লেখক- ভাওয়াইয়া গবেষক, E-mail: sk_roy11@yaho.coom

" />
গীতিকবি শ্যামাপদ বর্মণ স্বকীয়তায় সমুজ্জ্বল- সুশান্ত কুমার রায়
স্টাফ রিপোর্টার: হামরা গাই ভাওয়াইয়া গান-
ওরে দোতরা বাঁশির সুরে সুরে-
উজাড় করি প্রাণ।
ওরে উত্তর বাংলার ভাওয়াইয়া গান-
দেশের দশের সগারে মান-
এই ভাওয়াইয়া গান যে হামার-
রাখিছে সম্মান।
সাত পুরুষের ধন যে হামার-
এই ভাওয়াইয়া গান-
এই ভাওয়াইয়ার মধুর সুরে-
উদাস করে প্রাণ।
ওরে ঠাকুর দাদায় গাইছে এ গান-
বাপো হামার গাইছে এ গান-
হামরাও গাইছি-গায় রে সগায়-
সগারে এই গান।
দুঃখ সুখের সাথী হামার-
এই ভাওয়াইয়া গান-
এই ভাওয়াইয়ার সুরে জাগে-
হামার মরা প্রাণ।
গীতিকবি শ্যামাপদ বর্মণ রচিত একটি ভাওয়াইয়া গান। উত্তরবঙ্গে ভাওয়াইয়া গানের অনুষ্ঠানে উদ্বোধনী সংগীত বা সূচনা সংগীত হিসেবে গীতিকবি শ্যামাপদ বর্মণের যে গানটি বহুল গীত হয়ে থাকে। উত্তরবঙ্গের ঐতিহ্যবাহী লোকসংগীত ভাওয়াইয়ায় স্বকীয়তায় সমুজ্জ্বল গীতিকবি শ্যামাপদ বর্মণ। ভাওয়াইয়ার স্বভাব কবি বলতে কোনো দ্বিধা নেই। মুখে অমলিন হাসি, বুকে ব্যথা-বেদনার পাহাড় নিত্য সঞ্চারী, সৃষ্টির আনন্দে মশগুল শ্যামাপদ, ভাওয়াইয়ায় গড়লেন জীবন তরী। লোকসংগীতের একটি অসাধারণ হৃদয়গ্রাহী শাখা ভাওয়াইয়া আর সেই মাটি ও মানুষের গানকে লেখনীর মাধ্যমে শিল্পীর শৈল্পিক গুণে সুরের মূর্ছনায় মানুষের অন্তরে গীতিকবি শ্যামাপদ বর্মণের ভাওয়াইয়া গান দোলা দেয় শিল্পমাধুর্যে। উত্তরবঙ্গের লোকসংস্কৃতি জগতে স্বভাবকবি শ্যামাপদ বর্মণ চিরভাস্কর হয়ে আছেন তাঁর রচিত ও গীত ভাওয়াইয়ায়। উত্তরবঙ্গের গ্রামীণ শ্রমজীবী নর-নারীর জীবন-জীবিকা, প্রকৃতি-পরিবেশ, ইতিহাস-ঐতিহ্য, উৎসব-পার্বণ, আচার-আচরণ, শ্রেণী বৈষম্য কবি শ্যামাপদ বর্মণ তুলে ধরেছেন তার ভাওয়াইয়ার কথামালা ব্যঞ্জনা ও সুরের মূর্ছনায়।
শ্যামাপদ বর্মণের গান বেতারের অনুষ্ঠানমালায় প্রচার এবং বিভিন্ন অনুষ্ঠানে শিল্পীদের কণ্ঠে গাওয়ার পাশাপাশি তাঁর কনিষ্ঠ ভ্রাতা বরদা প্রসাদ বর্মণ (আকাশবাণীর বি-হাই শিল্পী) এবং আমাদের এপার বাংলার স্বনামধন্য ভাওয়াইয়া শিল্পী রথীন্দ্রনাথ রায়, বেগম সুরাইয়া বেলী এবং বাংলাদেশ বেতারের সাবেক উপ-মুখ্য সংগীত প্রযোজক, শিল্পী, গীতিকার ও ভাওয়াইয়া