্মৃতি শক্তিও দূর্বল। লেখার তো প্রশ্নই আসে না, মাঝে মধ্যে এদের পক্ষে গুছিয়ে যুদ্ধের ঘটনা বর্ণনা করাও কষ্টকর। সেসময় বর্তমানের ন্যায় লেখালেখির এতো মাধ্যম ছিল না। যুদ্ধের মাঠে সে সুযোগও ছিল না। তবে এত প্রতিকুলতার মধ্যেও কেউ কেউ যুদ্ধের সময় ঘটে যাওয়া উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলো লিপিবদ্ধ করে রেখেছিলেন। তাই কেবল তাঁদের লেখাতেই মৌলিকত্বের স্বাদ পাওয়া যায়।             
১৬৬১ সালের দিকে লাচিত বরফুকন নামে এক দুঃসাহসী সেনাপতির আবির্ভাব ঘটে আসামে। সামান্য সৈন্য নিয়ে শক্তিশালী মুঘলদের প্রায় ১৭ বার পরাজিত করেছিল সে। সাধারণত রাতের অন্ধকারে মোগল সৈন্যদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়তো লাচিত বরফুকন। মোগল সেনাপতি রাম সিং এ
ধরণের আক্রমণের সাথে মোটেও পরিচিত ছিলেন না। তাই আসামের সেনাপতিকে চিঠিতে লেখেন যে এ ধরণের যুদ্ধ নিয়ম বহির্ভূত এবং বীরোচিত নয়। উত্তরে লাচিত বরফুকন লিখে পাঠান যে সিংহ সব সময় রাতের অন্ধকারেই শিকার করা পছন্দ করে। ভারতের ইতিহাসে আসামের এই বীর তেমন একটা পরিচিত না হলেও লাচিত বরফুকনের এই যুদ্ধের কলা কৌশল ভারতীয় সেনাবাহিনীর অবশ্য পাঠ্য বিষয়। যার প্রয়োগ ঘটানো হয়েছিল আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময়। ভারতে সংক্ষিপ্ত ট্রেনিং শেষে বিভিন্ন বর্ডারে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল মুক্তিযোদ্ধাদের। সেখান থেকে সন্ধ্যেবেলা দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতো তারা। তারপর যতটা সম্ভব অপারেশন শেষ করে ভোরবেলা আবার ক্যা¤েপ ফিরে আসতো তারা। গোটা রাত জেগে চলতো নানা ধরণের অপারেশন। মোটামুটি এই কৌশলেই যুদ্ধ চলছিল বেশ ক'মাস। একথা নিশ্চিত করে বলা যায় যে সেসময় পাকিস্তানী সৈন্যবাহিনী অত্যন্ত শক্তিশালী বাহিনী হিসেবে স্বীকৃত ছিল। তারপরেও তারা একসময় আমাদের দেশের লুংগি পরা মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে হার মানতে বাধ্য হয়। ভারতীয় সেনা নেতৃত্ব যে লাচিত বরফুকনের কাছে শেখা কৌশল যে এক্ষেত্রে কাজে লাগিয়েছিল তা বুঝতে কোন অসুবিধা হয়না। তবে বুঝতে পারেননি আমাদের ডিমলার জোতদার বিশিষ্ট রাজনীতিক মশিউর রহমান যাদু মিয়া। যুদ্ধের শুরুতে তিনি তিস্তা নদী পার হয়ে ডাহাগ্রামে এসেছিলেন। সেখানে তখন ইয়োথ ক্যা¤েপ লুংগি পরা ছেলেরা লাঠি হাতে লেফট রাইট করে চলেছে। সেখানে কয়েকদিন থাকার পর তার মনে হলো এই লুংগি পরা ছেলেদের দিয়ে আর যাই হোক পৃথিবীর অন্যতম শক্তিশালী পাকবাহিনীকে পরাস্ত করা সম্ভব নয়। অগত্যা সময় থাকতেই হরির কেত্তন গাওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে। তিনি দেশে ফিরে গিয়ে পাকিস্তানী বাহিনীর সাথে হাত মেলালেন। এর পরের ঘটনা মোটামুটি সবারই জানা। দেশ স্বাধীন হলে বঙ্গবন্ধু তাঁকে দালাল আইনে গ্রেফতার করে জেলে পোরেন। এরপর ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকা-ের পরে জিয়াউর রহমান তাকে জেল থেকে মুক্ত করে সিনিয়র মন্ত্রী বানান। সে আর এক গল্প। আসলে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ধরণটা এমনই ছিল যে এই ভুখা নাঙ্গা লুঙ্গি পরা মুক্তিযোদ্ধাদের দিয়ে শক্তিশালী পাকবাহিনীকে পরাস্ত করা সম্ভব হবে এটা মশিউর রহমান যাদু মিয়ার মত অনেকেই