লালমনিরহাট বার্তা
ভারতে গেরিলা প্রশিক্ষণ ও রণাঙ্গনের স্মৃতি
গেরিলা লিডার ড. এস.এম শফিকুল ইসলাম কানু : May 1, 2021, 12:16:32 PM সময়ে

ভারতে গেরিলা প্রশিক্ষণ ও রণাঙ্গনের স্মৃতি

বিভিন্ন রণাঙ্গনের স্মৃতি

বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষের রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে অর্থনৈতিক মুক্তি, মর্যাদা, সাম্য প্রতিষ্ঠা। সর্বক্ষেত্রে বৈষম্য, শোষণ, দূর্নীতি, দূর্বৃত্তায়ন, নির্যাতন, নিপীড়ন ও প্রভূত্যের অবসান। আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার, মৌলিক চাহিদা পূরণ, মানবাধিকার ও ন্যায় বিচার প্রাপ্তির নিশ্চয়তাই ছিল মহান মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। ১৯৭১ সালে ২৫ মার্চ কালো রাতে পাকিস্তানের নরপশু ইয়াহিয়া বাহিনী ঘুমন্ত নর-নারী, শিশুদের নির্বিচারে হত্যা, নির্যাতন, নিপীড়ন, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ করে। এতে বাংলার ছাত্র, কৃষক, শ্রমিক, মজুর, মজদুর, কুলি, কামার, যুবকসহ সর্বস্তরের মানুষের বুকে প্রতিরোধ ও প্রতিশোধের লেলিহান শিখা প্রজ্বলিত হয়েছিল। ৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান, ৭০এর সাধারন নির্বাচনে একক সংখ্যা গরিষ্ঠতা। বহুধাবিভক্ত বাঙ্গালী জাতির ঐক্যবদ্ধতা ও দৃঢ়তা বিশ্ববাসীকে অবাক করে দিয়েছিল। দেশের সর্বত্রই আনন্দ, উৎসাহ, উদ্দীপনার পাশাপাশি উৎকণ্ঠা। আদৌউ বাংলার অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে পারবেন কিনা। ১৯৭১ সালের জানুযায়ী মাসে লেখা পড়ার জন্য আবারও রংপুর জেলার বদরগঞ্জ কলেজে ফিরে এলাম। ফেব্রুয়ারী মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে স্বপ্নে দেখলাম রক্তের ধারা বইছে। শিহরিত হলাম। কয়েকদিন পর সিদ্ধান্ত নিয়ে রংপুর জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার গোড়ল ইউনিয়নের ভারত সীমান্তবর্তী মালগাড়া গ্রামের নিজ বাড়িতে ফিরে এলাম। গ্রামীণ জনপদের মানুষের বিবিসি ভয়েস অব আমেরিকা ও আকাশবানীর খবর শুনছেন। অবশেষে ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণ, স্বাধীনতার ডাক, সেই সাথে মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতির আহবান। বাংলার সর্বত্রই উত্তেজনা, উৎকন্ঠা, আন্দোলন, মিটিং, মিছিল, লাঠি মিছিল, মশাল মিছিল শ্লোগান, বক্তব্য বিবৃতি সেই সাথে সমানতালে মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি। ইয়াহিয়া ও ভূট্টোর সাথে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আলোচনা পূর্বক সমঝোতার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলো। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ সামরিক জান্তা ইয়াহিয়ার বাহিনী নিরস্ত্র বাঙ্গালী জাতিকে নিশ্চিহ্ন করতে পৌচাষিক উন্মাদনায় মেতে উঠলো। নিরিহ বাঙ্গালী হানাদারদের রুখতে ও খতম করার জন্য দেশের সর্বত্রই প্রতিরোধে ব্যুহ সৃষ্টি করলো। আমার গ্রামের পার্শ্বেই লোহাকুচি সীমান্ত ফাঁড়ী। ফাঁড়ীতে হাবিলদারসহ ২ জন অবাঙ্গালী ও ১৫ জন বাঙ্গালী ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস এর সদস্য। ২ এপ্রিল গভীর রাতে লোহাকুচি সীমান্ত ফাঁড়ীর ২জন অবাঙ্গালীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এই অভিযানে আমার আব্বা অলিউদ্দিন আহমেদ কালীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি সার্বিক সহায়তা দিয়েছিলেন। তিনি আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনে ও ফাতেমা জিন্নাহ্ এর পক্ষে নির্বাচনী প্রচারনায় অংশ নেয়ায় পাকিস্তানের নিরাপত্তা আইনে কয়েক মাস জেলে অন্তরীন ছিলেন। ৭ এপ্রিল গভীর রাতে রংপুর থেকে নির্বাচিত এম.এল.এ (জাতীয় পরিষদ সদস্য) ও রংপুর জেলার আওয়ামী লীগের সভাপতি এম.এ আউয়াল মাস্টার আমাদের বাড়ীতে আসেন। রাত্রি যাপনের পরদিন ওনাকে ভারতে আমার আত্মীয়র বাড়ীতে রেখে এলাম। ইতোমধ্যে লোহাকুচি সীমান্তের বিভিন্ন বাড়ীতে লালমনিরহাট শহর ও পার্শ¦বর্তী এলাকার মানুষজন পরিবার পরিজনসহ আশ্রয় নেয়া শুরু করেছেন। অনেকেই আবার ভারতে তাদের আত্মীয় স্বজনদের বাড়ীতে চলে যাচ্ছেন। সীমান্তের পার্শ্বেই পৈত্রিক নিবাস, হানাদার বাহিনীর আসার সম্ভবনা নেই সেই সুবাদে নিবিঘেœ বাবা-মা, ভাই বোনদের ও আত্মীয়-স্বজনদের সাথে বসবাস করতে পারতাম। কিন্তু তা না করে দেশ মাতৃকার জন্য মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। বাড়ীতে মাকে বললাম, আমাকে কিছু টাকা দাও। ভারতের সিতাই থেকে ঘুরে আসি। মা সরল বিশ্বাসে কিছু টাকা দিলেন। মে মাসের ২ সপ্তাহে একটি শার্ট, লুঙ্গি ও গায়ের চাদর নিয়ে ভারতে উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। পূর্বের দিন এমএলএ আউয়াল সাহেবের নিকট যুদ্ধে যাওয়ার জন্য সার্টিফিকেট নিয়েছি। ভারতে অবন্থান ও বিভিন্ন এলাকায় যাতায়াতের করার জন্য একজন এমএলএ, এমপি কিংবা আওয়ামী লীগের থানা কমিটির সভাপতি সম্পাদকের স্বাক্ষরিত সুপারিশকৃত সার্টিফিকেট আবশ্যক। সকালে বাড়ী থেকে রওনা দিয়ে বিকাল নাগাদ ভারতে পশ্চিমবঙ্গের সিতাই থানা শহরে পৌছিলাম। সেখানে একটি সাধারন বাড়িতে আওয়ামী লীগের কালীগঞ্জ থানা অফিস। আব্বার পরিচয় দিয়ে ও এমএলএ আউয়াল সাহেবের সার্টিফিকেট দেখিয়ে একটি সনদ নিলাম। অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার জন্য নিজের নাম লিখলাম। সন্ধ্যা নেমে এলো অপরিচিত জায়গা, আত্মীয় স্বজন নেই বললেই চলে। এক বাড়ীতে থাকার জন্য গেলাম। ইতোমধ্যে হোটেলে কিছু খেয়ে নিয়েছি। আমার সাথে বড় ভাইয়ের ক্লাস ফ্রেন্ড আব্দুল মান্নান সরকার ভাই ও হাসান ভাই রয়েছেন। বাড়ীর মালিক বললেন, গোয়াল ঘড়ে একটু খালি জায়গা আছে, খর বিছিয়ে থাকতে পারেন। অতঃপর খড়ের বিছনায় ঘুমিয়ে পরলাম। ভোর রাতে গাভীর প্র¯্রাবের ছিটা শরীরে ও কাপড়ে পড়লো, কিন্তু উপায় নেই। ঘুম থেকে উঠতে একটু দেরী হলো। সিতাই শহরে নাস্তা খেয়ে