সংবিধানে মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধা শব্দ লেখা নেই!
স্টাফ রিপোর্টার: ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্ব পূর্ণ লড়াইয়ে বিজয় অর্জিত হয়। এতে ৩০ লাখ শিশু, যুবক, যুব মহিলা, নর-নারী, বৃদ্ধ-বৃদ্ধার প্রানোৎসর্গ, ২ লাখ মা বোনের সম্ভ্রোম হানি, অপরিসীম ত্যাগ-তিতিক্ষা, নির্যাতন-নিপীড়নে সর্বপরি এক সাগর রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জিত হয়। মজলুম জননেতা এশিয়া-আফ্রিকা-ল্যাটিন আমেরিকার মহান নেতা, প্রোফেট অব ভায়োলেন্স, ফায়ার ইটার মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর বলেছেন, রক্তের সাগর পাড়ি দিয়ে, আগুনের পাহাড় ডিঙ্গিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে।
রক্ত¯œাত বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে ৪ নভেম্বর মহান জাতীয় সংসদে গৃহীত হয়। প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, আমরা বাংলাদেশের জনগণ। ১৯৭১ খ্রীষ্টাব্দের মার্চ মাসের ২৬ তারিখে স্বাধীনতা ঘোষণা [জাতীয় মুক্তির জন্য ঐতিহাসিক সংগ্রামের] মাধ্যমে স্বাধীন সার্বভৌম গণ প্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করিয়াছি। প্রথম ভাগ: প্রজাতন্ত্রে মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধার শব্দটি উল্লেখ নেই। সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি নবম অনুচ্ছেদে জাতীয়তাবাদ শব্দটির ব্যাখায় বলা হয়েছে, ভাষাগত ও সংস্কৃতিগত একক সত্তাবিশিষ্ট যে বাঙালী জাতি ঐক্যবদ্ধ ও সংকল্পবদ্ধ সংগ্রাম করিয়া জাতীয় মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অর্জন করিয়াছেন। সেই বাঙালী জাতির ঐক্য ও সংহতি হইবে বাঙালী জাতীয়তাবাদের ভিত্তি। এই ব্যাখাটিও মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধা শব্দ দু’টি সাংবিধানিক স্বীকৃতির পর্যায়ে পড়ে না। মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধা এই দু’টি শব্দ সংবিধানে প্রস্তাবনায় না থাকায় রাষ্ট্রের স্বীকৃতি আর অঙ্গীকার অনুপস্থিত থেকে যায়। প্রকৃত ইতিহাস ঢাকা পড়ে। এমনকি ইতিহাস বিকৃতির আশংকাও দেখা দেয়।   
এ দেশের কৃষক, শ্রমিক, কামার, কুমার, কুলি, তাতি, জেলে, বেদে, মজদুর, ছাত্র-শিক্ষক ও যুবকেরা ভারতীয় সেনাবাহিনীর তত্বাবধায়নে গেরিলা প্রশিক্ষণ ও হাতে অস্ত্র তুলে নিয়ে জীবনবাজি রেখে মুক্তিযুদ্ধে ঝাপিয়ে পরে। পাকিস্তানী দখলদার বাহিনী তাদের এ দেশীয় দোসর রাজাকার- আলবদর-আল শামস্সহ স্বাধীনতা বিরোধ রাজনৈতিক শক্তিকে পরাজিত করে বাংলার স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করে ।
দেশের স্বাধীনতা, স্বাধীন ও সার্বভৌম সত্ত্বা আর অস্তিত্বের সাথে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। মুক্তিযুদ্ধের সাথে জড়িত মুক্তিযোদ্ধা। একটি আর একটি থেকে বিচ্ছিন নয়। মুক্তিযুদ্ধ যদি সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত না হয় তাহলে মুক্তিযোদ্ধাদের কোন রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও মর্যাদা থাকে না। স্বাধীনতার ৪৯ বছরের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেয়া হয়নি। অন্যদিকে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা প্রনয়নের নামে নানারূপ অনিয়ম, কারচুপি, মুক্তিযোদ্ধার সংগার পুনঃপুনঃ পরিবর্তন, দলীয়করণ, আত্মীয়করণ, ঘুষ, বাণিজ্যসহ জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে ইতিমধ্যে লক্ষাধিক অমুক্তিযোদ্ধাকে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। আবারও অমুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা প্রণয়নের জন্য নতুন নতুন ছক ও যাচাই-বাছাই শুরু হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে ভারতীয় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা সংখ্যা সর্বোচ্চ ৬৫ হাজার। যারা ফ্রিডম ফাইটার নামে পরিচিত। পাকিস্তান আমলে কর্মরত সেনা, নৌ, বিমান বাহিনী, ইপিআর, পুলিশ, আনসার, মোজাহিদ যারা পালিয়ে কিংবা স্বতঃস্ফূতভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে তাদের সংখ্যা সর্বোচ্চ ৩০ হাজার। এদেরকে বলা হয় মিলিটারী ফোর্স (এমএফ। তাছাড়া রয়েছে কাদেরিয়া বাহিনী, মুজিব বাহিনী সদস্য ও ভারতের মুক্তিক্যাম্পে (পশ্চিম বঙ্গে যে সেনানিবাসে গেরিলা মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ হয়েছে) অফিসার সট কোর্সে প্রথম ব্যাচে ৫৮ জন প্রশিক্ষণ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। দ্বিতীয় অফিসার সট কোর্সে ৬৭ জন প্রশিক্ষণ চলাকালীন সময়ে দেশ স্বাধীন হয় পরবর্তীতে ১৯৭২ সালে কমিশনপ্রাপ্ত হয়। এফএফ ও এমএফ এবং অন্যান্যদের নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা কোন অবস্থায় ৯৫ হাজারের বেশি হবে না।  এ ক্ষেত্রে স্বাধীনতার পরপরই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন সরকার ১৯৭২ সালে ৭ আগস্ট মুক্তিযোদ্ধা সংজ্ঞা নির্ধারন করে গেজেট প্রকাশ করেছিলেন। ইংরেজি প্রকাশিত গেজেটে বলা হয়েছে- মুক্তিযোদ্ধা বলতে বোঝায় যে কোনও ব্যক্তি সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে নিয়োজিত যে কোনও বাহিনীর সশস্ত্র সদস্য হিসাবে যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন বা দায়িত্ব পালন করেছেন, তবে প্রতিরক্ষা পরিষেবা, পুলিশ বা সিভিল সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা অন্তর্ভুক্ত হবে না।
বঙ্গবন্ধুর এই সংজ্ঞার ভিত্তিতে একাত্তরের রণাঙ্গনের অংশগ্রহণকারী বীর মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা প্রণয়ন না করে বিভিন্ন সরকারের আমলে দলীয়করণ, আত্মীয়করণ ও বাণিজ্যকরণের জন্য মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা বারবার পরিবর্তন করে নতুন নতুন মুক্তিযোদ্ধার তালিকা তৈরি সংযোজন আর বিয়োজন করা হলেও স্বাধীনতা যুদ্ধের সূবর্ণ জয়ন্তীর দাঁড়প্রান্তে এসে মুক্তিযোদ্ধার নির্ভূল ও সঠিক তালিকা প্রণয়ন করা হয়নি। অমুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করায় একাত্তরের প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের মান-সম্মান ও মর্যাদা ক্ষুণœ হচ্ছে। সর্বপরি মুক্তিযোদ্ধাদের ঐতিহাসিক অবদান ত্যগ-তিতিক্ষা আর শৌর্যবীর্যকে অস্বীকার করা হচ্ছে। ফলে মুক্তিযোদ্ধাদের মাঝে হতাশা, বঞ্চনা আর রাষ্ট্রীয় উপেক্ষা অন্তর্জালা বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই জীবনের শেষ প্রান্তে এসে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা সাংবিধানিক স্বীকৃতি চায়। এটি গোটা জাতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষভাবে উল্লেখ, ১৯৭১ সালে ২০ ডিসেম্বর স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী পরিষদের সভায় কার্যবিবরণী উল্লেখ করা হয় যে, মুক্তিযোদ্ধাদের পুনর্বাসন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। সভায় মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ৮০ হাজার উল্লেখ করা হয়েছিল। (সূত্র: ৭১ মূলধারা-লেখক মাঈদুল ইসলাম প্রথমা প্রকাশনী)।
বর্তমান ক্ষমতাশীল আওয়ামী লীগের ৩টি নির্বাচনী ইস্তেহারে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং তাদের অবদানের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির প্রতিশ্রুতি বা অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে তার প্রতিফলন পরিলক্ষিত হচ্ছে না।
এখানে আরও উল্লেখ যে, ১৯৭২ সালে মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা নির্ধারণ এবং ১৯৭৩ সালে মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার জন্য ৬৭৮ জন মুক্তিযোদ্ধাকে তালিকাভুক্ত করে বিভিন্ন খেতাবে ভূষিত করা হয়। কিন্তু ভারতীয় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এবং যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের তালিকা প্রণয়ন বা তাদের মর্যদা নির্ধারন এমনকি রাষ্ট্রীয় খেতাবে ভূষিত করা হয়নি। বিচ্ছিন্নভাবে ৮/১০টি খেতাব দেয়া হয়েছে। বেশির ভাগ খেতাবধারীরা হচ্ছে প্রতিরক্ষা বাহিনীকে পুলিশ, আনসার, মুজাহিদ সদস্য।