তখন ধারণা করতে পারেনি। তবে এক্ষেত্রে ভারতীয় সেনাবাহিনীর কূট কৌশল যে মূখ্য ভূমিকা পালন করেছিল এতে কোন সন্দেহ নেই। জেনারেল জ্যাকব তাঁর বইতে জেনারেল নিয়াজির সারেন্ডার স¤পর্কে লিখেছেন যে, ঢাকা শহরে তখন প্রায় ত্রিশ হাজার পাকিস্তানী সৈন্য অবস্থান করছিল। আর এর বিপরীতে ভারতীয় সৈন্য এসেছিল মাত্র তিন হাজার। কিন্তু কোনভাবেই জেনারেল নিয়াজি সেটা বুঝতেই পারেননি। জেনারেল জ্যাকব অবশ্য কাদের সিদ্দিকীকে তাঁর বিশ হাজার যোদ্ধাকে নিয়ে টাঙ্গাইল থেকে ঢাকার দিকে মার্চ করতে বলেছিলেন। কাদের সিদ্দিকী ঢাকায় প্রবেশ করে সোজা তেজগাঁ বিমান বন্দরে নিয়াজীর কার্যালয়ের সামনে গিয়ে নিয়াজীকে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে ছেড়ে দেয়ার দাবী জানিয়েছিলেন। বিষয়টা জ্যাকব নিয়াজীকে জানালে নিয়াজী মুক্তিযোদ্ধাদের চেয়ে ভারতীয় সেনাবাহিনীর হাতে আত্মসমর্পন করাকেই নিরাপদ মনে করেছিলেন। সামরিক বিচারে যতই শক্তিশালী হোক না কেন পশ্চিম পাকিস্তানীদের মাথা আসলেই মোটা। ঢাকা শহরে মাত্র কয়েক শ’ মুক্তিযোদ্ধা র্ক্যাক প্লাটুনের সদস্য হয়ে ঢুকেছিল। কিন্তুতাঁদের যত্র তত্র বোমা ফাটানো আর আক্রমণের ধরণ দেখে নিয়াজীর ধারণা হয়েছিল হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধা শহরে ঢূকে পড়েছে। বিপদের আশংকা করে তাই তিনি চিঠি লিখলেন জাতিসংঘে। সেই চিঠি নানা হাত ঘুরে শেষে পৌছালো জেনারেল জ্যাকবের হাতে। তারপরে তো যা হওয়ার তাই ঘটে গেল। রচিত হলো ৯৩ হাজার পাকিস্তানী সৈন্য আÍসমপর্নের ইতিহাস। ইন্দিরা গান্ধী যে কোন মূল্যের বিনিময়ে বঙ্গবন্ধুকে জীবিত ফেরত আনতে চেয়েছিলেন। তাই এই ৯৩ হাজার সৈন্যকে পর্যায়ক্রমে ফেরত পাঠিয়ে দিলেন শত্রু দেশ পশ্চিম পাকিস্তানে। বিনিময়ে বঙ্গবন্ধু ফিরলেন ১০ জানুয়ারি। সেদিন ফেরার পথে বঙ্গবন্ধু লন্ডন থেকে কয়েক ঘন্টার জন্য প্রথমে দিল্লিতে নেমেছিলেন। এয়ারপোর্টে অভ্যর্থনা জানিয়ে ইন্দিরা গান্ধী তাঁকে একটি জনসভায় নিয়ে যান। সেখানে অনেক আগে থেকেই হাজার হাজার দিল্লিবাসী অপেক্ষা করে ছিল। বঙ্গবন্ধু তাঁর স্বভাব সিদ্ধ ভঙ্গিতে লেডিস এন্ড জেন্টেল ম্যান সম্বোধন করে ইংরেজিতে বক্তৃতা শুরু করলেন। কিন্তু উপস্থিত জনগণের চিৎকারে প্রতিবাদে সেই বক্তৃতা থামাতে বাধ্য হলেন। কারণ সবাই বাংলায় তাঁর কথা শুনতে চায়। বঙ্গবন্ধু মুচকি হেসে বাংলায় বক্তৃতা দিলেন। এমনি অসংখ্য গল্প কাহিনীর জন্ম দিয়েছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ। আর এসব গল্পগুলোই মানসপটে ইতিহাসের চিত্র এঁকে দেয়।
আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে আর মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে যতো বিকৃতির ঘটনা ঘটেছে পৃথিবীর আর কোন দেশে তা বিরল। যুদ্ধের ঐ নয় আমাদের জাতীয় সাংস্কৃতিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক স¤পদ। তাই এর সঠিক উপস্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণ করা আমাদের জাতীয় দায়িত্ব। এ কাজে শুধু সরকার নয় দায়িত্ববান সকলকেই এগিয়ে আসতে হবে। ইংরেজিতে একটি কথা রয়েছে যে প্রকৃত ইতিহাস জানতে হলে পড়তে হবে between the lines। অর্থাৎ দুই লাইনের মাঝখানে যে কথাটা লেখা নেই সেটাও পড়তে জানতে হবে। তবেই জানা যাবে প্রকৃত ইতিহাস।
এক নজরে- এর অন্যান্য খবর