বাসযোগে দিনহাটা হয়ে কোচবিহারে পৌছিলাম। সেখান থেকে বিকালে কুচবিহার রাজবাড়ীর পার্শ্বেই বাংলাদেশী যুবকদের ক্যাম্প ‘সুভাষ পল্লীর’ পাট গুদামে পৌঁছিলাম। সেখানে পরিচয়পত্র দিলাম। এটি ছিল Youth Reception Camp যা যুব অভ্যর্থনা ক্যাম্প। এই পাট গুদানের মালিক কুচবিহার জেলার কংগ্রেস নেতা গান্দী দত্ত। এটি জয়বাংলা যুব ক্যাম্প হিসাবে সর্বাধিক পরিচিত ছিল। সেখানে বাংলাদেশী যুবকেরা অবস্থান করছেন ট্রেনিং যাওয়ার জন্য। ক্যাম্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা বললেন, আপনারা দুপুরে খেয়েছেন, না খেয়ে থাকলে ভাত,ডাল ও সবজী খেতে পারেন। আমাদের ৩ জনকে ভাত, ডাল ও সবজী খেতে দেয়া হলো। কিন্ত বিস্বাদ। তাই অল্প কিছু মুখে দিলাম। এই ক্যাম্পের দায়িত্বে থাকা রংপুর জেলার বদরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মুজিবুর রহমান এর সাথে দেখা হলো। বদরগঞ্জ কলেজের ছাত্র হওয়ায় উনি আমার পূর্ব পরিচিত ছিলেন। উনি বললেন, এখানে থাকা খাওয়া অসুবিধা, তাই আজ ট্রেনিং এর জন্য চলে যান। আমরা ১৬/১৭ জন যুবককে পাঠাচ্ছি। আপনারা এদের সাথে চলে যান। নতুবা পরবর্তী যুবকদের ব্যাচের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। আমি বললাম, ঠিক আছে আমাদের ৩ জনকে ওদের সাথে পাঠান। বিকালে যুব অভ্যর্থনা ক্যাম্প থেকে একজন গাইড এর নির্দেশনায় ২০ জন যুবক বাসে করে কোচবিহার শহরের পাশ দিয়ে প্রবাহিত তোরসা নদীর তীরে পৌছিলাম। সেখান থেকে নৌকা যোগে নদী পার হয়ে ওপারে অনতিদূরে বিএসএফ এর টাপুর হাট ক্যাম্প। পরন্ত বিকালে তোরসা নদী পাড়ি দেয়ার সময় ভাওয়াইয়া স¤্রাট আব্বাছ উদ্দীনের গাওয়া ‘তোরসা নদীর পাড়ে পাড়ে, মোড় বন্ধুয়া মাছ মারে রে’। গানটি মনে পড়ে গেল। সূর্য্যরে শেষ লালরস্মি নদীর পানিতে পড়ায় অপরুপ সৌন্দর্য্য মন্ডিত হয়েছিল। সন্ধ্যার কিছুক্ষণ পর বিএসএফ টাপুরহাট ব্যাটালিয়ন হেড কোয়াটারে পৌছিলাম। মোটো পথ, ধূলিকণা, কোথাও বা কর্দমাক্ত। চারিদিকে কাশবন, কাশবন কেটে মাঝে আমাদের জন্য তাবু স্থাপন করে রাত্রি যাপনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তাবুর ভিতরে মাটির বিছানা। সেখানে রাত্রি যাপন। রাত ১২টার পর প্রচন্ড বৃষ্টিপাত, মেঘের গর্জন, চারিদিকে অন্ধকার, লষ্ঠনের আলোয় কিছু দেখার উপায় নেই। এটি ছিল ট্রান্সজিট ক্যাম্প। এই ক্যাম্পে ছিল প্রচুর সাপ, জোক ও পোকামাকড়। সেখানে সারি সারি ভাবে ৮/১০টি তাবু। টাপুরহাট ক্যাম্পে পূর্ব থেকেই ২০/২২ জন যুবক অবস্থান করছেন। তারা আমাদেরকে সাপ, ঝোক ও পোকা মাকড়ের ভয় দেখালেন। আমি সাপ ও জোক প্রত্যক্ষ করছি। ক্যাম্পের ল্যাট্রিন স্বলতা ও সুপেয় পানির অভাব ছিল। তাবুতে বর্ষায় পানি ঢুকে যাওয়ায় রাত ১টার পর থেকে তাবুর বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে। সকাল হয়ে গেল। আমরা হাতমুখ ধুয়ে তাবুর বাহিরে অপেক্ষা করছি। সকাল ৬টায় বিএসএফ একজন হাবিদারের বাঁশি ফু দিয়ে হিন্দিতে বললেন, আপনারা তিন তিন করে অর্থাৎ ৩ লাইনে পরপর ৩ জন করে দাড়ান। প্যারেড ও পিটি করতে হবে। পেটে খিদা, রাত্রে ঘুমাতে পারিনি। ঝিমঝিম করে বৃষ্টি পড়ছে। মাঠে পানি জমেছে। কাশবনের কাটা মুড়া তৎসহ কর্দমাক্ত স্থানে লেফ-রাইট করতে অনেকেই বিরক্তিবোধ করলাম। আমরা ভাঙ্গা ভাঙ্গা হিন্দিতে আমাদের সমস্যা তুলে ধরলাম। কিন্তু বিএসএফ হাবিলদার তা শুনতে নারাজ। একপর্যায়ে সকলের অনুরোধে হাবিদারকে বললাম, আমরা বিএসএফ ক্যাম্পের যে কোন অফিসারের সাথে কথা বলতে চাই। ওনি বললেন, কিছু সময় অপেক্ষা করুন। ইতোমধ্যে সকালে আমাদের নাস্তার জন্য ড্রামে ভাত রান্না চলছে। আমাদেরকে ড্রাম থেকে ভাত তুলে প্লেটে করে খাওয়ার জন্য দেয়া হলো। মাড় জাতীয় ভাত, কোন তরকারী নেই। সামান্য লবণ, উপরে ভাতের সাথে সিদ্ধ করা পাকা মরিচ। ক্ষুধার তাড়নায় সামান্য কিছু খেলাম। কিছুক্ষণ পর বিএসএফ ক্যাপ্টেন সাহেব এসে আমাদের সাথে আলোচনা করলেন। আমরা রাতে বৃষ্টি-বাদল, তাবুতে কাঁদা রাতে ঘুম হয়নি। সকালে নাস্তার তরকারী ছাড়াই মাড় জাতীয় ভাত। সর্বোপরি বিএসএফ হাবিদার কর্তৃক লেফরাইট করার বিষয়ে তুলে ধরলাম। ক্যাপ্টেন সাহেব হাবিলদারের বুকে দুটি ঘুষি মেরে বললেন, তোমাকে কে হুকুম দিয়েছে কদর্মক্ত স্থানে ও বৃষ্টি মাঝে এনাদেরকে প্যারেড- পিটি করার জন্য। হাবিদার লজ্জিত হলেন। সকলের পক্ষে আমি ক্যাপ্টেন সাহেবকে এখানকার বিরাজমান সমস্যাগুলো পুনরায় তুলে ধরে আমাদেরকে অদ্যই ট্রেনিং সেন্টার অর্থাৎ মুজিব ক্যাম্পে পাঠানের অনুরোধ করলাম। উনি বললেন, এ ব্যাপারে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ নিদের্শ পেলেই আপনাদের অতি সত্ত¡র মুজিব ক্যাম্পে পাঠানো হবে। প্রায় দু-ঘন্টা পর আমাদের জানানো হলো আপনারা প্রস্তুতি নিন। আমরা কনভয় (গাড়ী) রেডি করছি। তখন গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি চলছে। আমরা দুপুরে ৪০ জন দুটি গাড়িতে করে মুজিব ক্যাম্পের দিকে রওনা দিলাম। বৃষ্টির দরুন গাড়ী স্ট্যার্ট নিচ্ছিল না। বাধ্য হয়ে অন্য একটি চালু গাড়ীতে পিছনে দড়ি লাগিয়ে জোরে টান দেয়ায় গাড়ী স্ট্যার্ট নিল। গাড়ী চলতেই থাকলো, গাড়ী দুটি পুরোপুরি ট্রিপাল দিয়ে ঢাকা। সকলেই গাড়ীর ভিতরে বসা, মাঝে মাঝে পিছনে ট্রিপাল বাতাসে ফাঁক হলে শুধু মাত্র পিছনের সড়ক দেখা যায়। সামনের ছিটে একজন বিএসএফ বাংগালী হাবিদার ও অপর গাড়িতে ১জন অবাংগালী বিএসএফ সদস্য। ওনারা গাড়ীতে উঠার আগে বলেছেন, আপনারা চুপচাপ বসে থাকবেন, উঁকি মারবেন না। গাড়ী কোথাও থামলে আপনারা নামতে পারবেন না। কারন আপনাদের চেহারা যেন বাহিরের লোক দেখতে না পারে। প্রসাব করার জন্য সড়কের ফাঁকা জায়গায় গাড়ী থামানো হবে। অনেকের ট্রাকের ভিতর ঘুমিয়ে পড়লেন। কেউ বা চোখ বুঝে থাকলেন। আর সকলের মাঝে আবেগ, উৎসাহ, উদ্দীপনা ট্রেনিং নিয়ে হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবেন, দেশকে শক্রমুক্ত করবেন। অনেকেই আবার ক্লান্ত সেই সাথে উদ্বিগ্ন। আকাবাকা, চড়াই উৎরাই