লালমনিরহাট বার্তা
উত্তরবঙ্গ থেকে আমার দেখা একাত্তরের স্মৃতি
পারভেজ এলাহী চৌধুরী : May 17, 2021, 6:56:22 PM সময়ে

উত্তরবঙ্গ থেকে আমার দেখা একাত্তরের স্মৃতি

মুক্তিযুদ্ধে লালমনিরহাট ...

নির্বাচন উত্তর লালমনিরহাট : ১৯৭১ সালের জানুয়ারিতে বাবা তার দীর্ঘ পুলিশ চাকুরী জীবনে এ প্রথম বারের মতো পূর্ব পাকিস্তান জেনারেল রেলওয়ে পুলিশের (জি.আর.পি) গোয়েন্দা কর্মকর্তা (আরআইও) হিসাবে বদলি হলেন। বাবা মা ও আমরা ৪ ভাইসহ ৬ জনের পরিবার জানুয়ারির শীতের বিকালে পৌঁছলাম ছোট শহর লালমনিরহাটে। আমাদের জন্য এই শহর নতুন হলেও বাবার জন্য একেবারে নতুন নয়। তিনি দুই দফায় প্রায় দীর্ঘ ১৪/১৫ বছর কুড়িগ্রাম মহকুমা গোয়েন্দা কর্মকর্তা (ডিআইও) ছিলেন। সেই সুবাদে কুড়িগ্রাম মহকুমার সকল অঞ্চলে নানা সময়ে সরকারি সফরে যেতেন। মূলত পশ্চিমে তিস্তা নদী থেকে পূর্বে ব্রহ্মপুত্রের পূর্বপাড়ের রউমারি পর্যন্ত যার বিশাল বিস্তৃতি। পাকিস্তান আমলে ও সম্ভবত ১৯৭৭ এর আগ পর্যন্ত কুড়িগ্রাম মহকুমা ছিল আয়তনে ও থানার সংখ্যায় সর্ব বৃহৎ মহকুমা। মোট ৮টি থানা যথাক্রমে- কুড়িগ্রাম, ঊলিপুর, চীলমারি, রউমারি, ভুরুঙ্গামারি, নাগেশ্বরি, ফুলবাড়ি ও লালমনিরহাট। তাই এই শহর ও তার অনেক লোকজন তার চেনা জানা। তবুও বাবা তাঁর চাকুরী জীবনের প্রায় শেষদিকে এটা ছিল তার জন্য একটা নতুন চ্যালেঞ্জ। তিস্তা নদীর পূর্বে এই লালমনিরহাট শহর একটি রেল জংশন হওয়ায় রেললাইন দ্বারা তিন ভাগে বিভক্ত অনেকটা ইংরেজি ‘এল’ অক্ষরের মতো। দক্ষিণে তিস্তা জংশন থেকে মহেন্দ্রনগর হয়ে রেল লাইন সোজা উত্তরে লালমনিরহাট এসে দুই ভাগ হয়েছে। একটি সোজা উত্তরে আরও ৭ কিঃ মিঃ মোগলহাট সীমান্তের ধরলা নদী পর্যন্ত চলে গেছে। অপরটি পশ্চিমে বাঁক নিয়ে আদিতমারী হয়ে আবার উত্তরে কালীগঞ্জ-হাতিবান্ধা-পাটগ্রাম ও সর্বশেষ বুড়িমারি সীমান্ত পর্যন্ত প্রায় ৯০ কিঃ মিঃ বিস্তৃত। লালমনিরহাট-মোগলহাট রেল লাইনের পূর্বপাড়ে ছিল রেলওয়ে বাজার, পুরান বাজার, থানা স্বাস্থ্য কেন্দ্র (বর্তমানে জেলা সদর হাসপাতাল), লালমনিরহাট হাই স্কুল, লালমনিরহাট থানা ও থানা সংলগ্ন আমাদের বাসা। লালমনিরহাট-মোগলহাট রেল লাইনের পশ্চিমে প্রধানত রেলওয়ে ইয়ার্ড, লোকোশেড, রেল দুর্ঘটনায় উদ্ধারকারি ট্রেন, ক্রেন ও সহযোগী গাড়ীর শেড, কর্মচারীদের বসবাসের এলাকা যা আপ-ইয়ার্ড কলোনী নামে পরিচিত, যা অধিকাংশই বিহারী অধ্যুষিত। লালমনিরহাট-আদিতমারী লাইনের দক্ষিণে মূল শহরের বিস্তৃতি, এখানে আছে লালমনিরহাট রেল জংশন স্টেশন, জি.আর.