গবেষক মো. সিরাজ উদ্দিনের কণ্ঠে অনেক গান গীত হয়েছে বলে জানা যায়। গীতিকবি শ্যামাপদ বর্মণকে শুধু ভাওয়াইয়া গান রচয়িতা বললে বোধ হয় ছোট করে দেখা হবে। বিভিন্ন ধরনের তিনি সংগীত রচনার পাশাপাশি কিছু রাগাশ্রিত গানও রচনা করেছেন। ভাওয়াইয়া তার সংগীত রচনা সম্ভারের একটি প্রশাখা মাত্র। গানের পাশাপাশি তিনি লিখেছেন কবিতা, প্রবন্ধ, ছোটগল্প, নাটক এবং সেই সঙ্গে উপন্যাস।
ধীরে বোলাও গাড়িরে গাড়িয়াল-আস্তে বোলাও গাড়ি।
এক নজর দেখিয়া নেও মোর দয়াল বাপের বাড়িরে গাড়িয়াল-
আস্তে বোলাও গাড়ি
অল্প বসে ও মোর গাড়িয়াল মায়ের কোলা ছাড়ি-
বুকোত পাষাণ বান্ধি ও মুই যাও সোয়ামীর বাড়িরে গাড়িয়াল
আস্তে বোলাও গাড়ি
বাপ ছাড়িনু মাও ছাড়িনুরে-ছাড়নু আশ পড়শী-
আলোন বসে ও মোর গাড়িয়াল-হনু পরার দাসীরে-গাড়িয়াল
আস্তে বোলাও গাড়ি। (কথা ও সুর-শ্যামাপদ বর্মণ)
সদ্য বিবাহিত কন্যার বিরহ-বিচ্ছেদ, বেদনাকে লেখনীর পারঙ্গময়তায় বাঙ্ময় করে তুলেছেন গীতিকবি শ্যামাপদ বর্মণ। বাবা-মায়ের স্নেহ, মায়া-মমতা ও ভালোবাসার বেড়াজাল ছিন্ন করে শ্বশুরালয়ে গমন। গাড়িয়ালকে আস্তে গাড়ি চালানোর অনুরোধ জানিয়ে অশ্রুসজল কন্যার আকুতি। গীতিকবি শ্যামাপদ বর্মণ স্বভাবকবিত্বের অধিকারী ছিলেন। উত্তরবাংলার সেই চিরচেনা মাটির গন্ধ ও পরিবেশেই বড় হয়েছেন। সবুজ শ্যামল গাছগাছালি, আঁকাবাঁকা মেঠোপথ, পাখির কলতান আর নিধূয়া পাথার এবং সেই মেঠোপথে ছৈ টানানো গরুরগাড়ি, গাড়িতে নাইওরি যাওয়ার দৃশ্য কবির চিরচেনা। এই মহান ভাওয়াইয়া গীতিকবি বাংলাদেশের তৎকালীন বৃহত্তর রংপুর জেলার পাটগ্রাম থানাধীন জগতবেড় গ্রামে ১৩৩৭ বঙ্গাব্দের ১২ মাঘ জন্মগ্রহণ করেন। পিতা প্রয়াত কালীকান্ত বর্মণ এবং মাতা কাদম্বরী দেবী। পিতা কালীকান্ত বর্মণ একজন সুকণ্ঠ গায়ক ছিলেন। আর সেই পারিবারিক সূত্র ধরেই সংগীত জগতে পদার্পণ। তবে উত্তরবঙ্গের মাটিতে যে প্রাণরস সঞ্চিত রয়েছে তার এক অনন্য প্রকাশ ঘটে তার রচিত ভাওয়াইয়া গানের মধ্যে। ভাওয়াইয়া সংগীত ভুবনের অনন্য পুরুষ ভাওয়াইয়া সম্রাট আব্বাস উদ্দিনকে তিনি তার মানস গুরু হিসেবে গ্রহণ করেন। প্রাইমারি স্কুলে অধ্যয়নকালীন সময়েই তার কবি প্রতিভার উন্মেষ ঘটে। শিক্ষাগুরু সুরেন্দ্র নাথ রায় আসোয়ার এর কাছ থেকে