পাহাড়ী পথে গাড়ী চলছে তো চলছেই। মাঝে দু’একটি জায়গায় গাড়ী থেমে ছিল। ড্রাইভারসহ ওনারা ২ জন চা পান করেছেন। যেহেতু আমাদের নিচে নামা নিষেধ তাই আমাদের চা পান করা হলো না। রাত ৪টায় আমাদেরকে বহনকারী কনভয় (গাড়ি) মুজিব ক্যাম্প যা মূর্তি ক্যাম্প হিসাবে পরিচিত সেখানকার প্রধান গেটে থামল। প্রয়োজনীয় তল্লাশি ও অনুমতির পর আমাদেরকে ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হলো। স্থানটি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়ি ও ভুটানের সীমান্তের কাছাকাছিতে এলাকায় অবস্থিত। মুলতঃ এটি ভারতের একটি বিশাল সেনানিবাস। যা উঁচু পাহাড়ের সমতল ভূমিতে অবস্থিত। সেনা নিবাসের পাশে পাহাড়ের উপরে উঁচু-নিচু জমিতে বিশাল চা বাগান। পার্শ্বে ঝর্ণা প্রবাহিত। পাহাড়ী এলাকায় বৃষ্টিপাত হলে এই ঝর্ণাটি বিশাল নদীর রুপ নেয়। আমাদেরকে গাড়ী থেকে নামিয়ে ক্যাম্পের এম.আই (মেডিকেল ইন্সপ্যাকশন) রুমে নেয়া হলো। সেখানে স্থান সংকলন না হওয়ায় অনেকে রুমের ভিতর কেউ বা বারান্দায় অবস্থান করলাম। সকাল সাড়ে ৬টায় শুরু হলো মেডিকেল চেকআপ। শার্ট, প্যান্ট খুলতে হলো, পরনে শুধু মাত্র জাঙ্গিয়া। এক এক করে স্বাস্থ্য পরীক্ষা চলছে। এক পর্যায়ে জাঙ্গীয়া খুলেও দেখাতে হয়। ২জন বাদে সবাই স্বাস্থ্য পরীক্ষায় উত্তীর্ন হলাম। মেডিকেল চেকআপে আমাকে ফাস্ট করা হলো। অতঃপর শুরু ইনজেকশন দেয়ার পালা। বড় সুচ দিয়ে যেন কোন পশুকে দাঁড়িয়ে ইনজেকশন দেয়া হচ্ছে। অনেকেই আৎকে উঠলেন, কেউ বা কেঁদে ফেললেন। আমি বললাম, কোন অবস্থায় দাঁড়িয়ে ইনজেকশন নিব না। আমাকে বসে ইনজেকশন দিতে হবে। মেডিকেল পরীক্ষায় প্রথম হয়েছি। তাই ডাক্তার সাহেবের নির্দেশে আমাকে চেয়ারে বসে ইনজেকশন দেয়া হলো। যারা মেডিকেলে আনফিট, তাদেরকে আমাদেরকে নিয়ে আসা গাড়ীতে করে ফেরৎ পাঠানো হলো। সকালে দেখতে পেলাম পূর্ব ও পশ্চিমে লম্বা বিশাল সেনানিবাস। আমাদেরকে এম.আই রুম থেকে ব্যারাকে নেয়া হলো। মুজিব ক্যাম্প বা মূর্তি ক্যাম্পে বাংলাদেশে জাতীয় নেতাদের নামে উইং-এর নাম দেয়া হয়েছে। তম্মধ্যে ভাসানী উইং, নজরুল উইং, তাজউদ্দিন উইং, মোস্তাক উইং। ভারতীয়দের দেয়া আলফা, ব্রেভো, ডেল্টা ও চার্লি উইং। আমাদেরকে ব্রেভো উইং-নেয়া হলো যা ভাসানী উইং হিসেবে পরিচিত। মেঝে পাকা ইটের দেয়াল উপরে টিনের ছাউনী। অনেক বড় এক সঙ্গে এক দেড়শত যুবক ৩ সারিতে পাশাপাশি ঘুমাতে পারবেন। আমাদেরকে লঙ্গরখানার পার্শ্বে আতব চাল, দুধ ও চিনির তৈরী ফিরনী খেতে দেয়া হলো। আমরা সমতলের মানুষ, কুয়া কিংবা টিউবওয়েলের পানি খেতে অভ্যস্থ হঠাৎ করে পাহাড়ী পানি, পাহাড়ি গন্ধ, চালে পাথর ছিল। তাই সম্পূর্ণ ফিরনী খেতে পারেনি। বাধ্য হয়ে কিছু নিদৃষ্ট স্থানে ফেলে দিয়েছি। সেনা বাহিনীর গাড়ীতে বড় মশকে করে পাহাড়ী ঝরনা পানি তুলে ক্যাম্পের লংগর খানার পার্শ্বেই ড্রমে ভর্তি করে রাখা হতো। বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট দিয়ে ড্রামের পানি পানের উপযোগী করা হতো। তবে ঝরনা পানির গন্ধ ও স্বাদ আলাদা। নাস্তা শেষে আমরা ভাসানী উইং অর্থাৎ ব্রোভো উইং-এ চলে এলাম । সেখানে কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর ঝরনায় গিয়ে গোসল করে ফিরলাম। সেখানে ইন থ্রিজ পদ্ধতিতে আমাদেরকে ফলিং করা হলো। আগামীকাল ট্রেনিং শুরু হবে এই মর্মে প্রস্তুতি নেয়ার জন্য নির্দেশনা দেয়া হলো। প্রত্যেককে সেলাইবিহীন লুঙ্গি, হাফ প্যান্ট, সেন্ডো গেঞ্জি, গামছা, প্লেট, মগসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী দেয়া হলো। প্রদত্ত সামগ্রি নিয়ে ভাসানী উইং এ গেলাম। সামনে লংগর খানা। প্লেট, মগ নিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে ভাত, ডাল, সবজী নিলাম। মাঠে বসে খেতে হবে। তবে কোন উচ্ছিষ্ট অংশ মাঠে ফেলা যাবে না। আধা সিদ্ধ ডাল হাতের আঙ্গুলের সাহায্য ভেঙ্গে ভাত খেয়ে নিলাম। ড্রামে রক্ষিত পানি মগে ভর্তি করে নিয়ে পান করলাম। ঝরনার পানিতে প্লেট, মগ পরিষ্কার করে নিজের ব্যারাকে ফিরে এলাম। বিশ্রাম অর্থাৎ কিছুটা ঘুমিয়ে নিলাম। বিকালে কোন কিছু খাওয়ার ব্যবস্থা নেই। সন্ধ্যার পূর্বে আবারও প্লেট, মগ হাতে নিয়ে লাইনে দাড়িয়ে ভাত ডালও ছোট এক টুকরো মাছ নিয়ে মাঠে বসে খেয়ে নিলাম। যথারীতি ঝরনার প্লেট মগ পরিষ্কার করে ব্যারাকে ফিরে এলাম। রাতে আবারও ফলিং ও গণনা। সকালের ট্রেনিং এর প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়া হলো। আমরা ব্রোভো উইংয়ে ৩টি প্লাটুনে ১শত ২০ জন প্রশিক্ষণার্থী ছিলাম। ব্রোভো উইংয়ের ট্রেনিং পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন একজন অবাঙ্গালী সুবেদার মেজর ও ২ জন প্রশিক্ষক। সেখানে ওনাদের থাকার ব্যবস্থা ছিল। ভোর ৫টায় ঘুম থেকে উঠে প্রাত্যঃকৃত সেরে ঝরণার ঠান্ডা পানিতে হাত মুখ পরিষ্কার করলাম। ল্যাট্রিনের সংখ্যা অপ্রতুল হওয়ায় ঝরণার কিছুটা দূরে অনেকেই প্রাত্যঃকৃত সেরে নিয়েছেন। পরবর্তীতে অবশ্য এটা বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। ব্যারাকে ফিরে এসে বিছনাপত্র ফোল্ডিং করে তার উপর প্লেট ও প্লেটের উপরে মগ। এমনভাবে সাজিয়ে রাখতে হবে যেন প্রতিটি মগের হাতল একদিকে থাকে। ব্যতিক্রম করা শান্তিযোগ্য অপরাধ। সকাল ৬টায় শুরু হলো গেরিলা প্রশিক্ষণ, ইনথ্রিজ ফোলিং, রোলকল। কেউ অসুস্থ্য থাকলে তাকে এমআই রুমে প্রেরণ প্লাটুনের ৪০ জন প্রস্তুত। সামনে ওস্তাদ কমান্ড দিচ্ছেন, লেফ-রাইট, একটু হালকা শরীর চর্চা। মুজিব ক্যাম্প থেকে প্রায় দু কিলোমিটার দুরে অস্ত্রাগারে। প্রথমে মার্চ, ডবল মার্চ সর্বশেষে রানিং। অস্ত্রাগারের পৌছে দুটি রাইফেল দু-কাধে নিয়ে আবারও পূর্বের প্রদ্ধতি মোতাবেক ব্যারাকে উপস্থিতি। অনেক সময় নতুন অস্ত্রগুলো পরিষ্কার করে কোতখানায় জমা দিতে হতো। ব্যারাকের বারান্দায় সারিবদ্ধভাবে রাইফেল গুছিয়ে রাখা, রাইফেলের ম্যাগজিন সামনে থাকতে হবে। ব্যতিক্রম করা যাবে না। অতঃপর প্লেট মগ নিয়ে লংগর খানা দিকে ডোবল মার্চ। লুচি, সবজী