লালমনিরহাট বার্তা
আজকের উদ্যোক্তা : স্বপ্ন পূরণ করতে উদ্যোগকে পেশা হিসেবে নিয়েছি আমি
রোকসানা আকতার : May 20, 2021, 12:06:33 PM সময়ে

আজকের উদ্যোক্তা : স্বপ্ন পূরণ করতে উদ্যোগকে পেশা হিসেবে নিয়েছি আমি

সত্যি বলতে কখন ভাবিনি উদ্যোগ নিবো বা উদ্যোক্তা হবো। কিন্তু হয়েছি। মানুষের জীবনের লক্ষ্য, গতিপথ কখন কিভাবে বদলে যায় কেউ বলতে পারে না। তবে আমার ক্ষেত্রে একটা ব্যাপার ছিলো তাহলো অতি আবেগ যা কিনা আমার লক্ষ্যে পৌঁছাতে বাঁধা হয়ে কাজ করেছে। যখন বুঝেছি তখন দেরী হয়ে গেছে তবে বলবো না খুব বেশি দেরী করে ফেলেছি। তাইতো আমি এখন একজন উদ্যোক্তা। বলতেই ভালো লাগে। থেমে যাইনি, থেমে যাবো বলে কি পৃথিবীতে এসেছি, একদম না। আমি মানুষের জন্য কাজ করছি। তাদের সর্বোচ্চ ভালো দেশি খাদ্য পৌঁছে দেয়ার চেষ্টা করছি। আমার কাজ আমাকে হতাশার গন্ডি থেকে মুক্তি দিয়েছে এর চেয়ে বেশি আর কি চাই। আমার সন্তান হওয়ার পর মনের ভিতরের স্বপ্নগুলো আরো বেশি প্রকট হয়ে ওঠে, মনে হয় আমার মেয়ের জন্য হলেও আমাকে ঘুরে দাঁড়াতে হবে। নাহলে সে কি শিখবে আমাকে দেখে? আমি নাট্যকলা ও সঙ্গীত বিভাগ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স, মাস্টার্স শেষ করার অল্প দিনের মধ্যেই বেসরকারী চাকুরীতে জয়েন করি ২০১৩-এ। আমি লালমনিরহাটের মেয়ে (তিস্তা), বর্তমান নিবাস ও কাজ করছি ময়মনসিংহ থেকে। বাংলাদেশের একটি স্বনামধন্য সর্বোচ্চ বিদ্যাপিঠে পড়েও প্রতিনিয়ত শুনতে হয়েছে এই সাবজেক্টে পড়ে কি হবে, এটা আবার কোন বিষয় নাকি আর প্রতিনিয়ত এসব কথার প্রতিবাদ করলেও মানসিক ভাবে খুব কষ্ট হতো। তবুও থেমে যাইনি। পড়ালেখা শেষে খুব অল্প দিনের মধ্যেই ফ্রিল্যান্সিং এ যুক্ত হই। কিন্তু আমাদের যোগ্যতার প্রমাণ দিতে বড় বড় পদ, পদবী দরকার হয় সেহেতু চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকি। ভালো একটা প্রতিষ্ঠানে বেশ ভালো বেতনের চাকুরীতে জয়েন করি। প্রায় দেড় বছরের প্রজেক্টটি শেষ হয়ে গেলে একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে যুক্ত হই। এরপর প্রায় চার বছরের চাকুরী জীবনকে পিছে ফেলে হাজবেন্ডের চাকুরীর সুবাদে ঢাকা ছেড়ে চলে আসতে হয়। আবার শুরু হয় অন্যরকম পথ চলা। একঘেয়ামী ও হতাশা ভর করে, ভেবেছিলাম সংসার ও সন্তান এসবে সময় ব্যয় করলে বুঝি আগের জীবন সব ভুলে যাবো কিন্তু আসলে এমনটা হয় না। আমি ভুলতে পারিনি... প্রত্যেকটা মানুষের সংসার, সন্তান এসবের বাইরেও নিজের একটা জগৎ থাকা দরকার। সেই জগত হবে তার কর্মের মাধ্যমে নিজ নামে পরিচিত। অনেক সময় আমরা অনেকে নিজের ভালো থাকা বুঝলেও অন্যেরটা বুঝি না। আর এ কারণে শুরু হয় পিছিয়ে যাওয়া আর মানসিক অশান্তি। সারাদিন কাজের ফাঁকেফাঁকে অনলাইনে অনেকের কাজ দেখতাম। চোখের সামনে অনেক মেয়ের সফলতা দেখে মনে হতো আমিও কিছু করবো, আমিও পারবো। চাকুরী জীবনের শুরুতে একটা ভালো চাকুরীর সুযোগ মিস করে ভুলে পরি। সেটা আমাকে কষ্ট দেয়। চাকুরী জীবনটাকে খুব মিস করতাম। এমন একটা জায়গায় থাকি