পি থানা (জেনারেল রেলওয়ে পুলিশ), বার্মা ইস্টার্ন তেল ডিপো, রেলওয়ে হাসপাতাল, সাহেব পাড়া (রেল কর্মকর্তাদের বাসস্থান), রেলওয়ে ট্রেইনিং স্কুল, ক্যাথলিক চার্চ ও স্কুল ও অন্যান্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, সাধারণের বসতি ও বাজার। সাপটানা সড়ক ছাড়াও শহরের পূর্ব ও পশ্চিম অংশ রেল স্টেশনের একটি বড় ওভার ব্রীজের দ্বারা সংযুক্ত। শহরের পূর্ব থেকে পশ্চিমে কমসময়ে ও সোজা-সুজি যেতে আমরা এই ওভার ব্রীজটি ব্যবহার করে থাকি। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়কালে উত্তর-পূর্ব আসামের যোগাযোগের কেন্দ্র হিসাবে লালমনিরহাটের গুরুত্ব অনেক বেড়ে যায় এবং সেই সময়ে শহরের ৩ কিঃ মিঃ উত্তর পশ্চিমে আদিতমারীর নিকট একটি বিমান বন্দর নির্মাণ করা হয় যা এখন পর্যন্ত ব্যবহার উপযোগি। বর্তমানে এই বিমান বন্দর ও রানওয়ে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে ও রক্ষণাবেক্ষণে আছে। কিছু অংশে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিজিবি) নানা স্থাপনা আছে। লালমনিরহাটে পূর্ব পাকিস্তান জেনারেল রেলওয়ে পুলিশের একটি আলাদা থানা বা কেন্দ্র আছে যাকে আমরা জি.আর.পি থানা বলি। এই জি.আর.পি থানা ও তাঁর পুলিশ ব্যারাক ছিল লালমনিরহাট স্টেশন সংলগ্ন। সভাবতই জি.আর.পি থানার জনবল ছিল লালমনিরহাট থানার দ্বিগুণেরও বেশী, প্রায় ৭০/৮০ জনের মতো। তাঁদের মধ্যে কিছু ছিল অবাঙ্গালী, তুলনায় লালমনিরহাট থানার লোকসংখ্যা প্রায় ৪০ জন এবং সবাই বাঙ্গালী । আমাদের বাসাটি ছিল লালমনিরহাট থানা সংলগ্ন মাঠের পশ্চিমে ও ইংরেজী অক্ষর ‘এল’ -এর মতো। সেজা ৩টি মাঝারি কামরা ও ২টি ছোট কামরা যার শেষেরটিকে নানা জিনিসপত্রের গুদাম হিসাবে ব্যবহাত হয়, এর পর আলাদা রান্নাঘর। সেকালে জ্বালানি কাঠের চুলায় রান্নায় প্রচুর ধোঁয়া হতো বলে রান্নাঘর একটু দূরে। যদিও মার কাছে একটি পরিবহনযোগ্য ধানের তুসের চুলাও ছিল যাতে ধুয়া অনেক কম হতো। বর্ষাকালে তার ব্যবহার হয়। বাসার পেছনে রান্নাঘরের সাথে ৫/৬ ফুট উচু বাঁশ ও টিনের বেড়া দিয়ে থানার মাঠ থেকে আলাদা করা তবে রান্না ঘরের পাশে একটি ছোট দরজা দিয়ে মাঠ পার হয়ে পেছন দিক দিয়ে থানায় যাওয়া যায়, সেখানে বাসার সীমানার ভেতর একটি বড় কাঁঠাল গাছ ছিল। নইলে বাসার সামনের দরজা দিয়ে রাস্তা দিয়ে বেশ ঘুরে থানায় যেতে হয়। বাবা সচারচর পেছনের দরজাই বেশি ব্যবহার করতেন। বাসার দক্ষিণ দিকে একটু খালি জায়গায় কিছু সব্জীর বাগান আছে যদিও সেগুলো আমাদের আসার আগেই লাগান ছিল। কুড়িগ্রামে বাবা মা উভয়েই সবজীর বাগান ও উন্নত জাতের মুরগী পালন করতেন, যেখান থেকে আমাদের অনেক সবজী ও ডিমের চাহিদা মিটত। বাবা তার সবজীর বাগানে উন্নত জাতের সবজী ফলিয়ে দুই বার কুড়িগ্রাম মহকুমা শীতকালীন মেলায় পুরস্কার পেয়েছিলেন। সবজীর বাগানের পর উঁচু পাকা দেয়াল ঘেরা একটি বিহারী যৌথ পরিবারের বড় বাড়ী। তারা পাইকারি আড়ত ব্যবসায়ী পরিবার। তিন ভাই ও তাঁদের বয়স্ক মা’কে নিয়ে বিরাট স্বচ্ছল পরিবার। বড়ভাই জান মোহাম্মদ, তার স্ত্রী ও দুই ছেলে ও এক মেয়ে। মেজোভাই নূর মোহাম্মদ, তার স্ত্রী ও এক ছেলে। সব ছোট ভাই রাফি মোহাম্মদ, বয়স ১৯/২০, লালমনিরহাট কলেজের ছাত্র। পরিবারের দুই বোন বিবাহিত, তাঁদের মধ্যে বড় বোন রংপুরে ও ছোটবোন সৈয়দপুরে থাকেন। পৈতৃকভাবে পাওয়া বড় দুই ভাইয়ের দুইটি আড়ত রেলওয়ে বাজারে আছে। সে সব আড়তে তাঁদের বেশ কিছু বাঙালী কর্মচারীও আছেন। বাবার সাথে এই ব্যবসায়ী পরিবারের জানাশোনা অনেক আগে থেকে। যখন তাঁদের বাবা বেঁচে ছিলেন ও নিজে ব্যবসা চালাতেন। রংপুর ও সৈয়দপুরে যেসব পরিবারে এই বাড়ির দুই মেয়েদের বিয়ে হয়েছে তাদেরকেও বাবা জানতেন। গোয়েন্দা কর্মকর্তা হিসাবে শহরের অনেক মানুষকে জানাও একটা কাজ। তবে যাওয়া-আসা না করলেও মা সৈয়দপুরে তাঁদের ছোটবোনের শ্বশুর বাড়ীকে জানতেন। যার কারণে পাশের বাড়ির প্রতিবেশী বিহারী হলেও ঐ বাড়ির বয়স্ক দাদীমায়ের সাথে আমার মায়ের ভালই সম্পর্ক সৃষ্ট হয়। মা উর্দু না জনলেও বুঝতে পারতেন যদিও তারা সঠিক উর্দু বলতোনা। সেভাবেই আমাদের মা কুড়িগ্রাম, রংপুর, সৈয়দপুর ও সবশেষে লালমনিরহাটে তার প্রতিবেশীদের সাথে ভালো সম্পর্ক রেখে গেছেন। আমাদের বাসার সামনেই একটা রেলওয়ে কর্মচারীদের কলোনী আছে যেখানে অধিকাংশই অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীগণ বাস করেন এবং বেশিরভাগই বাঙ্গালী অধ্যুষিত। কিছুদিনের মধ্যেই সেখানে বাঙালী রেল কর্মচারী খন্দকার বেলায়েত হোসেনের (পরবর্তীকালে তিনি আমাদের সাথে ধরা পড়েন ও শহিদ হন) পরিবারের সাথেও আমাদের পরিচয় হয়। তাঁদের ছেলে ২১/২২ বছরের এ কে এম কামরুল হোসেন বকুল সক্রিয়ভাবে ছাত্র রাজনীতিতে জড়িত ছিলেন ও পরে ভারতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগদেন। আমাদের এই বাসায় আসার পর জানলাম, লালমনিরহাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাও বদলী হয়েছেন ও নতুন আরেক কর্মকর্তা কিছুদিনের মধ্যেই জয়েন করবেন। যা সব সরকারি চাকুরীজীবীদের একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, তবে থানার সহকারি কর্মকর্তা জনাব আব্দুল কাইয়ুম যিনি তার পরিবার ছাড়া একাই থানা এলাকায় তার বাসায় থাকেন। থানার সাথেই পুলিশ কনস্টবলদের জন্য ব্যারাক আছে। সবার আশা এবার নির্বাচনের পর হয়ত সব বৈরী পরিবেশের অবসান হবে এবং দেশে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে। নির্বাচনের আগে বাঙ্গালী-বিহারী সম্পর্কের যে অবনতি হয়েছিল তা ধীরে ধীরে পরিবর্তন হবে। মা তার নতুন বাসা ও সংসার গোছাতে ব্যস্ত, বাবা তার সম্পূর্ণ নতুন জি.আর.পি গোয়েন্দা কর্মকর্তার কাজ বুঝে উঠতে ব্যস্ত, আমরাও আমাদের পড়াশোনায় ব্যস্ত হওয়ার চেষ্টা করছি। আগামী সংখ্যায় ‘উত্তরবঙ্গ থেকে আমার দেখা একাত্তরের স্মৃতি’ পর্ব-৩