নিয়ে মাঠে বসে আহার পূর্বক মগ নিয়ে চায়ের জন্য লাইন। মাঝে মাঝে বাসী ভাত তেলে ভেঁজে গরম গরম পরিবেশন করা হতো। আবার সবজীর পরিবর্তে সুজির হালুয়া কিংবা ফিরনী দেয়া হতো। অনেক সময় নাস্তার সাথে চা দিয়ে দিতেন। দারজিলিং-এর পাতার চা, খুবই সুস্বাদু। কেননা গাভীর ঘন দুধ, বেশী করে চিনি ও চা পাতা সংমিশ্রনে চা তৈরী হতো। তবে চা ছাকনীর প্রয়োজন হতো না। মগ ভর্তি চা, পান করতে করতে পাতা মগের তলদেশে চলে যেতো। আবারও ফ্লোডিং করা বিছানার ওপর প্লেট, মগ সজ্জিতকরণ করে ব্যাকের সামনে ফলিং। কোতখানা (অস্ত্রাগার) থেকে নিয়ে আসা রাইফেল নিয়ে সোজা প্রশিক্ষণ মাঠে। সেখানে রাইফেল এর বিভিন্ন অংশের পরিচিতি, খোলনা-জোড়না। অর্থাৎ বিভিন্ন অংশ খুলে আবার জোড়া লাগানো। প্রথম দিকে আমরা সাধারণত মার্কফোর ও থ্রি নট থ্রি রাইফেল ব্যবহার করতাম। একইভাবে অন্যান্য অস্ত্র যেমন এসএমজি, এসএলআর, এলএমজিসহ গ্রেনেড ও টু ইঞ্চ মর্টারের বিভিন্ন অংশের পরিচিতি, ম্যাগজিং খোলা, গুলি ভতির্, ম্যাগজিং লাগানো ও গুলি করার পদ্ধতি শেখানো হতো। মূল উদ্দ্যেশ্য হলো অস্ত্রগুলো রুক আউট অর্থাৎ বিকল হলে তা যেন ঠিক করে চালানো যায়। এতদবিষয়ে অভিজ্ঞতা অর্জন। ইতোমধ্যে একজন সামরিক কর্মকর্তার তত্বাবধায়নে গেরিলার প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণকারী প্রত্যেকের তথ্যাবলী অতি গোপনীয় (Top Secret) ফর্মে নেয়া হয়েছে। তথ্যাবলীর মধ্যে ছিল (১) নাম (২) পিতার নাম (৩) স্থায়ী ঠিকানা (৪) বয়স (৫) শারীরিক বর্ণনা ও শরীরে সনাক্তকরণ চিহ্ন (দৃশ্যমান দাগ) (৬) পারিবারিক পরিচিতি ও সদস্য সংখ্যা (৭) কর্মক্ষেত্র। প্রশিক্ষণ শেষে ভারতীয় সেনা কর্মকর্তা (৮,৯,১০,১১) ঘর পূরণ করে থাকেন। এতে প্রশিক্ষণের বিবরণ, প্লাটুন নম্বর, কি ধরনের প্রশিক্ষণ নিয়েছেন, তার বিবরণ। প্রশিক্ষণার্থীর দক্ষতা ও অর্জিত মান এবং মন্তব্য লিপিবদ্ধ করে থাকেন। আমার ক্ষেত্রে লেখা হয়েছিল বিভিন্ন অস্ত্র চালানো, গেরিলা যুদ্ধে বিশেষ পারদর্শিতা। মন্তব্যের ঘরে লেখা ছিল (Fit to be a Guerilla Leader) Guerrilla Warfare এর বাংলা অর্থ হচ্ছে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলে আক্রমণ করে শত্রæবাহিনীকে আতঙ্কিত ও ভীতসন্ত্রস্ত রাখা। আমার প্লাটুন নম্বর ছিল ২৫, বডি নম্বর ২৫/১। ব্রেহ উইংয়ের ২৫ প্লাটুন- এর লিডার সেলেকশনের সময় আমি পিছনে দাঁড়িয়ে ছিলাম। প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের দায়িত্বে নিয়োজিত কর্নেল আমাকে পিছন থেকে সামনে নিয়ে এসে লিডার হিসাবে ঘোষণা দিয়েছিলো। সেই থেকে আমি ২৫ প্লাটুনের লিডার হিসাবে দায়িত্ব পালন করি।¯েøটে ২৫/১ লিখা দুহাত দিয়ে বুকের উপর ধরে ছবি তোলা হয়েছিল। অস্ত্র চালানার প্রশিক্ষণের পাশাপাশি কঠিন শারীরিক কসরত, অবস্ট্রাকল জার্নি, ক্লোলিং, সেন্ট্রিসাইলেন্স ইত্যাদি চলত। শরীর যতক্ষণ পর্যন্ত ঘর্মাক্ত অর্থাৎ ঝরঝর করে ঘাম নির্গত না হতো ততক্ষণ পর্যন্ত শারীরিক ব্যায়াম ও কসরতসহ অন্যান্য প্রশিক্ষণ চলতো। এরমধ্যে কাটাতারের অনুচ্চ খাচায় ৫/৬ ফুট নিচে ড্রামের পানিতে রক্ষিত পাথরের কুচির উপর ক্লোলিং করতে হতো। অনেক কসরত করে নিচে নামতে হতো। উপরে কাটাতার রয়েছে। সোজা হয়ে নামার উপায় নেই। প্রশিক্ষক অপরপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি কণুই পরীক্ষা করে দেখবেন। প্রশিক্ষণার্থী ছোট ছোট কাটা পাথরে ক্লোরিং করেছে কি না। যদি তিনি দেখেন যে কণুই এর বিভিন্ন স্থানে কাটা পাথর ঢুকেছে তবে তার জন্য ২য় বার এ কোর্স করতে হবে না। কুচি ও কাটা পাথরের উপর ক্লোরিং না করলে পুনরায় তাকে এ কোর্স করতে হবে। প্রশিক্ষণের সবচেয়ে কষ্টকর ছিল অবস্টাকল জার্নি অর্থাৎ দূরহ যাত্রা পর্ব। তিন থেকে সাড়ে তিন ফুট উপরে স্থাপিত কাঠের উপর দিয়ে হাঁটা, দড়ি দিয়ে উপরে উঠা, আবার দড়ির জাল অতিক্রম করা, দড়ি ধরে নিচের কর্দমাক্ত জলধার অতিক্রম করা, ঝুলন্ত টায়ারের মধ্যে লাফ দিয়ে অপরপ্রান্তে চলে যাওয়া। সর্বদাই দৌড়ের মধ্যে থাকা। প্রায় ১২টি অবস্ট্রাকল কোর্স সম্পর্ন্ন করাসহ শারীরিক কসরতের দরুন শরীর দিয়ে ঘাম নির্গত হতে থাকে। এমতাবস্থায় ওস্তাদ বলতেন, কেউ গোসল করতে চাও, সময় মাত্র দুই মিনিট। প্রশিক্ষণ মাঠের পাশেই ঝরণা। যাওয়া আসা করতে ২ মিনিটের বেশি সময় লাগে। বেধে দেয়ার সময়ে একজন প্রশিক্ষণার্থী ঝরণার পানিতে ডুব দিয়ে ফিরে আসার সম্ভবনা নেই। ফলে কেউ গোসল করতে যেতে পারতো না। এই কোর্স শেষে অন্য মাঠে বিস্ফোরক বিষয়ে প্রশিক্ষণ হতো। বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী জয়রমন বিস্ফোরক ও মাইন-এর পরিচিতি নানামুখী ব্যবহার, কার্যকারিতা, মাইন স্থাপন, ব্রীজ, কালভার্ট, সেতু উড়িয়ে দেয়া, বিস্ফোরক দিয়ে রেলওয়ে লাইন বিচ্ছুন্নকরণ ইত্যাদি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিতেন। প্রশিক্ষক জয়মন একটি বড় টেবিলের উপর উঠে বিস্ফোরক ও বিভিন্ন ধরনের মাইন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিতেন। তিনি হাতেনাতে দেখাতেন কিভাবে বারুদের মধ্যে ডিটোনেটর ঢুকিয়ে পিছনে করটেক্স লাগিয়ে ফিউজি ম্যাচ জ্বালিয়ে বিস্ফোরন ঘটাতে হয়। প্রশিক্ষণ চলাকালীন সময়ে প্রশিক্ষণার্থীরা ঝিমিয়ে পড়লে, উনি বলে উঠতেন আপনারা সুস্থ অর্থাৎ ক্লান্ত হয়ে গেছেন। প্রশিক্ষণে মনযোগী হচ্ছেন না। কাজেই ২/৩ শত গজ দূরে একটি গাছ দেখিয়ে বলতেন গাছ স্পর্শ করে চক্কর দিয়ে আবারও এখানে ফিরে আসেন। এইভাবে ২ বার চক্কর দেয়ার সাথে সাথে ক্লান্তি দূর হতো। আবার বিস্ফোরক বিষয়ে প্রশিক্ষণ চলতো। গেরিলা প্রশিক্ষণের অন্যতম দিক হচ্ছে সর্বদাই দৌড়ের মধ্যে থাকতে হবে। প্র¯্রাব খানায় যেতে হলে দৌড়ে যাওয়া খাওয়ার লাইনে শামিল হওয়ার জন্য দৌড়, গোসল করতে গেলে দৌড়। প্রশ্ক্ষিণ মাঠ থেকে ব্রাকে ফিরতে হলে সেখানেও দৌড়। প্রত্যেকটি কাজের ক্ষেত্রে দৌড়, দৌড়, দৌড়। দুপুরে গোসল ও খাওয়ার জন্য বিরতি। ঝরণায় গোসল সেরে, মগ ও প্লেট নিয়ে লঙ্গর খানার