লালমনিরহাট পৌরসভায় মেয়র পদে চতুরমুখী লড়াই
বার্তা রিপোর্ট: আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারী লালমনিরহাট পৌরসভা নির্বাচন-২০২১। নির্বাচন ঘিরে ইতোমধ্যেই প্রচারণায় জমে উঠেছে। বিশ্ব ভালবাসা দিবসে অনেকটা কাকতালিও ভাবে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ৪র্থ ধাপের পৌরসভা নির্বাচন। এই বিশেষ দিনটিতে ভোটাররা তাদের ভালবাসার এবং আস্থার প্রার্থীকেই বেছে নিবেন বলে মনে করেন অনেকেই। দিন যতই ঘনিয়ে আসছে নির্বাচন সমীকরণ ততই কঠিন হয়ে উঠছে বলে ধারনা ভোট সংশ্লিষ্ট নেতা-কর্মীদের। অধিকাংশ ভোটারের ধারণা এবারের পৌর নির্বাচনে চর্তুরমুখী লড়াই হবে। এ নিয়ে চায়ের টেবিলে এখন ঝড় চলছে। চুল ছেড়া বিশ্লেষণ করছে সমীকরণে কে এগিয়ে কে পিছিয়ে। শেষ হাসিটা অবশেষে কে হাসবেন, সে জন্য অপেক্ষা করতে হবে ১৪ তারিখ পর্যন্ত। শৈত প্রবাহ, হিমেল বাতাস আর কনকনে শীত উপেক্ষা করে নেতা-কর্মীরা প্রার্থীদের পক্ষে বাড়ী-বাড়ী দিনরাত ছুটে চলেছেন, আর চায়ের দোকানে গরম চা’য়ের কাপে চুমুক দিয়ে সাধারণ ভোটাররা অতীত বর্তমানের নানা হিসাব মিলাচ্ছেন। এবারে পৌর নির্বাচনে মেয়র পদে নৌকা প্রতীকে ভোট করছেন সহকারী অধ্যাপক ও পৌর আওয়ামী লীগ সভাপতি মোফাজ্জল হোসেন, বিএনপির পক্ষে ধানের শীর্ষ প্রতীক নিয়ে সাবেক মেয়র মোশারফ হোসেন রানা, জাতীয় পার্টির লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে সাবেক কাউন্সিলর ও প্যানেল মেয়র এস.এম ওয়াহিদুল হাসান সেনা,  স্বতন্ত্র প্রার্থী রেজাউল করিম স্বপন নারিকেল গাছ প্রতীক এবং ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী আমিনুল ইসলাম হাতপাখা প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। লালমনিরহাট পৌরসভা ৯টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত। ব্রীজের ওপারে ৫টি এপারে ৪টি। ৯টি ওয়ার্ডে মোট ভোটার সংখ্যা ৪৭ হাজার ৭৬৯টি। তন্মধ্যে পুরুষ ভোটার ২৩ হাজার ৫৮৭ ও মহিলা ভোটার ২৪ হাজার ১৮২। নারী ও পুরুষ ভোট প্রায় সমান সমান। অনেকটা উৎসব মুখর পরিবেশে চলছে ভোটের প্রচার প্রচারণা। প্রার্থীরা নির্বাচনী বিধি মেনেই প্রচার কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
লালমনিরহাট পৌরসভায় বিগত ২ বারের নির্বাচিত মেয়র রিয়াজুল ইসলাম রিন্টু নৌকার মাঝি হতে পারেননি। তিনি বর্তমান মেয়র হিসেবে তার শেষ কার্যকাল অতিক্রান্ত করছেন। তার বাবা মরহুম মকবুল হোসেনও ছিলেন এই পৌরসভার ৩ বার নির্বাচিত পৌর চেয়ারম্যান। বাবার অবর্তমানে রিন্টু আওয়ামী লীগের নৌকার প্রতীক নিয়ে পর-পর ২ বার নির্বাচিত হন। এবারে নৌকার কর্মী সমর্থক তথা সাধারণ ভোটারদের প্রত্যাশা ছিল শেষ মেষ রিন্টুই হবে নৌকার মাঝি। কিন্তু সকল জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে নৌকায় উঠে পড়েন সহকারী অধ্যাপক পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি মোফাজ্জল হোসেন। নৌকার নতুন মাঝি হিসাবে মোফাজ্জল হোসেনের ভোটারদের মাঝে যতটা উচ্ছাস, উদ্দীপনা এবং ভোটের মাঠে যেমন ঝড়ো হাওয়া তুলবার কথা ছিল কার্যত: মনোনয়ন পাওয়ার পর সেটি হয়ে উঠেনি। রেলওয়ে বিভাগীয় শহর লালমনিরহাট একটি ওভার ব্রীজ দ্বারা ২ অংশে বিভক্ত। স্থানীয় মানুষ তাকে ব্রীজের এপার ওপার বলেই অভিহিত করে থাকেন। নৌকার প্রার্র্থীতা এপারে চলে এলে ওপারে অনেকটা শুনশান নিরবতা তৈরী হয়। ভোটাররা নতুন করে হিসাব করতে শুরু করে। নৌকার নতুন মাঝি মুলত: জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের বিশেষ স্নেহ ভাজন এবং তার মনোনয়ন প্রাপ্তিতে তাদের একটা বড় ভূমিকা আছে বলে অভিযোগ রিন্টু শিবিরের নেতা-কর্মীদের। তারা এটা কখনই কল্পনা করতে পারেনি যে নৌকায় নতুন কেউ উঠে বসবে। রিন্টুর পরিবার জেলা আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে একটি পরিচিত নাম। তাই অনেকটা হতাশ হয়ে পরেন ব্রীজের ওপারের নেতা-কর্মীরা। তবুও মনোনয়ন পত্র ক্রয় করেন বর্তমান মেয়র রিয়াজুল ইসলাম রিন্টু। অত:পর জেলা আওয়ামী লীগের বিশেষ সভায় রিন্টুকে জেলার সাংগঠনিক সম্পাদক পদে আসিন করবেন মর্মে প্রতিশ্রুতিতে তিনি তার প্রার্থীতা প্রত্যাহার করে নেন এবং নৌকার প্রতীকে তার সমর্থন ব্যক্ত করেন। ইতিমধ্যে তিনি নৌকার হয়ে ভোট প্রচারনায় অংশ নিয়ে ভোটারদের কাছে ভোট চাইছেন।
সাধারণ ভোটাররা মনে করছে সম্মিলিত দলীয় শক্তি এক মঞ্চে কাজ করলে নৌকার পালে বাতাস লাগতে পারে। কিন্তু কার্য্যত তা হচ্ছে না। বলে অনেকে মনে করেন। বিগত উপজেলা নির্বাচনে জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নজরুল হক পাটোয়ারী ভোলা নৌকা প্রতীক নিয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী কামরুজ্জামান সুজন এর নিকট বিপুল ভোটে পরাজয় বরন করেন। সেই নির্বাচনে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এ্যাডভোকেট মতিয়ার রহমানের নেতৃত্বে দলের বৃহৎ অংশ নৌকার বিরোধিতা করে বিদ্রোহী র্প্রাথী কামরুজ্জামান সুজন-এর পক্ষে ভোটে অংশ নেয়। ফলে নৌকা প্রতীকের পরাজয় নিশ্চিত হয়। অনেকেই বলছেন সেই নির্বাচনের কথা। সেই দগদগে ক্ষত এখনো শুকায়নি অনেকের মন থেকে। তাই বিশ্লেষকরা মনে করছেন এবারের পৌর নির্বাচনে সেই বিভক্তি, মান অভিমান এবং নৌকার বিরোধীতা একটি বড় ভূমিকা পালন করবে। এতে করে ভোটের হিসাব নিকাশ বদলে যাবে। এ বিষয়ে পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক কাজী নজরুল ইসলাম তপন বলেন, প্রার্থীতার বিষয়ে দলে প্রতিযোগিতা থাকলেও কোন কোন্দল নেই। এখন সবাই ঐক্যবদ্ধ এবং জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী।
আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী সহকারী অধ্যাপক মোফাজ্জল হোসেন বলেন, জননেত্রী শেখ হাসিনা আমাকে নৌকা প্রতীক দিয়েছেন। লালমনিরহাট পৌরসভার বরাবরে নৌকা প্রতীক জয় পেয়ছে। এবারেও তার ব্যতিক্রম হবে না। প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার উন্নয়ন কর্মসূচী অব্যাহত রাখতে পৌরবাসী আমাকে নির্বাচিত করবেন। নৌকা হচ্ছে উন্নয়নের প্রতীক।
স্বতন্ত্র প্রার্থী রেজাউল করিম স্বপন বিপুল অর্থ সম্পদের মালিক হয়েছেন। তার পক্ষে নিরবে কাজ করছে দলেরই অনেক নেতা-কর্মী, রাজনৈতিক মহলে এমন সমলোচনা চলছে। তারা গোপনে নৌকার বিরোধীতা করে ভোট চাইছে। দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগ রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকার কারণে রেজাউল করিম স্বপন নৌকার ভোট ব্যাংকেই ভাগ বসাবেন বলে মনে করছেন ভোট বোদ্ধারা। এতে করে ক্ষতির মুখে পড়বেন নৌকার প্রার্থী মোফাজ্জল হোসেন। পাশাপাশি ভোটাররা মনে করে রেজাউল করিম স্বপন মূলত: বর্তমান মেয়রের আর্শিবাদ পুষ্ট হয়ে পৌরসভার উন্নয়নমূলক ঠিকাদারী কাজের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। স্বপন মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য কয়েক বছর ধরে ভোটারদের বিভিন্নভাবে সাহায্য ও সহযোগিতা করে আসছেন। সর্বপরি কোভিড আতঙ্কের সময় তিনি ব্যাপকভাবে ত্রাণ তৎপরতা চালিয়েছে যা তার প্রতি ভোটারদের আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে বলে অনেকেই অভিমত ব্যক্ত করেছেন।
জাতীয় পার্টির একক প্রার্থী সাবেক কাউন্সিলর ও প্যানেল মেয়র এস.এম ওয়াহিদুল হাসান সেনা। তিনি বিগত দিনে ১নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর থাকায় যথাসম্ভব মানুষের সেবা করার চেষ্টা করেছেন। তিনি গত পৌর নির্বাচনে মেয়র পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে দু’টি বৃহৎ দলের বিপরীতে সম্মানজনক ভোট পেয়ে পরাজিত হন। এই ভোটটি মূলত: তার ব্যক্তিগত ইমেজের ফসল। যা তিনি এবারেও পাবেন বলে মনে করেন অনেকেই, তার সাথে যোগ হবে জাতীয় পাটির ভোটারদের ভোট। একজন সাদা মনের মানুষ হিসাবে তিনি খেটেখাওয়া মানুষের কাছে জনপ্রিয় এবং এই আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি.এম কাদেরের স্বচ্ছতা এবং পরিচ্ছন্নতার ইমেজকে কাজে লাগিয়ে জাপার নেতা-কর্মীরা দিন-রাত ছুটে বেড়াচ্ছেন ভোটারদের দাড়ে-দাড়ে। এবিষয়ে জাপা প্রার্থী এস.এম ওয়াহিদুল হাসান সেনা বলেন, আমি সবসময় মানুষের জন্য কাজ করেছি, মানুষের সাথে থাকতে চাই। আমাকে নির্বাচিত করলে একটি জনবান্ধব উন্নত পৌরসভার উপহার দিতে পারবো, কারণ হিসাবে তিনি উল্লেখ করেন, যেহেতু এ আসনের বর্তমান এমপি ও পাটির চেয়ারম্যান জি.এম কাদের তিনি লালমনিরহাট বাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত একটি দৃষ্টিনন্দন এবং সেবা বান্ধব পৌরসভার বিনির্মাণে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করবেন। আমি তার সাথে সমন্বয় করে উন্নয়নে গতিধারাকে আরো বেগবান করতে পারবো।  
