লালমনিরহাট বার্তা
ন্যায়পাল নিয়োগ ও দপ্তর প্রতিষ্ঠা হয়নি
বার্তা রিপোর্ট : May 9, 2021, 6:15:04 PM সময়ে

ন্যায়পাল নিয়োগ ও দপ্তর প্রতিষ্ঠা হয়নি

স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী

রক্তস্নাত বাংলাদেশের স্বাধীনতার সূবর্ণজয়ন্তী অতিক্রম করেছে। কিন্তু অদ্যবধি দেশে ন্যায়পাল নিয়োগ ও দপ্তর প্রতিষ্ঠা হয়নি। ইতোমধ্যে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত সরকার, সামরিক সরকার, জোট সরকার, সরকার ও বিরোধী দলীয় একত্রিত সরকার তত্বাবধায়ক সরকার দেশ শাসন করেছেন। কিন্তু কোন সরকারই ন্যায়পাল নিয়োগ ও দপ্তর প্রতিষ্ঠা করেননি। ১৯৭২ সালে জাতীয় সংসদে বাংলাদেশের সংবিধান গৃহীত হয়েছে। উক্ত সংবিধানের ৭৭ অনুচ্ছেদে ন্যায়পাল আইন পাস হয়েছে। ন্যায়পাল নিয়োগ ও দপ্তর প্রতিষ্ঠিত হলে তা একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে সংক্ষুদ্ধ নাগরিকদের অভিযোগ গ্রহণ করবে সে সম্পর্কে অনুসন্ধান পরিচালনা করবে এবং সংশোধনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। ন্যায়পাল দপ্তর যাতে স্বাধীন স্বত্বা নিয়ে কার্যকরভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারে তার জন্য এই প্রতিষ্ঠানটিকে আর্থিক স্বায়ত্বশাসন প্রদান করতে হবে। ন্যায়পালের ক্ষমতা ও অধিক্ষেত্র ও সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারন করতে হবে। সংবিধানের ৭৭ অনুচ্ছেদের (২) বলা হয়েছে, সংসদ আইনের দ্বারা ন্যায়পালকে কোন মন্ত্রণালয়, সরকারী কর্মচারী বা সংবিধিবদ্ধ সরকারী কর্তৃপক্ষের যে কোন কার্য সম্পর্কে তদন্ত পরিচালনার ক্ষমতাসহ যেরুপ ক্ষমতা কিংবা যেরুপ দায়িত্ব প্রদান করবেন। ন্যায়পাল সেরুপ ক্ষমতা প্রয়োগ ও দায়িত্ব পালন করবেন। (৩) তার দায়িত্ব পালন সম্পর্কে বাৎসরিক রিপোর্ট প্রনয়ন করবেন এবং অনুরুপ রিপোর্ট সংসদে উপস্থাপিত হবে। পার্লামেন্ট কর্তৃক নিযুক্ত কমিশনারকে ন্যায়পাল বলা হয়। সংবিধান প্রনয়নের ৮ বছর পর ১৯৮০ সালে ন্যায়পাল নিয়োগ ও দায়িত্ব নির্ধারন করে প্রনয়ন করা হয়। এই পদে এখন পর্যন্ত কেউকে নিয়োগ দেয়া হয়নি। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার ও নাগরিকদের অধিকার লংঘনের ঘটনা বন্ধ করতে ন্যায়পাল নিয়োগ জরুরী। ১৯৮০ সালে ন্যায়পাল নিয়োগের জন্য আইন করা হলেও এই আইনের ২ ধারায় বলা হয় এ-আইন বলবত হবে যখন সরকার তা বাস্তবায়ন করার জন্য বিশেষ গেজেট প্রকাশ করা হবে। বিগত ৪০ বছরে ক্ষমতাসীন সরকারগুলো বিশেষ গেজেট প্রকাশ করেননি। তাই ন্যায়পাল নিয়োগ হয়নি। হয়নি ন্যায়পালের দপ্তর স্থাপন। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী সরকার ন্যায়পাল নিয়োগ ও দপ্তর প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও দুরভিসন্ধির কারণে তা বাস্তবায়িত হয়নি। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইস্তেহার ন্যায়পাল প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার ছিল। তাদের নির্বাচনী ইস্তেহার ইস্তেহারে রয়ে গেছে, বাস্তবায়ন হয়নি। এক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞদের মতামত হচ্ছে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে সঠিক পথে পরিচালিত, টেকসই কার্যকর এবং সরকারী কাজে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে ন্যায়পাল নিয়োগ ও দপ্তর প্রতিষ্ঠা জরুরী। ন্যায়পাল সুপ্রীম কোর্টের একজন বিচারপতির ন্যায় ক্ষমতাবান হবেন। ন্যায়পাল আইনে মন্ত্রনালয় সংবিধিবদ্ধ সংস্থা অথবা সরকারী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা যাবে। অন্যান্য সূত্র ও পত্রিকা থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী ন্যায়পাল তদন্ত করবেন। তিনি যেকোন স্থানে প্রবেশ ও নথি জব্দ করার ক্ষমতাপ্রাপ্ত। দায়িত্ব পালনে বাধা প্রদানকারীকে জরিমানা ও তিন মাসের জেল দিতে পারবেন। যেকোন অভিযোগ বিষয়ে ন্যায়পাল তদন্ত পূর্বক উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের নিকট ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করবেন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নির্ধারিত সময় সীমার মধ্যে কি ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে তা ন্যায়পালকে অভিহিত করবেন। ন্যায়পাল সন্তুষ্ট হলে এই অভিযোগ নিস্পত্তি হবে। আর অসন্তুষ্ট হলে তিনি রাষ্ট্রপতিকে