দিকে দৌড়। লাইনে দাঁড়িয়ে ভাত-সবজি কিংবা ডাল গ্রহণ। তবে আধা সিদ্ধ ডাল নিচে পানি। রাতে বড় মাছের ছোট টুকরো, ভেড়া ছাগলের মাংস, সামান্য তেল, মরিচ, মসলা, পিঁয়াজ দিয়ে রান্না। খাবার অনুপযোগী। বিস্বাদ তবুও খেতেই হবে। মাঝেমধ্যে ফলমূল দেয়া হতো। একদিকে কঠোর গেরিলা প্রশিক্ষণ অন্যদিকে খাওয়া দাওয়ার সমস্যা অনেকের শারীরিক অবস্থা ঠিক যাচ্ছিল না। তবুও প্রশিক্ষণ চলছে তো চলছেই। প্রশিক্ষণের ২য় সপ্তাহ থেকে রাইফেলসহ অন্যান্য অস্ত্রের চানমারিতে ফায়ারিং, পাহাড়ের পাদদেশে টিন দিয়ে তৈরি মানুষের আকৃতি খুটি দিয়ে লাগানো হয়েছে। প্রশিক্ষণার্থীদেরকে নির্ধারিত লক্ষ্যবস্তুতে গুলি করতে হবে। অর্থাৎ মনুষ্য আকৃতির চোখ, বুক, পেট, কপাল লক্ষস্থল ভেদ করতে হবে। প্রথমার্ধে প্রত্যেকের জন্য ৫টি গুলি বরাদ্দ। মাটিতে ষষ্টাংগে শুয়ে তাক করে গুলি চালাতে হবে। অনুরূপভাবে এসএমজি, এলএমজিসহ অন্যান্য অস্ত্রের ফায়ারিং হতো। মাঝে মধ্যে এই ফায়ারিং এর জন্য চানমারি যেতে হতো। প্রশিক্ষণার্থীদের ক্লান্তি অনেকটা কমে এসেছে। আবার শুরু হলো দিনরাত ধরে হাইট আউট কেমোফ্লাক্স পূর্বক অ্যাম্বুস করে জঙ্গলে লুকিয়ে থাকতে হবে। দুটি দলে বিভক্ত হয়ে প্রশিক্ষণ চলতো। একসময় দুটি দল পরস্পরের মুখোমুখি হয়ে যুদ্ধের লিপ্ত হতো। অর্থাৎ যুদ্ধের মহড়া চলতো। এতে ফল্স রাউন্ট ফাকা গুলি ব্যবহৃত হতো। পাহাড়ি বন, জঙ্গল এলাকায় বৃষ্টিপাত হলে খুবই কষ্ট হতো। সর্বপরি রাতে প্রশিক্ষকের বাঁশির শব্দে কখনও ক্লোলিং, কখনও লুকিয়ে থাকা, কখনওবা শুয়ে পড়তে হতো। সাপ, বানরসহ অন্যান্য প্রাণির এমনকি হাতিরও ভয় ছিল। অনেক সময় চা বাগানের ভিতরে গভীর নালায় চুপ করে বসে শত্রæর গতিবিধি লক্ষ্য করতে হতো। রাত ১২টা ১টা পর্যন্ত চলতো এ প্রশিক্ষণ। অতঃপর ব্যাকে এসে ঘুম। পরদিন আবারও ভোরে উঠে যথারীতি প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ। ইতিমধ্যে আমরা গ্রেনেড ও টু-ইনস মর্টার প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেছি। সকালে প্রশিক্ষণার্থীদের তাজা থার্টিসিক্স হ্যান্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ ও টুইনস মর্টার ফায়ারিংয়ের জন্য একটি নদীর তীরে চা’বাগানে নিয়ে যাওয়া হতো। মুক্তি ক্যাম্প থেকে দূরত্ব প্রায় ২৫/৩০ কিলোমিটার। সকালের নাস্তা পুরি, সবজি খেয়ে দুপুরের খাবার হিসাবে পুরি ও আলু ভাজি সঙ্গে নিয়ে যেতে হয়। ব্রেভো উইংয়ের জন্য চারটি কনভয় মূর্তি ক্যাম্প থেকে বের হয়ে পাহাড়ি চলাই উৎরাই পথে চলছে। প্রায় এক মাস পর ক্যাম্প থেকে বাইরে এসে প্রশিক্ষণার্থীদের মনে আনন্দ ও উদ্দীপনা, সেই সাথে প্রশিক্ষণ শেষ পর্যায়ে। বাংলাদেশে এসে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়ার দৃঢ় মনোবৃত্তি। কনভয় চলার এক পর্যায়ে সড়কে স্বল্পবিরতি। আমাদের ব্রেভো উইং- এর দায়িত্বে নিয়োজিত সুবেদার মেজর আমাকে বললেন, আপনি পিছনের গাড়িতে উঠেন। আমি সামনের গাড়িতে যাব। ঠিক আছে। পাহাড়ি আঁকা বাঁকা সড়কে গাড়ি চলছে। হঠাৎ করে বেলা ১১টায় ড্রাইভারের বেখেয়ালের দরুন সামনের গাড়িটি সড়কের পার্শ্বের একটি পাকা টেলিফোন ভবনের বুথে ঢুকে গেলো। দুর্ঘটনা কবলিত গাড়ির সামনে বসা সুবেদার মেজরের স্কলারবোন ভেঙ্গে গেল। ড্রাইভার মারাত্মক আহত হলেন। সেই সাথে গাড়িতে অবস্থানকারী প্রশিক্ষণরত মুক্তিযোদ্ধার মধ্যে ৫/৭ জন গুরুতর আহত হলেন। অনেকের মাথা ফেটে ও শরীরের বিভিন্নস্থানে আঘাত পাওয়ার দরুন রক্তাত্ব হলেন। দুর্ঘটনার কিছুক্ষণ পরেই মিলিটারী পুলিশ, আর্মি এম্বুলেন্স, ডাক্তার, নার্স এসে উপস্থিত। আহতদের উদ্ধার করে দ্রæত এম্বুলেন্সে তুলে হাসপাতালে নেয়া হলো। প্রশিক্ষণরত সাথীদের রক্তাত্ব অবস্থায় রেখে আমরা তাৎক্ষণই চোখের পানি ধরে রাখতে পারলাম না। আমরা বললাম, আজ ফায়ারিং রেঞ্জে যাব না। গাড়িতে অবস্থানকারী অপর সুবেদার মেজর বললেন, আপনারা কেন কান্নাকাটি করছেন। কোন অবস্থাতেই সিডিউল পরিবর্তন করা যাবে না। উনি দৃঢ়তার সাথে বললেন, ১৯৬২ সালে ভারত-চীন যুদ্ধের সময় আমার পাশের ব্যাংকারে অবস্থানকারী একজন সৈন্য বোমার আঘাতে মারা গেলেন। আমরা সেখান থেকে পালিয়ে যাইনি। গুলি অব্যাহত রেখেছি। একপর্যায়ে গোলাগুলির বন্ধের পর আমরা মৃত সৈনিককে ব্যাংকার থেকে বের করে ক্যাম্পে নিয়ে এসেছি। কাজেই কোন কথা নেই। ফায়ারিং রেঞ্জের দিকে চলেন। আমরা অনেকটা বাধ্য হয়েই গাড়িতে উঠলাম। দুপুর নাগাদ ৪টি গাড়ি একটি বিশাল চা বাগানে প্রবেশ করলো। সেখান থেকে আমরা পায়ে হেঁটে প্রায় এক কিলোমিটার ভিতরে গেলাম। সেখানে পাশে বিশাল নদী, গ্রেনেড থ্রো করার জন্য কোমড় পরিমাণ ৮/১০ গর্ত। উক্ত গর্তে নেমে তাজা থার্টি সিক্স হ্যান্ড গ্রেনেড ছুঁড়তে হয়। তবে এই প্রশিক্ষণটি প্রশিক্ষকের সার্বিক তত্বাবধানে চলে। কেননা তাজা গ্রেনেড থ্রো করতে ভুল করলে গ্রেনেড বিস্ফোরিত হয়ে প্রশিক্ষণার্থী মারাত্বক আহত হয়ে প্রাণনাশের সম্ভাবনা। তাই তাজা গ্রেনেডের সেফটিপিন দাঁত দিয়ে খুলে, লিভার চেপে ধরে শারীরিক কসরতের মাধ্যমে দ্রæত নদীতে থ্রো করতে হয়। এক এক করে প্রত্যেক প্রশিক্ষণার্থীকে গ্রেনেড থ্রো করতে হবে। গ্রেনেড থ্রো শেষে টুু ইঞ্চ মর্টার সেল (বোম) নিক্ষেপ। টু ইঞ্চ মর্টারে সেল ভর্তি করে ৬০ ডিগ্রি এ্যাংগেলে মর্টার ধরে ট্রিগার চাপ দিতে হয়। এতে সেলের পিছনে আঘাত লেগে বোম সো সো শব্দে নদীতে পরে যায়। বিস্ফোরিত হয়। অতঃপর সন্ধ্যায় ফেরার পালা। ইতোমধ্যে ক্যাম্প থেকে সাথে নেয়া ২ পুড়ি, আলু ভাজি দিয়ে দুপুরের খাবার শেষ করেছি। রাতে মূতি ক্যাম্পে ফিরে এসে খাওয়া দাওয়া শেষে ঘুমিয়ে পড়া। আবারও প্রত্যুষে উঠে প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ। আমাদের ট্রেনিং চলাকালীন সময়ে ব্রেভো উইং থেকে স্পেশাল উইংয়ে নেয়া হয়েছিল। সেখানে মাটির দু’ফিট উপরে কাঠের পাটাতন। কাঠের বেড়া, উপরে টিন। খুবই সুন্দর ও আকর্ষনীয় নিরিবিলী পরিবেশ। পার্শ্বেই প্রশস্ত ঝরনা। কয়েকদিন পর আমাদের জানানো হলো আজই আপনাদেরকে