সেখানে আমি যেমন চাকুরী চাই সেটা হওয়াও সহজ নয়। তাই নিজেই কিছু শুরু করবো এই চিন্তা করি। ২০২০ সালের জুলাই মাসে ডড়সধহ ্ ব-ঈড়সসবৎপব ঋড়ৎঁস (ডঊ) এই গ্রæপটির দেখা পাই। এই গ্রæপের প্রেসিডেন্ট নাসিমা আক্তার নিশা যার জন্য উইকে পেয়েছি। তিনি মূলত মেয়েদের কথা চিন্তা করেই গ্রæপটি নিয়ে কাজ করতে শুরু করেন। আমি যেভাবে কাজ করতে পছন্দ করি যেমন লিখতে ও পড়তে এই গ্রæপের কাজও তাই। বিভিন্ন কনটেন্ট লেখা ও পণ্যের পরিচিতি তুলে ধরে ব্রান্ডিং করতে হয়। সুশৃঙ্খল ও উদ্যোক্তাবান্ধব এই গ্রæপকে পেয়ে মনে হলো পুণরায় একটি সুযোগ পেলাম ঘুরে দাঁড়ানোর। "স্বপ্ন দেখতে হলে আকাশের সমান দেখো, অর্ধেকও যদি পূরণ হয় সেওতো অনেক"। আমি কিছু করতে চাই এই স্বপ্নকে কখন থেমে যেতে দেইনি তাই হয়তো পুণরায় শুরু করতে পেরেছি। উদ্যোগ গ্রহণ খুব কঠিন কাজ, ভালোবেসে এই কঠিন কাজকে জয় করতে চাই। আমার পরিবার বাবা, মা, ভাই, হাজবেন্ড ও সন্তানকে সাথে পেয়েছি আমার উদ্যোগকে এগিয়ে নিতে। উইয়ের সাথে আমার পথ চলা জুলাই ২০২০ থেকে হলেও মাটির ফুল অর্গানিকের পথচলা শুরু হয় আগস্ট ২০২০ থেকে। আট মাসের উদ্যোক্তা জীবনে এর মধ্যে অনেক ভালো সারা পেয়েছি আমার সম্মানিত ক্রেতাদের কাছে। বর্তমানে মাটির ফুল অর্গানিকের ক্রেতা সংখ্যা ২২০ জনের বেশি। আখের রস থেকে হাতে তৈরি অপরিশোধিত ব্রাউন চিনি আমার সিগনেচার পণ্য। এই দেশীখাদ্য শত বছরের ঐতিহ্যকে লালন করছে একে আখের চিনি বা গুড়ের চিনিও বলে যা বর্তমানে মাটির ফুল অর্গানিকের নিজ তত্ত¡াবধানে তৈরি হচ্ছে। এছাড়াও আরো তিনটি দেশি খাদ্য নিয়ে কাজ করছি। তুলশীমালা আতপ চাল, পাহাড়ী হলুদ গুড়া মসলা, দেশী লাল মরিচ ও চৌরা লাল মরিচের গুড়া। শেরপুর জেলার কৃষকের থেকে সরাসরি ধান সংগ্রহ করি এরপর নিজে শুকিয়ে সাধারণ ছোট মিলে ভাঙ্গিয়ে খুব ভালো করে ঝেরে প্যাকেজিং করি। হলুদ গুড়া মসলা ও দেশী লাল মরিচ ও চৌরা লাল মরিচের গুড়া সরাসরি কৃষকের থেকে কিনে এনে ঘরোয়া পরিবেশে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে তৈরি করি। ব্রাউন চিনি ও তুলশীমালা চাল কিংবা হলুদ গুড়া, মরিচ গুড়া মসলা এই দেশী খাদ্যগুলোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে যা প্রাধান্য দিচ্ছি তাহলো এর গুণগত মান যেন অক্ষুন্ন থাকে। ব্রাউন চিনি আমার উদ্যোগের ক্রেতার মাধ্যমে জার্মানী ও ইটালি গিয়েছে। ক্রেতাদের ভালো ভালো রিভিউ ও ফিডব্যাক আমার কাজের অনুপ্রেরণা। ব্রাউন চিনি ও তুলশীমালা চালের প্যাকেজিং করেছি পাট ও কাপড় দিয়ে যা করতে গিয়ে পরিবেশবান্ধব যেনো হয় সেই বিষয়টি খেয়াল রাখার চেষ্টা করেছি। আমার ইচ্ছে মানুষকে ভেজালের ভীড়ে ভালো খাবারের যেন নিশ্চয়তা দিতে পারি। আমার উদ্যোগ দিয়ে আমি যেমন সমৃদ্ধ হবো সেই সাথে সমাজের মানুষের যেনো উপকারে আসতে পারি সেই লক্ষ্যেই কাজ করে চলেছি, কাজ করে যেতে চাই। উদ্যোগের নাম - মাটির ফুল অর্গানিক পণ্য- আখের রস থেকে হাতে তৈরি ব্রাউন চিনি, তুলশীমালা চাল, পাহাড়ী হলুদ গুড়া মসলা ও দেশী লাল মরিচ গুড়া।