অপরদিকে বিএনপি’র প্রার্থী সাবেক মেয়র মোশারফ হোসেন রানা তার দলীয় নেতা-কর্মীদের নিয়ে ছুটে বেড়াচ্ছেন ভোটারদের দাড়ে-দাড়ে। তিনি মনে করেন তাদের একটি নির্দিষ্ট ভোট ব্যাংক আছে পৌরসভায়। সেটিকে পুজি করে তিনি হিসাব নিকাশ করছেন কিভাবে বৈতরণী পার হওয়া যায়। তার নেতা দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক উপমন্ত্রী অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলু তার সমর্থনে খুলি বৈঠকে যোগ দিয়ে ভোট চাইছেন। মোশারফ হোসেন রানা বলেন, তিনি বিগত দিনে একবার মেয়র ছিলেন, তিনি মানুষের জন্য পৌরসভার উন্নয়নে কাজ করেছন, তাই জয়ের ব্যাপারে তিনি আশাবাদী। তবে সাধারণ ভোটাররা মনে করেন সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে এবং ভোটাররা স্ব:তস্ফুত ভাবে ভোট দিতে পারলে চমক অপেক্ষা করছে পৌরবাসির জন্য। একটি আধুনিক সেবাবান্ধব পৌরসভা বিনির্মাণে অপেক্ষাকৃত তরুণ সেবক মানসিকতার প্রার্থীকেই ভোটাররা বেছে নিবেন বলে অনেকের ধারণা।
স্বতন্ত্র প্রার্থী রেজাউল করিম স্বপন জানান, আমি লালমনিরহাট পৌরসভায় কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন মানবিক ও সামাজিক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছি। পৌরসভার সাধারন ভোটারেরা আমাকে তাদের কাছের মানুষ, আপন মানুষ হিসেবে মনে করেন। তাই নির্বাচন নিরপেক্ষ হলে পৌর নির্বাচনে আমি বিজয়ী হওয়ার আশাবাদী। তিনি জেলার নির্বাচন অফিসার ও জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনকে নিরপেক্ষ ও স্ষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের আহবান জানান।
আমার ভোট আমি দিব। বুঝে শুনে দেখে দিব- এই স্লোগানের ব্যাপক প্রচারণা রয়েছে। এতদসত্বেও ভোটারদের আশঙ্কা, আদৌও কি তারা ভোট দিতে পারবেন। ভোট মানেই উৎসাহা-উদ্দীপনা, আমেজ। কিন্তু নিকট অতীতে নানারূপ কর্মকান্ডের দরুন ভোটারদের মাঝে থেকে শঙ্কা ও আতঙ্ক দৃঢ় হয়নি। তাই অনেকের মাঝে প্রশ্ন ভোট সুষ্ঠ ও নিরপেক্ষভাবে হবে কি? তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে ভোট সুষ্ঠভাবে নেয়া হবে। উল্লেখ আগামী ১২ ফেব্রুয়ারী লালমনিরহাট পৌরসভার ১৮টি কেন্দ্রে এভিএম পদ্ধতিতে ভোটারদেরকে ভোট প্রদান বুঝিয়ে দেয়া হবে। ভোটারদেরকে নিজ নিজ কেন্দ্রে উপস্থিত হওয়ার জন্য আহবান জানানো হয়েছে।



জাতীয় বার্তা- এর অন্যান্য খবর