আবারও ব্রেভো ইউং এ ফিরে যেতে হবে। কেননা এখানে কমিশনপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের থাকতে দিতে হবে। এই কমিশন প্রাপ্তদের মধ্যে ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জৈষ্ঠ্য পুত্র শেখ কামালসহ আরও ৬০ জন। এখানে কমিশন প্রাপ্তদের প্রশিক্ষণ একাডেমী চালু করা হয়েছিল। মূর্তি ক্যাম্পের ব্যারাক ও প্রশিক্ষণ মাঠে অনতিদূরে প্রশিক্ষণার্থীদের জন্য একটি বড় রি-ফ্রেসম্যান্ট রুম অর্থাৎ ক্লাব ছিল। সেখানে প্রশিক্ষণার্থীরা বিকালে বিশেষতঃ রবিবার বিকালে অনেকেই মিলিত হতেন। সেখানে পরস্পরের মাঝে ভাব বিনিময়, গল্প, আড্ডা, গান-বাজনা, তাস খেলাসহ অন্যান্য খেলা ধুলার ব্যবস্থা ছিল। ক্লাব ঘরের বারান্দায় ইয়াহিয়া, ভূট্টো ও টিক্কা খানের মূর্তি বানিয়ে রাখা হয়েছে। পার্শ্বে ছিল পাকিস্তান হানাদার বাহিনী কিভাবে বাংলার মানুষকে বেয়োনেট দিয়ে এবং গুলি করে হত্যা করেছে। হানাদারেরা কিভাবে নারীর কাপড় খুলে সম্ভ্রমহানী করছেন তারও মূর্তি স্থাপিত হয়েছে। যা অবলোকন করে প্রশিক্ষণার্থীদের মনে ঘৃণার উদ্রেক হতো। প্রশিক্ষণার্থীদের অনেকেই এই মূর্তিগুলো দেখে অশ্রাব্য ভাষায় গালাগালি করতেন। আবারও প্রতিশোধ নেয়ার দৃঢ় সংকল্প ব্যক্ত করতেন। অনেকে আবার ইয়াহিয়া, ভূট্টো, টিক্কা খানের মূর্তির পার্শ্বে থু-থু নিক্ষেপ কিংবা পায়ের সেন্ডেল ছুঁড়ে দিতেন। আমাদের অনুরোধে মাঝেমধ্যে ক্লাবে রবিবার হিন্দি সিনেমা দেখানো হতো। প্রশিক্ষণের প্রায় শেষ পর্যায়ে একদিন বিকালে ক্লাবের সামনের মাঠে প্রশিক্ষণরত মুক্তিযোদ্ধাদের এক সমাবেশে বক্তব্য রাখলেন, মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজ উদ্দীন আহমেদ, মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রধান সেনাপতি জেনারেল এমএজি ওসমানী, মূর্তি ক্যাম্পে অফিসার্স ব্যাচে প্রশিক্ষণ গ্রহণকারী বঙ্গবন্ধুর জৈষ্ঠ্যপুত্র শেখ কামাল। তাদের তিনজনের বক্তব্য ছিল অনুপ্রেরণামূলক উৎসাহব্যঞ্জক। প্রশিক্ষণরত মুক্তিযোদ্ধারা শপথ নিলেন পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর একটি সদস্যও বেঁচে থাকা পর্যন্ত সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ অব্যাহত রাখবেন। এ সমাবেশে মুজিব ক্যাম্পের কমান্ডিং অফিসার বিগ্রেডিয়ার বিপীন চন্দ্র জোশি ও অন্যান্য ভারতীয় সেনা কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। ভারতে মুজিব ক্যাম্প কিংবা মূর্তি ক্যাম্পে আমাদের প্রশিক্ষণ শেষ পর্যায়ে। এখন কোন প্লাটুন কোন সেক্টরে যাবে। আমাদের ২৫ প্লাটুনকে ভারতের পশ্চিম দিনাজপুরের হীমকুমারীতে দেয়া হলো। ব্রেভো কোম্পানীর দায়িত্বে নিয়োজিত কর্নেল সাহেবকে অনুরোধ করলাম আমাদের প্লাটুনকে কোচবিহার কিংবা জলপাইগুড়ি জেলার যেকোন সীমান্তে দেয়ার জন্য উনি রাজী হলেন। ব্রেভো কোম্পানীর ২৫প্লাটুন সহ অন্য একটি প্লাটুনকে পশ্চিম বঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলার মাথাভাঙ্গা মহকুমার শীতলখুচি সীমান্তে দেয়া হলো। ভারতীয় সেনাবাহিনীর তত্বাবধায়নে মুজিব ক্যাম্পে ৪৫দিন ট্রেনিং নিয়ে অস্ত্র (হালকা মাঝারি) পরিচালনা, সেতু, ব্রীজ, কালভার্ট, রেলওয়ে লাইন উড়িয়ে দেয়া অর্থাৎ বিস্ফোরক বিদ্যায় বিশেষ পারদর্শী হয়েছি। সেই সাথে ক্ষেপনাস্ত্র চালানো সহ গেরিলা যুদ্ধের কলা কৌশল আয়ত্ত করেছি। সর্বপরি আমাদেরকে অ্যান্টি পারসোনাল মাইন, অ্যান্টিট্যাংক মাইন, বুবি ট্রাফ স্থাপন ও বিস্ফোরন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছিল। মূর্তি ক্যাম্প থেকে সকালে আনুষ্ঠানিক ভাবে বিদায় নিয়ে ত্রিপালে ঢাকা দুটি কনভয়ে অস্ত্র, গোলাবারুদ, অন্যান্য সরঞ্জাম ও রসদপত্র সহ শীতলখুচির দিকে রওনা দিলাম। যথারিতী দীর্ঘযাত্রার পর শীতলকুখিতে পৌছিলাম। বিত্রসএফ ক্যাম্পের পার্শ্বে আমাদের জন্য তাবু খাটানো হয়েছে। অস্ত্র, গোলাবারুদ ও রসদ সমূহ অস্ত্রাগারে ও নঙ্গরখানায় জমা দিয়ে তাবুতে গিয়ে রাত্রিযাপন করলাম। পরদিন থেকে শুরু হলো রাতের আধারে সিংগীমারি ও গেন্দুগুড়ি সীমান্ত অতিক্রম করে হাতীবান্ধা অবস্থিত হানাদার বাহিনীর ক্যাম্পে আক্রমন। আমাদের আক্রমনের পদ্ধতি ছিল হিট এন্ড রান। প্রতি রাতেই আমরা আক্রমন পরিচালনা করে হানাদার পাকিস্তানী সৈন্যদেরকে আতংকিত ও ভীতসন্ত্রীত করে রাখতাম। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলার মাথাভাঙ্গা মহকুমার শিতলখুচির বিএসএফ-এর ক্যাম্পের পার্শ্বে স্থাপিত তাঁবুতে অবস্থান করে ২৫ প্লাটুনের মুক্তিযোদ্ধারা দিবারাত্রি আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে। সীমান্তের অতিনিকটে ভারতে বাংলাদেশী শরণার্থীদের বিশাল ক্যাম্প। সপ্তাহখানেক পর আমাকে নির্দেশনা দেয়া হলো, পাকিস্তানি হানাদারের বিরুদ্ধে আক্রমণের পাশাপাশি রাতে কিংবা দিনে শরণার্থী শিবিরগুলোর দেখভাল করতে হবে। তাই দিনে কিংবা রাতে ৮/১০ জনের একটি মুক্তিযোদ্ধার দল শরণার্থী শিবিরে পাহারা দিত। আমি মাঝে মধ্যে তদারকিতে যেতাম। একদিন আমাদের অপারেশনে ব্যস্ততার দরুন রাতে পাহারা দিতে যাওয়া হয়নি। দুর্ভাগ্যবশত ভোরে পাকিস্তানি হানাদারদের পাহারায় কয়েকজন রাজাকার শরণার্থী শিবিরের নিকট থেকে প্রাতঃকৃত্যে যাওয়া দু’জনকে ধরে নিয়ে যায়। পরে তাদের হত্যা করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে পাহাড়া জোরদার করায় আমাদের অবস্থানকারীন সময়ে শরণার্থী শিবিরের আর কেউই হত্যাকাÐের শিকার হয়নি। একদিন ১০/১২ জন গেরিলা মুক্তিযোদ্ধার সমন্বয়ে গঠিত দল নিয়ে ফজরের আজানের আগে হাতীবান্ধার গেন্দুগুড়িতে আক্রমণ পরিচালনা করি। মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পর্যাপ্ত পরিমাণ গোলা বারুদ থাকে না। তাই আমরা গেরিলা অভিযানে অধিক গুলি ব্যয় করতে পারতাম না। তাই গুলি চালানো বন্ধ করে সবাই চুপচাপ বসে আছি। হঠাৎ করে মানুষ সাদৃশ্য একটি ছায়া দেখলাম। যে ছায়াটি দ্রæত আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে। কাছাকাছি