তিনি উৎসাহ-অনুপ্রেরণা পান। তার প্রথম কবিতা 'নিশীথ রাতে'। পাটগ্রাম হাইস্কুলে দশম মানে অধ্যয়নকালীন সময়ে কলকাতার বিখ্যাত সাপ্তাহিক মোহাম্মদীতে তার একটি কবিতা প্রকাশিত হয় ১৩৬০ বঙ্গাব্দের ১৫ আশ্বিন। তবে অর্থনৈতিক টানাপোড়েন আর দারিদ্র্যের নির্মম কষাঘাতে তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সমাপ্তি ঘটে।
পরবর্তীতে কুড়িগ্রাম হোমিও কলেজে ভর্তি হন এবং এইচএমবি পাস করেন।জীবিকার তাগিদে শিক্ষকতার পাশাপাশি হোমিও চিকিৎসক হিসেবে কাজ করেন। সেই সঙ্গে লেখনীর মাধ্যমে সাহিত্যচর্চা এবং সংগীতের প্রতি নিজেকে আবদ্ধ করে ফেলেন। পরবর্তীতে হোমিও চিকিৎসাও ছেড়ে দেন। তার সৃষ্টিশীল সত্তা প্রকাশিত হতে থাকে। বিখ্যাত দৈনিক আজাদ, দৈনিক ইত্তেফাক, বিভিন্ন সাপ্তাহিক, পাক্ষিক ও মাসিক পত্রিকায় তার অনেক লেখা নিয়মিতভাবে প্রকাশিত হতে থাকে। কলকাতা থেকে প্রকাশিত মৌচাক, রামধনু, জাগরী, শিশুতীর্থ, ঝিলিমিলি, সমতট, কলরব ছাড়াও উত্তরবঙ্গের পত্রিকাগুলোতে তার লেখা প্রকাশিত হতো। সেই সময়ে তার রচনাগুলো অত্যন্ত নন্দিত ও পাঠক প্রিয়তা পায়। তৎকালীন সময়ে বিখ্যাত সাহিত্য সংস্থা কর্তৃক গৌড়বঙ্গ সাহিত্য পরিষদ সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য কবিরতœ উপাধিতে ভূষিত করেন।
একবার আসিয়া-
পতিধন মোর যাও দেখিয়া-
আহাঃ হাঃ রে।
ছাড়িয়া সুন্দর নারী, কুনকা হিয়া ধরি-
ওরে কার আশায় বৈদ্যাশে পতি-
আছেন আজি পরি (আহাঃ হাঃ রে)।
গাড়ি বয়য়া যান গাড়িয়াল ও-
গাড়িয়াল ওইনা পন্থ দিয়া-
নাইওর যাবার চায়ছে মনটা
তোর গাড়ি দেখিয়া (গাড়িয়াল ও)।
গরুর গলায় ঘুগুরা বাজেরে-
ও গাড়িয়াল ঝুমুর ঝুমুর করি-
মনে কয় মোর গাড়িত চড়ং
আন্ধন বাড়ন ছাড়ি (গাড়িয়াল ও)।
রসিক কানাইরে-
পার করিয়া দেরে কানাই
বেলা ডুবিয়া যায়।
গোকুলে হামার বাড়ি
হামরা যে গোকুলের নারী
বসি আছি পার ঘাটেতে
পার হবার আশায়
ওকি হায়রে মোর পোড়া কপাল-
জনম গেল মোর কান্দিয়ারে-
কি দোষে মুই হনু গাবুর আড়ি।
বিয়ার বছর নাই ঘুরিতে
এই ঘটিল মোর কপালোতে।
প্রাণো পতি মোর কোন্টে গেইলেন ছাড়ি
ও মুই গান গাও ওরে-
দোতরা বাজেয়া,
টারী বাড়ি আশপড়শী-
সগায় কয় বাউদিয়া
ও মুই গান গাও রে।
ওরে নদীর শোভা বান বরিষা রে
জমিনের শোভা ধান,