প্রতিবেদন পাঠাবেন। এই আইনের ফলে সরকারী কর্মকর্তা কর্মচারীদের জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা নিশ্চিত হওয়ার মধ্য দিয়ে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, দলীয়ভৃত্যে পরিনত হওয়া সর্বপরি রক্তস্নাত বাংলাদেশে তাদের প্রভুত্ব পদদলিত হবে। পৃথিবীর অনেক সভ্যদেশে ন্যায়পাল পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। এমনকি আমাদের পার্শ্ববতী বন্ধুপ্রতীম দেশ ভারতেও ন্যায়পাল আইন পাশ ও আইনের বাস্তবায়ন চলছে। ভারতে এই আইনে সরকারী কর্মকর্তাদের দুর্নীতি তদন্ত করার জন্য ৯ সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিশন গঠন করা হয়েছে। অথচ বাংলাদেশে ৫০ বছরেও এ আইনের কোন খবর নেই। ন্যায়পাল স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছভাবে কাজ করলে সরকারী কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতানেত্রী ও ধনীক বনিকদের বল্গাহীন দৃর্নীতি ও দুর্বৃত্তায়ন বন্ধ হবে। এক্ষেত্রে উদাহরণ স্বরুপ বলা যেতে পারে, ফরিদপুর জেলা ছাত্রলীগ নেতার হাজার হাজার কোটি টাকা অবৈধ সম্পদ অর্জনের বিষয়টি তাৎপর্যপূর্ণ। আমলাদের সহযোগীতা ছাড়া রাজনৈতিক নেতানেত্রী কামব্যবসায়ী, শিল্পপতি, আমদানি রপ্তানিকারক চোরাচালানী ও মাদক ব্যবসায়ী, রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুষ্ঠন, ব্যাংক ডাকাতি, ধর্মব্যবসা, কর প্রতারণা, ঠিকাদারীসহ অন্যান্য কাজের পিসি গ্রহণ, চাকরি বাণিজ্যসহ নানারুপ দুস্কর্ম, আইন অমান্য সর্বপরি দুর্নীতি দুর্বৃত্তায়ন সম্ভব নয়। তাই এই ত্রি-শক্তি দেশের স্বাধীনতার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন এবং জাতীয় উন্নয়নের মূল প্রতিবন্ধকতা। তাই দেশে ন্যায়পাল নিয়োগ ও দপ্তর স্থাপন করে কার্যক্রম পরিচালনা সময়ের দাবী। দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব (সরকারি কিংবা বিরোধী দল) আমলা (সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী) ব্যবসায়ীদের (শিল্পপতি, কোম্পানী মালিক কিংবা কপোরেট ব্যবসায়ী) একত্রিত হয়ে দেশের মানুষের স্বাধীনতার উদ্দেশ্য মৌলিক ও মানবাধিক প্রতিষ্ঠা, ন্যায়বিচার প্রার্থীর নিশ্চয়তা সর্বক্ষেত্রে বৈষম্যের পরিবর্তে সমতা অর্থাৎ সাম্য ভিত্তিক দেশ প্রতিষ্ঠা, আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার, বাক ও ব্যক্তি স্বাধীনতাকে ভূলুণ্ঠিত করছে। এদের সীমাহীন জালিয়াতির মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুষ্ঠন, ব্যাংক ডাকাতি, (জালিয়াতির মাধ্যমে ঋণ গ্রহণ), দুনীতি, দুর্বৃত্তায়ন, বিদেশী অর্থ পাচার, বিদেশে সেকেন্ড হোম নির্মান সর্বোপরি প্রভুত্ব ও আইনের শাসনের নিয়ন্ত্রণসহ নানারুপ দুস্কর্য বাংলার মানুষের জীবন ও জীবিকাকে দূবিষহ করে তুলেছে। ১৯৭১ সালে ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ে পর থেকে রাষ্ট্রসম্পদ লুন্ঠনের প্রতিযোগীতা শুরু হয়েছিল। বিগত ৫০ বছরেও তা অব্যাহত রয়েছে। বৃদ্ধি পেয়েই চলছে। কোনরুপ বাঁধা ছাড়াই কয়েক লাখ রাজনৈতিক নেতা, আমলা ও ব্যবসায়ী সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছে, এরা আইনের উর্দ্ধে অবস্থান করছে। তা না হলে কিভাবে একজন রাজনৈতিক নেতা, আমলা, ব্যবসায়ী শতশত হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক হয়ে রক্তস্নাত বাংলাদেশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বিগত ৫০ বছরেও আইন কেন এদেরকে স্পর্শ করতে পারেনি? সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশ এখন চলছে আত্মপ্রতিষ্ঠার স্বর্ণযুগ। তা যে ভাবেই হোক এই ত্রি-শক্তি দেশকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে তাদের রাজস্ব কিংবা প্রভুত্ব বজায় রেখেছে। আমাদের দেশে আইন রয়েছে, সরকারী বিভিন্ন সংস্থা রয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন রয়েছে, আদালত রয়েছে, তার পরে কি করে রক্তস্নাত বাংলায় নরপশু ইয়াহিয়ার দোসরা বহাল তবিয়তে রয়েছে। জনগণ তাদের পূর্ব পুরুষের এবং নিজেদের রক্ত ঝড়ানোর বিভীষিকাময় দিনের কথা ভুলে যায়নি। কিন্তু তাদের কিছুই করণীয় নেই। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অপশক্তি তাদেরকে শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় রেখে দিয়েছে। এ অবস্থা থেকে কিছুটা হলেও নিস্কৃতি পেতে ন্যায়পাল ও দপ্তর প্রতিষ্ঠা জরুরী।