আসায় লক্ষ্য করলাম ইস্ট পাকিস্তান সিভিল আর্মস ফোর্সের (ইপিক্যাপ) পোশাক পরা এক ব্যক্তি। আমার এক সহযোদ্ধা বলল, স্যার গুলি চালাব। আমি বললাম, না। ইতোমধ্যে ইপিক্যাপ সদস্য দুহাত উপরে উঠিয়েছে। তাকে ধরে ফেলা হলো। সে বলল, ‘আমার বাড়ি নোয়াখালী জেলায়। ইপিআর সদস্য ছিলাম, এখন ইপিক্যাপে আছি। আমাকে হাতীবান্ধা সীমান্তে নিয়োজিত করা হয়েছে। আমি আপনাদের কাছে আত্মসমর্পণ করছি। আমি হানাদার পাকিস্তানী সৈন্যদের সাথে থেকে বাঙ্গালীকে হত্যা করতে পারি না তাই সুযোগ খুজছিলাম পালিয়ে আসার জন্য। আজ সুােযাগ পেয়েছি তাই মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে আত্মসমর্পণ করছি। তাকে আমাদের ক্যাম্পে নিয়ে গিয়ে ভারতীয় বিএসএফ কর্মকর্তার কাছে হস্তান্তর করলাম। রংপুর, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী ও দিনাজপুরের কিছু অংশ নিয়ে ৬নং সেক্টর। যা বর্তমান লালমনিরহাট জেলার চির মুক্তাঞ্চল পাটগ্রাম উপজেলার বুড়িমারী হাশর উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এই সেক্টর কমান্ডার ছিলেন বিমানবাহিনীর উইং কমান্ডার এম খাদেমুল বাসার। পরবর্তী সময়ে তিনি বিমানবাহিনীর প্রধান হয়েছিলেন এবং বিমান দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করেন। এই সেক্টরে গৌরবদীপ্ত ইতিহাস রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে এই সেক্টরে পরিদর্শনে এসেছিলেন মুজিব নগর সরকারের অর্থমন্ত্রী ক্যাপ্টেন মনছুর আলী। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আবু হেনা কামরুজ্জামান। উভয়েই সম্মুখ রণক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধাদের বাংকারে বাংকারে গিয়ে তাদেরকে উৎসাহ দিয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে আগস্ট মাসে পাকিস্তান রেডিও, টেলিভিশন ও পত্র-পত্রিকায় প্রচার করা হচ্ছিল, পূর্ব পাকিস্তানের সীমান্তে কতিপয় দুষ্কৃতিকারী গোলযোগ সৃষ্টি করছে। পাকিস্তান বাহিনী তাদেরকে প্রতিহত করে হটিয়ে দিয়েছে। বাস্তবে তখন মুক্তিযোদ্ধারা বিভিন্ন রণাঙ্গনে পাকিস্তানী হানাদারদের প্রতিহত করে চলছে। এই সেক্টরে দেশী এবং বিদেশী অনেক সাংবাদিক এসেছিলেন। তারা পাটগ্রামে এসে মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধের সংবাদ নিয়েছেন এবং তা প্রচার ও প্রকাশ করেছেন। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক ছিল মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে বৃটেনের শ্রমিক দলের এমপি ডোনাল্ট চেজওয়ার্থ তার ক্যামেরায় মুক্তাঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত ৬নং সেক্টরের বিভিন্ন রণাঙ্গনে যুদ্ধরত মুক্তিযোদ্ধাদের ভিডিও ধারণ করেন। তাছাড়াও তিনি পাটগ্রামে প্রতিষ্ঠিত মুজিব নগর সরকারের বিভিন্ন অফিস আদালতের ভিডিও চিত্র ধারণ করেন। তিনি যুদ্ধরত মুক্তিযোদ্ধাদের এই সকল ভিডিও চিত্র প্রথমে লন্ডনে ও পরবর্তীতে কমনওয়েথ রাষ্ট্রগুলোতে এই ভিডিও চিত্র প্রেরণ করেছিলেন। পাটগ্রাম থানার বাউরা সাব-সেক্টরের ভিডিও প্রদর্শনের সময় উচ্চারণ করেছিলেন, You see this is Patgram, This the Territory of Bangladesh. The Elected Leader have formed their own government. On the other hand, the Freedom Fighters are Fighting like anything against the brutal forces of Pakistan. The whole world should support this wore of liberation.এই ভিডিও চিত্র প্রদর্শনের পরে আন্তর্জাতিক বিশ্বে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত হওয়ার বিষয়টি স্বীকৃতি লাভ করে। ফলে পাকিস্তানের মিথ্যা প্রচারণা বিশ্ববাসীর কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। উল্লেখ্য বাংলাদেশে ১১টি সেক্টরের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত হলেও শুধুমাত্র ৬নং সেক্টর সম্পূর্ণ মুক্তাঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যুদ্ধ পরিচালনা করা হয়েছিল। তাইতো মহান মুক্তিযুদ্ধের গৌরবদীপ্ত লালমনিরহাট জেলার ৬নং সেক্টর। যুদ্ধকালীন সময়ে বর্তমান লালমনিরহাট জেলার পাটগ্রাম উপজেলা রংপুর সদরের একটি থানা ছিল। সেক্টরের অন্য কর্মকর্তাদের মধ্যে ছিলেন মেজর নওয়াজেস, ক্যাপ্টেন দেলওয়ার, ক্যাপ্টেন মতিয়ার, ক্যাপ্টেন ইয়াজ দানী। যুদ্ধকালীন সময়ে একদিন বিকালে মেজর ওয়াজেশের নেতৃত্বে একটি দল সৈন্য আমাদের শিতলকুচি ক্যাম্পে এসে বললেন, সন্ধ্যায় পাকিস্তানীদের শক্ত ঘাঁটি হাতীবান্ধায় আক্রমণ পরিচালনা করা হবে। মুক্তিযোদ্ধারা সামনে থাকবে আমরা পেছন থেকে সিক্স ইন মর্টার আর্টিলারি সাপোর্ট দেব। সেই সন্ধ্যায় হানাদারদের সঙ্গে উভয়পক্ষের তুমুল লড়াই হয়েছিল। হতাহতের সংখ্যা জানা যায়নি। গেরিলাযুদ্ধের কৌশল হচ্ছে আক্রমণ করো, দ্রæত স্থান পরিত্যাগ করো। ৬নং সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা ও সমন্বয়ের দায়িত্বে ছিলেন মুক্তি ক্যাম্পের কমান্ডিং অফিসার ব্রিগেডিয়ার বিপীন চন্দ্র যোশী (বিসি যোশী)। তিনি আমাদের শিতলখুচি ক্যাম্পে এলেন। তাঁকে অনুরোধ জানালে তিনি আমাদের দায়িত্বে নিয়োজিত ভারতীয় মেজর আরকে বালিকে নির্দেশ দিলেন অতিসত্বর আমাকেসহ কয়েকজনকে বাংলাদেশে পাঠাতে। এলএমজি, এসএলআর, এসএমজি, রাইফেল, গোলাবারুদসহ ভারত থেকে ৭ জনকে নিয়ে বাংলাদেশের দই খাওয়া ক্যাম্পে পৌঁচ্ছিলাম। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রথম ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছিল হাতীবান্ধা থানার দই খাওয়া সীমান্ত ফাঁড়ির পাশে একটি পরিত্যক্ত হিন্দুবাড়িতে। সেখানে মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে অবস্থান করলাম। সেখান থেকে দিবারাত্রি আক্রমণ পরিচালনা করা হতো। ইতোমধ্যে যুদ্ধক্ষেত্রে ২৭ প্লাটুন সেকেন্ড ইন কমান্ডার শফিকুল ইসলাম শহীদ হয়েছেন। সম্মুখযুদ্ধে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসার জন্য ভারতে নেয়া ছিল খুবই কষ্টকর। আহত মুক্তিযোদ্ধার রক্তে বহনকারী মুক্তিযোদ্ধারা রক্তস্নাত হতেন। কেউ বেঁচে থাকতেন। কেউ বা চিকিৎসার আগেই মারা যেতেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে মুক্তিযোদ্ধাদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা ছিল না বললেই চলে। তাদেরকে বাংলাদেশের পরিত্যক্ত গোয়াল ঘরে খর বিছিয়ে রাত্রিযাপন করতে হতো। যে রেশন কিংবা রেশনমানি দেওয়া হতো, তা ছিল প্রয়োজনের তুলনায় কম। মুক্তিযোদ্ধাদের গায়ে ভালো বস্ত্র ও পরনে সেন্ডেল ছিল না। লুঙ্গি, গামছা, শার্ট, গেঞ্জিই ছিল তাদের বস্ত্র। তাঁরা দুর্বিষহ জীবনযাপন করে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। তৎকালীন রংপুর জেলার সদর মহকুমার কালীগঞ্জ, আদিতমারী, হাতীবান্ধা থানা এবং কুড়িগ্রাম মহকুমার লালমনিরহাট থানায় ব্যাপক হত্যাকাÐ, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, নির্যাতন, নিপীড়ন করা হয়েছিল। এখানে অনেক গণকবর রয়েছে। ১৯৭১ সালে ১ রমজান হাতীবান্ধা উপজেলার চৌকিশাল গ্রামের ক্যাম্প থেকে কমান্ডার আশরাফুলের নেতৃত্বে ২৫ জনের একটি দল হাতীবান্ধার ভবানীপুর গ্রামে অভিযান চালায়। সেখানে পাকিস্তান বাহিনীর সঙ্গে তুমুল যুদ্ধ হয়। একপর্যায়ে হানাদার বাহিনীর আক্রমণের মুখে টিকতে না পেরে মুক্তিযোদ্ধারা ছত্রভঙ্গ হয়ে পিছু হটতে থাকেন। এমতাবস্থায় কালীগঞ্জ উপজেলার মদাতি গ্রামের শহীদ হাবিবুর রহমান ও কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার শহীদ খয়বর রহমান প্রাণ রক্ষার্থে একটি পুকুরে নেমে কচুরিপানা মাথায় দিয়ে নিশ^াস নিচ্ছিল। ভবানীপুর গ্রামের স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াত-শিবিরের সদস্যরা প্রথমে রাজাকারদেরকে ও পরে হানাদার বাহিনীকে মুক্তিযোদ্ধা দুজনের অবস্থান জানায়। সন্ধ্যার একটু আগে পাকিস্তান সৈন্য ও রাজাকাররা দুজনকে অস্ত্রসহ পুকুর থেকে তুলে নির্মম নির্যাতন করে হত্যা করে। রশি দিয়ে এদের লাশ গাড়ির পেছনে বেঁধে টেনে হেচড়ে নেয়া হয়। পরের দিন হাতীবান্ধা কলেজ মাঠে এই দুজনের লাশের উপর দিয়ে আর্মির গাড়ি চালিয়ে উল্লাস করা করেছিল। পরে শহীদ হাবিবুর রহমান ও শহীদ খয়বরের থেঁতলে যাওয়া লাশ ভবানীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দক্ষিণ পাশের একটি পুরোনো কুয়ায় ফেলে দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে এখানে শহীদ হাবিবুর রহমানের ও খয়বরের মাযার তৈরি হয়। যুদ্ধকালীন সময়ে মুক্তিযোদ্ধারা লালমনিরহাট-বুড়িমারী রেললাইনের ভোটমারী ও হাতীবান্ধা রেলওয়ে স্টেশনের মধ্যবর্তী স্থানের লাইন বিস্ফোরক দিয়ে উড়িয়ে দিয়েছিল। তাছাড়া মাইন স্থাপন ও বিস্ফোরক দিয়ে পাকিস্তানি হানাদারদের চলাচলের পথের ব্রিজ, কালভার্ট, সেতু ধ্বংস করেছিল। বাংলার মানুষের সার্বিক সহযোগিতা ছাড়া মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষে মুক্তিযুদ্ধ করা ছিল খুবই দুরূহ ব্যাপার। ১৯৭১ সালে ১/ডি কোম্পানি কমান্ডার ছিলেন নৌবাহিনীর সদস্য মাহাতাব উদ্দিন সরকার (বীরপ্রতীক)। আমি ছিলাম কোম্পানি সেকেন্ড ইন কমান্ড। কোম্পানি কমান্ডারের ভাই জানালেন, নীলফামারী জেলার আলম বিদিতর ইউনিয়নে অবস্থিত ক্যাম্পের কমান্ডারসহ ১১ জন রাজাকার মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে অস্ত্রসহ আত্মসমর্পণ করবে। কোম্পানি কমান্ডারের নেতৃত্বে আমরা ক্যাম্প থেকে অস্ত্র ও গোলাবারুদসহ ১৫ সদস্যের একটি দল বের হয়ে তিস্তা নদী পাড়ি দিয়ে ভোরের কিছুক্ষণ আগে রাজাকার ক্যাম্পের পার্শ্বে পৌঁছলাম। নদী পার হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিÑএমন সময় কোম্পানি কমান্ডারের বড় ভাই ওপার থেকে বললেন, তোমরা থামো। আমরা দাঁড়িয়ে থাকতাম। উনি বললেন, তোমাদের গভীর রাতে আসতে বলেছি। এখন ভোর হয়েছে। রাজাকারেরা সকলেই জেগে উঠেছে। কাজেই তোমরা এপারের যে কোনো বাড়িতে আশ্রয় নাও। আমরা এক বৃদ্ধের বাড়িতে আশ্রয় নিলাম। বৃদ্ধ ব্যক্তিটি অতি দ্রæততার সঙ্গে তার স্ত্রী, সন্তান, বউমা নাতি-নাতনিদের অন্য বাড়িতে নিয়ে গেলেন। আমরা ওনার বাড়ির বিভিন্ন ঘরে, ধানের গোলার নিচে, আশ্রয় নিয়ে মৃত্যুর প্রহর গুনছি। কেননা পাশে রংপুর ও সৈয়দপুর সেনানিবাস। সেখানে খবর গেলে আমাদের নিশ্চিত মৃত্যু। কারণ আমাদের কাছে যে অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ রয়েছে, তা দিয়ে এক ঘণ্টাও যুদ্ধ চালানো সম্ভব নয়। এছাড়া সাপোর্টিং ও কভারিং পার্টি নেই। আমরা সবাই দোয়া পড়ছি, আল্লাহকে স্মরণ করছি। দুপুর বেলা সামান্য মুড়ি ও পানি খেয়েছি। ক্রমেই বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমে এলো। আমরা সৃষ্টিকর্তার কৃপায় প্রাণে রক্ষা পেতে যাচ্ছি। কেননা সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে গেরিলা মুক্তিযোদ্ধাদের সক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। অতঃপর সন্ধ্যা নেমে এলে বৃদ্ধের প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিস্তা নদীর তীরে একটি বাড়িতে খাওয়া দাওয়া করলাম। রাতে আবারও তিস্তা নদী পাড়ি দিয়ে আমাদের ক্যাম্পে পৌঁছলাম। সেই বৃদ্ধ যদি আশ্রয় না দিতেন অথবা কোনো কারণে যদি রাজাকার ক্যাম্পে কিংবা রংপুর সেনানিবাসে সংবাদ দিত, তবে আমাদের সকলের মৃত্যু নিশ্চিত। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে আমরা স্বাধীনতাকামী মানুষের সর্বাত্মক সহযোগিতা পেয়েছি। খাদ্য, আশ্রয় ও পথের নির্দেশনা পেয়েছি। দেশ হানাদারমুক্ত হওয়ার পর আবারো কলেজে ফিরে গেছি। অবশেষে দেশমাতৃকার সেবার জন্য সাংবাদিকতা পেশা হিসেবে গ্রহণ করে আমি দৈনিক ইত্তেফাক, নিউনেশন ও বাংলাদেশ টেলিভিশনে লালমনিরহাট জেলা প্রতিনিধি হিসাবে কর্মরত রয়েছি। আমার সম্পাদনায় ২৯ বছর ধরে লালমনিরহাট। বার্তা পত্রিকা প্রকাশিত হচ্ছে। লেখক:সম্পাদক লালমনিরহাট বার্তা, কার্যালয়: শেখ কামাল জেলা স্টেডিয়াম, লালমনিরহাট। E-mail: lalbarta@gmail.com & shafqul1954@gmail.com