ইতিমধ্যে লক্ষাধিক অমুক্তিযোদ্ধা তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। আবারও যাচাই-বাছাইয়ের নামে লক্ষাধিক অমুক্তিযোদ্ধাকে তালিকা ভুক্তির পায়তারা চলছে বলে একাত্তরের প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা অভিমত ব্যক্ত করেছেন।
আবারও ৩০ জানুয়ারি থেকে সারা দেশে তিন স্বাক্ষীর মাধ্যমে যাচাই-বাছাই এর মধ্য দিয়ে ভূয়া তথা অমুক্তিযোদ্ধাদর চিহ্নিত করার কাজ শুরু করেছে মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয় ও জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা)।
এক বিষয়ে একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধা সংগঠনের পক্ষ থেকে ভূয়া তথা অমুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা থেকে বাদ দিয়ে ১৯৭২ এর সংজ্ঞা মোতাবেক মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা প্রনয়ণের জন্য সরকারের নিকট দাবী জানানো হয়েছে। নেতৃবৃন্দ আদিভৌতিক সিদ্ধান্ত ‘তিন স্বাক্ষীর ফর্মূলা নয়’ বরং প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা তালিকা প্রণয়নে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন জাতীয় কমিশন গঠনের দাবী জানান। মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয় সচিবের তথ্য মতে দেশে ভাতাপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৯২ হাজার। কিন্তু সফটওয়্যারের মাধ্যমে ভাতা প্রদানের ক্ষেত্রে ২০ হাজার মুক্তিযোদ্ধার নাম বাদ পড়েছে। এদের জাতীয় পরিচয় পত্র, জন্মনিবন্ধন ও ভোটার আইডি কার্ডের সঙ্গে নামের বানান ও জন্ম তারিখের মিল নেই।
দেশে মুক্তিযোদ্ধাদের ১১ বার যাচাই-বাছাই হয়েছে। তন্মধ্যে ১৯৮৪ সালে ১ লাখ ২ হাজার ৪৫৮ জন  মুক্তিযোদ্ধার নাম অন্তর্ভুক্ত করে জাতীয় তালিকা প্রণয়ন করা হয়। ১৯৮৮ সালে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট ভারতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ৬৯ হাজার ৮৩৩ জনের একটি অসম্পূর্ণ তালিকা প্রণয়ন করেন। এখানে কিছু সংখ্যক ভারতীয় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধার নাম তালিকাভুক্ত হয়নি।
১৯৯৮-৯৯ সালে প্রণীত হয় সবুজ ও লাল মুক্তিবার্তা তালিকা সেখানে মুক্তিযোদ্ধর সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৮৬ হজার ৮৮৯ এবং ১ লাখ ৫৮ হাজার ৪৮২ জন।
পৃথিবীর কোন দেশে মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয় না থাকলেও বিগত বিএনপি-জামাত জোট সরকারের আমলে মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয় ও জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল গঠন করা হয়। জোট সরকারের আমলে ১ লাখ ৮৯ হাজার ৮৮৯ জন মুক্তিযোদ্ধার নাম গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়।
মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর তথ্য মতে, কোন না কোন তালিকায় অন্তর্ভুক্ত মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৫৬ জন। স্বীকৃতির দাবী করেছেন, এমন মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ২ লাখ ৫১ হাজার ২৮৫ জন। তিনি জানান, একজনের নাম একাধিক দলিলে থাকা মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা বেশি মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে এর স্যংা ১ লাখ ৭০  হাজারের বেশি হবে না। মন্ত্রণালয় সূত্র জানান, বর্তমানে স্বীকৃতি পাওয়া মুক্তিযোদ্ধা সংখ্যা ২ লাখ ৩ হাজার ৫৬ জন।
একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধা সংগঠনের পক্ষ থেকে এফএফ, এমএফ, মুজিব বাহিনী, মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী শিল্পী, মুজিব নগর সরকারের কর্মচারী, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকসহ অন্যান্য দাবীদার মুক্তিযোদ্ধাদের পৃথক পৃথক তালিকা প্রণয়নের দাবী জানানো হয়েছে ।


সম্পাদকীয়- এর অন্যান্য খবর