ওরে দিনের শোভা সুরুজ রে মন-
আইতের শোভা চান।
বাড়ির শোভা সুন্দর নারীরে-
গুয়া পানের বাগান-
ওরে রসিয়ার শোভা রসের দোতরা
গায় ভাওয়াইয়া গান
আজি পার করো পার করো, মাঝিরে-
মাঝি পার করো আমারে,
দীন ভিখারি পরের কাঙ্গাল হে
দয়াল কান্দি বসি পাড়ে।
সকাল বেলা আইলাম ঘাটেরে,
দয়াল-পাড়ে যাবার আশে
সকাল গেল বৈকাল গেলরে-
দয়াল সন্ধ্যা হৈলো শ্যাষে।
নিদান কালের বন্ধু হে তুমি-
পরকালের গতি
দয়া কর তোমার পদে
থাকে যেন মতি হে-
দয়াল হে চরণ ছাড়া প্রভু
কর না আমারে।
সংসারে সকলি পরহে-
কাঁও নহে আপনা-
স্বার্থ ছাড়া ভাই ভাতিজা-
কেউ কারে পুছে না হে
দয়াল হে-স্বার্থে সবাই
আপন হয় সংসারে।
তার শ্রোতানন্দিত গানগুলো অখন্ড সুরের মূর্ছনায় অগণিত ভক্ত শ্রোতাদের অন্তর ছুঁয়েছে অপার মহিমায়। তৎকালীন সময়ে ঢাকা বেতারের উদ্যোগে আয়োজিত পূর্ববঙ্গ পল্লীগীতি উৎসবে সংগীত পরিবেশন করে তিনি বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন। ১৯৬২ সালে ঢাকা বেতারে অডিশন দিয়ে বেতারের শিল্পী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। প্রথমে ঢাকা ও পরে রাজশাহী বেতারে নিয়মিতভাবে সংগীত পরিবেশন করেন।১৯৬৪ সালে নিজ জন্মভূমি তৎকালীন পূর্বপাকিস্তান ছেড়ে ভারতে চলে যান। সেখানে গিয়ে সংগীত ও সাহিত্য সাধনা চালিয়ে যান। ১৯৬৬ সালে আকাশবাণী কাশিয়াং বেতারের একজন নিয়মিত শিল্পী হিসেবে যোগদান করেন। এ ছাড়াও আকাশবাণী শিলিগুড়ি কেন্দ্র থেকেও সংগীত পরিবেশন করেন। পরবর্তীতে ১৯৭৮ সালে আকাশবাণীর গীতিকার হিসেবে অনুমোদন লাভ করেন। তার রচিত গানগুলো আকাশবাণীর বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গীত হয়। ১৯৮৮ সালে তিনি আকাশবাণী শিলিগুড়ি কেন্দ্রের প্রোগ্রাম স্ক্রিনিং কমিটির সদস্য এবং ১৯৯০ সালে অডিশন বোর্ডের সদস্য নিযুক্ত হন। উত্তরবঙ্গের লোকসংস্কৃতিতে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে আব্বাস উদ্দিন স্মরণ সমিতি ১৯৯৩ সালের ৫ নভেম্বর সংবর্ধনা জ্ঞাপন করেন কলকাতার রবীন্দ্র সদনে।কবিরতœ শ্যামাপদ বর্মণ জামালদহে নিজ বাড়ি কবিতীর্থ বর্মণ পল্লীতে ১০ মার্চ ২০০৩ সালে পরলোক গমন করেন।
লেখক- ভাওয়াইয়া গবেষক, E-mail: sk_roy11@yaho.coom


সপ্তাহের বিশেষ প্রতিবেদন- এর অন্যান্য খবর